Home LATEST NEWS BANGLA ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেও ফিফা সভাপতি পদেই থাকছেন ইনফান্তিনো

ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেও ফিফা সভাপতি পদেই থাকছেন ইনফান্তিনো

7
0

Source : BBC NEWS

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

ছবির উৎস, Getty Images

ফিফা আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোর অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাবের কারণে যে ‘ভুল’ তৈরি হয়েছে সেটির জন্য ক্ষমা চেয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

তবে মরক্কোতে অনুষ্ঠিত এক সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমর্থন পাওয়ায় ফিফা সভাপতির পদেই বহাল থাকছেন তিনি।

তার এই প্রস্তাবগুলো বাতিল হয়ে যাওয়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে বুধবার মরক্কোর রাবাতে ফিফার আফ্রিকা কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের তলব করেন ইনফান্তিনো।

ওই বৈঠকটি শেষ হওয়ার চার ঘণ্টা পর ফিফা ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে।

উয়েফা ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) প্রস্তাবটিকে একটি “নিম্নমানের, গোপন ও অস্পষ্ট চুক্তি” হিসেবে অভিহিত করেছে।

ফিফার ভেতর থেকেও বেশ কিছু সমালোচনা এসেছে। যার মধ্যে ছিলেন সংস্থাটির মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রোম, যিনি বুধবারের বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন।

মঙ্গলবার ফিফার কর্মীদের কাছে পাঠানো একটি স্মারকে তিনি লেখেন, এই পরিস্থিতিটি একটি “দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনাপ্রবাহ”।

যদিও বৈঠকের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে ফিফা সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের “পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত” করেছেন গ্রাফস্ট্রোম এবং ফিফার পরিচালনা পর্ষদ।

ফিফার সহ-সভাপতি, কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্য সংস্থাকে ইনফান্তিনো এবং গ্রাফস্ট্রোমের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিবিসি এই চিঠিটি দেখেছে।

চিঠিতে তারা তাদের ভুলের জন্য “আন্তরিকভাবে ক্ষমা চান” এবং “ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর ঘটবে না বলে প্রতিশ্রুতি” দেন।

ওই বৈঠকের পরে ইনফান্তিনো এবং গ্রাফস্ট্রোমকে রাবাতে উইমেনস আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের একটি ম্যাচ একসঙ্গে উপভোগ করতে দেখা গেছে।

এফএফই নামের একটি নতুন অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাবটি সমর্থন করলে প্রতিটি সদস্য সংস্থাকে ৪০ মিলিয়ন ডলার অথবা চার কোটি ডলার (৩০ মিলিয়ন পাউন্ড) দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো।

ফিফা জানিয়েছে, বুধবারের বৈঠকে এফএফই সংক্রান্ত “ভুলগুলো স্বীকার করা হয়েছে।”

এই সংস্থাটির দাবি, ফিফা কাউন্সিল ও সদস্য সংগঠনগুলো যেন “এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছে বলে মনে না করে”। এই প্রক্রিয়াটি “ভিন্নভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল” বলেও তারা উল্লেখ করে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, “গণমাধ্যমে প্রস্তাবটি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরেও যে ভুল হয়েছে” সেটি তারা স্বীকার করেছে।

২৮শে জুলাই দ্য টাইমসে ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনার খবরটি প্রথম ব্রেকিং হিসেবে প্রকাশ করে।

তবে, বিবৃতিতে ফিফা এটিও বলেছে, “সততা, সুশাসন এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার ওপর কোনো আঘাত আর সহ্য করা হবে না এবং সংস্থার সুনাম রক্ষা ও সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে”।

এর আগে, দ্য টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর অস্বীকার করে ফিফা।

খবরটিতে বলা হয়েছিল, মরক্কোর সমর্থন পাওয়ার বিনিময়ে ইনফান্তিনো দেশটিকে ২০৩০ বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ফিফা এই দাবিকে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ অভিহিত করে বলেছিল, স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, সেটি ‘যথাসময়ে’ নির্ধারণ করা হবে।

জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌথভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের ট্রফি ধরে আছেন

ছবির উৎস, Getty Images

আরো সমালোচনার পর অভ্যন্তরীণ সমর্থন

ফিফার এই সমর্থনের মধ্য দিয়ে নিজের ১০ বছরের মেয়াদে হওয়া সাম্প্রতিক এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় একটি বিতর্কের অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন ইনফান্তিনো।

তবে ফিফার কর্মকর্তাদের এই সমর্থন আসার আগে তিনি বেশ কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সঙ্গে যৌথভাবে সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ আয়োজন করা দেশ কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এরই মধ্যে বলেছেন, ইনফান্তিনোর ওপর তার আর কোনো আস্থা নেই।

এদিকে, বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ ও পর্তুগালের সাবেক উইঙ্গার লুইস ফিগো, যিনি ২০১৫ সালে ইনফান্তিনোর পূর্বসূরি সেপ ব্লাটারের বিরুদ্ধে ফিফা সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর সরে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি ইনফান্তিনোকে অবিলম্বে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ফিগো বলেন, “ইনফান্তিনো সেই পদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন, যেটিকে তিনি আরো উজ্জ্বল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার নিজের মর্যাদা বাঁচানোর সময় পার হয়ে গেছে, তবে ফুটবলকে বাঁচানোর সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।”

কিন্তু ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো ফিফার প্রেসিডেন্ট হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আগ্রহীদের ১৮ই নভেম্বরের মধ্যে তাদের নাম জমা দিতে হবে।

২০২৭ সালের মার্চে মরক্কোয় ফিফা কংগ্রেসে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

নির্বাচনে জয়ী হতে হলে একজন প্রার্থীকে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে ১০৬টি ভোট পেতে হবে।

তবে, উয়েফার হয়তো এটি নিয়ে ভিন্ন কোনো চিন্তা থাকতে পারে।

সপ্তাহের শুরুতে ইউরোপীয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা জানায়, তারা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছে; সঙ্গে ফিফার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেয় তারা।

এছাড়া কয়েকটি সদস্য সংস্থা তাকে পুনর্নির্বাচনের জন্য দেওয়া সমর্থন প্রত্যাহার করেছে এবং যুক্তরাজ্যও একই পথ অনুসরণ করতে যাচ্ছে।

ফিফা আরো জানিয়েছে, যদিও “কিছু ভুল হয়েছে, তবে যা কিছু করা হয়েছিল সেটি ফিফার নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সম্পূর্ণ নিয়মকানুন মেনেই করা হয়েছে”।

ফুটবলের এই সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, তারা মনে করে বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো “ফিফার শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে এবং সংস্থাটির প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে”।

কিন্তু এই ধরনের বক্তব্য এবং একদল কর্মকর্তার অনুমোদন সংস্থাটির প্রতি উয়েফার ক্ষোভ কমিয়ে দেবে এমন সম্ভাবনা কম।

ফিফার সাইনবোর্ড

ছবির উৎস, EThamPhoto via Getty Images

উয়েফা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে?

ইনফান্তিনোর এফএফই পরিকল্পনা সামনে আসার পর থেকেই ইউরোপীয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছে।

এফএফই পরিকল্পনাকে প্রাথমিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা থেকে শুরু করে উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশই যখন ফিফা প্রতিযোগিতা বয়কট করার হুমকি দেয় এবং পরবর্তীতে কার্যত অনাস্থা ভোট দেওয়ার মতো পদক্ষেপ সবকিছুতেই উয়েফা সক্রিয় ছিল।

কিন্তু উয়েফার একটি বড় সমস্যা রয়েছে এবং এই বাধা অতিক্রম করার মতো সামান্য কোনো বাধা নয়।

ইনফান্তিনো নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পর কেবল কনকাকাফ কনফেডারেশন (উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের যৌথ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) ফিফা সভাপতির সমালোচনা করেছে। কিন্তু উয়েফার মতো তারা ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা হারানোর কথা স্পষ্টভাবে বলেনি।

অন্যদিকে, এশিয়া কনফেডারেশন ওই পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করলেও সেটি বাতিল হওয়ার পর থেকে ইনফান্তিনোর পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

উয়েফার যথেষ্ট ক্ষমতা থাকলেও ইনফান্তিনোকে ক্ষমতাচ্যুত করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য উয়েফার আরো বৈশ্বিক সমর্থন প্রয়োজন।

ইউরোপের বাইরে এখন পর্যন্ত শুধু জর্ডানই প্রকাশ্যে তার পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে।

এই বিতর্ক শুরুর আগে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের সমর্থনের চিঠিতে স্বাক্ষর না করা হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্যতম জর্ডান।

অন্যদিকে, ইনফান্তিনোর শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে পরিচিত এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশই তার প্রতি তাদের সমর্থন প্রকাশ করেছে এবং সেই তালিকাটি বেশ দীর্ঘ।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মিশর, মরক্কো, নাইজার, মৌরিতানিয়া, ডিআর কঙ্গো এবং ফিলিপাইন প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের সমর্থন প্রকাশ করেছে।

এই ধরনের দেশগুলো ইনফান্তিনোর ফিফা ফরওয়ার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতি তিন বছরের চক্রে আট মিলিয়ন অথবা ৮০ লাখ ডলার (৫৯ দশমিক চার লাখ পাউন্ড) পর্যন্ত আর্থিক অনুদান পেয়ে উপকৃত হয়েছে।

উয়েফাকে এখন এসব দেশকে বোঝানোর পথ খুঁজতে হবে যে, অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীও একই ধরনের আর্থিক সুবিধা দিতে পারেন, তবে তা আরো স্বচ্ছতা এবং সংস্কারের মাধ্যমে।

তবে ইনফান্তিনো ইতোমধ্যেই এই দেশগুলোর আনুগত্য অর্জন করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বসে আছেন। পেছনে ইনফান্তিনোসহ আরো কয়েকজন দাঁড়ানো।

ছবির উৎস, Getty Images

ইনফান্তিনো কীভাবে পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারেন?

সৌদি আরবের ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পাওয়া থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা শান্তি পুরস্কার দেওয়া অথবা বিশ্বকাপে ফোলারিন বলোগানের নিষেধাজ্ঞা থেকে বেঁচে যাওয়ার মতো সাম্প্রতিক কোনো বিতর্কই ইনফান্তিনোকে ছুঁতে পারেনি।

তবে এবার ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক ও টিকিটের স্বত্ব বিক্রি করে দেওয়ার একটি চেষ্টা অনেকের কাছেই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির ঘটনা বলে মনে হয়েছে।

বিষয়টি কেবল বাহ্যিক দৃষ্টিতেই খারাপ ছিল না বরং ফিফার ঊর্ধ্বতন অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের থেকেও এটি গোপন রাখা হয়েছিল।

এছাড়া, মার্কিন প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনার, এই চুক্তির সুবিধাভোগী হতেন।

এই কারণে শুধু ২১১টি জাতীয় ফুটবল সংস্থার সঙ্গেই নয় বরং নিজের কাছের ব্যক্তিদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল ইনফান্তিনোর।

আর এই পরিকল্পনার জেরে ইনফান্তিনোর বৈশ্বিক কৌশল ও শাসনব্যবস্থা সংক্রান্ত জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করেছেন।

তবে অন্যান্য যারা এটির সমালোচনা করেছিলেন, যেমন- গ্রাফস্ট্রোম, ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভলপমেন্টের প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গার এবং চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুর পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্ত নেন।

সম্ভবত ফিফার ক্ষমতার মাঠে এমন আরো অনেকেই ছিলেন যারা নিজেদের অবস্থান গোপন রেখেছেন।

এর পাশাপাশি, ইনফান্তিনোকে হয়তো একটি সংস্কারের পথ তৈরি করতে হতে পারে অথবা তিনি হয়তো নিজেই তার একটি প্রস্তাব দিতে পারেন।

এর জন্য হয়তো এমন কিছু অতিরিক্ত যাচাই এবং ভারসাম্যের ব্যবস্থা রাখা হতে পারে যাতে এই ধরনের পরিকল্পনা ভবিষ্যতে আর কখনো এভাবে তৈরি এবং উপস্থাপন করা সম্ভব না হয়।

এমন প্রশ্নও সামনে আসছে যে তিনি ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারেন কি না, অথবা ফিফার নগদ তহবিল উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রস্তাবও দিতে পারেন কি না।