Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Serenity Strull/ BBC
সন্তানের জন্মের আগে থেকেই পুরুষদের শরীরে মারাত্মক হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে, যা তাদের আচরণকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের সন্তানের সুস্থতার ওপর।
আমার ছেলের জন্মের আগের মাসগুলোতে, আমার স্ত্রী ও আমি একটি ‘অ্যাক্টিভ বার্থ’ ওয়ার্কশপ (শিশুর জন্মের আগে প্রসব সংক্রান্ত বিষয়ে মা-বাবার প্রশিক্ষণ), একটি ‘ব্রেস্টফিডিং সেশন’ এবং হাসপাতাল পরিচালিত প্রসব-পূর্ব কোর্সে অংশ নিয়েছিলাম।
আমরা গর্ভাবস্থা ও শিশু বিষয়ক এক গাদা বই পড়েছিলাম এবং অসংখ্য ওয়েবসাইট ঘুরে দেখেছিলাম। আমাদের নোটপ্যাডগুলো দ্রুতই তথ্যে ভরে গিয়েছিল।
আমার সেই সময়ের নোটগুলোর মধ্যে নারীদের শরীর কীভাবে প্রসব এবং মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হয় – তার বিস্তারিত বিবরণ ছিল। যেমন হরমোনের ওঠানামা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্থান পরিবর্তন এবং মস্তিষ্কের পুনর্গঠন।
তবে কেউ আমাকে বলেনি যে, আমার নিজের মস্তিষ্ক ও শরীরও পিতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।
আমার ছেলের বয়স যখন এক বছরের বেশি, তখন প্রিম্যাটোলজিস্ট সারাহ ব্লাফার হার্ডির লেখা ‘ফাদার টাইম’ নামক একটি বই পড়ার পর আমি প্রথম এ ধারণার মুখোমুখি হই।
সেখানে লেখক যুক্তি দিয়েছেন যে, পুরুষদের মধ্যেও “যেকোনো নিবেদিতপ্রাণ মায়ের মতোই সুরক্ষামূলক ও যত্নশীল” হওয়ার মতো প্রয়োজনীয় জৈবিক গঠন বা ওয়্যারিং রয়েছে।
এটি আমার কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলে।
আমি সক্রিয়ভাবে বাবা হিসেবে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী ও বিশ্বাসী, তবে আমি ভেবেছিলাম এটি হয়তো আমাদের প্রজন্মের পুরুষদের একটি সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্ত।
ছবির উৎস, Serenity Strull/ BBC
কিন্তু হার্ডির বই আমাকে একটি সম্পূর্ণ নতুন একাডেমিক ধারনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল, যা বলছে যে আমাদের এই আচরণটির শেকড় আসলে জীববিজ্ঞানের গভীরে, যা কেবল সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং সঠিক সময়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেওয়া এবং বিভিন্ন গবেষণা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখার পর আমি একটি সহজ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি – পিতৃত্ব একজন পুরুষকে এমনভাবে পরিবর্তিত করে, যা মাতৃত্বের রূপান্তরের মতোই একদম একই রকম।
একজন বাবা তার সন্তানের যত্নে যত বেশি সম্পৃক্ত হন, এ রূপান্তর তত বেশি গভীর হয়। পুরুষের এন্ডোক্রাইন (হরমোন) এবং স্নায়ুতন্ত্রের পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, একজন যত্নশীল বাবা কোনো আধুনিক ব্যতিক্রম নন, বরং এটি তার একটি গভীর জৈবিক বৈশিষ্ট্য।
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা হ্রাস
শিশুদের কারণে বাবারা শারীরিকভাবে কীভাবে পরিবর্তিত হন, সে বিষয়ে প্রাথমিক গবেষণাগুলো এসেছিল অন্যান্য প্রাণীদের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।
বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের এসব গবেষণায় দেখা গেছে যে, অনেক স্তন্যপায়ী পুরুষ (অন্যান্য প্রাইমেটসহ) যখন সক্রিয়ভাবে সন্তানের যত্ন নেয়, তখন তাদের শরীরে স্পষ্ট হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে।
এর মধ্যে টেস্টোস্টেরন, ভ্যাসোপ্রেসিন ও প্রোল্যাকটিনের মতো হরমোনের ওঠানামা অন্তর্ভুক্ত, যা সাধারণত মাতৃত্বের সাথে জড়িত।
আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী লি গেটলার যখন ২০০০-এর দশকের শুরুতে আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র হিসেবে এসব ফলাফলের কথা শোনেন, তখন তিনি এতে মগ্ন হয়ে পড়েন।
ইন্ডিয়ানার ইউনিভার্সিটি অফ নটর ডেমের হরমোন, স্বাস্থ্য এবং মানব আচরণ গবেষণাগারের পরিচালক গেটলার বলেন, “আমি আমার লেকচারারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, কেউ মানুষের পিতৃত্বের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নগুলো নিয়ে গবেষণা করছে কি-না, এবং যার উত্তর ছিল – না।”
২০০০ সালে দুইজন কানাডিয়ান গবেষক – ক্যাথরিন উইন-এডওয়ার্ডস এবং অ্যান স্টোরি, তারা পুরুষদের হরমোন পরিবর্তনের ওপর প্রথম গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন।
ছবির উৎস, Getty Images
গেটলার যখন এ ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেন, ততদিনে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য ছিল যে সন্তানহীন পুরুষদের তুলনায় সন্তান আছে এমন পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকে।
“কিন্তু সেখানে একটি ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’ মার্কা সমস্যা ছিল,” গেটলার ব্যাখ্যা করছিলেন, “টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকা পুরুষদেরই কি বাবা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি? নাকি পিতৃত্বের রূপান্তরই পুরুষদের মধ্যে এই জৈবিক পরিবর্তনের ধারা তৈরি করে?”
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেটলার ফিলিপাইনের সেবু সিটিতে কয়েক দশক ধরে চলা একটি প্রকল্পের বিজ্ঞানীদের সাথে যুক্ত হন।
২০০৫ সালে, এই দলটি ২১ বছর বয়সী এবং কোনো সঙ্গীহীন ৬২৪ জন পুরুষের লালার নমুনা সংগ্রহ করে টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা করে। চার বছর পর তারা আবার পরীক্ষা করেন।
তারা দুটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিলেন – অন্তর্বর্তী সময়ে যারা বাবা হয়েছেন তাদের টেস্টোস্টেরন কম হবে কি-না, এবং যারা শিশু যত্নে বেশি সময় ব্যয় করেছেন তাদের ক্ষেত্রে এটি আরও কম হবে কি-না।
যখন ফলাফল এলো, দুটি প্রশ্নের উত্তরই ছিল ‘হ্যাঁ’।
যারা বাবা হয়েছিলেন তাদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সন্তানহীন পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।
এবং যে পুরুষরা শিশুদের দেখভালে বেশি সময় কাটিয়েছিলেন, তাদের টেস্টোস্টেরন সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছিল।
যারা তাদের সন্তানদের সাথে একই বিছানায় ঘুমাতেন, তাদের মাত্রাও ছিল কম।
গেটলার আমাকে বলেন, “আমি মনে করি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটিই প্রথম স্পষ্ট বার্তা ছিল যে পুরুষদের পিতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হওয়ার এ ক্ষমতা রয়েছে।”
এক অর্থে, জৈবিক প্রক্রিয়াই সন্তান যত্নের জন্য তাদের প্রস্তুত করে তোলে।
তাদের এই অনুসন্ধান অনন্য নয়। বিজ্ঞানীদের আরো কয়েকটি দলও দেখেছে যে সঙ্গীর গর্ভাবস্থায় টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া শিশুর জন্মের পর তাকে বাবার বেশি সময় দেওয়া, সন্তান লালনে সুস্পষ্ট আগ্রহ এবং সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কিত।
এমনকি এ হরমোনের মাত্রা শিশুর কান্নায় পুরুষদের প্রতিক্রিয়ার সাথেও সম্পর্কিত ছিল – এটি তাদের আরও সতর্ক ও স্পর্শকাতর করে তুলেছিল।
২০১৮ সালে গেটলারের ল্যাবের একটি দল এ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, কম টেস্টোস্টেরন যে বাবাদের তারা কম বয়সী বাচ্চাদের যত্নে বেশি জড়িত থাকেন।
ছবির উৎস, Getty Images
কিন্তু এটি কখন ঘটে? জন্মের আগে নাকি পরে – এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইমোরি ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরি ফর হিউম্যান সোশ্যাল নিউরোসায়েন্সের পরিচালক জেমস কে. রিলিংয়ের মনে।
রিলিং আমাকে বলেন, “আমার ধারণা ছিল যে এটি মায়ের সন্তান প্রসবের পর ঘটবে, যখন বাবারা তাদের শিশুদের সাথে কিছুটা সময় কাটাবেন।”
গবেষণায় যা তারা পেয়েছিলেন তা তাদের অবাক করে দিয়েছিল।
যখন তাদের স্ত্রী বা সঙ্গীর গর্ভধারণের চার মাস পরে হবু বাবাদের পরীক্ষা করা হয়, তখন তাদের টেস্টোস্টেরন ও ভ্যাসোপ্রেসিন – দুটি হরমোন ইতোমধ্যেই কম ছিল।
রিলিং, যিনি ২০২৪ সালে পিতৃত্বের বিজ্ঞান নিয়ে ‘ফাদার নেচার’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন, তিনি বলেন যে ভ্যাসোপ্রেসিনেরও একই রকম প্রভাব ছিল।
রিলিং জানতে চান যে এটি কেন ঘটে। হবু বাবারা কি তাদের গর্ভবতী সঙ্গীদের কাছ থেকে কোনো ফেরোমনাল সংকেত (দুই জন মানুষের মধ্যে এক ধরনের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া যা আচরণ বা শারীরিক পরিবর্তনকে প্রভাবিত করে) পান?
নাকি সন্তান আসার খবর জানার পর এটি একটি মানসিক পরিবর্তন?
এগুলো আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না। তবে যা নিশ্চিত তা হলো, পরিবর্তনগুলো টেস্টোস্টেরনের বাইরেও বিস্তৃত।
ভালোবাসার হরমোনের তরঙ্গ
উদাহরণস্বরূপ, অক্সিটোসিন বা তথাকথিত ‘লাভ হরমোন’ এর কথাই ধরা যাক।
প্রসব-পূর্ব কোর্স থেকে মনে আছে – আমাদের উৎসাহিত করা হয়েছিল যাতে প্রসবের সময় আমার সঙ্গী শান্ত ও শিথিল থাকে, যাতে করে তার অক্সিটোসিন হরমোন প্রবাহিত হতে পারে এবং প্রসব সহজ হয়।
আমাদের সন্তান জন্মের পর আমাদের বলা হয়েছিল যে, জন্মের সময় অক্সিটোসিনের একটি বিশাল ঢেউ তৈরি হবে এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে বারবার এই হরমোন বাড়বে যা মা ও শিশুর বন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করবে।
ছবির উৎস, Getty Images
কিন্তু আমি জানতাম না যে জন্মের প্রথম কয়েক ঘণ্টায়, যখন সে আমার খালি বুকে ঘুমাচ্ছিল, তখন আমার মধ্যেও অক্সিটোসিন বাড়ছিল।
বিশ্বজুড়ে অনেক গবেষণায় বাবাদের মধ্যে উচ্চ মাত্রার অক্সিটোসিন পাওয়া গেছে – এমনকি যাদের সন্তানের বয়স এক থেকে দুই বছর বা যারা ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের যত্ন নিচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে।
সন্তানদের সাথে কী পরিমাণ সময় কাটানো হচ্ছে তার ওপরই এটা নির্ভর করে।
উদাহরণস্বরূপ, যে বাবারা তাদের সন্তানদের সাথে বেশি খেলাধুলা করেছেন ও কাছাকাছি থেকেছেন তাদের অক্সিটোসিন বেড়ে গিয়েছিল।
এমনকি বাবারা যখন প্রথমবার তাদের নবজাতককে কোলে নিয়েছিলেন, তখনও একই রকম পরিবর্তন স্পষ্ট ছিল।
অক্সিটোসিন আমাদের বাবার ভূমিকা পালনের সহজাত প্রবৃত্তিকে বাড়িয়ে তোলে। রিলিং ব্যাখ্যা করেন যে, আপনি পুরুষদের নাকে এই হরমোন স্প্রে করে কী ঘটে তা নোট করে এটি পরীক্ষা করতে পারেন।
তিনি বলেন, “সেখানে একটি গবেষণা আছে যা আমি দারুণ পছন্দ করি। তারা বাবাদের তাদের শিশুর সাথে যোগাযোগ করার সময় ইনট্রানাসাল (নাকের মাধ্যমে) অক্সিটোসিন দেয় এবং দেখতে পায় যে এটি বাবাদের মাথা দ্রুত ঘোরাতে সাহায্য করে।”
রিলিং ভিডিও কলে তার মাথা বাম থেকে ডানে এবং ওপরে-নিচে দোলালেন, যা দেখতে একজন অতি-উৎসাহী বাবার মতো লাগছিল।
এ ধরনের ফলাফল অক্সিটোসিনের সাথে একটি ইতিবাচক চক্রের ইঙ্গিত দেয় – হরমোন যত বাড়ে, একজন বাবার তার সন্তানের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়ে, আর সন্তানের কাছাকাছি থাকার কারণে পরে এই হরমোন আরো বাড়তে পারে।
বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে যত বেশি অনুসন্ধান করছেন, অন্যান্য হরমোনেও তত বেশি পরিবর্তন পাচ্ছেন।
ছবির উৎস, Getty Images
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় রিলিং এবং তার দল দেখতে পান যে ভ্যাসোপ্রেসিন হরমোনের পরিমাণ শিশুর জন্মের আগেই নতুন বাবাদের মধ্যে কমে গিয়েছিল।
পুরুষে-পুরুষে বিবাদ বা তাদের প্রাধান্য ধরে রাখার অনুভূতির সঙ্গে জড়িত এই হরমোন।
আরেকটি বিস্ময়কর হরমোন হলো প্রোল্যাকটিন। মানুষের মধ্যে এই রাসায়নিকটি ল্যাকটেশন (দুগ্ধক্ষরণ) এবং মাতৃকালীন যত্নে ভূমিকার জন্য পরিচিত। তবে জীববিজ্ঞানীরা পাখি, মাছ এবং মারমোসেটসহ (এক জাতের দক্ষিণ আমেরিকান বানর, যা তার পিতৃত্বের প্রবৃত্তির জন্য পরিচিত) অন্যান্য প্রাণীদের পিতৃত্বের যত্নের সাথে একে যুক্ত করেছেন।
২০২৩ সালে, আমেরিকান ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ডার্বি স্যাক্সবের নেতৃত্বে একটি দল হবু বাবাদের প্রোল্যাকটিনের মাত্রা পরীক্ষা করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, যারা তাদের অনাগত সন্তানের সাথে দৃঢ় বন্ধন অনুভব করেছিলেন তাদের এই হরমোনের মাত্রা বেশি ছিল।
আবার, সন্তান জন্মের আগের প্রোল্যাকটিনের মাত্রা নির্ধারণ করেছিল এই বাবারা সন্তানের যত্নে কতটা সম্পৃক্ত থাকবেন।
আমরা ইতোমধ্যে অক্সিটোসিনের মাত্রার ক্ষেত্রে যা দেখেছি, এই দুটি হরমোনজনিত পরিবর্তনই সেই বাবাদের মধ্যে বেশি স্পষ্ট, যারা তাদের শিশুদের বেশি যত্ন নিচ্ছেন।
ডার্বি বলেন, “এমন নয় যে কেবল নতুন মায়েরাই হরমোনজনিত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যান। মনে হচ্ছে, পুরুষরাও একই ধরনের অভিযোজন এবং একই ধরনের ফলাফল দেখাচ্ছেন।”
ছবির উৎস, Getty Images
পুরুষের দ্বিতীয় কৈশোর
স্যাক্সবে পরীক্ষা করে দেখছেন যে, এই হরমোনজনিত পরিবর্তনের প্রভাব বাবাদের মস্তিষ্কে কোনো ছাপ ফেলে কি-না।
তিনি আমাকে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম বাবারা আসলে একটি খুব কৌতূহলপূর্ণ, বলতে গেলে একটি বিশেষ জনসংখ্যা – এই অর্থে যে তারা গর্ভাবস্থার মধ্য দিয়ে না গিয়েও অভিভাবকত্বের রূপান্তরগুলো অনুভব করেন।”
জন্মদাত্রী মায়েরা সন্তান গর্ভে ধারণ করার সময় হরমোনের এক বিস্ফোরণ অনুভব করেন এবং সন্তান প্রসবের সময় আরেক দফা সেগুলো বাড়ে। কিন্তু তাদের সঙ্গীদের অভিজ্ঞতা আরও সূক্ষ্ম।
স্যাক্সবের বই ‘ড্যাড ব্রেন’ ২০২৬ সালে প্রকাশিত হচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “গর্ভাবস্থার প্রভাবগুলোর সাথে সন্তান লালনপালনের অভিজ্ঞতার তফাৎ আলাদা করে বুঝতে বাবাদের ভূমিকা আমাদের সুযোগ করে দেয়।”
কয়েক বছর আগে, তার গবেষক দল স্পেনের সহকর্মীদের সাথে প্রথমবার বাবা হওয়া পুরুষদের সন্তান জন্মের আগে এবং পরে তাদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করার কাজটি করেছিল।
তারা দেখতে পান যে সেখানে স্নায়বিক পরিবর্তন ঘটছে। নতুন অভিজ্ঞতা এবং তথ্যের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য তাদের মস্তিষ্ক অভিযোজিত হচ্ছিল।
স্যাক্সবে পিতৃত্বের এই রূপান্তরকে কৈশোরের সাথে তুলনা করেন, যা আমাদের বিকাশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, যেখানে আমাদের মস্তিষ্ককে নতুন চ্যালেঞ্জ, উদ্দীপনা ও ধারণার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়।
এবং একটি ফলো-আপ গবেষণায় তিনি আবিষ্কার করেন যে, যে পুরুষরা তাদের অনাগত সন্তানের সাথে বেশি বন্ধন অনুভব করেছিলেন বা বেশি দিন পিতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদের মস্তিষ্কে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।
২০২৬ সালে রিলিং নতুন বাবাদের মস্তিষ্কের পরিবর্তনের অনুরূপ প্রমাণ রিপোর্ট করেন, যা এই স্নায়বিক রূপান্তরকে নিশ্চিত করে।
আমাদের পিতৃত্বকালীন মস্তিষ্ক এবং শরীরের অনেক পরিবর্তনের মতোই, এখানে একটি বিষয় রয়েছে – আপনি যত বেশি সম্পৃক্ত হবেন, আপনার মধ্যে তত বেশি পরিবর্তন আসবে।
ছবির উৎস, Getty Images
‘ফাদার টাইম’ বইয়ের লেখক, প্রিম্যাটোলজিস্ট সারাহ হার্ডি বলেন, সমস্ত মানুষের মস্তিষ্কেই সন্তান লালন-পালনের একটি সুপ্ত ক্ষমতা রয়েছে, যাকে তিনি “অলপ্যারেন্টাল সাবস্ট্রেট” বলেন, যা সঠিক পরিস্থিতিতে সক্রিয় হতে পারে।
ফাদার টাইম বইয়ে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, মানুষ যখন আরও জটিল সমাজে বিবর্তিত হয়েছিল, তখন সম্মিলিত যত্নই মানুষকে বিকশিত হতে সাহায্য করেছিল।
একটি শিশুকে প্রাথমিক যত্ন করতে পারে এমন পুরুষদের থাকাটা মূল্যবান ছিল এবং তাই আমরা এটি করার ক্ষমতা অর্জন করেছি – যা আমরা এখনো ধরে রেখেছি।
২০১৪ সালের একটি গবেষণায় রুথ ফেল্ডম্যানের নেতৃত্বে ইসরায়েলি শিক্ষাবিদদের একটি দল বিষমকামী দম্পতিদের যুক্ত করেছিলেন যেখানে একজন নারী প্রাথমিক যত্ন প্রদান করতেন এবং বাবা ‘সাহায্য’ করতেন।
পাশাপাশি কোনো নারী ছাড়াই সন্তান লালন-পালন করা সমকামী পুরুষ দম্পতিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তারা যখন তাদের শিশুদের ভিডিও দেখছিলেন তখন তাদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করা হয়।
বিষমকামী দম্পতিদের ক্ষেত্রে, প্রাথমিক যত্ন নেওয়া নারীদের মস্তিষ্ক গভীর সহজাত প্রতিক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত অঞ্চলগুলোতে (যেমন অ্যামিগডালা) উদ্দীপিত হয়েছিল।
অন্যদিকে, তাদের সহয়তাকারী পুরুষদের মস্তিষ্কের সামাজিক অঞ্চলগুলোতে বেশি সক্রিয়তা দেখা গিয়েছিল, যার অর্থ হতে পারে তারা পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছিলেন।
কিন্তু প্রাথমিক যত্ন প্রদানকারী সমকামী পুরুষরা মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা এবং ‘মাতৃসুলভ’ অনুভূতির একই ধরনের সক্রিয়তা দেখিয়েছেন, পাশাপাশি সামাজিক উপাদানটিও বজায় রেখেছেন।
পিতৃত্ব আক্ষরিক অর্থেই তাদের মস্তিষ্ককে নতুন রূপ দিচ্ছিল।
ছবির উৎস, Getty Images
সামাজিক পরিবর্তন
আমি যেসব বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলেছি এবং এ ক্ষেত্রের বেশিরভাগ গবেষণা একমত হয়েছে যে, পিতৃত্বের জৈবিক এই বিকাশগুলোর ওপর পরিবারের জন্য তৈরি সরকারি নীতির ওপর নতুন করে নজর দেওয়া উচিত।
স্যাক্সবে বলেন, “বাবাদের সেই বন্ধনগুলো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য জরুরি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাজের কাজ করা উচিত।”
তিনি বলেন যে, পিতৃত্বকালীন ছুটি বাবা ও সন্তানের মধ্যে বন্ধন সহজতর করতে পারে।
গেটলার আমাকে বলেন, আরেকটি মূল পরিবর্তন হলো শুরু থেকেই পুরুষদের যুক্ত করা, যেমন আল্ট্রাসাউন্ডে অংশ নেওয়া, ডাক্তারের কাছে যাওয়া এবং গর্ভাবস্থায় তাদের সঙ্গীর সাথে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ রাখা।
তিনি আমাদের বলেন, “আমরা জানি যে এই জীববিজ্ঞান সম্ভাব্যভাবে গর্ভাবস্থার সময় থেকেই কার্যকর হতে শুরু করে, যখন একটি পরিবার তাদের শিশুকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেয়।”
সক্রিয় বাবারা পরিবারের জন্য দারুণ উপকারী।
পাকিস্তান, কেনিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে যে মায়েদের সঙ্গীরা বেশি সক্রিয়, তারা উন্নত মানসিক স্বাস্থ্যের কথা জানিয়েছেন। আর গুরুত্বপূর্ণভাবে, শিশুরা এতে উপকৃত হয়।
২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত একটি বড় গবেষণা, যা সাত বছর ধরে ২৯২টি পরিবারের ওপর চালানো হয়েছিল, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, সন্তান লালনপালনে অধিক মনোযোগী বাবাদের সন্তানদের হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো ছিল।
মজার ব্যাপার হলো – মায়েদের ওপর একই ধরনের প্রভাব দেখা যায়নি।
গেটলার বলেন, “আমি মনে করি শুরু থেকেই শক্তিশালী এবং সুস্থ পরিবার গঠনের ভিত্তি হিসেবে পিতৃত্বের জৈবিক প্রক্রিয়া কীভাবে ভূমিকা রাখে, তা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে।”




