Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Elke Scholiers/Getty Images
হরমুজ প্রণালিতে মাসের পর মাস আটকে থাকা জাহাজগুলো সাগরে পরিবেশগত বিপদের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, এটি সাগরে আন্তর্জাতিক জৈব-নিরাপত্তার জন্য ‘বিরাট হুমকি’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল ‘বায়োলজিক্যাল ইনভেশান্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই সতর্কতা উচ্চারণ করেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, জাহাজগুলো মাসের পর মাস স্থির হয়ে থাকায় সেগুলোর গায়ে আটকে থাকার জন্য অভূতপূর্ব দীর্ঘ সময় পেয়েছে আক্রমণাত্মক প্রজাতিগুলো। ফলে এই জাহাজগুলো আবার সারা বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে চলাচল শুরু করলে তা ‘বৃহৎ পরিসরের সামুদ্রিক জৈব-আক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি’ বা ‘সুপার-স্প্রেডার’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে পারস্য বা আরব উপসাগরে (দ্য গালফ) আনুমানিক ১,৫০০টি জাহাজ আটকে রয়েছে, আর ওমান উপসাগরে রয়েছে আরও কয়েকশ জাহাজ।

‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’
জাহাজ অনেক দিন এক জায়গায় স্থির থাকলে অনেক সামুদ্রিক অণুজীব, শৈবাল ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী দ্রুত এর গায়ে আটকে যায় এবং বৃদ্ধি পায়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বায়োফাউলিং বা জৈব দূষণ।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লেখক ও সামুদ্রিক প্রতিবেশবিজ্ঞানী অধ্যাপক মারিও তামবুরি বলেন, “এমন একগুচ্ছ জীব রয়েছে, সাধারণত অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও শৈবাল, যাদের আমরা স্থির বা স্বল্প-চলনশীল বলি। কারণ তারা জীবনের পুরোটা সময় কোনো না কোনো পৃষ্ঠের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় কাটায়।”
তিনি ও যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, সৌদি আরব, নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা এবং ইসরায়েলের বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছেন।
তামবুরি বলেন, যখনই সমুদ্রে নতুন কোনো কাঠামো স্থাপন করা হয়, তখনই প্রথমে ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব সেটিকে উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে এবং একটি মাইক্রোবিয়াল স্তর তৈরি হয়।
“পরবর্তীতে সেই বায়োফিল্মের ওপর কেল্পের মতো বৃহৎ শৈবালের স্পোর, অথবা বার্নাকল, কৃমি এবং এ ধরনের অমেরুদণ্ডী প্রাণীর লার্ভা বসতি গড়ে তোলে… এরপর ওই সম্প্রদায়গুলো বৃদ্ধি পায় ও বিস্তৃত হয়, কারণ তাদের বেঁচে থাকার জন্য কঠিন পৃষ্ঠ প্রয়োজন।”
ছবির উৎস, Lokman lhan/Anadolu via Getty Images
তামবুরি বলেন, পারস্য উপসাগরের পানির নিচে শক্ত ভূমি খুবই কম। সমুদ্রতলের বেশিরভাগ অংশ কাদা, পলি ও বালু দিয়ে গঠিত। তাই এই জীবগুলো শক্ত কোনো পৃষ্ঠ, যেমন জাহাজ, পেলে সেখানে দ্রুত আটকে যায়।
আর বৈশ্বিক নৌ-পরিবহন রুটগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীয় অবস্থানের কারণে এই উপসাগর এমন একটি জায়গা, যেখানে জাহাজগুলো বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এসব বায়োফাউলিং জীব নিয়ে আসে। আবার স্থির অবস্থায় থাকার সময় এসব জাহাজের গায়ে সেগুলো জড়োও হয়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় অত্যন্ত বড় বিপুল সংখ্যক জাহাজ দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
গবেষকেরা এই পরিস্থিতিকে আধুনিক ইতিহাসে ‘নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
উদাহরণ হিসেবে তামবুরি উল্লেখ করেন, ২০২১ সালে মিসরের সুয়েজ খাল মাত্র ছয় দিনের জন্য অবরুদ্ধ ছিল। আর ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর বন্দরে একটি সেতু ধসে পড়ার ঘটনায় প্রায় ১১ সপ্তাহ ধরে ‘অল্প কয়েকটি জাহাজ’ চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
ছবির উৎস, Mario Tamburri
বিজ্ঞানীদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজগুলো সাধারণত বন্দর ছাড়ার আগে এক থেকে তিন দিন সেখানে অবস্থান করে।
তারা বলছেন, ১০ দিনের বেশি সময় পার হলে জাহাজে আক্রমণাত্মক প্রজাতি দ্রুত জমা হতে পারে।
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা দীর্ঘ সময় স্থির থাকা জাহাজগুলোকে পুনরায় যাত্রা শুরুর আগে বায়োফাউলিং মোকাবিলার ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
কিন্তু উপসাগরের অনেক জাহাজ ইতোমধ্যে কয়েক মাস ধরে স্থির রয়েছে।
তামবুরি বলেন, “জাহাজে বায়োফাউলিং এবং আক্রমণাত্মক প্রজাতি বিস্তারের জন্য যদি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির কথা ভাবা হয়, তাহলে এর চেয়ে খারাপ আর কোনো পরিস্থিতি ভাবতে পারবেন না।”
এর পাশাপাশি, অনেক সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও শৈবাল ঋতু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় প্রজনন করে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার সময় গ্রীষ্মের আগে পানির তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছিল।
তামবুরি বলেন, “তাপমাত্রা বৃদ্ধি অনেক সময় জীবদের প্রজনন, ডিম ছাড়ার, বেড়ে ওঠার এবং নতুন আবাস বা নতুন পৃষ্ঠ খুঁজে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে… যদি এই বন্ধ হয়ে যাওয়া শীতকালের মাঝামাঝি ঘটত, তাহলে ঝুঁকি কম হতো।”
ছবির উৎস, Kim Holzer, Smithsonian Environmental Research Center
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাগরের মোহনায় বসবাসকারী ও অত্যন্ত অভিযোজন ক্ষমতা রয়েছে এমন একটি বার্নাকল, যার নাম অ্যামফিব্যালানাস ইমপ্রোভিসাস, সেটি নৌ-পরিবহনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি উপসাগরেও পাওয়া যায় এবং ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রতিদিন প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক প্রাণী ৩৬টি পর্যন্ত লার্ভা ছাড়তে পারে।
প্রতিবেদনটি বলছে, এই স্থির অবস্থানের সময়কালে একটি জাহাজ থেকেই লাখ লাখ লার্ভা নির্গত হয়ে থাকতে পারে।
তামবুরি বলেন, “মূল বিষয় হলো এর বিশাল আকার, পরিসর এবং ব্যাপ্তি। আর ওই অঞ্চল থেকে যেসব জাহাজ বের হয়, তারা পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই যায়।”
‘বিপুল’ ক্ষতি
তামবুরি বলেন, এসব জীব যদি নতুন আবাসস্থলে পৌঁছে যায়, তাহলে তা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে ‘বিপুল’ ক্ষতি করতে পারে।
তার ভাষায়, তারা স্থানীয় বিভিন্ন প্রজাতিকে সরিয়ে দিতে পারে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটাতে পারে, মৎস্য ও জলজ চাষব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের শীতলীকরণ ব্যবস্থাও বন্ধ করে দিতে পারে।
“আক্রমণাত্মক প্রজাতিগুলো একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে, বিশেষ করে সামুদ্রিক পরিবেশে, সেগুলো অপসারণ করা সত্যিই কঠিন।”
প্রতিবেদনের লেখকেরা বলছেন, এসব জীব ক্ষতিকর পরজীবী ও রোগজীবাণুও বহন করতে পারে, আর উপসাগরীয় অঞ্চলের উষ্ণ পানি তাপ-সহনশীল জাতগুলোর জন্য অনুকূল হতে পারে।
এসব জীব যদি অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বাড়লে সেগুলো স্থানীয় প্রজাতির তুলনায় আরও বেশি সহনশীল হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া বায়োফাউলিং জাহাজগুলোর জন্যও ক্ষতিকর। জীবগুলো বৃদ্ধি পেলে জাহাজের ওজন বাড়ে এবং পানির মধ্যে ঘর্ষণও বৃদ্ধি পায়, ফলে গতি কমে যায়।
তামবুরি বলেন, “জাহাজকে আগের গতি বজায় রাখতে বেশি জ্বালানি পোড়াতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু মাইক্রোবিয়াল বায়োফিল্মের স্তর থাকলেই জ্বালানি ব্যয় দুই থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
“আর যদি বার্নাকল ও ঝিনুকের মতো ভারী বায়োফাউলিং থাকে, তাহলে জ্বালানি ব্যয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।”
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
অবাঞ্ছিত এসব সামুদ্রিক প্রাণীর বৃদ্ধি ঠেকাতে বিষাক্ত বায়োসাইডযুক্ত অ্যান্টি-ফাউলিং রং তৈরি করা হয়েছে।
তামবুরি বলেন, “জাহাজ চলাচল করলে এসব রং ভালো কাজ করে… কিন্তু দীর্ঘ সময় জাহাজ স্থির থাকলে এগুলো কার্যকর থাকে না,” কারণ তখন এগুলো “বায়োফাউলিং বৃদ্ধির চাপে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে”।
নৌ-চলাচলের পরিমাণ, ভ্রমণের সময় এবং পরিবেশগত অবস্থার মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে গবেষকেরা এমন কয়েকটি বন্দর চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো এসব প্রজাতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের জেদ্দা, ভারতের মুম্বাই, শ্রীলঙ্কার কলম্বো, সিঙ্গাপুর, মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া, গ্রিসের পিরেয়ুস, স্পেনের আলহেসিরাস এবং নেদারল্যান্ডসের রটারডাম।
তামবুরি বলেন, উষ্ণ ও লবণাক্ত পানির মতো একই ধরনের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বন্দরগুলো “অত্যন্ত সংবেদনশীল” হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
বিজ্ঞানীদের মতে, সবচেয়ে আদর্শ পরিস্থিতিতে জাহাজগুলো উপসাগর ছাড়ার আগে পরিষ্কার করা উচিত। তবে বিপুল সংখ্যক বড় এবং ব্যাপকভাবে বায়োফাউলিং আক্রান্ত জাহাজ পরিষ্কার করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবগুলো যাতে পানিতে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য সেগুলো সংগ্রহ ও নিরাপদে অপসারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিষাক্ত উপাদান ও মাইক্রোপ্লাস্টিকযুক্ত অ্যান্টি-ফাউলিং রং যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ছবির উৎস, Getty Images
তামবুরি বলেন, রোবটিক প্রযুক্তির মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে জীবগুলো সংগ্রহ করেই জাহাজ পরিষ্কার করা সম্ভব, কিন্তু উপসাগরের বেশিরভাগ পানির মধ্যে পরিষ্কারকরণ সেবায় এখনো বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নেই, কারণ প্রযুক্তিটি তুলনামূলকভাবে নতুন।
তিনি আরও বলেন, ব্যাপক বায়োফাউলিং আক্রান্ত বিপুল সংখ্যক জাহাজের কারণে সক্ষমতার সমস্যাও রয়েছে।
সমস্যার ব্যাপ্তি, নৌপরিবহন দ্রুত পুনরায় চালু করার জরুরি প্রয়োজন, আটকে থাকা নাবিকদের সরিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যাত্রার আগে যথাযথভাবে জাহাজ পরিষ্কার করা বাস্তবসম্মত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য হবে এবং যেসব বন্দর এই অঞ্চল থেকে আসা জাহাজ গ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে, সেগুলোতে আগমনের পর পরিষ্কারের প্রস্তুতি রাখা উচিত, যাতে আক্রমণাত্মক প্রজাতির বিস্তার কমানো যায়।
তামবুরি বলেন, “প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার পর অ-স্থানীয় জীবের নতুন স্থানে প্রবেশ ঘটবে, সে বিষয়ে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত”।
“কিছু আক্রমণাত্মক প্রজাতি পটভূমিতে থেকেই যেতে পারে, তারা থাকবে কিন্তু খুব একটা চোখে পড়বে না বা বড় ধরনের ক্ষতি করবে না। আবার কিছু করবে।”
গবেষকেরা বলছেন, এটি বৈশ্বিক “জৈব-আক্রমণের সুপার-স্প্রেডার ঘটনা”-তে পরিণত হবে কি না, তা এখন জাহাজগুলোর গায়ে কী জন্মেছে তার চেয়ে বেশি নির্ভর করছে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর।




