Home LATEST NEWS BANGLA কঠিন প্রতিপক্ষ ও ইতিহাসের মুখোমুখি ব্রাজিল-নরওয়ে এবং ইংল্যান্ড-মেক্সিকো

কঠিন প্রতিপক্ষ ও ইতিহাসের মুখোমুখি ব্রাজিল-নরওয়ে এবং ইংল্যান্ড-মেক্সিকো

5
0

Source : BBC NEWS

ব্রাজিল বা নরওয়ে

ছবির উৎস, Getty Images

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া দল ব্রাজিল সর্বশেষ শিরোপা জিতেছিল ২০০২ সালে। এরপর থেকে প্রতিটি আসরেই ব্রাজিল হেক্সা বা ষষ্ঠবার জেতার আশায় খেলতে নেমে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে।

চলতি বিশ্বকাপে গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দ্বিতীয় রাউন্ডেও জাপানকে হারিয়ে দলটি রাউন্ড অফ ১৬ এ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে এবং বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন টিকিয়ে রেখেছে।

তবে, এ রাউন্ডেই ব্রাজিল সেই বাঁধার মুখোমুখি হবে, যা গত পাঁচ আসরে ল্যাটিন আমেরিকার দলটি পার হতে ব্যার্থ হয়েছে।

আর তা হচ্ছে, নক আউট পর্বের ইউরোপীয় দল।

ফলত, জুলাইয়ের পাঁচ তারিখ (বাংলাদেশ সময় ছয়ই জুলাই রাত দুইটায়) নিউ ইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে ব্রাজিল যখন নরওয়ের মুখোমুখি হবে, সে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে হলে ইউরোপীয় দলটির সাথে ইতিহাসকেও মোকাবিলা করতে হবে।

জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ২০০৬ সালের বিশ্বকাপটা ব্রাজিল শুরু করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে। সে সময়ে দুনিয়ার অন্যতম সেরা দলটা ফেভারিট হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইউরোপের দল ফ্রান্সের।

সে ম্যাচে থিয়েরি অরির একমাত্র গোলে বিদায় নেয় ব্রাজিল।

পরের আসরে ২০১০ সালে দক্ষিন আফ্রিকায় কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল মুখোমুখি হয় নেদারল্যান্ডের। প্রথমে গোল দিয়ে এগিয়ে গেলেও শেষতক ২-১ গোলে হেরে যায় দলটি।

নিজেদের দেশে হওয়া টুর্নামেন্টে ২০১৪ সালে ব্রাজিল সেমিফাইনালে পৌঁছায়, কিন্তু সেই ম্যাচে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরে গেলে আবারো ইউরোপের দলের কাছে স্বপ্নভঙ্গ হয়।

ভিনিসিয়াস

ছবির উৎস, Getty Images

একই ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন থাকে ২০১৮ সালে রাশিয়াতেও। সে আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলে হারে ব্রাজিল।

গত আসর অর্থাৎ ২০২২ সালে কাতারেও ব্রাজিল হারে কোয়ার্টার ফাইনালে। সেবার প্রতিপক্ষ ছিলো ক্রোয়েশিয়া আর ব্যাবধান ছিলো ২-১।

চলতি আসরে এই ধারা ছেদ করতে হলে ব্রাজিলের নরওয়েকে হারাতে হবে। তবে, নরওয়েকে হারাতে হলেও দলটিকে নতুন ইতিহাস তৈরি করতে হবে।

এ পর্যন্ত ইউরোপীয় দলটির বিপক্ষে চারবার মুখোমুখি হলেও এখনো জিততে পারেনি ব্রাজিল। হেরেছে দুইটি ম্যাচ আর ড্র করেছে দুইটিতে।

আর বিশ্বকাপেও এই দুই দলের মধ্যে একমাত্র দেখায় জিতেছিলো নরওয়ে। ১৯৯৮তে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত সেই আসরে ব্রাজিল ফাইনালে উঠলেও গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ২-১ গোলে যায় নরওয়ের বিপক্ষে।

ইতিহাস বাদ দিলেও নরওয়ের বিরুদ্ধে আজ ব্রাজিলকে যথেষ্ঠ বেগ পেতে হবে বলেই ধারনা করা হচ্ছে।

ফ্রান্সের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে ৪-১ গোলের ব্যাবধানে হারলেও সেনেগাল ও ইরাককে হারিয়ে নরওয়ে গ্রুপের রানারআপ হয়েছে।

রাউন্ড অব ৩২-এ তারা আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জয় করেছে।

নরওয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা আর্লিং হালান্ড। বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে তিনি অল্প সুযোগ থেকেই গোল বের করে আনতে সক্ষম।

তার সঙ্গে মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা এবং আলেকজান্ডার সোরলথের শারীরিক উপস্থিতি নরওয়ের আক্রমণকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

নরওয়ে সাধারণত দ্রুতগতির ভার্টিকাল আক্রমণ এবং লং বলের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করে।

এই ম্যাচে নরওয়ের কৌশল হতে পারে পাল্টা আক্রমণ নির্ভর।

হালান্ডের ওপর সব মনোযোগ থাকায়, কোচ স্তোলে সোলবাক্কেন হয়তো তার উইং খেলোয়াড়দের ব্রাজিলের দুর্বল ফুলব্যাক পজিশনে আক্রমণ চালাতে উৎসাহিত করতে পারেন, বিশেষ করে আন্তোনিও নুসাকে দিয়ে, এবং দ্রুতগতির জন্য সোরলথের বদলে অস্কার বব-কে বিবেচনা করা হতে পারে, কারণ ট্রানজিশনে আঘাত হানাই তাদের জেতার সেরা সুযোগ।

আর্লিং হালান্ড

ছবির উৎস, Getty Images

তবে নরওয়ের দুর্বলতাও রয়েছে। এই বিশ্বকাপে তারা গোল করলেও রক্ষণে ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি এবং শক্তিশালী আক্রমণভাগের বিপক্ষে বেশ কয়েকবার বিপদে পড়েছে।

ব্রাজিলের মতো বহুমুখী আক্রমণের বিরুদ্ধে এই দুর্বলতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ব্রাজিল দলও মাষ্টার ট্যাকটিশিয়ান কার্লো আনচেলত্তির অধীনে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে।

প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে হতশ্রী ফুটবল খেলে ড্র করলেও পরের ম্যাচগুলোতে ব্রাজিল দাপটের সাথে জিতেছে।

দ্বিতীয় রাউন্ডে জাপানের বিপক্ষে প্রথমার্ধে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে কৌশল পরিবর্তন করে আক্রমনের ধারা অনেক বাড়িয়ে শেষ মূহুর্তের গোলে ২-১ গোলের দারুন এক জয় পায়।

ব্রাজিল দলের এখন প্রানভোমরা হচ্ছে ভিনিসিয়াস জুনিয়র। তিনি এই বিশ্বকাপে বাম দিক দিয়ে বিপক্ষ দলগুলোর জন্য ত্রাস ছড়াচ্ছেন।

তার গতি ও ড্রিবলিং ঠেকাতে রক্ষনভাগের খেলোয়াড়দের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফ্রান্সের বিপক্ষে চারগোল হজম করা নরওয়ের রক্ষনের জন্য ভিনি ছাড়াও চিন্তার কারন হতে পারেন দুই গতিশীল তরুন এন্ড্রিক এবং রায়ান।

জাপানের বিপক্ষে দুইজনেই দারুন খেলেছেন। জাপানের বিপক্ষে সাবস্টিউট নেমে গোল করা অভিজ্ঞ মার্তিনেল্লীও এই ম্যাচে চমক দেখাতে পারেন।

প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের মিডফিল্ডকে তেমনভাবে খুঁজে পাওয়া না গেলেও ধীরে ধীরে ব্রুনো গিমারেস মধ্যমাঠের কান্ডারী হয়ে উঠছেন।

ইতিমধ্যেই তিনি চারচারটি এসিস্ট করেছেন। অভিজ্ঞ কাসেমিরো এবং পাকেতার ইঞ্জুরি সমস্যা অবশ্য ব্রাজিলের জন্য চিন্তার কারন হতে পারে।

অন্যদিকে ডিফেন্সে ব্রাজিলের হয়ে আছেন গ্যাব্রিয়েল ও মারকিউনিওস। আর্সেনালে খেলা গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে ম্যানচেষ্টার সিটির হয়ে খেলা হালান্ডের দ্বৈরথ আজ খুবই দারুন হতে পারে।

হালান্ডের দলকে পেছনে ফেলেই এই বছর লীগের শিরোপা জিতেছে গ্যাব্রিয়েলের দল।

হ্যারি কেইন

ছবির উৎস, Getty Images

আর, গ্যাব্রিয়েলদের শেষ ভরসা হিসেবে থাকবেন বর্তমান দুনিয়ার অন্যতম সেরা গোলরক্ষক, লিভারপুলে খেলা এলিসন বেকার।

ব্রাজিলের আরেকটা অস্ত্র হতে পারে নেইমার। তবে, বহুদিন ধরেই তিনি অনুপস্থিত। ইনজুরিতে জর্জর। এই বিশ্বকাপে খেলেছেন মাত্র ১৪ মিনিট।

এই মাপের খেলোয়াড়রা জরুরি মুহুর্তে জ্বলে উঠতে পারেন এই আশাতে থাকবেন ব্রাজিল সমর্থকেরা।

তবে, সব ছাপিয়ে ব্রাজিলের সম্ভবত সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে তাঁদের কোচ কার্লো আনচেলত্তি।

ক্লাব পর্যায়ে অসংখ্যা ট্রফি জেতা এই ইতালীয় ইতিমধ্যেই নিজেকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং এ বিশ্বকাপেও তিনি নিজের জাত চেনাচ্ছেন।

আনচেলত্তিকেও ইতিহাসের মুখোমুখি হতে হবে। এই যাবতকালে কোন বিদেশি কোচ বিশ্বকাপ জেতেননি।

তবে, নামটা যেহেতু আনচেলত্তি, সে আশা করাই যায়। সেই ইঙ্গিতও তিনি দিচ্ছেন।

দিনের অপর ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর বিরুদ্ধে খেলাতেও ইতিহাসের মুখোমুখি হতে হবে ইংল্যান্ডকে।

ম্যাচের ভেনু মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এজটেকা স্টেডিয়াম যেখানে চল্লিশ বছর আগে দিয়াগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুইটি গোল দেন, যার একটি হ্যান্ড অফ গড এবং অপরটি গোল অফ দ্যা সেঞ্চুরী নামে পরিচিত।

শুধু তাই না, এই মাঠে স্বাগতিক মেক্সিকো ৮৯ ম্যচ খেলে মাত্র ২টিতে হেরেছে। বিশ্বকাপের ১০ ম্যাচের কোনটিতে হারেনি।

মেক্সিকো সিটির গড় উচ্চতা প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট, যা ইংল্যান্ডের জন্য অস্বস্তির কারন হবে।

এছাড়াও, স্বাগতিক দেশটি দারুন ফর্মে আছে। এখনো পর্যন্ত চার ম্যাচের সবকয়টিতে জেতা মেক্সিকো একটি গোলও হজম করেনি।

মেক্সিকোর আক্রমণভাগে রাউল হিমেনেস ও হুলিয়ান কিনিওনেসের জুটি এই টুর্নামেন্টে দারুণ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষ করে আগের রাউন্ডে তাদের নৈপুণ্য নজরকাড়া ছিল।

তবে, মেক্সিকোর প্রধান শক্তি তাদের সম্মিলিত দলগত ফুটবল। তারা কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং মাঝমাঠের দ্রুত পাস, উইং দিয়ে আক্রমণ এবং উচ্চ গতির ট্রানজিশনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে।

প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ক্রমাগত নড়াচড়া করিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি করাই তাদের অন্যতম কৌশল।

মেক্সিকোর আক্রমণভাগে রাউল হিমেনেস

ছবির উৎস, Getty Images

অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাদের আক্রমণভাগ। অধিনায়ক হ্যারি কেইন এখনও দলের প্রধান গোলমুখী অস্ত্র।

ডিআর কংগোর বিপক্ষে শেষ ম্যাচে প্রচন্ড চাপের মুখে দুই গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন কেন তাকে দুনিয়ার অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার বিবেচনা করা হয়।

কেনের পাশাপাশি জুড বেলিংহামের সৃজনশীলতা, বুকায়ো সাকার গতি, ফিল ফোডেনের টেকনিক এবং ডেকলান রাইসের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ ইংল্যান্ডকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছে।

ইংল্যান্ড সাধারণত বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্যশীল আক্রমণ গড়ে তোলে এবং প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষায় থাকে।

তবে, ইংল্যান্ডের দুর্বলতাও রয়েছে।

প্রতিপক্ষ যখন দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যায়, তখন তাদের রক্ষণভাগ মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দেয়।

বিশেষ করে ফুল-ব্যাকরা ওপরে উঠে গেলে পিছনের স্পেস কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়। মেক্সিকো এই দিকটিই কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।

এই ম্যাচে মাঝমাঠের লড়াইটিই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

যদি বেলিংহাম ও রাইস খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে ইংল্যান্ড ম্যাচের ছন্দ নিজেদের হাতে রাখতে পারবে।

কিন্তু মেক্সিকো যদি দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করে কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করতে পারে, তাহলে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে।

সব মিলিয়ে একটি রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ হবে বলেই ধারনা করা হচ্ছে।

তবে, এই ম্যাচে জিতলে সামনে আরো বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করবে, কারন এই ম্যাচের বিজয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে ব্রাজিল বনাম নরওয়ের মধ্যেকার খেলার বিজয়ী দলের।