Home LATEST NEWS BANGLA বাংলাদেশি কাজল ও ভারতীয় তরুণের প্রেমের গল্প পাল্টে দিলো একটি ফোনকল

বাংলাদেশি কাজল ও ভারতীয় তরুণের প্রেমের গল্প পাল্টে দিলো একটি ফোনকল

5
0

Source : BBC NEWS


তরুণ প্যাটেল ও কাজল

ছবির উৎস, Tarun Patel

বলা হয়, প্রেম কোনো সীমানা মানে না; কিন্তু গুজরাতের তরুণ প্যাটেল ও বাংলাদেশি কাজলের জীবনে সীমান্তই এখন প্রধান শত্রু।

প্রথমে প্রেম ও পরে সীমান্ত পেরিয়ে বিয়ে – যার জেরে পরিবারটি আইনি জটিলতায় পড়েছে।

গুজরাত পুলিশের ‘অপারেশন ডেল্টা হান্ট’ হঠাৎ সবকিছু ওলটপালট করে দেওয়ার আগে পর্যন্ত তাদের জীবনে কোনো অশান্তি ছিল না।

হঠাৎ করেই প্রশাসন জানতে পারে যে ওই বাংলাদেশি নারী অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন; ফলে এখন তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চাইছে প্রশাসন।

তরুণের এখন একমাত্র লক্ষ্য হলো– তার সন্তানরা যেন মায়ের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করা।

তরুণ প্যাটেল ও কাজল

ছবির উৎস, Tarun Patel

একটি ফোন কল ও গ্রেফতার

দোসরা জুনের কথা মনে পড়ে গুজরাতের আনন্দ জেলার লাম্বভেল গ্রামের বাসিন্দা তরুণ প্যাটেলের। একটি সাধারণ ফোন কলের সূত্র ধরে পুলিশ তার বাড়িতে এসেছিল সেদিন।

তিনি বলেন, “কাজলের মা বাংলাদেশে থাকেন। মায়ের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে তিনি মাকে ফোন করেছিলেন। সেই ফোন কলটি ট্র্যাক করা হয় এবং এরপরই পুলিশ আমার বাড়িতে এসে হাজির হয়।”

তরুণ জানান, পুলিশ তার ফোনটি পরীক্ষা করে কাজলের মায়ের নামে সেভ করা একটি নম্বর দেখতে পায় এবং জানতে চায় নম্বরটি কার। তখন তরুণ স্বীকার করেন যে তার স্ত্রী বাংলাদেশি এবং ওই ফোন কলটি তার মায়ের কাছে বাংলাদেশে করা হয়েছিল।

এরপর কাজলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, কাজলের কাছে কোনো বৈধ নথিপত্র, যেমন পাসপোর্ট বা বিয়ের প্রমাণ নেই। তাই তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তরুণ প্যাটেলের সঙ্গে আট বছর ও দুই বছর বয়সী তার দুই সন্তান

ছবির উৎস, NACHIKETA MEHTA

বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে কি কাজলের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল?

এই প্রশ্নের জবাবে তরুণ প্যাটেল জানিয়েছেন, “কাজল মাঝেমধ্যে তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। যে ফোন কলটি ট্র্যাক করা হয়েছিল, সেদিন ফোনে কাজল তার মায়ের খোঁজ নিচ্ছিলেন, তার মায়ের অস্ত্রোপচার হয়েছিল।”

“সে কান্নাকাটি করে আমাকে বলেছিল যে তাকে মায়ের সঙ্গে কথা বলাতেই হবে। তাই আমি আমার মোবাইল ফোন থেকেই একটি আইএসডি কল করেছিলাম। আমার স্ত্রী শুধু তার মায়ের কাছে জানতে চায় তিনি কেমন আছেন। সে জিজ্ঞাসা করে- ‘মা, তুমি কেমন আছো? তোমার শরীর কেমন? গুরুতর কিছু হয়নি তো?’ ব্যস, এটুকুই। ওই একটি কলই ট্র্যাক করা হয়েছিল। সে কোনো ভুল জায়গায় ফোন করেনি।”

আনন্দ জেলার পুলিশ সুপার জি.জি. জাসানি বিবিসি গুজরাতির সংবাদদাতা নচিকেতা মেহতাকে বলেন, “কাজল যে গুজরাতে অবৈধভাবে বাস করছেন তা প্রমাণিত। বাংলাদেশ থেকে গুজরাতে আসার সময় তার কাছে পাসপোর্ট বা বিয়ের কোনো প্রমাণ ছিল না।”

ফেসবুকে বন্ধুত্ব থেকে প্রেম ও বিয়ে

তরুণ ও কাজল। শাড়ি পরা কাজলের কোলে একটি ছেলে শিশু

ছবির উৎস, NACHIKETA MEHTA

২০১২ সালে বাংলাদেশের গোপালপুর নামে একটি গ্রামের কাজুলির সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় তরুণের। তাদের বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হয় এবং তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

তরুণ প্যাটেল তাকে পাসপোর্ট তৈরি করে গুজরাতে চলে আসতে বলেন। কিন্তু কাজুলির বাবা-মা তাকে একজন বাংলাদেশি পুরুষের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।

কাজুলি পাসপোর্ট তৈরির জন্য একজন দালালকে ১২-১৩ হাজার টাকা দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হন।

পারিবারিক চাপের মুখে তিনি বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে কলকাতায় পৌঁছান এবং সেখান থেকে গুজরাতের আনন্দে চলে আসেন। এরপর তারা মালা বদল করে বিয়ে করেন। কাজুলি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘কাজল’ রাখেন।

প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে তাদের বিয়েটি আইনতভাবে নথিভুক্ত হয়নি জানিয়ে তরুণ বলেন, “আমরা কখনোই ভাবিনি যে বিষয়টি পরে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সেই পরিস্থিতিতে তার পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে আনা সম্ভব ছিল না।”

মুসলিম ধর্মাবলম্বী কাজল বিয়ের পর হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন বলেও জানান তরুণ। তার আশঙ্কা, কাজলকে যদি নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়, তবে তার বাবা-মা তাকে আর মেনে নেবেন না।

শোকাচ্ছন্ন পরিবার

ইন্দুবেন প্যাটেল

ছবির উৎস, Tejas Vaidya/BBC

কাজল গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তরুণ ও তার পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কাজল বর্তমানে আনন্দের একটি নারী সুরক্ষা কেন্দ্রে রয়েছেন।

তরুণ বলেন, “আমার সন্তানরা প্রতিদিন কান্নাকাটি করছে, জানতে চাইছে তাদের মা কবে ফিরবে। আমার কাছে এর কোনো উত্তর নেই। তাকে যদি বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়, তবে আমাদের পরিবার পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।”

কাজলের শাশুড়ি ইন্দুবেন বলেন, “কাজল চলে যাওয়ার পর থেকে আমাদের পরিবারের কেউই ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছে না। বাচ্চারা সারাক্ষণ কাঁদছে। কাজল আমার কাছে কেবল পুত্রবধূই ছিল না, ছিল আমার নিজের মেয়ের মতো।”

“যা ঘটেছে তা ঠিক হয়নি… আমি শুধু প্রার্থনা করি কাজল যেন বাড়ি ফিরে আসে।”

কাজলকে রাখা হয়েছে ‘জাগ্রুতি মহিলা সংগঠন’ নামে একটি হোমে।

বিবিসি গুজরাতিকে ‘জাগ্রিত মহিলা সংগঠনের সভানেত্রী আশা দালাল বলেন, “কাজল সবসময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন এবং প্রায়ই কান্নাকাটি করেন। তিনি সবসময় তার পরিবারের কথা, বিশেষ করে তার দুই ছেলের কথা মনে করছেন। তার একমাত্র ভয়, যদি তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়, তবে তিনি আর কখনোই ভারতে ফিরে আসতে পারবেন না।”

“কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে আমরা মাঝেমধ্যে তাকে দূর থেকে তার সন্তানদের দেখার সুযোগ করে দেই। এতে তিনি কিছুটা স্বস্তি পান। তবে তিনি সারাক্ষণ মন খারাপ করে থাকেন। আমরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ও শান্ত রাখার চেষ্টা করছি। বর্তমানে আমরা কাজলের দেখাশোনা করছি। সরকার ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

আনন্দের নারী সংগঠন

আইনি লড়াইয়ে তরুণ প্যাটেল

বর্তমানে তরুণের একমাত্র লক্ষ্য, যেকোনো মূল্যে কাজলকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো থেকে আটকানো। এ জন্য তিনি সব পর্যায়েই বিষয়টি তুলে ধরছেন এবং এমনকি হাইকোর্টের দ্বারস্থও হয়েছেন।

তার আইনজীবী জয়নব সাইয়েদ বিবিসি নিউজ গুজরাতিকে বলেন, “আমরা আদালতে গিয়ে চেষ্টা করব আইনের মারফত কাজল যাতে ভারতের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এই অধিকার কেবল ভারতীয় নাগরিকদের জন্যই নয়, বরং ভারতে বসবাসকারী যে কারোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই আমরা এই বিষয়গুলোই তুলে ধরব।”

জয়নব সাইয়েদ আরও ব্যাখ্যা করেন, “কেউ যদি কোনো ভারতীয়কে বিয়ে করেন এবং বেশ কয়েক বছর তার পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন, তবে পরিস্থিতি ও প্রমাণ বিবেচনা করে তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেন। আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে যাতে কাজলকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো না হয় এবং তিনি ভারতের নাগরিকত্ব পান।”

তরুণ প্যাটেল আনন্দ এলাকার সংসদ সদস্য মিতেশ প্যাটেলের কাছেও আবেদন জানিয়েছেন। বিবিসি গুজরাতিকে মি. প্যাটেল বলেন, “আমি দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে এই বিষয়টি তুলে ধরব।”

আইনজীবী জয়নব সাইয়েদ

ছবির উৎস, Tejas Vaidya/BBC

অপারেশন ডেল্টা হান্ট

গুজরাতের পুলিশ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে ‘অপারেশন ডেল্টা হান্ট’ নামে অভিযান শুরু করে।

২০২৬ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ৩৬২ জন কথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয় যাদের মধ্যে ১০৩ জন পুরুষ, ১৮৮ জন নারী এবং ৭১ জন শিশু ছিল।

এ ছাড়াও ৭৮২ জনেরও বেশি ‘সন্দেহভাজন বাংলাদেশি’ নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

গুজরাত সরকারের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সাহায্যে পুলিশি দলগুলো স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করে, যারা এই ব্যক্তিদের ভুয়া নথিপত্র সরবরাহ করেছিল।