Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে ১৬ই জুন (বাংলাদেশ সময় ১৭ জুন) সন্ধ্যায় একটি নামই বারবার গুঞ্জরিত হয়েছে, আর সেই গুঞ্জন ছড়িয়েছে গোটা দুনিয়ায়। লিওনেল মেসির এক অনবদ্য হ্যাট্রিক বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে চলতি বিশ্বকাপে দিয়েছে এক নিখুঁত সূচনা।
আর মাত্র এক সপ্তাহ বাদে ৩৯ বছর পূর্ণ করতে যাওয়া এই আর্জেন্টাইন জাতীয় দলের হয়ে ২০০তম ম্যাচে, ষষ্ঠ বিশ্বকাপে, ৩৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক করলেন এবং মিরোস্লাভ ক্লোজের ১৬ গোলের সর্বকালীন রেকর্ড স্পর্শ করলেন।
সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাট্রিকের রেকর্ড করা এই রাতে মেসি গোল দেন ১৭, ৬০ এবং ৭৬ মিনিটে। গ্রুপ জের উদ্বোধনী ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে আলজেরিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করলো।
ম্যাচ শুরুর আগেই টানটান উত্তেজনা ছিল। আলজেরিয়ার কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, মেসিকে আটকাতে কোনো বিশেষ কৌশল তাদের নেই। তার যুক্তি ছিল, একজনকেই সামলাতে সব শক্তি ঢাললে আর্জেন্টিনার বাকি আক্রমণভাগ আরও বেশি স্বাধীনতা পাবে।
এই সিদ্ধান্ত যে কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে, সেটা প্রথম বাঁশি বাজার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোঝা গিয়েছিল।
ছবির উৎস, Getty Images
ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই একবার সতর্কঘণ্টা বেজেছিল যখন মেসির শট নেটে জড়ালেও অফসাইডে বাতিল হয়। তবে এর দশ মিনিট পর তা আর হয়নি। ম্যাচের ১৭তম মিনিটে মাঝমাঠে দ্রুত বলের দখল নেন রদ্রিগো ডি পল এবং মেসির উদ্দেশ্যে পাস দেন।
বল পেয়ে মেসি নিজের অর্ধ থেকে এগিয়ে আসেন। সামনে কয়েক গজ ফাঁকা জায়গা, আলজেরিয়ার মিডফিল্ড পিছিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই তিনি প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ের এক দুর্দান্ত শট নেন। বলটি বাতাস চিরে ডান দিকের ওপরের কোণের দিকে ছুটে যায়। গোলরক্ষক লুকা জিদান দুই হাত লাগালেও বলের গতি থামাতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যে স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হয় উল্লাসে।
মেসি তার স্বভাবসুলভ আয়েসী ভঙ্গিতে খেললেও যখনই পায়ে বল গিয়েছে তখনই তিনি বিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ান।প্রথমার্ধে অবশ্য ওই একটি গোলই হয়, তবে খেলা এক ঘণ্টায় গড়ালে আর্জেন্টিনার আধিপত্য আরো নিশ্চিত হয়ে পড়ে।
খেলার ৬০তম মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে তৈরি হওয়া এক আক্রমণে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগ কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায়। গোলরক্ষক প্রথম শট ঠেকালেও বল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। সেই মুহূর্তে সবচেয়ে আগে পৌঁছে যান মেসি। গোলমুখে উপস্থিত থেকে তিনি রিবাউন্ড বলটি সহজেই জালে পাঠিয়ে গোলের ব্যাবধান দ্বিগুণ করেন।
রাতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্তটি আসে খেলার ৭৬তম মিনিটে। মেসি বক্সের বাইরে বল পেয়ে এক সতীর্থের সঙ্গে দ্রুত ওয়ান-টু পাস খেলেন। মুহূর্তের মধ্যে আলজেরিয়ার ডিফেন্ডাররা ছিটকে পড়ে।
বল ফেরত পেয়ে মেসি ডান দিকে সামান্য সরে জায়গা তৈরি করেন। তারপর বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের একটি জোরালো শট বাঁক নিয়ে গোলের ওপরের কোণে গিয়ে জড়িয়ে যায়। গোলরক্ষক নড়ারও সুযোগ পাননি। এই গোলের মাধ্যেমে বিশ্বকাপে জার্মান মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসান মেসি।
ছবির উৎস, Getty Images
পরিসংখ্যান বলছে, আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে পজেশনে আধিপত্য না করলেও বলের দখলে থাকার সময়টুকু পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে। মাত্র ৪৫ শতাংশ পজেশন থাকলেও আর্জেন্টিনার ছয়টি শট অন টার্গেটে ছিলো আর বিপরীতে আলজেরিয়া একটি শটও অন টার্গেটে রাখতে পারেনি।
মেসিকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো এই বিশ্বকাপের আগে ঘুরছিল, তার সবচেয়ে বড় উত্তর এল আজ। বয়স, ক্লান্তি, ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল থেকে অবসরের পর ফর্মের প্রশ্ন সমস্ত সংশয় মুছে দিলেন তিনি। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেই তিনি ৮ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করেছিলেন। তবে এ দিন তিনি মূলত একজন প্লেমেকার হিসেবে মাঠে নামেন, দলের ছন্দ তৈরি করেন, জায়গা তৈরি করেন, এবং সুযোগ পেলেই ভয়াবহ হয়ে ওঠেন।
খেলার ৮০ মিনিটে যখন তিনি মাঠ ছাড়েন, পুরো স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানায় এবং বিশ্বব্যাপী সমর্থকেরা উদ্বেল হয়ে উঠে।
আর্জেন্টিনার এই পারফরম্যান্সের পেছনে শুধু মেসির জাদু নয়, কোচ লিওনেল স্কালোনির সুচিন্তিত কৌশলও সমান ভূমিকা রেখেছে। স্কালোনির দল মূলত ৪-৩-৩ বা ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলে, তবে বল না থাকলে ৪-৪-২-এ নেমে দুটি শক্তিশালী ব্লক তৈরি করে প্রতিপক্ষকে আটকায়। এই ফরমেশনে মেসিকে সর্বত্র ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা দেওয়া হয়। মিডফিল্ডে রদ্রিগো দে পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজের ত্রিভুজ বলের দখল নিশ্চিত করে এবং বল হারালে সক্রিয়ভাবে প্রেস করে প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধেই আটকে রাখে।
বিল্ড-আপের সময় আর্জেন্টিনার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। মিডফিল্ডার পাশের চ্যানেলে সরে যান, উইঙ্গাররা ভেতরে ঢোকেন, ফলে পাসিং অ্যাঙ্গেল এতটাই বৈচিত্র্যময় হয় যে প্রতিপক্ষের পক্ষে কার্যকরভাবে প্রেস করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরাসরি আক্রমণের সময় স্ট্রাইকারকে দ্রুত লম্বা পাসে খোঁজা এবং ডিফেন্সলাইনের পেছনের জায়গা কাজে লাগানো এই দলের আরেকটি কার্যকর অস্ত্র। ম্যাক অ্যালিস্টার এই পুরো ব্যবস্থার প্রাণভোমরা। তার প্রেস রেজিস্ট্যান্স, বিস্তৃত পাসিং রেঞ্জ এবং বল ছাড়া মাঠের বিশাল অংশ কভার করার ক্ষমতা আর্জেন্টিনার সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখে।
তবে এত শক্তির পাশেও আর্জেন্টিনার কিছু উদ্বেগজনক দিক আছে। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো মেসি-নির্ভরতা। শুরুটা অসাধারন হলেও ৩৮ বছর বয়সে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর টুর্নামেন্টে তার শরীর কতটা সাড়া দেবে, সেটা সময়ই বলবে। এর পাশাপাশি কিছু পজিশনে স্কোয়াডের গভীরতার অভাব এবং ডিফেন্ডারদের আত্মবিশ্বাসের অভাব বড় ম্যাচগুলোতে সমস্যায় ফেলতে পারে।
তবে আর্জেন্টিনার পক্ষে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে শক্তিশালী তা হলো দলটির মানসিক দৃঢ়তা এবং ঐতিহাসিক ট্র্যাক রেকর্ড। ২০১৯ কোপা আমেরিকার পর থেকে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ হারেনি তারা। ২০২২ বিশ্বকাপ, ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা টানা তিনটি বড় শিরোপা জিতেছে। বর্তমান স্কোয়াডের ১৭ জন কাতারজয়ী দলের সদস্য। বড় মঞ্চের চাপ সামলানোর এই অভিজ্ঞতা বিশ্বকাপের মতো আসরে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ছবির উৎস, FIFA via Getty Images
আর্জেন্টিনা কতদূর যাবে?
প্রশ্ন হচ্ছে আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপে কতদূর যাবে?
আলজেরিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর গ্রুপ পর্ব নিয়ে তেমন কোনো উদ্বেগ নেই। বাকি দুই ম্যাচে অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হতে সম্ভবত তেমন বেগ পেতে হবে না।
তবে রাউন্ড অব ৩২ ও রাউন্ড অব ১৬ পার করতে পারলে আসল পরীক্ষা শুরু হবে কোয়ার্টার-ফাইনালে। সেখানে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেন বা ব্রাজিলের যেকোনো একটি দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, মেসির আর্জেন্টিনা প্রথম খেলাতেই নিজেদের ফেভারিট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে।
লক্ষ্যটা ঐতিহাসিক। ইতালি ১৯৩৮ সালে এবং এরপর পেলের ব্রাজিল ১৯৬২ সালে টানা দুটি বিশ্বকাপ জিতেছিল। এরপর আর কোনো দল সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করতে পারেনি। মেসির আর্জেন্টিনা সেই লক্ষ্য অর্জনেই যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে।
সকালের সূর্য সবসময় দিনের পূর্বাভাস দেয় না, তবে মেসিদের দুর্দান্ত শুরু এই পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, দলটির পক্ষে সেই লক্ষ্যপূরণ করার সমস্ত সম্ভাবনাই রয়েছে।







