Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, EPA
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে ইরানের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তেহরান এমন একটি চুক্তি করতে চাইছে যার মাধ্যমে তারা দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে, কারণ তারা ‘খুব বাজেভাবে হারছে’।
ট্রাম্পের মন্তব্যের বিষয়ে এক টেলিগ্রাম পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক জবাবের জন্য অপেক্ষা করবে।
শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘে সাংবাদিকদের আরাঘচি বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে’ একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব এবং এসব শর্ত দুই দেশের মধ্যে জুন মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে উল্লেখ আছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ গ্যাস ও তেল সরবরাহ পরিবহন করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
শনিবার ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাদের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করছি’।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ইতোমধ্যেই হরমুজের ওপর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে এবং ‘বিপুল পরিমাণ তেল’ এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
“তারা একটি চুক্তি করতে চায় এবং আমি মনে করি সেটা ভালো। আমিও চুক্তি করতে পছন্দ করি। কিন্তু সেই চুক্তি (ইরানের দেওয়া প্রস্তাবের দিকে ইঙ্গিত করে) গ্রহণযোগ্য হবে না,” বলেছেন তিনি।
ওদিকে আরাঘচি লিখেছেন, ট্রাম্প ‘অনেক ভালো বক্তব্য দিয়েছেন, আবার অনেক পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও দিয়েছেন, যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা প্রায়ই শুনি’।
ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
তিনি আরও বলেন, তিনি মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে ‘চূড়ান্ত মতামত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন এবং তারপর তেহরান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
শুক্রবার কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ট্রাম্প সন্দিহান যে ইরান তার দাবিগুলো মেনে চলবে। পত্রিকাটি আরও জানায়, ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন যে নতুন করে বোমা হামলার অভিযান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর ইরান ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়।
একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে জ্বালানির দামে ব্যাপক ওঠানামা শুরু হয়।
এ অর্থনৈতিক প্রভাব ট্রাম্পের ওপর সংঘাত শেষ করার জন্য একটি সমাধান খুঁজে বের করার চাপও বাড়িয়েছে – বিশেষ করে নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচন থাকায়।
শুক্রবার আরাঘচি সাংবাদিকদের বলেন, “প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ হলে প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া যেতে পারে এবং সাত দিনের মধ্যে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার করা সম্ভব”।
তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রকে যে পদক্ষেপগুলো নিতে হবে, সেগুলো নতুন কিছু নয়। এগুলো সবই ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে আছে….. এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে”।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিবিসির মার্কিন অংশীদার সংস্থা সিবিএস নিউজকে বলেন, “পাকিস্তানে স্বাক্ষরিত সমঝোতার ভিত্তিতে আমরা এর আগে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিলাম…যুক্তরাষ্ট্র যদি সে পদ্ধতিতে এগোতে সম্মত হয়, তাহলে সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।”

তবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে দায়িত্ব পালন করা কার্স্টেন ফন্টেনরোজ বিবিসিকে বলেন, সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা আবার শুরু করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আগ্রহ নেই।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এটিকে একটি ‘খারাপ চুক্তি’ হিসেবে দেখা হয় এবং ইরান ‘একটি শক্তভাবে বন্ধ দরজায় চাপ দিচ্ছে’।
ওই সমঝোতার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা এবং হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে পুনরায় খুলে দেওয়া।
১৪ দফার ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা ‘সব ফ্রন্টে’ সামরিক অভিযান বন্ধ করবে।
পাশাপাশি মার্কিন নৌ অবরোধ ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে উভয় পক্ষ আবার হামলা শুরু করার পর চুক্তিটি ভেঙে পড়ে।
ইরান এমন কিছু জাহাজের ওপর হামলা চালিয়েছে, যেগুলো তাদের দাবি অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনা এবং ইরানের উপকূলের কাছে থাকা কয়েকটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।
একই সঙ্গে তারা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রেখেছে, যার ফলে দেশটির অর্থনীতিতে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এরপর ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল বের করে আনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছে।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
পণ্যবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স বলেছে, সাম্প্রতিক ১০ দিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। কোনো কোনো দিনে এই সংখ্যা ৯টি জাহাজে নেমে এসেছে।
ইয়েমেনের হুথিদের হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরানের মিত্র হুথিরা সম্প্রতি লোহিত সাগরের মাধ্যমে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ব্যাহত করার লক্ষ্যে হামলা বাড়িয়েছে।
হুথিরা চলতি মাসে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত কিছু এলাকা দখল করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মোকা বন্দর, যা আরব উপদ্বীপের অপর পাশে অবস্থিত আরেক গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে মুখ করে আছে।
শনিবার ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, তারা সৌদি আরবের দিকে হুথিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও কয়েকটি ড্রোন প্রতিহত করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্ব ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে।
এ সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, তিনি মনে করেন নভেম্বরের নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। একই সময়ে তিনি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস করে’ দ্রুত পুনর্গঠনের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।
এর জবাবে আরাগচি শুক্রবার বলেন, “ধ্বংসের হুমকির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।”




