Source : BBC NEWS

ছবির উৎস, Getty Images
দক্ষিণ কোরিয়ার সাংবিধানিক আদালত রায় দিয়েছে যে, ইউন সুক ইওল গত ডিসেম্বর মাসে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দিয়ে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এজন্য তাকে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়া, তাদের কে-ড্রামা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য সারা বিশ্বে প্রশংসিত। দেশটি সব সময় একটি শান্তিপূর্ণ এবং গর্বিত গণতন্ত্র চর্চা করে আসছে।
এই দেশটির কোথাও কখনো সামরিক দখলদারিত্ব হতে পারে, এমনটা কেউ আশাও করেনি।
এ কারণে, যখন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওল সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেন, তার সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের আদেশ দেন, তখন গোটা দেশ ও বিশ্বের সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়ে।
সাধারণ কোরিয়ান থেকে শুরু করে বিশ্বের নেতারা, সবার মনে একটি প্রশ্নই জ্বলে উঠছিলো, ইউন কী ভেবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
ইউন তার দেশের জনগণ, সেনাবাহিনী এবং পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রতিরোধকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন। এ কারণে মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যে তিনি আদেশটি বাতিল করতে বাধ্য হন।
বিবিসি দক্ষিণ কোরিয়ার এই প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে কাছের কিছু মানুষের সাথে কথা বলেছে – তার বন্ধু, বিশ্বস্ত সহকর্মী, এবং রাজনৈতিক সহকারী।
যাতে বোঝা যায় যে, কী কারণে একসময়কার সফল এবং নীতিবান প্রসিকিউটর (আইনপ্রণেতা), যিনি সঠিক এবং ভুলের পার্থক্য করার জন্য পরিচিত ছিলেন, তিনি কেন স্বৈরশাসন শুরু করতে বাধ্য হলেন।
যে সিদ্ধান্ত তার দেশকে বিপথগামী করতে পারতো, তার আন্তর্জাতিক খ্যাতি নষ্ট করতে পারতো এবং তার ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে পারতো।
ছোটবেলা থেকে, ইউন “জয়ের ব্যাপারে মরিয়া ছিলো”, তার সবচেয়ে পুরনো বন্ধু, চুলউ লি সামরিক আইন ঘোষণার পরবর্তী সপ্তাহগুলোয় বিবিসিকে এ কথা বলেন।
“একবার সে কোন সিদ্ধান্ত নিলে, সেটা বাস্তবায়ন করতে একরোখা থাকতো”।

ইউনের সাথে একই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একই ক্লাসে ছিলেন মি. লি । পরে তারা একসাথে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন, তারপর ইউন প্রসিকিউটর হন।
স্কুলে, ইউন ক্লাসের সবচেয়ে লম্বা ছাত্র ছিলেন, মিস্টার লি বলেন, যার মানে ছিল ইউন সবসময় পিছনের বেঞ্চে বসতো, যাতে অন্য ছাত্রদের দৃষ্টি আটকে না যায়।
“সে ছিলো জনপ্রিয় এবং বুদ্ধিমান”, মি. লি যোগ করেন, “ইউন এমন একটি মিথকে খণ্ডন করতে চেয়েছিলো, যার কারণে একাডেমিকভাবে তাকে বেশ বেগ পোহাতে হয়। বার পরীক্ষা পাস করতে তাকে নয়বার প্রচেষ্টা চালাতে হয়েছিলো”।
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ইউন কলেজে পড়াশোনা করতেন, ওই সময় দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক শাসক চুন ডু-হোয়ান সামরিক আইনের মাধ্যমে দেশ শাসন করতেন।
সেনাবাহিনী যেদিন গোয়াংজু শহরে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম হামলা চালায়, তখন পুরো দেশ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা সেদিন রাস্তায় নামলেও লি-এর মতে, ইউন “এতে খুব একটা অংশ নেননি”।
” ইউন ছাত্র আন্দোলন বা রাজনীতির ব্যাপারে তেমন একটা আগ্রহী ছিলেন না,” লি বলেন, তবে তার “ন্যায়ের প্রতি শক্ত বিশ্বাস ছিলো”।
মি. লি একদিন ক্যাম্পাসে হাঁটছিলেন,তখন ইউন দেখতে পান যে একটি মেয়েকে দুইজন সাদা পোশাকধারী পুলিশ কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
“ইউন তৎক্ষণাৎ তাদের দিকে চিৎকার করতে শুরু করে। ইউন দেখতে বিশালাকার আর অনেক রাগান্বিত থাকায় পুলিশ কর্মকর্তারা ভয় পেয়ে গিয়েছিলো”।
“কারণ তিনি এত বড় এবং রাগান্বিত ছিলেন, তারা প্রায় পালিয়ে বেঁচেছিল,” তিনি বলেছিলেন। “তার রাগ ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে”।

‘আমি আমার আনুগত্য কারো জন্য বিকিয়ে দেইনি’
প্রায় এক দশক পরে, মিস্টার লি তার বন্ধুর রাগের শিকার হন।
একজন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর হিসেবে, ইউন নিজের খ্যাতি গড়ে তোলেন একজন বিস্ফোরক চরিত্র হিসেবে।
যিনি সঠিক এবং ভুলের সহজাত বোধকে কঠোরভাবে মেনে চলতেন।
কিন্তু সময়ের সাথে ইউনের তদন্তগুলো অযথাই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। যা মি. লি-কে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলো।
যখন তিনি ইউনের সাথে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফোন করেন, ” ইউন রাগে ফোনটি ঘরের একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দেন”।
ততদিনে, ইউন খুবই জনপ্রিয়, ২০১৩ সালে তিনি তার বসের নির্দেশ অমান্য করে গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করেন।
এজন্য তাকে তার চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়, কিন্তু মি. লি’র মতে, জনগণ তাকে সাহসী মনে করতো, কারণ তিনি রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন।
একবার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে, ইউন ঘোষণা দিয়েছিলেন: “আমি আমার আনুগত্য কারো জন্য বিকিয়ে দেইনি।”
তার এই কথায় প্রমাণিত হয় ২০১৮ সালে যখন তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার অভিশংসিত রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হো এর বিচার করে তাকে কারাবন্দী করেন, যার কারণে তিনি বামপন্থীদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন।
এ কারণে, তাকে বামপন্থী সরকারে প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু, তিনি সুসম্পর্ক তৈরির বদলে, সরকারের এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন।
তখন মি. লি তাকে ফোন করে সতর্ক করেন যে “তিনি এমন একটি সেতু পার হচ্ছেন যাতে একবার পা রাখলে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়,” যা ইউনকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এরপর তারা এক বছর কেউ কারো সাথে কথা বলেননি।

ছবির উৎস, Getty Images
তবে, ইউনের দৃঢ়, পক্ষপাতহীন মনোভাব তাকে অনেক জন সমর্থন এনে দেয়।
“আমি তার পক্ষে ছিলাম কারণ তিনি সবসময় সঠিক কাজটি করতেন, শুধু তার বসের নির্দেশমতো চলতেন না। আমি মনে করি তার মতো আরো মানুষ থাকা উচিত,” বলেছিলেন ইউনের আরেক বন্ধু, শিন (এখানে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে)।
শিন, যিনি ইউনকে তার বড় ভাই বলে ডাকেন (যা দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি শ্রদ্ধাভাজন শব্দ), তিনি দাবি করেন, ইউন সেই সময়কার অন্য অনেক প্রসিকিউটরদের থেকে আলাদা ছিলেন, যারা প্রভাব ব্যবহার করে ধনী ও ক্ষমতাশালী পরিবারের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতেন।
অথচ ইউন সরকারের বিরুদ্ধে তদন্ত করে, এমন এক লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছিলেন যেখানে তিনি জিততে পারেননি।
তাকে প্রধান প্রসিকিউটরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এমন সিদ্ধান্ত তাকে রাজনীতির দুই পক্ষের কাছে নায়ক এবং খলনায়ক বানিয়ে দেয়। যা তার ব্যক্তিত্বকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে।
তবুও, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত এতোটাও সহজ ছিল না, শিন বলেন।
তারা নিয়মিত দেখা করে একে অপরের সাথে আলোচনা করে একটি পরিকল্পনা তৈরি করতেন। তবে তারা ইউনের রাজনৈতিক যোগাযোগের অভাব নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
“যদি আপনি আপনার পুরো জীবন একজন রাজনীতিবিদ হন, তবে অনেকেই আপনাকে সমর্থন করবে। অনেকের সাহায্য পাবেন। কিন্তু ইউন জানতেন যে তিনি একজন নিঃসঙ্গ প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন,” শিন বলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ডান পন্থায় ঝোঁক
“খুব আফসোস হয় যে আমি তাকে আমাদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছি,” সামরিক আইন ঘোষণার পরপরই ইউনের প্রচারণা কৌশলী কিম কুন-সিক বিবিসির কাছে তা স্বীকার করেন।
কিম কুন-সিক প্রথমে ইউনের আইনের প্রতি নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু পরে তিনি দ্রুত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
“তিনি আমাদের কোনো পরামর্শ শুনতেন না। শুধু নিজের ইচ্ছা মতো কাজ করতেন – তিনি ছিলেন ভীষণ জেদি।”
তিনি গোপনে গোপনে আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিতেন, যে বন্ধুদের সাথে তিনি মদ্যপান করতেন, তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন, কিম বলেন। “আমাদেরকে বার বার তার তৈরি করা ঝামেলা মেটাতে হতো।”
তবে এসব সতর্ক সংকেত সত্ত্বেও, তাকে দক্ষিণ কোরিয়ার রক্ষণশীল ‘পিপল পাওয়ার পার্টি’র প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
“আমরা জানতাম তিনি একজন ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ, কিন্তু আমরা ভেবেছি যে তিনি আমাদের প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিতে পারবেন,” কিম বলেন।
দল থেকে সমর্থন পাওয়ার পর, ইউনের রাজনীতি দ্রুত ডানপন্থার দিকে সরে যায়।
তার বন্ধুদের মতে, অনেক ডানপন্থী রাজনীতিবিদ এবং সাংবাদিকরা “তার মনের মধ্যে ডানপন্থী ধারণা শক্তিশালী করেছিল।”

ছবির উৎস, Getty Images
ইউন বিরোধী দলের প্রতি চরম শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে বিরোধীদের উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আছে।
“আমার খুবই দুঃখ হচ্ছিল, কারণ তিনি বদলে যাচ্ছিলেন,” শিন বলেন। “তিনি জিততে চেয়েছিলেন, এবং ভুল পরামর্শ তার মাথা দখল করে ফেলেছিলো। তিনি ভাবতে শুরু করেছিলেন যে তিনি একটি যুদ্ধের মধ্যে আছেন।”
এদিকে ইউনের স্কুলের বন্ধু লি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
“সে রাজনীতিতে এতো বিস্তৃত সমর্থন নিয়ে এসেছিল। আমি আশা করেছিলাম যে সে দেশে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু সে এতো দ্রুত ডানপন্থায় সরে যায় এবং প্রায় প্রতিদিনই সে তার সমর্থন হারাতে থাকে।”
“সমস্যা হলো ডানপন্থী শ্রেণির লোকেরা অন্ধ সমর্থক হয়” লি আরো বলেন, ইউন যত বেশি সমর্থন হারাচ্ছিলো, ততই সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাকে এই অন্ধ ভক্তদের উপর নির্ভর করতে হবে, এবং সে আরও ডানপন্থার দিকে সরে যায়।
এটি একটি আত্মবিনাশি চক্র ছিলো। ইউন দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে কম ব্যবধানে মাত্র দশমিক সাত শতাংশ ভোটে নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
ইউনের বিজয়ের পর, মি. লি দেশের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তার স্কুল বন্ধুকে মেসেজ পাঠান সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য।
“আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলাম যেদিন তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হবে সেদিন আমি তাকে দেখতে যাবো।”

ছবির উৎস, Reuters
একজন প্রসিকিউটর প্রেসিডেন্ট
ইউন যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করে তার অফিসে আসেন, তখন তিনি তার সবচেয়ে পুরনো বন্ধুদের দূরেই সরিয়ে দেননি, অনেক মধ্যপন্থী ভোটারকেও আলাদা করে দেন।
তিনি পার্লামেন্টে ক্ষমতাধর বিরোধী দলের সাথে সংঘাতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন, যারা পার্লামেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতো।
প্রসিকিউটর থাকাকালে নিজের সকল বৈশিষ্ট্য তিনি রাজনীতিতে প্রয়োগ করতে শুরু করেন। তবে যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য, তাকে একজন শক্তিশালী প্রসিকিউটর বানিয়েছিল, প্রেসিডেন্ট হিসেবে সেই একই বৈশিষ্ট্য তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
“সাধারণত যে রাজনীতিবিদদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তারা তাদের সহকারীদের পরামর্শ অনেক শোনেন, কিন্তু ইউন চেয়েছিলেন নিজেই সঠিক পথ নির্ধারণ করতে,” বলেন তার একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বক্তব্য দেন।
উপদেষ্টা, যিনি প্রেসিডেন্টের অফিসে কাজ করতেন, তিনি বলেন যে, ইউন তার বক্তব্য “উচ্চস্বরে এবং জোরালোভাবে” তুলে ধরতেন, যার ফলে বিকল্প মতামত প্রকাশ করা “অস্বস্তিকর” হয়ে যেতো।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিকে, অধিকাংশ দল তাকে বিরোধী দলের নেতাদের সাথে বসে নিজেদের মতভেদ মিটিয়ে কার্যকরভাবে শাসনভার পালন করার জন্য চাপ দেয়। কিন্তু ইউন তা প্রত্যাখ্যান করেন বলে উপদেষ্টা জানান।
“তিনি বিরোধী দলের নেতা, লি জে-মিয়াংকে একজন অপরাধী হিসেবে দেখতেন।”
তার পরিবর্তে, ইউন প্রেসিডেন্টের অফিসের একটি ছোট গোষ্ঠীর সাথে একমত হন যারা চেয়েছিল তিনি যেন “পার্টির সাথে সরাসরি লড়াই করেন”।
এভাবে খুব দ্রুত, যারা সংলাপের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন তারা হয় চলে গেলেন অথবা তাদের বের করে দেওয়া হল, যার ফলে ইউনকে ঘিরে রইলেন তার সাথে একমত পোষণকারী লোকজন এবং নিম্ন স্তরের আমলারা, যারা কথা বলতে ভয় পেতেন।

ছবির উৎস, Reuters
এই আগ্রাসী নেতৃত্ব ইউনকে একটি কৌশলগত ভুলের দিকে ঠেলে দেয়– তিনি ভোটারদের পছন্দ ও প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করতে শুরু করেন। তিনি অজনপ্রিয় নীতি নিয়ে এগোচ্ছিলেন।
তার স্ত্রী বিলাসবহুল উপহার গ্রহণ করায় সাধারণ মানুষ বিরক্ত ছিলো। কিন্তু তিনি এ জন্য ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন।
“মানুষ তার সম্পর্কে কি ভাবছে; তারা কি মনে করে যে তিনি ভাল কাজ করছেন কি না- এসব বিষয়কে তিনি খুব একটা পাত্তা দিতেন না,” বলেছিলেন তার বন্ধু শিন।
নিবার্চনী প্রচারণার শুরুর দিনগুলোয় ইউনকে স্মার্টভাবে পোশাক পরার ব্যাপারে রাজি করাতে সংগ্রাম করতে হয়েছিলো মি. শিনকে।
ইউন ভয় পেতেন যে সাধারণ মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে গিয়ে এবং তাদের পছন্দের পাত্র হয়ে উঠতে গিয়ে তিনি তার লক্ষ্য অর্জন থেকে ছিটকে পড়তে পারেন।
তিনি আশা করতেন, মানুষ একদিন বুঝতে পারবে যে তিনি ভালো কাজ করছেন, শিন ব্যাখ্যা করেন।
কিন্তু বাস্তবে ঘটলো এর উল্টোটা।
তার মেয়াদের দুই বছর, তার পার্টি পার্লামেন্টারি নির্বাচনে এক কঠিন পরাজয়ের শিকার হয়। যার ফলে বিরোধী দল আরও বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
এ সময় ইউন একদম স্থবির হয়ে পড়েন, তার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে অক্ষম হয়ে যান।
“এটা অহংকারের ব্যাপার যে আপনি জনপ্রিয় হতে চান না, আপনি অনুমোদন রেটিং চান না, কিন্তু এটাই ইউনের “সবচেয়ে বড় ভুল” ছিলো,” বলেন শিন।
“তিনি একজন রসিক, পছন্দসই মানুষ ছিলেন। তিনি একজন জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন।”

ছবির উৎস, Reuters
বিরোধীদের শাস্তি দেওয়া
অন্যদিকে, ইউন তার পার্টির নির্বাচনী পরাজয় নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না।
একজন রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ এবং সে সময় প্রেসিডেন্টের কাছের একজন বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন লিনটন। তিনি বলেন, “ইউন বলেছিলেন যে তিনি এখনও নির্বাহী আদেশ দিতে পারবেন এবং অনেক কিছু অর্জন করতে পারবেন। তিনি আমাকে চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন।”
বিভিন্ন সাক্ষ্য অনুযায়ী, ইউনের সামরিক আইনের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নেওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার ছিলো।
মূলত তখন থেকেই, তিনি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়েন, যা প্রভাবশালী ডানপন্থী ইউটিউবাররা প্রচার করছিল। তারা এসব বিষয় নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করছিল।
তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বিরোধী দল উত্তর কোরিয়া থেকে নির্দেশনা নিতো, সেইসাথে যারা উত্তর কোরিয়া শাসনব্যবস্থা ধারণ করতেন, তারা ওই নির্দেশ মতো চলতো, যদিও তিনি কখনো এর কোন প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
লিনটন জানান, ইউন বারবার বলতেন যে বিরোধী দলকে মার্কসবাদীরা পরিচালনা করছে, একবার তাদেরকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাথেও তিনি তুলনা করেন।
তিনি ভাবতেন যে, যদি তারা ক্ষমতায় আসে, তারা দক্ষিণ কোরিয়াকে একটি কর্তৃত্ববাদী কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত করবে এবং দেশটিকে দেউলিয়া করে ফেলবে।
“আমি এই বক্তৃতা কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ বার শুনেছি।”
বিরোধী দল যত শক্তিশালী হতে থাকে, ইউন ততই একগুঁয়ে হয়ে ওঠেন, তার প্রেসিডেন্সিয়াল ভেটো ব্যবহার করে পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তগুলোকে আটকাতে থাকেন।
এর বদলে, পার্লামেন্ট তার বাজেট কেটে দেয়, তার বড় সংখ্যক রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের অভিশংসন করে, এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করার চেষ্টা করে।

ছবির উৎস, Reuters
লিনটনের মতে, ইউন “রেগে গিয়েছিলেন”। “তারা আমাকে নামাতে, সরকারের পতন ঘটাতে এবং আমাদের গণতন্ত্র শেষ করতে চাইছে – এবং আমরা এটা মেনে নিতে পারি না,” তিনি তাকে বলেছিলেন।
৩রা ডিসেম্বর, অবশেষে তিনি সহ্য করতে না পেরে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারান।
“তিনি সামরিক আইনকে বিরোধী দলকে শাস্তি দেওয়ার একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, কারো তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত,” লিনটন বলেন।
“যখন তিনি কোন সিদ্ধান্ত নেন, ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোন সংকোচ থাকে না,” লিনটন আরো বলেন, এটি ইঙ্গিত করে যে ইউন সম্ভবত তার পরিকল্পনা নিয়ে গভীরভাবে ভাবেননি।
“এটা একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, এবং তিনি এখন এর ফল ভোগ করছেন, কিন্তু আমি মনে করি তিনি সত্যিই ভাবতেন যে তিনি দেশের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করছেন।”
ইউনের স্কুল বন্ধু চুলউ লি পরোক্ষভাবে এই দাবির সাথে একমত হন: “তার একটি মিথ্যা ধারণা ছিল যে সে কমিউনিস্ট হুমকি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে পারবে, তবে আমি তার প্রতি কোনো সহানুভূতি রাখি না; সে আমাদের গণতন্ত্রকে বিপদে ফেলেছে।”
যতই ভুল হোক, ইউন সেটাই করতেন যা তিনি সঠিক বলে মনে করতেন, এর পরিণতি কী হতে পারে সেটা খুব কমই ভাবতেন তিনি, শিন পুনরায় বলেন।
“একজন প্রসিকিউটর হিসেবে তিনি ঠিক এভাবেই ৩০ বছর কাটিয়েছিলেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সামরিক আইন এমন কিছু ছিল, যা কেবল ইউন করতে পারতেন।”