Source : BBC NEWS

প্রধান শিক্ষকের গাছে ওঠার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ে

ছবির উৎস, SCREEN GRAB

আম গাছে উঠে একজন শিক্ষক মোবাইল নেটওয়ার্ক খুঁজছেন- এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে যে ব্যক্তিকে গাছে উঠে মোবাইল হাতে নেটওয়ার্ক খুঁজতে দেখা গেছে, তিনি রাঙামাটি জেলার সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলার পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

বিবিসি বাংলাকে ওই শিক্ষক জানিয়েছেন, ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক না পেয়ে অনলাইনে শিক্ষক হাজিরা নিশ্চিত করতেই নিরুপায় হয়ে গাছে উঠেছিলেন তিনি।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সময় মতো শিক্ষকরা উপস্থিত হচ্ছেন কি না এবং শ্রেণি পাঠদানে অংশ নিচ্ছেন কি না, এই বিষয়টি নিশ্চিত হতে সম্প্রতি একটি নির্দেশনা জারি করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

যেখানে অনলাইনে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে শিক্ষকদের হাজিরা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে লেখাপড়া নিশ্চিত করতেই সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

১৫ই জুন (সোমবার) থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের প্রথম দিনেই সারাদেশে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষক নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি নিয়ে নানা অভিযোগ পাওয়ায় হাজিরার বিষয়টি মনিটরিংয়ে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যদিও কর্মসূচির প্রথম দিনেই হাজিরার তথ্য দিতে একজন প্রধান শিক্ষকের গাছে ওঠার এই ঘটনা নানা আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা বলছেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নয়নে প্রশাসনিক জবাবদিহির তুলনায় নৈতিক জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

“একজন শিক্ষকের সুযোগ-সুবিধা কী দিচ্ছেন, তার সামাজিক অবস্থান কেমন, বেতন কাঠামো ঠিক আছে কি না- সব মিলিয়ে কাজের ক্ষেত্রে তার সন্তুষ্টি কতটা- তাদের নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম।

দেশের শহরাঞ্চলের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইনেও পাঠদান করা হয়

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ভাইরাল ভিডিও নিয়ে যা জানা যাচ্ছে

বাংলাদেশে ‘শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন’ আলোচিত একটি বিষয়। বিশেষ করে করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে শিক্ষা খাতসহ দেশের বিভিন্ন মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের সক্ষমতা বেড়েছে বলেই দাবি করা হয়।

কিন্তু আম গাছে উঠে একজন শিক্ষকের নেটওয়ার্ক খোঁজার ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে একদিকে যেমন হাস্যরসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তেমনি এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বল কাঠামোর বিষয়টিও সামনে উঠে এসেছে।

রাঙামাটির সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলার পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তাহের তার প্রতিষ্ঠানের হাজিরা নিশ্চিত করতে মোবাইল নেটওয়ার্কে খোঁজে গাছে উঠেছিলেন।

তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, পাহাড়ের প্রায় তিন থেকে চারশো ফুট নিচে অবস্থিত হওয়ায় তার স্কুল থেকে ঠিকমতো নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। এছাড়া ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বা অন্য কোনো ব্যবস্থাও নেই।

মূলত এ কারণেই গাছে উঠে শিক্ষক হাজিরা বইয়ের ছবি পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি।

“সকালে স্কুলে এসে ছাদ থেকে প্রথমে চেষ্টা করছি। পরে পাহাড়ে উঠেও নেটওয়ার্ক না পেয়ে নিরুপায় হয়ে আমগাছের ডালে উঠছি। এই সময় কে বা কারা হয়ত ভিডিওটা করে অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. তাহের।

যদিও ইন্টারনেট সংযোগ না পাওয়ায় আমগাছে উঠেও ছবি পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানান এই শিক্ষক। শেষমেষ মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টেক্সট ম্যাসেজে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে হাজিরা নিশ্চিত করেন তিনি।

মি. তাহের বলছেন, পাহাড় ঘেরা দুর্গম এলাকা হওয়ায় রাঙামাটির অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ দূরের কথা, মোবাইল নেটওয়ার্কই ঠিক মতো পাওয়া যায় না।

“আমরা ইন্টারনেট ঠিকমতো পাই না, এমনকি বাটন ফোনেও অনেক সময় কথা বলা কষ্ট হয়ে যায়। একমাত্র রাঙামাটি উপজেলা সদর ছাড়া বেশিরভাগ এলাকায় নেটওয়ার্ক ঠিকমতো থাকে না, বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

দেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ প্রত্যন্ত অনেক এলাকায় মোবইল নেটওয়ার্ক এখনও দুর্বল বলে অভিযোগ রয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাহাড় ঘেরা প্রত্যন্ত ওই এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নিয়ে জটিলতা রয়েছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ফাতেমা জান্নাত মুমু জানান, রাঙামাটিসহ পার্বত্য তিন জেলার বেশিরভাগ এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইল নেটওয়ার্ক নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়।

“শহরের দিকে একেক এলাকায় একেক মোবাইল সিম কাজ করে। একটু পাহাড়ি এলাকা বা প্রত্যন্ত এলাকায় গেলেই নেটওয়ার্ক থাকে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এজন্যই তো সমস্যা,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

শিক্ষকের গাছে ওঠার এই ঘটনা নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে জেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসও।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (চলতি দায়িত্ব) মো. কফিল উদ্দিন বলছেন, শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই অনলাইন হাজিরার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একজন শিক্ষক নেটওয়ার্ক খুঁজতে গাছে উঠবেন কেন?

“পাহাড়ি এলাকায় নেটের সমস্যা আছে, এটা তো বাস্তব বিষয়, কিন্তু কোনো শিক্ষককে গাছে চড়ে বা অন্য কোনো উপায়ে হাজিরা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়নি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মি. উদ্দিন বলছেন, কর্মসূচির প্রথম দিন জেলার ৭০৮টি স্কুলের মধ্যে ৫৩৮টি স্কুলের শিক্ষক হাজিরার তথ্য পাওয়া গেছে। মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকায় বাকি ১৭০টি স্কুলের হাজিরা তথ্য পাওয়া যায়নি।

“প্রথম দিনে রাঙামাটির ৭৬ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হাজিরার তথ্য পাঠিয়েছে। ২৪ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেটওয়ার্কের বাইরে আছে। যে-সব এলাকায় নেটওয়ার্কের সমস্যা রয়েছে, ইতোমধ্যে সেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা চাওয়া হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. উদ্দিন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায় সরকার

ছবির উৎস, Majority World via Getty Images

কেন এই নির্দেশনা?

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে নানা অভিযোগ নতুন নয়।

এমন প্রেক্ষাপটে চলতি মাসের ১১ই জুন দেশের প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের হাজিরা মনিটরিংয়ের বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

‘সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের দৈনন্দিন উপস্থিতি মনিটরিং কার্যক্রম’ নামের ওই নির্দেশনায় শিক্ষকরা কীভাবে তাদের হাজিরা নিশ্চিত করবেন, সেই বিষয়ে উল্লেখ করা হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার অথবা সহকারী থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে এডমিন বা প্রধান করে প্রধান শিক্ষকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থাকবে, যেখানে নিয়মিত শিক্ষক হাজিরা তথ্য পাঠাবেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকরা।

প্রতিদিন বিদ্যালয় শুরু হওয়ার ২০ মিনিটের মধ্যে (বর্তমানে ক্লাস শুরু হয় সকাল নয়টায়) শিক্ষক উপস্থিতির তথ্য ওই গ্রুপে পাঠাবেন প্রধান শিক্ষকরা।

এরপর উপজেলা বা থানা শিক্ষা অফিসার সকাল ৯টা ৪৫ এর মধ্যে এসব তথ্যের সারসংক্ষেপ উপজেলা বা থানা শিক্ষা অফিসে পাঠাবেন।

এসব তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের মাধ্যমে এর সারসংক্ষেপ সকাল সোয়া এগারোটার মধ্যে শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপে পাঠাবেন বিভাগীয় উপর-পরিচালক।

এই কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং পর্যায়ক্রমে তাদের মনিটরিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খন্দকার দীন মোহাম্মদ বলছেন, দেশের কতজন শিক্ষক এখন সাসপেনশনে আছেন বা মেডিক্যাল ছুটিতে আছেন এমন তথ্যগুলো এর মাধ্যমে উঠে আসবে।

“শিক্ষকদের উপস্থিতির বিষয়টি আমাদের কেন্দ্রীয়ভাবে জানা দরকার। বিভাগ কিংবা জেলা পর্যায়েও এই তথ্য নাই যে কত শতাংশ শিক্ষক সময়মতো উপস্থিত হচ্ছে বা হচ্ছে না, এটা একটা মনিটরিংয়ের মধ্যে এনেছি আমরা,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

করোনা মহামারির পর বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বেড়েছে বলেই মনে করা হয়

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN

তিনি জানান, গতকাল (সোমবার) এই কর্মসূচির প্রথম দিনে দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ শিক্ষক সময় মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

“আমাদের কালকের তথ্য অনুযায়ী, আট বিভাগের তিন লাখ তিন হাজার ১৩২ শিক্ষকের মধ্যে দুই লাখ ৭৮ হাজার ২৩০ জনকে যথাসময়ে আমরা উপস্থিত পেয়েছি। অর্থাৎ ৯১ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিক্ষক যথাসময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।”

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা সময়মতো উপস্থিত হচ্ছেন কি না এই বিষয়টি মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরাও।

কিন্তু যে পদ্ধতিতে মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি কতটা কার্যকর তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে অনেক শিক্ষাবিদ ও গবেষকের।

এছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের মান এবং তাদের বেতন কাঠামোর বিষয়টিও সামনে আনছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলছেন, “আপনি কোনো একটা নির্দেশনা চালু করতে চান, তাহলে তার সুযোগ সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের মোবাইল ডেটা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে?”

প্রশাসনিক নির্দেশনা চাপিয়ে দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন এই গবেষক।

তিনি বলছেন, “শিক্ষককে তার নিজের কাছে দায়বদ্ধ করতে হবে, তার বেতন কাঠামোর বিষয়টি ঠিক না করে, কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে আর যাই হোক শিক্ষককে শিক্ষাদানে উৎসাহ দেওয়া সম্ভব নয়।”