Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Reuters
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালিয়েছে। শনিবার হরমুজ প্রণালীতে পানামার পতাকাবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার পর আবারো এই হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ‘অব্যাহত আগ্রাসনের’ জবাবে তারা ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি আরও সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির পরিপন্থী এবং এর ফলে শান্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, “ইরানকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের বাহিনী ড্রোন ব্যবহার করে পানামা পতাকাবাহী ট্যাংকার এমটি কিকুতে হামলা চালিয়ে সেই সুযোগ নষ্ট করেছে।”
এর জবাবে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা এবং ড্রোন সংরক্ষণাগারে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে সেন্টকম।
আইআরজিসির বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘অপরাধী জাহাজের বিরুদ্ধে আইআরজিসি নৌবাহিনীর অভিযানের অজুহাতে’ ইরানের উপকূলীয় পাঁচটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
তাদের দাবি, চলতি মাসের শুরুতে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও নৌপথ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ইরানের ওপর রয়েছে। এখন থেকে নিয়ম ভঙ্গকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে আগের তুলনায় আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “যেকোনো সম্ভাব্য শত্রুর আগ্রাসন- যে অজুহাতেই হোক না কেন, এমনকি যদি তা গত রাত ও আজ রাতের মতো ছোটখাটো লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও হয়- তার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর ও বিধ্বংসী।”
এর আগে বৃহস্পতিবার একটি কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলার জবাবে শুক্রবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার অবস্থানে হামলার কথা জানিয়েছিল মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড।
ছবির উৎস, AFP via Getty Image
সর্বশেষ হামলার ঘোষণা দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল- এ একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বলেন, তেহরান সম্ভবত ‘কখনোই শিক্ষা নেবে না’।
শনিবার সন্ধ্যায় তিনি লেখেন, “এমন একটি সময় আসতে পারে, যখন আমাদের পক্ষে আর সংযত থাকা সম্ভব হবে না। তখন আমরা যে কাজ অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করেছি, সেটি সামরিকভাবে সম্পূর্ণ করতে বাধ্য হব।”
তিনি আরও লেখেন, “যদি এমনটা ঘটে, তাহলে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের অস্তিত্ব থাকবে না!”
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কুয়েত ও বাহরাইন জানায় যে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনী সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, “কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করছে।” একই সঙ্গে তারা জনগণকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানায়।
অন্যদিকে, বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের ‘শান্ত থাকার এবং নিকটস্থ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার’ আহবান জানিয়েছে।
এদিকে সেন্টকম জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকভাবে অব্যাহত রয়েছে।
সর্বশেষ এই হামলাগুলো ঘটেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলার এক দিনেরও কম সময় পর। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ২৫শে জুন সিঙ্গাপুর-পতাকাবাহী মালবাহী জাহাজ এমভি এভার লাভলি তে ড্রোন হামলার জবাবে তারা ওই হামলা চালিয়েছিল।

সেন্টকম ওই মার্কিন হামলাকে ‘একটি শক্তিশালী জবাব’ বলে বর্ণনা করে। তারা আরও জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ইরানি বাহিনীর অযৌক্তিক আগ্রাসন স্পষ্টভাবেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
অন্যদিকে তেহরানের দাবি, মালবাহী জাহাজটি উপসাগরীয় জলপথ অতিক্রমের জন্য অনুমোদনহীন একটি রুট ব্যবহার করায় সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তারা আরও বলেছে, এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র যে হামলা চালিয়েছে, সেটিই প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল।
শনিবার সকালে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে তারা আরও হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা পরিস্থিতির জন্য ‘চুক্তিভঙ্গকারী মার্কিন সরকারকে’ দায়ী করেছে।
গত সতেরই জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের আওতায় শত্রুতা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছিল। ওই সমঝোতায় বলা হয়েছিল যে, ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বব্যাপী তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর তেহরান কার্যত এই নৌপথ বন্ধ করে দেয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায় এবং সারের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হয়।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের পরিকল্পনা ইরান বাদ দিয়েছে।
ছবির উৎস, Atta Kenare / Getty Images
বুধবার ট্রুথ সোশ্যাল -এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে, ‘কোনো টোল, কোনো বীমা ব্যয় এবং অন্য কোনো ধরনের অতিরিক্ত ফি নেওয়া বা আদায় করা হবে না’।
তিনি আরও বলেন, “যদি এই তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে আলোচনা অবিলম্বে শেষ হয়ে যাবে।”
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজ থেকে ইরান ফি আদায় করছে- এমন প্রতিবেদনের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অনেকের মতে, এ ধরনের টোল ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘনের শামিল।
মঙ্গলবার ওমানের রাজধানী মাস্কাটে ইরান ও ওমানের কর্মকর্তারা ‘নৌপথ পরিচালনার ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা’ নিয়ে আলোচনা করেন। তবে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি বলেছেন, উভয় দেশই টোলমুক্ত ও নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সবাইকে জেনে রাখা উচিত যে, হরমুজ প্রণালীর প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা আর কখনো যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না।”




