Home LATEST NEWS BANGLA রাড্ডা ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় ফের আলোচনায় বিএনপির চাঁদাবাজি ও...

রাড্ডা ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় ফের আলোচনায় বিএনপির চাঁদাবাজি ও দখল

6
0

Source : BBC NEWS

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

Published

পড়ার সময়: ৬ মিনিট

মাত্র গত সপ্তাহেই পটুয়াখালীর এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেওয়ার অডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সমালোচনার মুখে হুমকি দেয়া ব্যক্তিকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার করা হয়। জানা যায় অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত।

ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে খোদ ঢাকাতেই পরপর দুই রাতে দুইটি ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। দুইটি ক্ষেত্রেই দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে, সাথে আঙ্গুল ওঠে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার।

এর মধ্যে ৫০ বছরের পুরনো একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুড়িয়ে দেওয়া এবং একজন আলোচিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষ করে সালমান মুক্তাদির তার স্টুডিওতে হামলা ও ভাংচুরের পর করা ফেসবুক ভিডিওতে বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজ’ বলে মন্তব্য করেন।

এসব ঘটনার জের ধরে বিএনপি দলীয় কর্মীদের দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। সেইসাথে সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে আলোচনা চলছে।

এদিকে, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কিশোরগঞ্জের জলমহাল দখল সংঘর্ষ এবং সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’ (টিআইবি)।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার ও রাষ্ট্র পুলিশকে যথাযথ কার্যকর করে তুলতে পারেনি বলেই এসব ঘটনা ঘটছে। তাদের মতে, দেশজুড়ে হওয়া অপরাধমূলক কার্যক্রম প্রতিরোধে যে ধরনের উদ্যম ও মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা পুলিশের থাকার দরকার সেটি একদমই নেই।

তাদের মতে, সরকার অপরাধের সাথে রাজনৈতিক ইন্ধন বা যোগসূত্র বন্ধ করতে পারছে না বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তবে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

রাড্ডা গুড়িয়ে দিয়ে জমির মালিকানা দাবি করে একটি সাইনবোর্ডও বসানো হয়েছে

কী ঘটেছে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে?

শনিবার রাতে সুপরিচিত ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

সেসময় মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে মি. মুক্তাদিরের স্টুডিও ছাড়াও আশপাশের কয়েকটি বাড়িসহ স্থাপনায়ও হামলার অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার পর রাতেই নিজে লাইভ ভিডিও করে মি. মুক্তাদির হামলা ও লুটপাটের জন্য বিএনপির কর্মীদের দায়ী করেন এবং বিএনপিকে চাঁদাবাজ দল বলে মন্তব্য করেন।

ওই ভিডিওতে দেখা যায়, স্টুডিওর ভেতরে ভাঙচুর করা হয়েছে। চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাব ও সরঞ্জাম ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সালমান মুক্তাদির ভিডিওতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “ভিডিওটা শুধু খুবই স্পেশালি বানানো আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ – উনার জন্য। আপনি প্লিজ কোনো টেনশন নিবেন না, দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ”।

এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঢাকার মিরপুরে সুপরিচিত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি এর কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

দুই জন নিরাপত্তারক্ষীকে জিম্মি করে রাতের আঁধারে গুড়িয়ে দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটি। কয়েক ঘণ্টা ধরে চালানো এ হামলায় এক্সক্যাভেটর দিয়ে একটি পাকা, তিনটি আধা পাকা ভবনসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনার সময় পুলিশের বিরুদ্ধে নিস্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ওঠে যে, সরকারি দল বিএনপির লোকজনের সম্পৃক্ততা থাকার কারণেই কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি।

ঘটনার সাথে বিএনপিরই একজন সংসদ সদস্য জড়িত থাকারও অভিযোগ ওঠে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্ত্যের পর সালমান মুক্তাদির তার ভিডিও তার প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন

অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছেই – নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিশ্লেষকেরা।

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অপরাধীদের প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বহন করা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, বাড়ির সামনে গিয়ে গুলি করাসহ বিভিন্ন ঘটনার বেশ কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনী কার্যত ভেঙ্গে পড়েছিল। ফলে তার একটি প্রভাব এখনো রয়ে গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ওপরে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, সরকার পুলিশকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার মতো উদ্যমী করে তুলতে না পারাই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

“পুলিশ ফাংশন করতে পারছে না। এ ধরনের ক্রাইম মোকাবেলার জন্য যে মনস্তাত্ত্বিক সাহস ও উদ্যম থাকার দরকার সেটা তাদের নেই। ফলে হামলা, ভাংচুর, ধর্ষণ বা এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। আবার অপরাধ মোকাবেলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকাও জরুরি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে।

অধ্যাপক ফারুক বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন শৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। এখন বর্তমান সরকার কিছুটা রিকভারের চেষ্টা করলেও পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই দুর্বল হয়ে গেছে।”

এদিকে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আদৌ উন্নতি হয়েছে কি-না এখন সে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

বিশেষ করে হামলা, দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনা সারাদেশেই ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছিল শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। এর আগে অনেক দিন আলোচনায় ছিল ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় কিশোর গ্যাংয়ের সহিংস তৎপরতা।

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলছেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক নেতাদের ইন্ধন বন্ধ করতে না পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।

রাড্ডার ঘটনার সময় পুলিশের বিরুদ্ধে নিস্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে

“অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে, আবার কারও বিরুদ্ধে হবে না—এই চর্চা বরং অপরাধীদের উৎসাহিত করে। এসব কারণে দেশের আইন শৃঙ্খলার উন্নতি হচ্ছে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) সারাদেশে ৩১৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা সভাগুলোতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজিতে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্তদের জড়িত হয়ে পড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম বড় কারণ।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে অপরাধের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এসময়ে সারাদেশে ছোট-বড় বিভিন্ন অপরাধে ঘটনায় প্রায় এক লাখ মামলা হয়েছে।

ব্যাপক সমালোচনা – কী বলছে সরকার?

সাম্প্রতিক এসব ঘটনা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে রাজনৈতিক মহল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বিএনপির চাঁদাবাজি দখলদারিত্ব ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট বিকেল থেকেই শুরু হয়েছিল।

এদিকে, সমালোচনার মুখে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।

রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

টিআইবি

‘রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, বরং দলমত নির্বিশেষে’ অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সেইসঙ্গে, কোন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গাফিলতি প্রমাণ হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মি. আহমদ।

সেই ধারাবাহিকতায় মিরপুরে রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা ও লুটপাটের ঘটনার পর শাহআলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

তবে, ঢাকায় নিজের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় সালমান মুক্তাদির বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির যে অভিযোগ তুলেছেন, তাকে ‘ঢালাও অভিযোগ’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি আরো বলেন, “বিএনপি চাঁদাবাজ দল, এটা ঢালাও অভিযোগ। আমার দিকেও অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। যদি তিনি সুনির্দিষ্ট মামলা করেন, আমরা সেটা তদন্ত করে দেখতে পারি।”

এদিকে, দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’ (টিআইবি) রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কিশোরগঞ্জের জলমহাল দখল সংঘর্ষ এবং সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।