Source : BBC NEWS

নারীদের নিয়ে যাওয়া একটি গাড়িকে নির্দেশনা দিচ্ছেন সেনারা।

ছবির উৎস, Reuters

লেবানন জানিয়েছে, দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব মেনে ইসরায়েলের ওপর হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। সেইসাথে মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী ইসরায়েলও লেবানের রাজধানী বৈরুতের ওপর আর হামলা চালাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত লেবানন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “পারস্পরিক হামলা বন্ধের” মার্কিন প্রস্তাবে হেজবুল্লাহ সম্মতি দিয়েছে বলে তারা নিশ্চিত হয়েছে।

এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এ সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তবে, তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, “হেজবুল্লাহ যদি আমাদের শহরগুলো ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ না করে, তাহলে বৈরুতের ওপর হামলা চলবে।”

এর আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি নেতানিয়াহু ও হেজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবংউভয় পক্ষ “সব ধরনের গোলাগুলি বন্ধে” সম্মত হয়েছে।

এদিকে, এর-ও আগে ইরান সতর্ক করেছিল, লেবাননে ইসরায়েল যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে, সেটি চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির জন্য হুমকি তৈরি করছে।

সোমবার রাতে দেওয়া ওই বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত লেবানন দূতাবাস জানায়, প্রস্তাবিত সমঝোতা বা চুক্তির আওতায় বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হবে।

এর বিপরীতে হেজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর হামলা করা থেকে বিরত থাকবে।

লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা

ছবির উৎস, Reuters

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই যুদ্ধবিরতি পরে পুরো লেবাননজুড়ে কার্যকর করা হবে।

যদিও নেতানিয়াহু বলেছেন, “একই সময়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) পরিকল্পনা অনুযায়ী দক্ষিণ লেবাননে তাদের অভিযান চালিয়ে যাবে।”

এদিকে, দুই পক্ষ হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে বলে ট্রাম্প দাবি করলেও, পরে কিছু সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

হেজবুল্লাহ জানিয়েছে, উত্তর ইসরায়েলের দু’টি গ্রামের কাছে ইসরায়েলি ট্যাংক ও সেনাদের ওপর ড্রোন ও কামানের গোলা ব্যবহার করে তারা তিনটি হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, লেবানন থেকে ছোড়া দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় ইসরায়েলি হামলা হয়েছে।

সেইসাথে, দেশটির ডেব্বিন শহরে “অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণের” ঘটনা ঘটার কথা জানিয়েছে বার্তা সংস্থাটি।

এর আগে, ইরান-সমর্থিত হেজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হামলার জবাবে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে “সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুতে” হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু।

এ ঘটনায় ইরানের কর্মকর্তারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি “লেবাননসহ সংঘাত-সংশ্লিষ্ট সব এলাকার জন্য প্রযোজ্য” এবং “একটি এলাকায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন মানে সব এলাকায় তা লঙ্ঘন করা।”

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Reuters

এদিকে, ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ আলোচনা স্থগিত করতে পারে ইরান।

ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-ঘনিষ্ঠ এ সংবাদ সংস্থাটি আরও বলেছে, ইরান ও তার মিত্ররা প্রয়োজনে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত বাব আল-মান্দাব প্রণালিসহ অন্য প্রণালিগুলোতেও সক্রিয় হতে পারে।

প্রণালি বলতে সাধারণত দুইটি বড় জলভাগকে সংযুক্ত করা সরু জলপথকে বোঝায়।

তবে, এরপর ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একাধিক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা “দ্রুতগতিতে” এগোচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহু ও হেজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার কথা হয়েছে।

ট্রাম্পের ভাষ্য, “নেতানিয়াহুর সঙ্গে আমার খুব ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বৈরুতে কোনো সেনা যাবে না এবং যেসব সেনা সেখানে যাচ্ছিলো, তাদেরকে ইতোমধ্যে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।”

বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার স্থান থেকে ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী বের হচ্ছে (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

তিনি আরও বলেন, “উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হেজবুল্লাহর সঙ্গেও আমার ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তারা সব ধরনের গোলাগুলি বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। ইসরায়েল তাদের ওপর হামলা করবে না এবং তারাও ইসরায়েলের ওপর আর হামলা করবে না।”

যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করে আসছে লেবাননের পরিস্থিতিকে ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনার বাইরে রাখতে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে হেজবুল্লাহকে আদর্শিক, সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসা ইরান বলছে, যে কোনো চুক্তির মধ্যেই লেবাননে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি থাকতে হবে।

রোববার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নেতানিয়াহু ও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের কাছে ধাপে ধাপে উত্তেজনা কমানোর একটি প্রস্তাব দিয়েছেন।

গত ১৬ই এপ্রিল ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী দুইবার বৈরুতে হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ হামলাটি ছিল বৃহস্পতিবার।

তবে এটি ঠিক যে আগের তুলনায় হামলার মাত্রা কমেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানে একটি বৃহত্তর সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে হোয়াইট হাউজ বৈরুতে সামরিক অভিযান সীমিত রাখার জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ দিচ্ছে।

দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ইসরায়েলি হামলা (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Reuters

গত আটই এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি।

সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান বলেছে, এর জবাবে তারা কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা করেছে।

এই হামলা-পাল্টা হামলার পর সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার বেড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় পাঁচ ডলার বেড়ে ৯৭ দশমিক ৪৪ ডলারে পৌঁছায়। পরে তা কিছুটা কমে ৯৫ দশমিক ৭০ ডলারে নেমে আসে।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে তেলের দাম ওঠানামা করছে। সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি কিংবা নতুন সংঘাতের শঙ্কা, দু’টো খবরই বাজারে প্রভাব ফেলছে।

তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সাধারণত এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি স্থায়ী চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।