Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Geeta Pandey/BBC
একটা দৃশ্য ভাবুন- কেনাকাটা করতে গিয়ে আপনি এক দোকান থেকে অন্য দোকানে যাচ্ছেন আর আপনার ব্যাগগুলো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্য কেউ। কিংবা আপনি কেনাকাটায় মশগুল আর আপনার ছোট বাচ্চার প্যারামবুলেটর ঠেলে দিচ্ছে একজন।
না কল্পনা নয়। ভারতের রাজধানী দিল্লির এক ব্যস্ত বাজারে ক্রেতাদের জন্য এই ব্যবস্থাই করেছে এক নতুন স্টার্ট-আপ।
গত এপ্রিলে দিল্লির লাজপত নগর মার্কেটে চালু হয়েছে ‘ক্যারিমেন’ নামক এই পরিষেবা।
দিল্লির ওই বাজারে কেনাকাটা করতে গেলে চার ঘণ্টা পর্যন্ত পুরুষ ও নারী অ্যাসিস্টেন্ট বা সহায়ককে পাশে পেতে পারেন আপনি।
অর্থের বিনিময়ে আপনার হয়ে ব্যাগ বয়ে দেবেন এই ব্যক্তি। আধ ঘণ্টার জন্য এর খরচ পড়বে ভারতীয় মুদ্রায় ৭৯টাকা এবং এক ঘণ্টার জন্য খরচ ১৪৯ টাকা
ইতিমধ্যে অনেকের মন কেড়েছে এই পরিষেবা। অনেকেই জানিয়েছেন ব্যস্ত বাজারে কেনাকাটার কাজ অনেকটা সহজ করে দিয়েছে এমন পরিষেবা।
তবে একইসঙ্গে এই বিতর্কও উস্কে দিয়েছে যে, ভারতীয় মধ্যবিত্ত কি বিশেষ সুবিধা বা অধিকার নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে পড়ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই সহায়করা আসলে মহিমান্বিত ‘কুলি’ কি না।
ছবির উৎস, Geeta Pandey/BBC
পরিষেবার নেপথ্যে যে ভাবনা
‘ক্যারিমেন’ নামে এই স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠা করেছেন দুই বন্ধু- ঋতু কান্দারি শ্রীবাস্তব এবং কণিষ্কা মালহোত্রা।
দুজনেরই ছোট সন্তান রয়েছে।
ঋতু কান্দারি শ্রীবাস্তব বিবিসিকে বলছিলেন, “গত বছর যখন আমি আর কণিষ্কা আমাদের ছোট বাচ্চাদের নিয়ে লাজপত নগরের মার্কেটে গিয়েছিলাম, সেই সময় এই ধারণাটা মাথায় আসে। কেনাকাটার সব ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্যারামবুলেটর ঠেলে নিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল।”
“এক বয়স্ক নারীকে ব্যাগপত্র নিয়ে হিমশিম খেতে দেখেছিলাম এবং আমরা তাকে সাহায্যও করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নিজেদের জিনিসপত্রই ঠিকমতো সামলাতে পারছিলাম না। কাজেই ব্যাপারটা খুবই বিরক্তিকর ছিল।”
“তাই আমরা ভেবেছিলাম যদি অর্থের বিনিময়ে এমন কোনো সহায়কের পরিষেবা পাওয়া যায়, তাহলে আর কেনাকাটা করতে যাওয়ার সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাওয়ার অনুরোধ করতে হবে না।”
দিল্লির লাজপত নগর মার্কেটসহ এমন অনেক বাজার রয়েছে, যেখানে ঋতু কান্দারি শ্রীবাস্তব ও কণিষ্কা মালহোত্রার মতো লক্ষ লক্ষ ভারতীয় প্রতিদিন কেনাকাটা করতে যান। এই বাজারগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, উঁচু নিচু রাস্তা। সেখানে শপিং মলের মতো চলমান সিঁড়ি নেই, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের সুবিধা নেই।
হয় খোলা বাজারের সঙ্গেই ফুটপাত মিশে গিয়েছে, বা সেটা দোকানদারদের দখলে কিংবা রাস্তা একেবারেই সমতল নয়। এর ফলে প্যারামবুলেটর নিয়ে চলাচল করা তো মুশকিল বটেই একেক সময়ে হাঁটাচলা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ওইদিন বিকেলে লাজপত নগর মার্কেটের অভিজ্ঞতার পর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিজেদের ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন মিজ মালহোত্রা এবং মিজ শ্রীবাস্তব। এরপর একটু একটু করে আকার পেতে থাকে ‘ক্যারিমেন’।
কয়েক মাসের মধ্যে নিজেদের কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন করান তারা। পুরসভা ও পুলিশের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট অনুমতি পান। এরপর লাজপত নগরে একটা কিয়স্ক তৈরি করা হয়।
প্রথমে পাঁচজন যুবককে এবং তারপর দুই নারীকে নিয়োগ করা হয়। তারপর শুরু হয় তাদের এক মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ। সেই প্রশিক্ষণ শেষে এপ্রিল মাস থেকে চালু হয়েছে পরিষেবা।
ছবির উৎস, Geeta Pandey/BBC
আসলে কি মহিমান্বিত “কুলি”?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হাত ধরে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এই স্টার্ট-আপের নয়া উদ্যোগ। হাজার হাজার মানুষ এই পরিষেবা সংক্রান্ত প্রতিবেদন শেয়ার করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গিয়েছে।
অনেকে একে বুদ্ধিদীপ্ত ধারণা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের যুক্তি যেখানে দেশের শহরগুলোতে বেকারত্বের ধারাবাহিক হার পাঁচ শতাংশের বেশি এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ পাচ্ছেন না, সেখানে এই পরিষেবা কয়েক হাজার মানুষকে কর্মসংস্থান দিতে পারে।
তবে সমালোচনাও হচ্ছে। সমালোচকরা একে অলস ও ধনী ভারতীয়দের মধ্যে ছোটখাটো কাজের জন্য অন্যদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা এবং গৃহ পরিচারকদের দিয়ে কাজ করানোর প্রবণতা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এরই মাঝে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এই পরিষেবার সম্ভাব্য উপভোক্তা হিসাবে ভাল পোশাক পরা ধনী নারীদের দেখানো হয়েছিল। এরপর শুরু হয় সমালোচনা।
সমাজবিজ্ঞানী আকৃতি ভাটিয়ার কথায়, “(পরিষেবার বিষয়ে) শুনেই মনে হয় এই পরিষেবা অত্যন্ত ধনী এক নারীর জন্য যিনি সবেমাত্র ম্যানিকিওর করিয়েছেন এবং নিজের নখ নষ্ট করতে চান না।”
শ্রমিক অধিকার নিয়েও কাজ করেন মিজ ভাটিয়া।
সমালোচকদের কারো মতে ‘ক্যারিমেন’ আসলে মহিমান্বিত “কুলি” যারা শোষণমূলক গিগ অর্থনীতিতে শ্রমিকদের পদমর্যাদা বাড়িয়ে তুলবেন। কেউ আবার একে ‘আধুনিক দাসত্ব’ বলে অভিহিত করেছেন। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্টার্ট-আপের দুই প্রতিষ্ঠাতা।
মিজ শ্রীবাস্তব বলেছেন, “প্রথমত এখানে দাসত্বের তো কিছু নেই। আমরা কাউকে আমাদের জন্য কাজ করতে বাধ্য করছি না। আমাদের সমস্ত কর্মী পূর্ণকালীন বেতনভোগী কর্মচারী, তারা গিগ কর্মী নন।”
গিগ অর্থনীতি এমন এক শ্রমবাজার, যেখানে স্থায়ী কর্মীর বদলে চুক্তিভিত্তিক বা ফ্রিলান্সার কর্মী নিয়োগ হয়।
এই পরিষেবার উপভোক্তাদের সম্পর্কেও বলেছেন তিনি। তার কথায়, “তাছাড়া এটা অধিকারের বিষয় নয়। আমরা শুধুমাত্র তাদের পরিষেবা দিচ্ছি যাদের রাস্তায় বা উপচে পড়া ভিড় রয়েছে এমন বাজারগুলোতে চলাচল করতে অসুবিধা হয়।”
তিনি জানিয়েছেন, গত ছয় সপ্তাহে তাদের উপভোক্তাদের মধ্যে বেশিরভাগই গর্ভবতী নারী, ছোট শিশুর মা, প্রবীণ এবং বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তি।
ছবির উৎস, Geeta Pandey/BBC
অভিজ্ঞতা কেমন?
‘ক্যারিমেন’-এর কর্মীদের মধ্যে একজন আনন্দ কুমার। তিনি জানিয়েছেন তার প্রথম গ্রাহক ছিলেন একজন গর্ভবতী নারী। প্রশিক্ষণের সময় তাকে বিনয়ী হতে এবং উপভোক্তাদের নিজেদের পরিবারের সদস্যদের মতো করে দেখতে বলা হয়েছিল।
ক্যারিম্যানরা সাধারণত ছাতা, ভাঁজ করা যায় এমন চেয়ার, জলের বোতল এবং পোর্টেবল চার্জারও বহন করেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্যারামবুলেটর খোলা এবং লক করার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
“বাজারের দোকান-পাট, রাস্তা সম্পর্কে আমাদের ভালভাবে জেনে নিতে বলা হয়েছিল যাতে গ্রাহকরা চাইলে আমরা তাদের দ্রুত গাইড করতে পারি। তারা চেয়ারে বসে অপেক্ষা করেন আর আমরা খাবার দোকানে লাইন দিয়ে দাঁড়াই,” আনন্দ কুমার বলেছেন।
বছর ১৮-র এই যুবক এর আগে একটা শাড়ির দোকানে হেল্পারের কাজ করেছেন, অ্যাপ ভিত্তিক খাবার ডেলিভারির কাজও করেছেন। তবে মি. কুমারের মতে ‘ক্যারিমেন’-এ বেতন তার চেয়ে ভাল এবং এই নতুন ভূমিকায় কাজ করতে গিয়ে সম্মানও পেয়েছেন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি এক ব্যক্তির কথা বলেছেন যার কৃত্রিম হাত ছিল। আনন্দ কুমারের হাতে সমস্ত নগদ টাকা তুলে দিয়ে সেটা হিসেব করে দেখতে এবং সেখান থেকে কেনাকাটার পর দাম মেটাতে বলেছিলেন।
মি. কুমার বিবিসিকে বলেন, “উনি আমার ওপর যে আস্থা রেখেছেন তাতে আমি আপ্লুত।”
এই পরিষেবা চালু করার পর এক সপ্তাহ কোনো বুকিং পাননি বলে জানিয়েছেন ঋতু কান্দারি শ্রীবাস্তব।
তিনি বলেছেন, “তবে আমরা মানুষের মধ্যে এই নিয়ে আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছিলাম।”
“লোকে বিষয়টা দেখতে এবং পরিষেবা সম্পর্কে বিশদে জানতে আমাদের কিয়স্কের কাছে দাঁড়াচ্ছিলেন। তবে এখন আমরা প্রতিদিন প্রায় ছটা করে বুকিং পাই এবং সপ্তাহান্তে এই সংখ্যা আট বা নয়ে দাঁড়ায়।”
গত সপ্তাহের এক গরম এবং আর্দ্র দুপুরে যে সময় আমরা ‘ক্যারিমেন’-এর কিয়স্কে গিয়েছিলাম, সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন যতীন্দর এবং অনিতা সবরওয়াল। ‘ক্যারিমেন’-এর কমলা ও সাদা রঙের কিয়স্কের কাছে একজন অ্যাসিস্টেন্ট-এর খোঁজে এসেছিলেন এই যুগল।
কয়েক মাসের মধ্যেই ‘প্রবীণ নাগরিক’ হতে চলেছেন যতীন্দর সবরওয়াল। তার কাঁধে একটা ভারী ব্যাগ ছিল। স্ত্রী অনিতা সবরওয়ালের সঙ্গেও ছিল দুটো ব্যাগ। এরপরও বেশ কয়েকটা জিনিস কেনা বাকি ছিল তাদের।
ওই এলাকার কাছেই থাকেন এই দম্পতি তবে এই প্রথম এমন পরিষেবা গ্রহণ করছিলেন তারা।
ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
‘ক্যারিমেন’-এর বিষয়ে স্ত্রীর কাছে শুনেছিলেন মি. সবরওয়াল। অনিতা সবরওয়াল আবার এই পরিষেবার কথা জানতে পারেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে।
‘ক্যারিমেন’-এর তরফে এই দম্পতির সঙ্গী ছিলেন আনন্দ কুমার। তাদের প্রথম গন্তব্য ছিল একটা ওষুধের দোকান। মাইগ্রেনের যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিলেন অনিতা সবরওয়াল।
ব্যাথা কমার ওষুধ কিনতে দোকানে ঢুকেছিলেন এই যুগল। আর দোকানের বাইরে তাদের ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আনন্দ কুমার।
দোকান থেকে বেরিয়ে আসার পরই তাদের দিকে জলের বোতল এগিয়ে দেন মি. কুমার যাতে মিসেস সবরওয়াল ওষুধ খেতে পারেন।
“উনি আমাদের নেভিগেট করতেও সাহায্য করেছেন। এখানে কোথায় ওষুধের দোকান আছে জানা ছিল না আমাদের। আমাদের মতে এটা খুবই ভাল পরিষেবা। এরা সঙ্গে আছেন বলে আমরা কিছুটা সাহায্য পাচ্ছি আর স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটাও করতে পারছি,” বলেছিলেন মি. সবরওয়াল।
তার স্ত্রীও এই পরিষেবা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার কথায়, “মালপত্র নিয়ে টানাটানি না করেই আমরা অবাধে চলাফেরা করতে পারছি।”
‘বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অধিকার’, ‘শোষণ’-এর মতো প্রসঙ্গ টেনে এই পরিষেবাকে ঘিরে যে সমালোচনা হচ্ছে তা মানতে নারাজ মি. সবরওয়াল ও তার স্ত্রী।
মি. সবরওয়াল মনে করেন, “আমি মনে করি যারা নিজেদের ব্যাগ সামলাতে পারেন, তাদের নিজেদের ব্যাগ বহন করা উচিত। আর যারা পারবেন না তারা এই পরিষেবা গ্রহণ করবেন। আমি মনে করি এটা আমাদের মতো মানুষের জন্য খুবই ভাল। প্রতিটা বাজারে এই পরিষেবা থাকা উচিত।”
মিজ শ্রীবাস্তব জানিয়েছেন, তারা এই পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন। জুলাই মাসে তারা চাঁদনি চক বাজারে এই পরিষেবা চালু করতে চলেছেন। ধীরে ধীরে দিল্লির অন্যান্য বাজার এবং ক্রমে গোটা দেশে এই পরিষেবা চালু করতে চান তারা।
শ্রমজীবীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আকৃতি ভাটিয়া অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার মতে পরিষেবা সম্প্রসারণের জন্য তহবিলের প্রয়োজন এবং তা নির্ভর করছে পরিষেবাটা আদৌ কতদিন চলে তার উপর।
এই মুহুর্তে, ‘ক্যারিমেন’ আকারে ছোট। এখানে সাতজন কর্মী রয়েছেন। এদের সবাই ফুল-টাইম কর্মী।
“পরিধি বাড়ানোর পরও কি একই সিস্টেম অনুসরণ করতে পারবে তারা? এর আগে এমন অনেক স্টার্ট-আপ প্রচুর সুযোগ সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। গিগ ওয়ার্ক এবং প্লাটফর্ম ভিত্তিক পরিষেবাও শুরু করেছিল কিন্তু তারা সফল হয়নি,” বলেছেন মিজ ভাটিয়া।
“ভারতে সস্তা শ্রমের প্রাচুর্য রয়েছে এবং ইউনিয়নগুলোর মধ্যে সংহতির অভাবের কারণে কোম্পানিগুলো কর্মীদের উপর চাপ দিতে পারে। এখন ক্যারিমেন কোন দিকে যায় সেদিকে আমাদের নজর রাখত হবে,” বলছিলেন মিজ. ভাটিয়া।







