Home LATEST NEWS BANGLA বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে সবশেষ কী জানা যাচ্ছে

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে সবশেষ কী জানা যাচ্ছে

3
0

Source : BBC NEWS

পাঁচশ, একশ ও ১০ টাকার নোটের কয়েকটি বান্ডিল। ওপরে কয়েকটি পয়সা

ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নতুন অর্থবছরে বাড়বে- এটা নিশ্চিত করেছিলেন অর্থমন্ত্রী নিজেই। নিজের বাজেট বক্তব্যে তিনি পহেলা জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করেনি সরকার।

অর্থাৎ, সরকারি চাকরিজীবীদের গ্রেডের ভিত্তিতে কার বেতন কত বাড়ছে এটি এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি।

এছাড়া নতুন পে-স্কেল দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত কমিশন যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটিই কার্যকর হবে, নাকি বর্তমান সরকার ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে- সেটিও স্পষ্ট নয়।

যদিও, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে বলে জানানো হয়েছিল।

যে খসড়া রূপরেখাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতেই এখন কাজ চলছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। যেখানে বেতন কত বাড়বে, কয় ধাপে বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে, মূল্যস্ফীতি এড়ানোর পন্থা কী হবে এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে কবে থেকে বেতন কাঠামো কার্যকর হবে, বেতন-ভাতা কত বাড়বে, কত ধাপে বা পর্যায়ে বাড়ানো হবে–– সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এমন নানা বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই নতুন বেতন কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও গেজেট প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছুই বলার সুযোগ নেই।

আর প্রশাসনিক আদেশ, গেজেট প্রকাশ এবং আইনি প্রক্রিয়ার কারণে নতুন কাঠামোয় বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে বলেও জানান তিনি।

তবে যখন থেকেই এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হোক না কেন, বকেয়াসহ তা পরিশোধ করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে বলেও তিনি জানান।

আর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘যথাসময়েই’ বাস্তবায়ন হবে নতুন বেতন কাঠামো।

এদিকে, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন আসা জরুরি; তবে কীভাবে সরকার এটি বাস্তবায়ন করবে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অনেকদিন ধরেই নতুন পে-স্কেলের দাবি জানিয়ে আসছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

নতুন কাঠামোয় বেতন কবে থেকে?

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষিত হয়েছিল ২০১৫ সালে।

এরপর থেকে প্রতি বছর তাদের মূল বেতনের নির্ধারিত ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও, নতুন করে আর পে-স্কেলের ঘোষণা আসেনি।

ফলে দীর্ঘদিন ধরেই নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।

২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান এর নেতৃত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এছাড়া বৈশাখি ভাতার হার বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ এবং যাতায়াত ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রেও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ব্যাপক সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল।

কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান ওই সময় জানিয়েছিলেন যে, গত এক দশকে দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সূচকে যে বিশাল পরিবর্তন এসেছে, তা মাথায় রেখেই এই সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়েছে।

তখন জানানো হয়েছিল যে, পুরো সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর বড়ো ধরনের প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রাখে।

ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে বর্তমান সরকার। যে কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে। যার ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে গেজেট তৈরির কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় রেখেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।

“ইশতাহারে বলা হয়েছে যে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সেই অনুযায়ীই একটা রিভিউ করা হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি বেসরকারি খাতে কী প্রভাব ফেলবে সেদিকেও নজর রাখার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ছবির উৎস, Getty Images

কবে নাগাদ গেজেট প্রকাশ হতে পারে এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব দেননি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা। বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, “পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নটা করা হবে।”

যদিও, জাতীয় সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তব্যে নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি কর্মচারীদের জন্য পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

“সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবৎ একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী পহেলা জুলাই ২০২৬ হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি,” জাতীয় সংসদে বলেন তিনি।

বেতন-ভাতা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছিল পে-স্কেল পর্যালোচনা কমিটিও। প্রথম দুই অর্থবছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি এবং তৃতীয় বছরে ভাতা কার্যকরের কথাও জানানো হয়েছিল।

নতুন পে-স্কেলে বেতন-ভাতা একসাথে কার্যকর না করার বিষয়টি বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলছেন, “আমরা কয়েকটা ধাপে এটা করবো, প্রথমেই বেতন বা বেসিকটা বাড়ানো হবে।”

তবে কোন গ্রেডের কর্মচারীর বেতন কত হতে পারে সে বিষয়ে এখনই কিছু জানাতে রাজি হননি মি. তিতুমীর।

তিনি বলছেন, গেজেট চূড়ান্ত করতে সরকার পর্যালোচনা করছে, “এই পর্যালোচনা এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার আলোকেই পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।”

যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে যে, চলতি মাসের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ বেতন বৃদ্ধির গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় রয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ যা এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।

বাজেটের ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে মূলত সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলছেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা রয়েছে, তবে এক্ষেত্রে বাজারের অন্যদের পরিস্থিতি কী সেটাও বিবেচনা করা জরুরি।

“অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত পে কমিশন একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে, কিন্তু সেই সময়ের অর্থনীতির সঙ্গে বর্তমান অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন হয়েছে সেটি যাচাই করতে হবে। কারণ বাজারে দাম বাড়লে সবার জন্যই বাড়বে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

তিনি বলছেন, বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলেই হবে না, দেশের অর্থনীতিতে সেটি সহনশীল কি না সেটাও নিশ্চিত করতে হবে- তা না হলে এর কার্যকারিতা হারাবে বলেও মনে করেন মি. মজিদ।

সরকারি বিভিন্ন অফিসে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে

প্রায় এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্কেল দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এই সময়ে যে মাত্রায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি হয়েছে, সার্বিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় সেটি বেশ কম।

“নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের ওপর বিশাল আর্থিক দায় তৈরি হবে, কিন্তু এটাকে ব্যয় হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে” বলেই মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

তবে নতুন বেতন কাঠামো কেবল মূল বেতন বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা এবং শিক্ষা ভাতার মতো আনুষঙ্গিক সুবিধাগুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।

একইসাথে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব অন্যান্য খাতের ওপরেও পড়বে, যা চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে সেটিও বিবেচনায় রাখার কথা বলছেন এই অর্থনীতিবিদ।

“সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিকল্প নেই, তবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে কীভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায় সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. রহমান।

বেতন বৃদ্ধির সাথে সরকারি কর্মচারীদের সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে বলছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।

তিনি বলছেন, “সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন হয় মানুষের টাকায়। তারা মানুষকে সেবা দিচ্ছে কি না সেটা তো নিশ্চিত হতে হবে। সেটি না হলে বেতন বৃদ্ধি করা হলো, দুর্নীতিও চলতে থাকলো, তাহলে তো দুদিকেই ক্ষতি।”