Home LATEST NEWS BANGLA চট্টগ্রামে ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা কেন?

চট্টগ্রামে ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা কেন?

5
0

Source : BBC NEWS

পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন

চট্টগ্রামে একটি মামলার সাক্ষী একজন পুলিশ সদস্য। কিন্তু বদলি হয়ে তিনি বর্তমানে খুলনায় কর্মরত আছেন। মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে চট্টগ্রামে আসতে হবে, কিন্তু অনেকদিন ধরেই তিনি উপস্থিত হননি বা হতে পারেননি।

এটি একটি উদাহরণ হিসাবে বলা হলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালতে জমে থাকা অনেক মামলার ক্ষেত্রে এই জটিলতা বেশ পরিচিত। এর ফলে দিনের পর দিন মামলার তারিখ যেমন পেছাতে থাকে, তেমনি বিলম্বিত হয় সামগ্রিক বিচার প্রক্রিয়া।

দেশের বিচার প্রক্রিয়ায় এই বিষয়টিকে একটি পদ্ধতিগত জটিলতা হিসেবেই দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এটি সমাধান করা সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি যে কেবল পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রেই ঘটে, বিষয়টি এমন নয়। সাধারণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সাক্ষ্য গ্রহণ নিয়ে এমন জটিলতার অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি, চট্টগ্রামের আদালতে বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষ্য দিতে না আসা প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার একটি সংবাদ নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চট্টগ্রামের আদালত এবং পুলিশের একাধিক দাপ্তরিক চিঠি পর্যালোচনা করে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে যে, পুলিশ সদস্যরা কেন দীর্ঘদিন ধরে মামলার সাক্ষ্য দিতে আসেননি? আর পুলিশের যে-সব সদস্যের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়েছে, তাদেরকে কি গ্রেফতার করা হবে?

চট্টগ্রাম পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য এরই মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। বর্তমানে চট্টগ্রামে কর্মরত কিংবা অতীতে সেখানে কর্মরত ছিলেন এমন সদস্যদের আদালত নির্ধারিত তারিখে হাজির হতে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষী দিতে না আসা সদস্যদেরকে সমন জারি করেছে আদালত, এটি গ্রেফতারি পরোয়ানা নয়।

সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় মামলার কার্যক্রমও পিছিয়ে যায়

গ্রেফতারি পরোয়ানা কেন?

চট্টগ্রাম পুলিশের বর্তমানে কর্মরত ও বিভিন্ন ইউনিটে বদলি হওয়া প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘নন-বেইলেবল ওয়ারেন্ট বা এনবিডব্লিউ’ বা ‘অজামিনযোগ্য পরোয়ানা’।

জানা গেছে, এসব পুলিশ সদস্য চট্টগ্রামের আদালতে বিচারাধীন বিভিন্ন মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হলেও নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

মূলত, একজন সাক্ষীকে মামলার নির্দিষ্ট তারিখে সাক্ষ্য দিতে আদালতে উপস্থিত হতে হয়। কোনো কারণে সে ওই দিন আদালতে উপস্থিত হতে না পারলে পরবর্তীতে আবারও তাকে হাজির হওয়ার দিন দেওয়া হয়।

এভাবে দিনের পর দিন তারিখ দেওয়ার পরও যদি কোনো সাক্ষী আদালতে উপস্থিত না হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে সমন জারি বা হাজির হওয়ার লিখিত আদেশ জারি করে সংশ্লিষ্ট আদালত।

কিন্তু এরপরও যদি সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত না হয়, তখন আদালত ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এনবিডব্লিউ বা নন-বেইলেবল ওয়ারেন্ট ফর উইটনেস জারি করে।

অর্থাৎ সাক্ষ্য গ্রহণের জটিলতায় সংশ্লিষ্ট মামলার বিচার প্রক্রিয়া যে দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে, সেটিকে ত্বরান্বিত করতে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেয় আদালত।

“বারবার সমন জারি করার পরও না আসার কারণেই এবার এনবিডব্লিউ দেওয়া হয়েছে। এটাকে গ্রেফতারি পরোয়ানা বলা যাবে কিন্তু তারা আসামি না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন চট্টগ্রাম মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোঃ মফিজুল হক ভূঁইয়া।

মি. ভূঁইয়া বলছেন, আসামিকে গ্রেফতার করা এবং সাক্ষীকে এভাবে আসার জন্য তলব করা এক বিষয় নয়।

চট্টগ্রামে যে সাতশ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এনবিডব্লিউ দেওয়া হয়েছে, সেটি কোনো একক আদালতের নয় বলেও জানান তিনি।

এসব মামলা চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চ, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ আদালত ও শিশু আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন।

“চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ, তার অধীনে এডিশনাল আছে ছয়টা, যুগ্ম আছে বারোটা। এভাবে জেলা ও দায়রা জজের আছে। সব মিলিয়ে যে-সব কোর্টে সাক্ষীরা আসছে না সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে এনবিডব্লিউ হচ্ছে। এটা যে শুধু পুলিশের জন্য হচ্ছে তা নয়,” বলেন মি. ভূঁইয়া।

পুলিশ অবশ্য এই বিষয়টিকে গ্রেফতারি পরোয়ানা না বলে বরং সমন জারি বা হাজির হওয়ার লিখিত আদেশ হিসেবেই উল্লেখ করছে।

“এটা আসলে সাক্ষীর সমন। যখন দুই-তিনটা ফেইল করে তখন আদালত এনবিডব্লিউ দেয়। পুলিশের যে সাতশ জনকে এটি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনে ২৫৮ জন কর্মরত আছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল চৌধুরী।

তিনি জানান, সাক্ষী হিসেবে সাধারণ ব্যক্তি কিংবা পুলিশ সদস্যদের সমন জারির বিষয়টি নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন আদালতেই সাক্ষীদেরকে এভাবে তলব করার প্রক্রিয়া রয়েছে।

ঢাকার নিম্ন আদালতে প্রিজন ভ্যানে একজন আসামি (ফাইল ছবি)

এই জটিলতা নতুন নয়

আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর, সাক্ষীদের হাজির করতে দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ‘অতীব জরুরি’ চিঠি পাঠাচ্ছে সিএমপি। চিঠিতে পুলিশ সদস্যদের অনুপস্থিতিকে মামলার নিষ্পত্তির ‘প্রধান অন্তরায়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্ধারিত তারিখে সাক্ষী হাজির না হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫(ক) ধারায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।

সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য নির্ধারিত এসব পুলিশ সদস্যের অধিকাংশই একসময় নগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত ছিলেন।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল চৌধুরী বলছেন, একজন পুলিশ সদস্য চট্টগ্রামে কর্মরত থাকা অবস্থায় যে-সব মামলায় সাক্ষী ছিলেন, পরবর্তীতে তার বদলি যদি রংপুরেও হয় সাক্ষ্যগ্রহণের দিনে তাকে চট্টগ্রামে আসতে হয়।

ফলে মামলার নির্ধারিত দিনে যদি ওই পুলিশ সদস্য হাজির হতে না পারেন এবং এরকম ঘটনা একাধিক দিন ঘটে, তখন তাকে আদালত সমন জারি করেন।

মি. চৌধুরী বলছেন, “চলমান কাজ, মামলা, তদন্ত এগুলোর মধ্যেই পুরোনো মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য যেতে হয়। অনেক সময়, দেখা যায় বিজ্ঞ আদালত থেকে আজকে সমন আসছে, কালকে সাক্ষ্য, ফলে নির্ধারিত সময় পৌঁছানো সম্ভব হয়না।”

এছাড়া দীর্ঘদিন যেহেতু মামলার প্রক্রিয়া চলমান থাকে, অনেক সময় চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পরও পুলিশের অনেক সদস্যকে সাক্ষীর জন্য আদালত ডেকে পাঠায়।

“যারা কর্মরত আছে, তাদের সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ভাতা (ভ্রমণ ও নিয়মিত) দেওয়া হয়, কিন্তু যারা অবসরে গেছেন তাদের কোনো ভাতা নাই, ফলে অনেকে আসেন না। আবার অনেকে দেখা গেছে বেঁচেও নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ম. চৌধুরী।

বাংলাদেশে মামলা নিয়ে এই জটিলতা নতুন নয়। নানা কারণে মামলার তারিখ পেছাতে থাকে। যার ফলে সাক্ষীদেরকে তলব করার বিষয়টিও পুরোনো।

এই প্রক্রিয়াটি দেশের বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতার একটি বড়ো কারণ বলেই মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।

তিনি বলছেন, আদালত থেকে সমন পাওয়ার পর তা রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর কাছে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক সময় সমন যথাসময়ে কার্যকর হয় না।

“বারবার সমন জারি করার পর সাক্ষী না আসলে ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়। ওয়ারেন্ট অব অ্যারেস্ট, শব্দটা একই কিন্তু এর ফোর্সটা এক না। আসামির জন্য হলো তাকে ডিটেইন করা, আর সাক্ষীর জন্য ওয়ারেন্ট হলো তাকে আদালতে আসতে বাধ্য করার জন্য,” বলেন তিনি।

এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে সমনে সাক্ষীর বিপি নম্বর না থাকায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য বর্তমানে কোথায় কর্মরত, সেটি শনাক্ত করতেও সমস্যা হয়।

সাক্ষ্য গ্রহণের এই প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত বা দীর্ঘয়িত করে বলেও মনে করেন মি. মোরসেদ।

তিনি বলছেন, “দেশে অপরাধ প্রবণতা এবং সংখ্যা অতীতের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে আগের নিয়মেই যদি বিচার প্রক্রিয়া চলে, তাহলে মামলার জট কমানো কঠিন।”