Home LATEST NEWS BANGLA ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম চালু, সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে আরও যত চ্যালেঞ্জ

ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম চালু, সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে আরও যত চ্যালেঞ্জ

3
0

Source : BBC NEWS

গত ২৫শে জুন ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারে গিয়ে ২৮শে জুন থেকে ভিসা কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী

ছবির উৎস, facebook.com/IndiaInBangladesh

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন আজ রোববার থেকে স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম শুরু করেছে, যার ফলে প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশিদের ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন গ্রহণ করা শুরু হল।

দেশটি এতদিন সীমিত আকারে মেডিকেল ভিসা দিয়ে আসলেও স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম বিশেষ করে ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন নেওয়া বন্ধ ছিল।

ফলে ভ্রমণ ছাড়াও তৃতীয় কিছু দেশের ভিসার জন্য আবেদন করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশিরা সমস্যার মুখে পড়েছিলেন।

বাংলাদেশে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের আগে থেকেই ভারত সরকার বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।

কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকে দিল্লি বিমানবন্দরে হেনস্তার ঘটনায় বাংলাদেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন চীন সফরে ছিলেন তখন গত ২৫শে জুন বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা অনেকের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছিল।

বিশ্লেষকরা কেউ কেউ মনে করেন, ভারতের নতুন হাইকমিশনার দায়িত্ব গ্রহণের দিনই ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেওয়ার মধ্যে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে দেশটির আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে এবং একটি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধাগুলো দূর করতে আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে।

আবার কেউ বলছেন, ভিসা চালুর মধ্য দিয়ে ভারত বাংলাদেশের সাথে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরির ইঙ্গিত দিলেও এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে সীমান্তে পুশ ইন, তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানি বণ্টনের মতো ইস্যুগুলো।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেছিলেন দীনেশ ত্রিবেদী।

ছবির উৎস, facebook.com/IndiaInBangladesh

ভিসা চালু কী বার্তা দিচ্ছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দৃশ্যত অবনতি ঘটেছিল।

দুই পক্ষেই ভিসা কার্যক্রম স্থগিত ছাড়াও তখন দুই দেশেরই রাজনীতিবিদদের কারও কারও বক্তব্য- পাল্টা বক্তব্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে অস্বস্তি বেড়ে গিয়েছিল।

এমনকি তখন দুই দেশেই হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভের ঘটনায় হাইকমিশনারদের পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনাও ঘটেছে ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর উভয় দেশের তরফ থেকেই আবার সম্পর্ক উন্নয়ন বা স্বাভাবিক করার দিকে অগ্রসর হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ পেতে শুরু করে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সফর ও প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে ফোনালাপসহ নানা উদ্যোগও দেখা গেছে গত চার মাসে।

যদিও সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের দিল্লি বিমানবন্দরে গিয়ে হেনস্থার শিকার হয়ে দেশে ফেরত আসার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে আবারো আলোচনায় নিয়ে এসেছিল।

এর মধ্যেই ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মি. রহমান চীন সফরে থাকার সময়েই বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী গত ২৫শে জুন রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশের পর বাংলাদেশে ২৮শে জুন থেকে ট্যুরিস্ট ভিসা কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর

ছবির উৎস, Getty Images

ফলে ভিসা কার্যক্রম শুরুর এই ঘোষণার আলাদা কোনো তাৎপর্য আছে কি-না সেই আলোচনাও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে উঠে আসে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ সুফিউর রহমান অবশ্য বলছেন ভারত স্বাভাবিক ভিসা আবেদন নেওয়ার কার্যক্রম যেভাবে অস্বাভাবিকভাবে বন্ধ করে রেখেছিল সেটিকে স্বাভাবিকীকরণ করলো।

“ভিসা কার্যক্রম দুই দেশের মধ্যে খুব স্বাভাবিক একটি কার্যক্রম। ফলে এটা নতুন করে চালু করাটা যুগান্তকারী কোনো বিষয় নয়। এটা তাদের করণীয় ছিল এবং সেটা তারা করেছে, যা ইতিবাচক,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

ভিসা কার্যক্রম চালু বা স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে কোনো বার্তা দিলো কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে মি. রহমান বলেন তিনি মনে করেন ভারতের এই ভিসা কার্যক্রম চালু ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিকেই বিবেচনায় নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বলছেন, ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম শুরুটা দুই দেশের মানুষের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরির প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিবে।

“সম্পর্ক উন্নয়নে মানুষের যাতায়াতের সুযোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার আসার পর থেকেই এটা আশা করা হচ্ছিল। এটি দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার ক্ষেত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

ভারত সফর করে এসেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান

ছবির উৎস, Getty Images

সামনে যত চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক না থাকায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে সেটির আপাত অবসান হলেও সামনে বাংলাদেশের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারত সরকার কী অবস্থান নেয় সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার দু’দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশ ত্রিশ বছর মেয়াদী ওই চুক্তি সম্পাদন করেছিল।

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ নবায়ন হবে নাকি দুই দেশের মধ্যে নতুন করে চুক্তি হবে, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও দুই দেশের কারিগরি দল এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে।

এছাড়া তিস্তার পানি ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে একটি চুক্তির জন্য বাংলাদেশের আগ্রহ অনেক দিনের। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে।

এছাড়া গত কিছুদিন ধরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পুশ ইন ইস্যু। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর যখন উভয় দেশের সরকারই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ ব্যক্ত করছে তখন হুট করে বাংলাদেশের সাথে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলের সীমান্তে এতো পুশ-ইনের চেষ্টা হচ্ছে কেন সেটিও অনেকের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মোহাম্মদ সুফিউর রহমান বলছেন, দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার ভিত্তি হতে হবে সাধারণ মানুষ এবং মানুষকে কেন্দ্র করেই এ সম্পর্কের ভিত তৈরি হতে হবে।

“দুই দেশের সম্পর্ক টেকসই হয় তখন যখন পদক্ষেপগুলো জনগণ কেন্দ্রিক হয়। এছাড়া সম্পর্ক টেকসই বা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সম্পর্ক জনগণ কেন্দ্রিক হলে ছোটোখাটো বিষয়গুলো বাধা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পায় না,” বলছিলেন তিনি।

অধ্যাপক ডঃ নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বলছেন, পুশ ইন কিংবা নদীর পানি বণ্টন- সব কিছুই আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করতে হবে, যাতে জন আস্থা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ভালো করা সম্ভব হয়।

“দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। গঙ্গার পানি চুক্তির ইস্যু আছে। পুশ ইন ইস্যু আছে। বাংলাদেশ ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশা করে। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশকে নিয়ে নানা মন্তব্য শোনা যায়। আমার মনে হয় ভারতের রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার হিসেবে দু দেশের মধ্যকার সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয় এমন কোনো মন্তব্য করা শ্রেয় হবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।