Source : BBC NEWS

গত ২৮ মে কলকাতার হাকিমপুরে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ক্যাম্পের কাছে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য পৌঁছেছেন এক নারী, যিনি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে এবং বলা হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশি।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ভারত থেকে বাংলাদেশে গত কয়েকদিন একাধিকবার লোক ঠেলে পাঠানোর বা ‘পুশইন’-এর চেষ্টা দেখা গেছে। বিভিন্ন সীমান্তে একাধিকবার এমন চেষ্টা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

তবে বিজিবির বাধার মুখে তাদের কেউই দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি। ফলে কোনো কোনো সীমান্তে এরকম ব্যক্তিদের শূন্যরেখা ও নো-ম্যানস-ল্যান্ডে অবস্থান করতে দেখেছেন বিবিসির সংবাদদাতাও।

সম্প্রতি বাংলাদেশের লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, নীলফামারী, নেত্রকোনা, মেহেরপুরসহ নানা জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী – বিএসএফ বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ঠিক তখনই, যখন আটই জুলাই থেকে দিল্লিতে বিজিবি ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছে, যা চলবে ১১ই জুন পর্যন্ত। সেখানকার আলোচনাতেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পুশইন-পুশব্যাক ইস্যু।

প্রশ্ন উঠছে, কেন এখন সীমান্তে এরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে?

গুজরাটে যাদের 'বাংলাদেশি' সন্দেহে আটক করা হয়েছিল, তাদেরই একাংশ - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

সীমান্তে যা ঘটছে

সোমবার আটই জুন সকালে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়ে ১০-১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।

তবে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক অবস্থানের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

এর আগে গত ছয়ই জুন শুক্রবার নওগাঁ জেলার সাপাহার সীমান্ত এলাকা দিয়ে নয় জন নারী, আট জন পুরুষ ও তিন জন শিশুসহ মোট ১৭ জনকে এভাবে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়।।

ওইদিন সন্ধ্যায় বিজিবি ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়ার গেট দিয়ে পুশইন করেছে। পুশইন করার পর আমাদের টহল দল তা দেখে ফেলে এবং তাদেরকে ইন্ডিয়ার অংশের জিরো লাইনে ঠেলে পাঠায়।”

সেদিন আরও কয়েকটি সীমান্ত থেকে একদিনেই ৬০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।

এর আগে, চৌঠা জুন বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ২৪ ঘণ্টায় বিএসএফ কর্তৃক অবৈধভাবে পুশইনের ১০টি পৃথক অপচেষ্টাকে ঠেকানো হয়েছে। সেসব ঘটনায় অন্তত ৯০ জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এদিকে, সম্প্রতি ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, নাগরিত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় পড়েন না এমন ইতিমধ্যেই চার হাজার ৮০০ জন ‘অনুপ্রবেশকারীকে’ ওপারে (বাংলাদেশে) পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, আরও ৮৩৬ জন বর্তমানে ভারতের হোল্ডিং সেন্টার বা আটক শিবিরগুলোয় রয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন , যাদেরকে সীমান্তের ওপারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

বহুদিন ধরেই বিজেপি নেতারা অভিযোগ করে আসছেন, বাংলাদেশ থেকে অনেকে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে বসবাস বা কাজ করছে। গুজরাট, মুম্বাই,আসামে এরকম বেশ কয়েকজনকে আটকের পর ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বর্ণনা করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়াও হয়েছে।

তবে পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেখানেও এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমানার সবটুকুতে বেড়া দিতে চায় ভারত

এরকম পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি

বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে অনেক সময় উত্তেজনা বা প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত বিপুল সংখ্যায় মানুষকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা আগে দেখা যায়নি।

মূলত, ২০২৫ সালে ভারত থেকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাভাষী ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষদের বলপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ওই বছরের সাতই মে সর্বপ্রথম এরকম ঘটনা শুরু হয়, যা চলে প্রায় অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু সম্প্রতি ফের শুরু হয়েছে।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ওই সময়ের দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছিলো। এরপর তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে যে অধিকাংশই বাংলাদেশি। তবে তাদের মাঝে অন্তত ১২৬ জন ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন।

এর আগে সীমান্তে মারামারি, গোলাগুলি, চোরাচালান – হলেও খুব একটা এরকম ‘পুশইনের’ ঘটনা ঘটেনি, এটা আমাদের জন্য “নতুন ধরনের আলামত” – বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশের একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।

একই বক্তব্য মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনেরও। তিনিও বলছিলেন যে এর আগে এত আয়োজন করে, এত বড় মাত্রায় ‘পুশইনের’ ঘটনা ঘটতে তিনি দেখেননি।

ভারতে এসআইআর বিরোধী বিক্ষোভকারীদের দাবি, যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও অনেক বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে — ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Asian News International

ভারত এটা কেন করছে?

সাম্প্রতিক পুশইনের ঘটনাগুলোকে শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এর সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকা নিয়ে চলমান বিতর্ক এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতারও যোগসূত্র রয়েছে।

বিশেষ করে, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

তখন দুই পক্ষেই ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং দুই দেশের রাজনীতিবিদরা একে অপরকে আক্রমণ করে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলেছে।

এ বিষয়ে এমদাদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের দিক থেকেও কিছু আনওয়ান্টেড কথা বলা হয়েছে। যেমন, সেভেন সিস্টার্সের বিষয়ে আমাদের দায়িত্বশীল এবং দায়িত্বের বাইরের মানুষও বিভিন্ন মন্তব্য করেছে। এগুলোর ফলশ্রুতি এই পুশইন।”

এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাই, ভোটার তালিকা পর্যালোচনা এবং অবৈধ অভিবাসী শনাক্তকরণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রচারণার অন্যতম বিষয় ছিল কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা এবং তাদেরকে ফেরত পাঠানো।

যেহেতু নির্বাচনে এটা তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল, তাই তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা জন্য বা বাস্তবায়নের চেষ্টা দেখানোর জন্য এটা করছে বলে মনে করছেন এমদাদুল ইসলাম।

‘পুশইনের’ প্রক্রিয়া তখন থেকেই শুরু হয়েছিলো উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলছিলেন, “পশ্চিমবাংলার নির্বাচনের আগে ৯০ লাখ লোককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য এক পক্ষ থেকে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।”

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদেরকে বিবেচনা করা হয় একটি নির্দিষ্ট দলের ভোটব্যাংক হিসেবে। তাই, এই পুশইনের মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে মুসলিমদের মাঝে ভয় ঢুকিয়ে ফায়দা নেওয়া হয় এবং সাম্প্রদায়িকতার বীজও বপন করা হয় এই পদ্ধতিতেই – যোগ করেন তিনি।

পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ ফেরত পাঠানোর কথা বলতে শুরু করেছে। সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার জন্য যেমন দ্রুত বিএসএফকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তেমনি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আটকে রাখার জন্য ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরি করা হয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের গোলকগঞ্জ এলাকায় কাটাতারের বেড়ার পাশে টহল দিচ্ছেন বিএসএফ সদস্যরা। ভারতের আসামের ধুবড়ি জেলা, ২৬শে মে ২০২৫।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

প্রক্রিয়া মেনে হস্তান্তর চায় বাংলাদেশ

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত মাসে ঘোষণা দিয়েছিলেন, যারা ভারতে অবৈধপথে এসেছিলেন, তারা ‘স্বেচ্ছায়’ ফিরে যেতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দেওয়া হবে না।

তবে ওই ঘোষণার আগেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য অনেক মানুষ প্রতিদিন হাজির হচ্ছেন সাতক্ষীরা আর পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত অঞ্চলে, মে মাসের শেষ দিকে বিষয়টি সরেজমিন দেখেছেন বিবিসির প্রতিবেদক অমিতাভ ভট্টশালী।

সেসময় সীমান্তে জড়ো হওয়া কথিত বাংলাদেশিরা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ‘অনুপ্রবেশকারীদেরকে’ ধরছে, জেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সেখানকার পুলিশ-প্রশাসন যেমন কড়াকড়ি করছে, বাড়িওয়ালারাও আর থাকতে দিতে চাইছে না। সে কারণেই সুযোগ পেয়ে তারা এখন ‘নিজেদের দেশ’ বাংলাদেশে ফেরত আসতে চাইছেন।

বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতে যেমন অনেক বাংলাদেশি অবৈধভাবে বসবাস করছেন, বাংলাদেশেও অনেক ভারতীয় অবৈধভাবে এসে থাকছেন। উভয় দেশেরই উচিৎ, এদেরকে চিহ্নিত করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো।

সোমবার আটই জুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও বলেছেন, “বাংলাদেশে যদি ভারতীয় কোনো ইলিগ্যাল (অবৈধ) সিটিজেন (নাগরিক) থাকে বা ভারতে যদি বাংলাদেশের কোনো ইলিগ্যাল সিটিজেন থাকে, তাদেরকে ফেরত আনা এবং আমাদের ভারতীয়দের ফেরত দেওয়ার একটি মেকানিজম (প্রক্রিয়া) বিদ্যমান আছে।”

“সেই বিদ্যমান মেকানিজমটা, ডিপ্লোমেসিটা অবলম্বন করেই ভারতকে আমাদের সাথে কাজ করতে হবে এবং কথা বলতে হবে এবং বাংলাদেশও সেটা করবে।”

এর আগে , বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের অবৈধ পুশব্যাক বা পুশইনের বিপক্ষে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, “ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে কোনো তালিকা পাঠালে আইন অনুযায়ী রিপ্যাট্রিয়েশন (প্রত্যাবাসন) প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তালিকা সরকার পায়নি।”

সীমান্ত এলাকায় পাহারায় বিজিবি সদস্যরা

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তরে বাধা কোথায়?

সকল মহল থেকে পুশইন প্রসঙ্গে বারবার ‘যথাযথ’ প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেটি কী?

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও সেটি মূলত অপরাধী বা রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু অবৈধ অভিবাসীদেরকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) বা নির্দিষ্ট কাঠামো নেই।

ভারত জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, বাংলাদেশ আবার তাতে স্বাক্ষর করেছে। তাই, বাংলাদেশ সেই কনভেনশনের নীতিমালা অনুসরণ করে। ফলে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন বিবেচনায় নিতে হয়েছে।

কিন্তু ভারতের কাছে অভিবাসন ও শরণার্থী-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সাধারণত ‘কেস-টু-কেস’ বিবেচনা করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এ কারণে আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে অবৈধ অভিভাসীদেরকে চিহ্নিত করে ফেরত দেওয়া, এটা ভারত ও বাংলাদেশের মাঝে গড়ে ওঠেনি।”

বিশ্বের অনেক দেশ, যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠালেও সেখানে একটি নির্দিষ্ট ও স্বীকৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। যেমন– সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যাচাই, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ, আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর। তবে এসব ক্ষেত্রে ভারত অনেক সময় প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাজ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কারণ, ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কিছু ক্ষেত্রে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে আনুষ্ঠানিক মামলা ছাড়াও কাউকে সীমান্ত পার করে দেওয়ার সুযোগ থাকে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের তেমন কোনো চাপ বা বাধ্যবাধকতা নেই বলে তিনি মনে করেন।

তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার যে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটি মানে হলো বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা এবং চিহ্নিত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য একটি তালিকা সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে জমা দেওয়া।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে পরিচয় যাচাই এবং তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “এই ধরনের তালিকার মাঝে ভারত যাচ্ছে না। কারণ, সেই তালিকা করতে গেলে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের বহিষ্কারের যে বিষয়টি রয়েছে, তা জটিলতার মুখে পড়তে পারে। মূলত এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি পদক্ষেপ। আর এই এজেন্ডা আজকের নয়। সবমিলিয়ে, ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রে তাদের যে দুর্বলতা ও সময়, সেগুলোকে বাইপাস (এড়িয়ে যাওয়া) করার জন্য সে এটা করছে।”

তবে বিষয়টিকে আইনিভাবে মোকাবিলা করার জন্য দুই দেশের মধ্যে অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর আইনি কাঠামো না থাকলেও সদিচ্ছা থাকলে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে যৌথভাবে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারত থেকে বাংলাদেশে এভাবে লোকজন ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা এখনও সহনীয় পর্যায়ে আছে। কিন্তু এটি বড় পরিসরে হলে তা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

এই সমস্যার সমাধানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনার জন্যও তারা পরামর্শ দিচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে বহু মানুষ রোজ জড়ো হচ্ছেন বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Uttarayan Chakrabarti/BBC