Home LATEST NEWS BANGLA কেন ২০শে জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করছে বিজেপি সরকার?

কেন ২০শে জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করছে বিজেপি সরকার?

3
0

Source : BBC NEWS

২০শে জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের দাবি তুলে ২০২৫ সালে মিছিল করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী

ছবির উৎস, Debajyoti Chakraborty/NurPhoto via Getty Images

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

আজ ২০শে জুন পালিত হচ্ছে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’। সরকারিভাবে এই দিনটিকে উৎসব হিসেবে পালন করার ঘটনা এই প্রথম। তবে বেশ কয়েক বছর ধরেই বিজেপি ও বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এই দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গের ‘ভারত-ভুক্তির দিন’ হিসাবে উদযাপন করে আসছিল।

১৯৪৭ সালের ২০শে জুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় অবিভক্ত বাংলা ভাগ করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে ভোট হয়। সেদিনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে বাংলা ভাগ করে পূর্ব বঙ্গ চলে যাবে পাকিস্তানের অংশে, আর পশ্চিমদিকের অংশটি মিশবে ভারতের সঙ্গে।

হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর এ কারণে ২০শে জুনকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করার দাবি তোলে। তবে এর পরিবর্তে পহেলা বৈশাখ ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

২০২৪ সালে একটি সভা ডেকে বাংলা ক্যালেন্ডারের পহেলা বৈশাখ দিনটি পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সদ্য সাবেক তৃণমূল সরকার। তবে আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ বলে কোনো নির্দিষ্ট দিন পালনের কথা শোনা যায়নি।

বিগত সরকারের বক্তব্য ছিল, বাংলা ভাগ হওয়া কোনো উদযাপনের বিষয়বস্তু নয়; এই ঘটনায় বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিলেন, অনেকে স্বজন হারিয়েছিলেন।

বিজেপির কয়েকজন নেতা দাঁড়িয়ে আছেন। পেছনে দেয়ালে টানানো  শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ছবিতে মালা ঝোলানো

ছবির উৎস, Raj K Raj/Hindustan Times via Getty Images

কেন ২০শে জুন উদযাপন করতে চায় বিজেপি?

রাজ্যের সদ্য-অভিষিক্ত মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত সম্প্রতি ২০শে জুন দিনটিকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন যা প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফে।

তিনি লিখেছেন, “১৯২২ সালে খিলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পরে বাংলায় হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব আগের থেকে অনেক বেশি প্রকট হয়। চিত্তরঞ্জন দাস বেঙ্গল প্যাক্টের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন রোখার চেষ্টা করলেও তার প্রচেষ্টা হিন্দু সমাজ বা কংগ্রেস, কেউই ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। দেশবন্ধুর (চিত্তরঞ্জন দাস) আকস্মিক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই প্যাক্টও গুরুত্ব হারায়”।

ধর্মের ভিত্তিতে বাংলার বিভাজনের বিষয়টি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আরও প্রকট হয়ে ওঠে দাবি করে তিনি আরও লিখেছেন, “১৯৪০ সালের পাকিস্তান রেজল্যুশন বাংলা বিভাজনের সিদ্ধান্তকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল”।

“সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে ইসলামী বিচ্ছিন্নতাবাদের বীজ সমাজের মধ্য থেকেই বপন হয়েছিল। এটি শুধু কংগ্রেসের ভ্রান্ত নীতি বা মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রের ফলে উৎপন্ন হয়নি,” যদিও কোন গবেষণার দিকে তিনি নির্দেশ করছেন তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

স্বপন দাশগুপ্ত মনে করেন যে, বাংলা ভাগ এমন একটি ঘটনা যা হওয়ারই ছিল। বরং দুই বাংলা যুক্ত থাকলে হিন্দু বাঙালির সমস্যা আরও বাড়তে পারত।

তার দাবি, “মমতা ব্যানার্জীর সরকার চিরকালই বাংলায় হিন্দু রাজনৈতিক চেতনাকে অস্বীকার করেছেন এবং এই কারণেই ২০শে জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস বলে পালনের দাবি মানুষের মধ্যে বেশি গুরুত্ব লাভ করেছে”।

প্রবন্ধের শেষে তিনি দাবি করেছেন, “বাঙালি প্রকৃতপক্ষেই দুটি আলাদা পরিচিতি। ভারতের বাঙালি স্বত্বা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের বাঙালি স্বত্বার মধ্যে কিছু মিল থাকলেও দুটি পরিচয় ভিন্ন”।

এই পরিচয়ের ভিন্নতাকে উদযাপন করাকেই তিনি ২০শে জুনের মাহাত্ম্য বলে ব্যাখ্যা করেন।

অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী ‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড’ বলে পশ্চিমবঙ্গকে তুলে ধরার বিজেপির যে ভাষ্য, সেই ভাষ্যকেই একটি ইতিহাসগত ভিত্তি দিতে চেয়েছেন।

১৯৪৮ সালে একটি বক্তৃতায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী

ছবির উৎস, Photo by Shukdev Bhachech/Dipam Bhachech/Getty Images

ইতিহাসের পাতায় ২০শে জুন

আজ থেকে ৭৯ বছর আগে, ১৯৪৭ সালের ২০শে জুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় বাংলা ভাগ করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে ভোটাভুটি হয়।

মুসলমান সংখ্যাগুরু পূর্ব বঙ্গের জনপ্রতিনিধিরা এবং পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু সংখ্যাগুরু জনপ্রতিনিধিরা পৃথকভাবে ভোট দিয়েছিলেন।

পূর্ব বঙ্গের মুসলিম নেতাদের অধিকাংশই বাংলা ভাগ না করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, অন্যদিকে পশ্চিমদিকের হিন্দু জনপ্রতিনিধিদের বেশিরভাগ ভোট দেন বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে।

ইতিহাসবিদ ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের গার্ডিনার অধ্যাপক সুগত বসু বিবিসি বাংলাকে কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, প্রাদেশিক আইনসভার বেশিরভাগ সদস্য দেশভাগ না চাইলেও মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার মাধ্যমে তেসরা জুনই ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল যে পাঞ্জাব আর বাংলা ভাগ করা হবে।

তার কথায়, ২০শে জুনের ভোটের মাধ্যমে দেশভাগের সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়েছিল মাত্র।

“তাই এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন নয় যে আলাদা করে উদযাপন করতে হবে। এটা গৌরবেরও দিন নয়। এটা আত্মঘাতী বাঙালীর লজ্জার দিন,” মন্তব্য করেছিলেন অধ্যাপক বসু।

২০শে জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনে আপত্তি ছিল মমতা ব্যানার্জীর - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

যুক্তবঙ্গ প্রস্তাব বনাম শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী

ভারতের স্বাধীনতার বেশ কয়েক মাস আগে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওর্দীসহ বেশ কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা, কয়েকজন কংগ্রেস নেতা, সুভাষ চন্দ্র বসুর বড় ভাই শরৎ চন্দ্র বসু, কিরণ শঙ্কর রায় বাংলাকে ভাগ না করে একটি যুক্ত বঙ্গ প্রদেশের পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই পরিকল্পনাকে ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল প্ল্যান’ বলা হয়।

এই যুক্ত বঙ্গ পরিকল্পনার বিরোধী ছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা ও ‘জনসঙ্ঘ’-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। এছাড়াও জওহরলাল নেহেরু ও বল্লভভাই প্যাটেলও এই পরিকল্পনার বিরোধী ছিলেন।

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে আরএসএস, বিজেপি এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ‘পশ্চিমবঙ্গের জনক’ দাবি করে সম্মান দেখিয়ে থাকে।

আরএসএসের ইতিহাসবিদদের সংগঠন, ভারতীয় ইতিহাস সংকলন সমিতির পশ্চিমবঙ্গ শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক রবি রঞ্জন সেন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, “এটাকে আমরা যদি বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত হওয়ার দিন হিসেবে না দেখে যদি বিপরীতভাবে দেখি যে এই দিনে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির এবং তার ভারতভুক্তির সিদ্ধান্ত হয়েছিল?”

“শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী উদ্যোগটা নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি একা ছিলেন না। দলমত নির্বিশেষে, পশ্চিমবাংলার বুদ্ধিজীবী সবাই বাংলাভাগকে সমর্থন করেছিলেন। এমনকি কংগ্রেসও সমর্থন করেছিল। কেবল শরৎ চন্দ্র বসু ও কিরণ শঙ্কর রায় মি. সোহরাবর্দীর যুক্তবঙ্গ পরিকল্পনার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন,” বলছিলেন অধ্যাপক রবি রঞ্জন সেন।

এই বছর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করার পরে ২০শে জুন তারিখটিকে তাই তারা পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি এবং ভারতভুক্তির দিন হিসাবেই উদযাপন করছে সরকারিভাবে।

পালন করা হচ্ছে যেভাবে

২০শে জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপন করতে কলকাতা সফরের কথা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীন। পশ্চিমবঙ্গ দিবস ও ২১শে জুন যোগ দিবস উপলক্ষ্যে কলকাতায় দুই দিনের কর্মসূচি রয়েছে তার।

পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষ্যে বিজেপির ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে বিভিন্ন জেলায়, ছোট শহরে ও গ্রামে চলছে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ছবিতে মাল্যদান অনুষ্ঠান।

সকালেই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা অগ্নিমিত্রা পাল ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর আবক্ষ মূর্তিতে মালা পরান।

এই কর্মসূচির পরে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের গঠন সম্ভব হয়েছিল আমাদের পার্টির প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর লড়াই ও দূরদৃষ্টির জন্য।… ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জন্যই আমরা আজ বাংলাদেশে নেই। উনি না থাকলে হয়তো আমরা থাকতাম না”।

তিনি আরও বলেন, “শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জন্যই বাঙালি হিন্দু তাদের জীবন সুরক্ষিত করার জন্য একটি হোমল্যান্ড পেয়েছে”।