Source : BBC NEWS

তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও নির্বাচন চিহ্ন নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের জন্য পৃথক নাম ও প্রতীক ঘোষণা করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। এই সিদ্ধান্তের পরে মমতা ব্যানার্জী নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শুক্রবার কমিশনের জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী আগামী নির্বাচনে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ‘ফুটবল প্লেয়ার’ প্রতীক।
অন্যদিকে ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন শিবিরের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’। এই দলের প্রার্থীরা লড়বেন ‘খাম’ প্রতীক নিয়ে।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেসে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলের একাংশ মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে দাবি করতে শুরু করে।
এরপরই দলের ঐতিহ্যবাহী ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ প্রতীক এবং ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামের অধিকার নিয়ে বিরোধ সামনে আসে।
আগামী ছয়ই অক্টোবর রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনকে ঘিরে সেই বিরোধ আরও তীব্র আকার নেয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুই পক্ষকেই আলোচনার জন্য ডেকে পাঠায় নির্বাচন কমিশন। দুই দফা বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার বেশি রাতে কমিশন ‘ঘাসের উপরে জোড়াফুল’ প্রতীকটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানায়।
একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়, আপাতত কোনো পক্ষই ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ব্যবহার করতে পারবে না।
এরপর উভয় শিবিরের কাছ থেকে বিকল্প নাম ও প্রতীকের প্রস্তাব চাওয়া হয়। দুই পক্ষই তিনটি করে নাম ও প্রতীকের বিকল্প জমা দেয়। সেই প্রস্তাবগুলোর ভিত্তিতেই শুক্রবার নতুন নাম ও প্রতীক ঘোষণা করা হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের দুই শিবিরই এই নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছিল। তবে মমতা ব্যানার্জী মনোনীত প্রার্থী সঞ্চিতা দে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার পরে নন্দীগ্রাম থেকে তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন।
এই ঘটনার পরে মমতা ব্যানার্জী ঘোষণা করেছেন যে নন্দীগ্রামে তিনি কংগ্রেসের প্রার্থীকে সমর্থন দেবেন ও রেজিনগর নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেবেন।
যদিও মমতা ব্যানার্জীর সমর্থন ঘোষণার পর পরেই হত্যার অভিযোগের একটি পুরোনো মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধানকে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ সূত্র এবং কংগ্রেস রাজ্য নেতৃত্ব এই তথ্য জানায়।
ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images
দলের দুই ভাগের মধ্যে শুরু বাকযুদ্ধ
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রেজিনগর ও নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে দুই গোষ্ঠীকে এই নতুন নাম ও প্রতীক নিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।
কমিশনের ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ঋতব্রত ব্যানার্জী নাম উল্লেখ না করেই মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীকে আক্রমণ করেন। তার বক্তব্য, “গণতন্ত্রে রাজার ছেলে রাজা হয় না। উত্তরাধিকার বলে কিছু থাকে না। এটা কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নয়।”
অন্যদিকে, নতুন নাম ও প্রতীককে সাময়িক ব্যবস্থা বলে উল্লেখ করেছেন শ্রীরামপুরের সংসদ সদস্য কল্যাণ ব্যানার্জী। তার দাবি, “নির্বাচনের বাইরে দল আগের মতোই ‘ঘাসের উপরে জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ঋতব্রত শিবির তাদের মূল উদ্দেশ্যে সফল হতে পারেনি।”
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক বিজেপি সভাপতি তথাগত রায় সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করে মন্তব্য করেছেন, “তৃণমূল পার্টি টিকবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। ১৯৯০-এর দশকে এই পার্টি তৈরি হয়েছিল সিপিএম-এর বিরোধিতা করার জন্য। সুবিধা হয়েছিল, কারণ কংগ্রেস সিপিএম-এর সঙ্গে সেটিং-বদ্ধ ছিল। আর বিজেপি হাত গুটিয়ে বসে ছিল, তেমন কোনো চেষ্টাই করেনি।”
ছবির উৎস, Debarchan Chatterjee/NurPhoto via Getty Images
কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ভাঙন এবং দলের পরিচিত প্রতীক হারানোর ঘটনায় মমতা ব্যানার্জীকে দায়ী করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
শুক্রবার এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার দায় দলের নেতৃত্বকেই নিতে হবে। তার ভাষায়, “উনি দলকে একজোট রাখতে পারেননি। দল তিন ভাগ, চার ভাগ হয়েছে। তার দায়-দায়িত্ব তো ওর। এতে সরাসরি বিজেপির কোনো ভূমিকা নেই।”
শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, দলের বর্তমান পরিস্থিতি তিনি আগেই অনুমান করেছিলেন। প্রাক্তন দলনেত্রীর নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, “আমি গণনার দিন হলদিয়াতে বলেছিলাম, আর যে-ই থাকুক, এরা থাকবে না।”
নিজের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে একটি সংস্কৃত প্রবাদও উদ্ধৃত করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “অতি দর্পে হতা লঙ্কা, অতিমানে চ কৌরবা।” এরপর তিনি যোগ করেন, “দম্ভ যার হবে, তাকে চূর্ণ করবে ভগবান। সর্বশক্তিমান আছেন।”
নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক স্থগিত রেখে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের জন্য পৃথক নাম ও প্রতীক ঘোষণা করার পর মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য সামনে এলো।
ছবির উৎস, Debajyoti Chakraborty/NurPhoto via Getty Images
মমতা কি তার আঁকা জোড়াফুল প্রতীক ফিরে পাবেন না?
জোড়াফুল প্রতীকটি মমতা ব্যানার্জী নিজেই এঁকেছিলেন বলে জানান তার দলের কর্মী-সমর্থকরা। ফলে, এই চিহ্নটির প্রতি তার একটি দুর্বলতা আছে।
বর্তমানে এই চিহ্নটি দলের কোন শিবির পাবে, সেই সংক্রান্ত বিবাদ সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। কিন্তু সামনেই মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ও পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন।
তাই নির্বাচন কমিশন একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি করেছে যে দুই শিবিরের মনোনীত প্রার্থীরা তৃণমূল কংগ্রেস নাম ও দলীয় চিহ্ন জোড়া ফুল কোনোটাই ব্যবহার করতে পারবেন না।
যদিও এই দুই শিবিরের মধ্যে কে ‘আসল তৃণমূল’ সেই বিচার করার দায়িত্ব এখন সুপ্রিম কোর্টের।
দলের প্রতীককে যে কোনো পার্টির মুখ্য পরিচিতি বলে ধরা হয়।
ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা গেছে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভেঙে একনাথ শিন্ডে ও উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বে দুটি আলাদা দল গঠিত হয়েছে।
একনাথ শিন্ডের দল সমর্থন দিয়েছিল বিজেপিকে এবং তারা মহারাষ্ট্র সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক দল।
অন্যদিকে উদ্ধব ঠাকরে বিজেপি বিরোধী এবং বর্তমানে ইন্ডিয়া জোটের সদস্য।
ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images
নির্বাচন আইন কী বলে?
‘সিম্বলস অর্ডার ১৯৬৮’ – এর ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আছে প্রতীকের যৌক্তিক দাবিদার বেছে নেওয়ার।
মূলত ভাঙনের ক্ষেত্রে দুই দলের সঙ্গে কথা বলে নির্বাচন কমিশন প্রতীকের মুখ্য দাবিদার বেছে নেয়।
১৯৭১ সালের সাদিক আলি বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন মামলার রায়ের উপর ভিত্তি করে এক্ষেত্রে সব থেকে বেশি প্রাধান্য পায় এমপি, এমএলএ ও দলীয় সংগঠনগুলোর সিংহভাগ নেতারা কোন পক্ষে আছেন সেটি বিবেচনা করে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ ছাড়াও আরও কয়েকটি পন্থা নির্বাচন কমিশন অবলম্বন করে থাকে। ১৯৭১ সালের সাদিক আলি বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন মামলায় সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে,
- প্রথমত, কোন অংশ দলের সংবিধানের প্রতি বেশি আনুগত্য প্রদর্শন করছে
- এবং দ্বিতীয়, দলের উদ্দেশ্য ও পন্থার সঙ্গে কোন ভাগের মতামত বেশি মিলছে
তবে উক্ত সব ক্ষেত্রেও প্রতীকের উপযুক্ত দাবিদার না পাওয়া গেলে নির্বাচন কমিশন দুই দলকে আলাদা পার্টি গঠন করতে অনুরোধ করতে পারে।
তবে এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট জড়িয়ে গেলে শীর্ষ আদালতের কাছে এই বিবাদ নিষ্পত্তির দায়িত্ব চলে আসে। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।




