Home LATEST NEWS BANGLA ঢাবির সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির সিদ্ধান্ত ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, কী বলছে আইন?

ঢাবির সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির সিদ্ধান্ত ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, কী বলছে আইন?

4
0

Source : BBC NEWS

(বা থেকে) অধ্যাপক সাদেকা হালিম, শফিকুল ইসলাম, আফরোজা শেলী, আব্দুল মুহিত, রফিকুল ইসলাম, আবু সারা শামসুর রউফ ও মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাময়িক বরখাস্ত ও অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষকরা তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ বলে বর্ণনা করেছেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। তবে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করার অভিযোগকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ তিনজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, আর চারজনকে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এই শিক্ষকদের প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। তাদের অনেকেই বলছেন, তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু নীল দলের সমর্থক হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সাতজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে সাদা দলের পক্ষ থেকে। তারা বলছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নীল দল হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের একটি ফোরাম বা প্যানেল। আর সাদা দলের ব্যানারে যে শিক্ষকেরা রয়েছেন, তারা মূলত বিএনপি সমর্থক।

নীল দলের শিক্ষকদের অভিযোগ, শুধু সাতজনই নয়, নীল দলের মোট ২৩১ জন শিক্ষককে জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা ও ফ্যাসিবাদের সমর্থনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনি প্রক্রিয়া–এই তিনটি বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল

ছবির উৎস, Getty Images

যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

গত মঙ্গলবার, ২৮শে জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় “জুলাইয়ের চেতনা বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সংগঠনের বিরুদ্ধে” কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, পৃথক পৃথক অভিযোগে তিন জন শিক্ষককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া, চার জন শিক্ষককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এই তালিকায় আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সাদেকা হালিমও। তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

“শ্রেণিকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে অশিক্ষকসুলভ আচরণ, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ-সহ বিভিন্ন অভিযোগে” তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার কথা জানানো হয়।

এছাড়া, বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং তথ্যানুসন্ধান কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. আফরোজা শেলীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেট সভায় নেওয়া হয় বলে বলা হয় ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা পরিপন্থি কার্যক্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও সরকার বিরোধী অপপ্রচার এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ ও হুমকি প্রদানের অভিযোগে” ক্লিনিক্যাল ফার্মেসী ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

একই অভিযোগে ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সারা শামসুর রউফ এবং শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলামকেও একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে।

আর, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনের বিষয়ে অভিযোগ– তিনি নানাবিধ অনিয়মের সাথে যুক্ত এবং এম.ফিল ও পিএইচ.ডি থিসিসের মধ্যে সাদৃশ্যমূলক চৌর্যবৃত্তি করেছেন। তাই, তাকেও সকল দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এদের একেকজনের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগ আছে। তবে জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াটা তো অবশ্যই একটা মূল কারণ। এটা কমন।”

কলা ভবনের সামনে অপরাজেয় বাংলাদেশ

বরখাস্ত ও অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষকদের প্রতিক্রিয়া

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যাপক সাদেকা হালিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বরখাস্ত হওয়া অধ্যাপক ড. আফরোজা শেলীর দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের স্বপক্ষে কাজ করেছেন এবং রেফারেন্স হিসেবে তিনি বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে তাকে দেখা গিয়েছিলো

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন উপাচার্য মিটিং ডেকেছিলেন এবং সেই সময় বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে ওই মিটিং-এ যেতে হয়েছিলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি তখন কোনো স্পিচ দেইনি। ফিরে এসে কোনো স্টেটমেন্ট দেইনি। কোনো কিছু এপ্লাই করিনি। কিন্তু সেই মিটিং-এ অংশ নেওয়াটাকে তারা (বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ) ইস্যু করেছে।”

“ওরকম (নির্দিষ্ট) করে তো কিছু বলে নাই। তারা শুধু আমাকে চিঠি দিয়েছে, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।”

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে এমনকিছু পাওয়া যায়নি, যার কারণে তার বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে, বলেন অধ্যাপক আফরোজা শেলী।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে “রাজনৈতিক” বিবেচনা কাজ করেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “২০২১-এ জয়েন করি আমি, তখন অনেক মিটিং হতো। সেখানে জয়েন করতে হতো। এতে আমাকে নীল দলের সদস্য বানিয়ে দেওয়া হলো।”

তার মতে, তিনি কোনো রাজনৈতিক পদে নেই, কখনো কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি।

“দ্বিতীয় কথা, সাদা গ্রুপ যদি সাদা দল করতে পারে, তাহলে নীল গ্রুপ নীল দল করতে পারে, গোলাপী গ্রুপ গোলাপী দলও করতে পারে। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাজনীতি সবাই করতে পারে। সেই রাজনীতি কারও ক্ষতি করলে তখন সেটা খারাপ,” যোগ করেন তিনি।

আরেকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি এ বিষয়ে এখনও চিঠি পাননি।

“আমার জুলাইবিরোধী মনোভাব ছিল না। জুলাইয়ের চেতনা সাম্য, মানবাধিকার, কোটা সংস্কার…এগুলোতে তো আমি বিশ্বাসী। আর, একজন শিক্ষককে তার একাডেমিক ও তার রিসোর্সের ওপর ভিত্তি করে জাজ না করে তাদেরকে ঢালাওভাবে জুলাইয়ের চেতনাবিরোধী বলা যায় না কখনোই। ইউনূস আমলে আমি শুধু মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম।”

“এছাড়া, নির্বাচনের পরে গণতান্ত্রিক সরকার এসেছে। তারা যেভাবে দেশ চালাচ্ছে, তাতে শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত করা গণতন্ত্রের সাথে যায় না। অধ্যাদেশে বলা নাই যে আমি রাজনীতি করতে পারবো না বা মতামত প্রকাশ করতে পারবো না,” যোগ করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার

ছবির উৎস, Getty Images

ক্লিনিক্যাল ফার্মেসী ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুল মুহিত মনে করেন, “আমাকে মিথ্যা দোষারোপ করে অন্যায়ভাবে সরিয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় আমি প্রশাসনে ছিলাম এবং তারপরও তাদের নিরাপত্তায় কাজ করেছি। তাদের হাতে মারও খেয়েছি। সেই সময়ের ঘটনার প্রেক্ষিতে আজ দুই বছর পর বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ করে চাকুরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগের প্রেক্ষিতে এটা করেছে।”

“শিক্ষার্থীরা অভিযোগ দিলে না হয় মানা যেত। কিন্তু ফার্মেসী ফ্যাকাল্টির সাদা দলের শিক্ষকরা সম্পূর্ণভাবে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে এবং সরিয়ে দিয়েছে। এখানে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, গত দুই বছরে তিনি শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন, গবেষণা করছেন, ১২টি আর্টিকেল প্রকাশ করেছেন, অনেক শিক্ষার্থীদেরকে গবেষণা করাচ্ছেন। কারও কোনো অভিযোগ নেই।

নিয়োগ বাণিজ্য করার জন্য তাকে তার পদ থেকে সরানো হয়েছে বলে অভিযোগও তোলেন তিনি। এই শিক্ষক আরও বলেন, “আমরা একসময় একটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে ছিলাম, সেটাকে অস্বীকার করছি না আমরা, কিন্তু আমরা কারও বিরুদ্ধে যাইনি, কাউকে মারতে বলিনি, দমন করি নাই; নীল দলে নাম থাকার কারণেই সাদা দল এটা করেছে। আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেয়া হয়নি।”

ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সারা শামসুর রউফ লিখিতভাবে বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমার সম্পর্কে যে বানোয়াট অভিযোগ করা হয়েছে, এর সাথে বিভাগ ও অনুষদের সাদা দলের শিক্ষকরা জড়িত। ২০২৪ সালের অগাস্টের পর শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের যৌথ মিটিংয়ে সাদা দলের কতিপয় শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে লেলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল, যাতে আমিসহ অনেক শিক্ষককে যেন অপদস্ত করা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা করে নাই।”

তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের “পক্ষে বা বিপক্ষে কোনোরকম সম্পৃক্ততা ছিল না” তার।

“পারলে উনারা দেখাক। ওইসময় আমি প্রতিদিন বিভাগে গিয়ে আমার গবেষণার কাজ করেছি। আমি যে প্রতিদিন বিভাগে এসে কাজ করতাম তা বিভাগের কর্মচারীরা ভাল বলতে পারবেন। ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমার কোনো ধরনের পজিটিভ-নেগেটিভ চিন্তা নেই।”

“এই প্রসাশন ভিন্নমতকে চরমভাবে দমন করছে, যা আইয়ুব-ইয়াহিয়ার সময়কে মনে করিয়ে দিচ্ছে” উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ সকল শিক্ষকের স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে এবং সমালোচনা করার অধিকার সংবিধান দিয়েছে।

ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনেরও একই মত।

তিনিও বলেন, “আমার আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই আমাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। কেননা, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, সেটির পরিপ্রেক্ষিতে অব্যাহতি দেয়া একেবারেই ন্যায়সঙ্গত বা বিধিসম্মত নয়। আর, চব্বিশের আন্দোলন ঘিরে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই।”

“আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের একনিষ্ঠ সমর্থক। আদর্শে বিশ্বাসী। অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল। সেই আদর্শ গণ-অভ্যুত্থানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।”

জুলাই আন্দোলনের ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

কী বলছেন সাদা দলের শিক্ষকরা

সাময়িক বরখাস্ত ও অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, তারা আওয়ামী লীগ সমর্থিত নীল দলের সদস্য হওয়ায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে বিএনপি সমর্থিত সাদা দল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভূমিকা রেখেছে।

এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে সাদা দল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলতে পারে। কিন্তু ব্যবস্থা নিয়েছে সিন্ডিকেট। কোনো সংগঠন কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না।”

“জুলাইবিরোধী মনোভাব ছাড়াও তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা অভিযোগ আছে। যেটা হয়েছে, প্রসিডিওর মেনেই হয়েছে। আমরা মাত্র দায়িত্ব নিলাম। কিন্তু এই প্রসিডিওর শুরু হয়েছে অনেক আগেই,” যোগ করেন তিনি।

২৩১ জনের তালিকা সম্বন্ধে তিনি বলেন, এই তালিকা সম্বন্ধে তার কোনো ধারণা নাই।

সাদা দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক মো. আল আমীন বলেন, ওই তালিকায় যাদের নাম এসেছে, আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরাসরি যারা অভিযুক্ত, তাদের নামগুলোই এখানে আছে। কিন্তু কারা এই তালিকা করেছে, তা স্পষ্ট নয়। পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি।

তিনি আরও বলেন, “এটা কোনো চক্রান্তের বিষয় নয়। তাদের কৃতকর্মের কারণে এটা হয়েছে। তারা ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা পুরোপুরি একটা দলের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল”।

তিনি দাবি করেন, “নীল দলের তথাকথিত শিক্ষকেরা প্রফেসর ইউনূসের নোবেল বাতিলের দাবিতে দাঁড়িয়েছিল। রাতের ভোটকে সাপোর্ট দিয়েছে। তিন তারিখ তাদেরকে শেখ হাসিনা বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনার জন্য ডাকে। এসএসএফ ক্লিয়ারেন্স না থাকলে ওইখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না। ওই ক্রাইসিসের সময়ে তারা দুই তিন গাড়ি ভরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে গিয়েছিল”।

“তথ্য-উপাত্ত, ছবি-ভিডিও বিচার বিশ্লেষণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছিলো” বলেন মো. আল আমীন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র

আইন ও বিধিমালায় কী বলা আছে?

সেই আদেশ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী কর্তৃপক্ষ হলো সিন্ডিকেট।

অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সিন্ডিকেটের হাতেই ন্যস্ত।

তবে কোনো শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা কিংবা তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “ওই আদেশ অনুযায়ী ‘সাময়িক বরখাস্ত’ বলে কোনো বিধান নেই। বরখাস্ত হলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।”

তিনি বলেন, কোনো শিক্ষক অসদাচরণ (মিসকন্ডাক্ট) করলে প্রথমে অভিযোগের তদন্ত করতে হয়। এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ভর্ৎসনা, ইনক্রিমেন্ট বা পদোন্নতি স্থগিত রাখা, বাধ্যতামূলক অবসর এবং চাকরিচ্যুতি। এরকম ব্যবস্থার উল্লেখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে রয়েছে।

ওই আইনজীবীর মতে, ‘জুলাইবিরোধী’ মনোভাব বা অবস্থান কোনো আইনি অভিযোগ হতে পারে না।

“কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে নির্দিষ্ট অভিযোগ লিখিতভাবে জানাতে হবে। তিনি কী করেছেন, কোন চেতনার বিরুদ্ধে কী কাজ করেছেন। এসব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। শুধু চিন্তা বা মতপ্রকাশের ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী।”

আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থন করার প্রসঙ্গে ও আইনজীবী বলেন, “কোনো জঙ্গী সংগঠনের পক্ষে কথা বলা অপরাধ। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তাই, এটা নিয়ে কথা বললে সেটা অপরাধ না।”

উল্লেখ্য, ১৯৭৩ এর আদেশের ৫৬ (৩)– এ বলা আছে, কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে কেবল নৈতিক স্খলন বা অদক্ষতার অভিযোগে বরখাস্ত করা যায়। তবে তার আগে অভিযোগের তদন্ত করতে হবে এবং তদন্ত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে নিজের পক্ষে একজন প্রতিনিধির মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

কিন্তু ওই সাত শিক্ষকের অনেকেই বলেছেন, তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। কেউ কেউ বলছেন, তাদের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেই চিঠিও তারা পাননি এখনো।