Home LATEST NEWS BANGLA পুরুষদের তুলনায় কেন বেশি নারী মাইগ্রেনের সমস্যায় ভোগেন?

পুরুষদের তুলনায় কেন বেশি নারী মাইগ্রেনের সমস্যায় ভোগেন?

6
0

Source : BBC NEWS

চুল পেছনে বাঁধা এবং মুখে গম্ভীর অভিব্যক্তি থাকা এক নারীর মাথা ও কাঁধের সম্পাদিত ছবি। পটভূমিতে ট্যাবলেটের সারি দেখা যাচ্ছে, আর তার মুখের সামনে একটি লাল প্যাঁচানো রেখা রয়েছে, যা মাইগ্রেনকে উপস্থাপন করছে।

ছবির উৎস, Getty Images

অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকা, আর নিরবচ্ছিন্ন ব্যথা – যেন সেটা কপালের ভেতর ড্রিল করে ঢুকে যাচ্ছে, এটি মাইগ্রেনে ভোগা অনেক মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত এক অভিজ্ঞতা।

সম্পর্ক, চাকরি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে অক্ষম করে দেওয়ার মতো এই শারীরিক অবস্থা।

এটি বিশেষভাবে নারীদের বেশি প্রভাবিত করে। পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেন আক্রমণের ঝুঁকি তিন গুণ বেশি।

কিন্তু মাইগ্রেনের আক্রমণ কেন হয় এবং এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী করা যেতে পারে?

মাইগ্রেনের উপসর্গ কী?

যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা মাইগ্রেন ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি সাতজনের মধ্যে প্রায় একজন মাইগ্রেনে আক্রান্ত হন। সংখ্যাটি এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষের সমান।

এটি একটি জিনগত ও স্নায়ুবিষয়ক অবস্থা, যা মস্তিষ্ককে পরিবর্তনের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে।

যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা ন্যাশনাল মাইগ্রেন সেন্টারের মাইগ্রেন বিশেষজ্ঞ ডা. ক্যাটি মনরো বলেন, কিছু মানুষ এই জিন বহন করলেও কখনও সেটি সক্রিয় হয় না এবং তারা “কোনো সমস্যা ছাড়াই জীবন পার করে দেন”।

কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাহ্যিক কারণ মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু পথ সক্রিয় করে দিতে পারে।

এর ফলে নিউরোকেমিক্যাল নিঃসৃত হয়, যা মাইগ্রেনের উপসর্গকে উদ্দীপিত করে।

এর মধ্যে মাথাব্যথা থাকতে পারে, তবে বমি, মাথা ঘোরা এবং ব্রেন ফগও হতে পারে।

মাইগ্রেন নিয়ে ‘হেডস আপ’ নামের একটি পডকাস্টের উপস্থাপক ডা. মনরো বলেন, “কখনও মানুষের এক ধরনের উপসর্গ দেখা যায়, আবার পরেরবার তা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও এটি ভিন্ন হতে পারে এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়েও এর পরিবর্তন হতে পারে।”

একজন নারী নিজের কপালে হাত দিয়ে চোখ কুঁচকে শুয়ে আছেন

ছবির উৎস, Getty Images

মাইগ্রেনের আক্রমণের কারণ কী?

কেবল একটি বিষয়ই যে ব্যথার শুরু করবে, এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ছোট ছোট নানা কারণ জমতে জমতে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির সহনসীমা অতিক্রম করতে পারে।

এর মধ্যে থাকতে পারে হরমোনের পরিবর্তন, রক্তে শর্করার মাত্রার অনিয়ম এবং কম বা দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যা।

মানসিক চাপ বড় ভূমিকা রাখে।

তবে দীর্ঘ চাপের পর হঠাৎ শান্ত সময়ও একটি আক্রমণ শুরু করতে পারে।

ডা. মনরো বলেন, নারীদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে দেখা যায়।

“পরিবারের সবকিছু সচল রাখা, একসঙ্গে অনেক কাজ সামলানো, পরিবারের সবার সময়সূচি দেখাশোনা করা, এগুলো প্রায়ই আমরা নারীরাই করে থাকি।”

আবহাওয়ার পরিবর্তন, যেমন তাপমাত্রা, বায়ুচাপ এবং আর্দ্রতার পরিবর্তনও আক্রমণের কারণ হতে পারে।

এটি হতে পারে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরের খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়ার কারণে, যেমন বায়ুচাপের পরিবর্তন, অথবা এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় যেমন পানিশূন্যতার কারণে।

শরীরে আয়রনের স্বল্পতা, সিলিয়াক রোগ বা থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মতো স্বাস্থ্যগত সমস্যাও মাইগ্রেনের কারণ হতে পারে।

প্রসঙ্গত, সিলিয়াক রোগ একটি অটোইমিউন অবস্থা, যেখানে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্লুটেনের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা কখনও কখনও ক্ষুদ্রান্ত্রের ক্ষতি করে।

হরমোনের প্রভাব কী?

প্রায় ১০ শতাংশ শিশুর মাইগ্রেন হয় এবং এতে ছেলে ও মেয়ে সমানভাবে আক্রান্ত হয়।

কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে পরিস্থিতি বদলে যায়, যখন মেয়েদের মাসিক চক্র শুরু হয়।

সাবেক জিপি (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) ডা. মনরো বলেন, “এটি এমন একটি কারণ, যার ফলে মেয়েরা সংখ্যায় এগিয়ে যায় এবং পুরুষদের তুলনায় বেশি নারী মাইগ্রেনে ভোগেন। আর মেনোপজ পর্যন্ত পুরো জীবনজুড়েই আমরা এটি দেখতে পাই।”

হরমোনের ওঠানামা একটি বড় উদ্দীপক। আর মাসিক শুরুর ঠিক আগে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়ার কারণে এই সময়ে আক্রমণ বিশেষভাবে কষ্টদায়ক হতে পারে।

পেরিমেনোপজে, অর্থাৎ মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগের রূপান্তর পর্যায়ে, হরমোনের দ্রুত পরিবর্তনও মাইগ্রেনকে আরও খারাপ করতে পারে।

তিনি বলেন, “হরমোন তখন পুরোপুরি এলোমেলো অবস্থায় থাকে। পেরিমেনোপজে মাইগ্রেন অনেক, অনেক নারীর জন্য বড় একটি সমস্যা।”

তবে বিষয়টি শুধু হরমোনের নয়।

তিনি বলেন, “হতে পারে আপনি একদিকে কিশোর সন্তান, অন্যদিকে বয়স্ক বাবা-মায়ের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাচ্ছেন। আবার মেনোপজজনিত উপসর্গের কারণে হয়তো ঘুমও ভালো হচ্ছে না।”

মেনোপজের পর হরমোনের মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়ে যাওয়ায় আক্রমণের তীব্রতা ও সংখ্যা কমে আসতে পারে।

মাইগ্রেন ব্যথার চারটি ধাপ বোঝানো হয়েছে একটি ইলাস্ট্রেটেড ছবিতে

কীভাবে বুঝবেন যে আপনার মাইগ্রেনের সমস্যা হচ্ছে?

এটা সাধারণত চারটি ধাপে ঘটে।

প্রথম ধাপটি হলো প্রোড্রোমাল বা পূর্বাভাস ধাপ, যখন মস্তিষ্কে পরিবর্তনগুলো জমতে শুরু করে।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হাই তোলা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘাড়ে ব্যথার মতো সতর্ক সংকেত দেখা যায়।

পরবর্তী ধাপ হলো অরা, যা সাধারণত এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং এতে চোখের সামনে জিগজ্যাগ রেখা বা সাদা দাগের মতো দৃশ্যগত পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

এটি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগীর ক্ষেত্রে ঘটে।

এরপর মাথাব্যথা বা প্রভাব পর্যায় শুরু হয়, যা চার ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

কিছু মানুষের বমি বমি ভাব এবং বমিও হতে পারে।

শেষ ধাপটি পোস্ট-ড্রোমাল বা ‘হ্যাংওভার’ পর্যায় নামে পরিচিত, যা মাথাব্যথা অনেকটাই কমে যাওয়ার পর আরও এক বা দুই দিন স্থায়ী হতে পারে।

ডা. মনরো বলেন, “মনে হয় যেন আপনার ওপর দিয়ে একটি স্টিমরোলার চলে গেছে।”

“আপনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছেন। আর এই সময়েই মানুষ সাধারণত কাজে ফিরে যায়, কিন্তু তখনও তারা পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না।”

মাইগ্রেন ব্যবস্থাপনার কিছু পরামর্শসহ ছবি

জীবনযাপনে কী পরিবর্তন আনলে মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে?

প্রচলিতভাবে মাইগ্রেনে আক্রান্ত মানুষদের কফি বা চকলেটের মতো সম্ভাব্য উদ্দীপক খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কিন্তু ডা. মনরো বলেন, এর পরিবর্তে যতটা সম্ভব নিয়মিত জীবনযাপন বজায় রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, একজন ‘মাইগ্রেন গোয়েন্দা’ হয়ে আক্রমণ স্পষ্ট হওয়ার আগের দুই বা তিন দিনে কী কী পরিবর্তন ঘটেছিল, তা খুঁজে দেখলে উপকার হতে পারে। কারণ তখন সেসব বিষয় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা যায়।

তবে, জীবন সবসময় পরিকল্পনামাফিক চলে না।

ডা. মনরো বলেন, “আমরা কেউই নিখুঁত হতে পারি না। তাই অপরাধবোধে নিজেকে কষ্ট দেবেন না। আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।”

নিয়মিত খাবার খাওয়া এবং রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যেতে না দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে ভালো ঘুম নিশ্চিত করার চেষ্টা করা এবং যতটা সম্ভব নিয়মিত একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও জেগে ওঠাও জরুরি।

ব্যায়াম সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি মাইগ্রেনের উদ্দীপক হতে পারে। তাই আক্রান্তদের দেখা উচিত তারা যথেষ্ট খাবার ও পানি গ্রহণ করছেন কি না।

ডা. মনরো বলেন, এ কারণেই সাপ্তাহিক ছুটির সময়টাকে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এ সময় আমরা এমন কী করি যা অন্য দিনের চেয়ে ভিন্ন?

তিনি বলেন, “হয়তো আপনি কাজ শেষ করতে তাড়াহুড়া করছেন। হয়তো সন্ধ্যায় একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন এবং এমন এক গ্লাস ওয়াইন পান করছেন যা সপ্তাহের অন্য দিন পান করেন না। হয়তো একটু দেরিতে ঘুমাতে যাচ্ছেন।”

“ভাবতে হবে কী পরিবর্তিত হচ্ছে এবং কীভাবে সেটিকে আরও নিয়মিত করা যায়।”

একজন নারী মাথায় হাত রেখে সোফায় শুয়ে আছেন

ছবির উৎস, Getty Images

কোন কোন সাপ্লিমেন্ট ও ওষুধ সাহায্য করে?

কার্যকর ওষুধ দিয়ে খুব দ্রুত মাইগ্রেনের আক্রমণের চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, অনেক মানুষ অপেক্ষা করেন, দেখার জন্য যে এটি খুব খারাপ আকার ধারণ করছে কি না।

“ততক্ষণে তুষারগোলার মতো এর প্রভাব এত বড় হয়ে যায় যে আপনি যা-ই করুন না কেন, তা আর থামাতে পারবেন না। শুরুতেই ওষুধ খেলে সেই তুষারগোলাকে থামিয়ে দেওয়া যায়।”

ডা. মনরো বমি প্রতিরোধক একটি ট্যাবলেট এবং ব্যথানাশক, যেমন আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিন বিবেচনা করার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, প্যারাসিটামল তুলনামূলক কম কার্যকর। আর কোডিন ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেন, কারণ এটি মাথাব্যথা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এ ছাড়া ট্রিপটানস নামে মাইগ্রেনের জন্য বিশেষ কিছু ওষুধ রয়েছে, যা চিকিৎসকেরা দিতে পারেন।

ম্যাগনেসিয়াম এবং ভিটামিন বি২-এর মতো কিছু সাপ্লিমেন্ট ব্যথার আক্রমণের সংখ্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে বলে কিছু প্রমাণ রয়েছে বলে তিনি জানান।

যেসব নারী মাসিকের সময় মাইগ্রেনে ভোগেন, তারা প্রায়ই দেখেন যে গর্ভনিরোধক পিল হরমোনের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আবার পেরিমেনোপজের সময় এইচআরটিও উপকারী হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেছেন কোন নিউরোকেমিক্যালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সিজিআরপি নামে একটি পেপটাইড কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এর প্রভাব প্রতিরোধ করার চিকিৎসাও রয়েছে।

অন্যান্য চিকিৎসার মধ্যে বোটক্সও রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি ব্যথা-সৃষ্টিকারী রাসায়নিকের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এ ছাড়া আকুপাংচার, যোগব্যায়াম, তাই চি এবং ব্যথা উপশম থেরাপির মতো সামগ্রিক পদ্ধতিও উপকার করতে পারে।

ডা. মনরো বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আরও তথ্য খোঁজা এবং নিজেকে সচেতন করা।

তিনি বলেন, “আশার অনেক কারণ রয়েছে। তাই হাল ছেড়ে দেবেন না এবং ভাববেন না যে আপনি সবকিছুই চেষ্টা করে ফেলেছেন, কারণ বাস্তবে তা নয়।”