Home LATEST NEWS BANGLA ‘এখনো তদন্তই শেষ হয়নি’- আদালতে ঝুলছে জুলাই আন্দোলন ঘিরে সহস্রাধিক মামলা

‘এখনো তদন্তই শেষ হয়নি’- আদালতে ঝুলছে জুলাই আন্দোলন ঘিরে সহস্রাধিক মামলা

3
0

Source : BBC NEWS

কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা চলার সময় গুলিতে নিহত চারজন। ওপরে ডান দিক থেকে, ঘড়ির কাটার ক্রম অনুসারে- মাহমুদুর রহমান সৈকত, মোঃ মেরাজ, মাহমুদুর রহমান সৈকত ও তাহির জামান প্রিয়

নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজারে দুস্তারা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি বাবুল মিয়া ২০২৪ সালে মারা যান। কিন্তু পরের বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চৌঠা অগাস্ট আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি নিহত হয়েছেন এমন অভিযোগে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

আড়াইহাজার থানায় দায়ের করা এই হত্যা মামলায় ১৩১ জনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের অনেকেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন।

পুলিশের তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলে মামলাটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আদালতের একটি সূত্র। তবে, এমন মামলার সংখ্যা একটি নয় বরং শতাধিক।

জুলাইয়ের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত করতে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা এমন মিথ্যা, অসত্য, ভুয়া মামলা যেমন পাচ্ছেন ঠিক তেমনি দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও হত্যা মামলাগুলোর তদন্তের গতি খুব ধীর বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন স্বজন ও সংশ্লিষ্টরা।

জুলাইয়ের ঘটনায় মামলাগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় মানবাধিকার কর্মী ও আইনজ্ঞরা অতীতের মতো ঢালাও মামলা বলে সমালোচনা করে আসছেন। একই ফরম্যাটে এবং একই ধরনের আসামিরা এসব মামলাগুলোতে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সময় বিবিসি বাংলাও প্রতিবেদন করেছে।

ভুয়া, অসত্য মামলা পাওয়ার কথা আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও জাতীয় সংসদে স্বীকার করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, বিপুলসংখ্যক মামলার তদন্ত একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।

এদিকে, মামলাগুলোর তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা শত্রুতা ও হয়রানিমূলক মামলা এবং বাদীর দেখা না পাওয়াসহ নানা ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন বলেন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এবং মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত এবং আহতদের পরিবার এখনো শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন

সারাদেশে দায়ের হওয়া হত্যাসহ অন্য ধারার মামলাগুলোর কী অবস্থা?

২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় নিহত হন ফ্রিল্যান্স ফটো সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়।

রংপুরে মা সামছি আরা জামানের সাথে দেখা করে ১০ই জুলাই ঢাকায় ফেরেন তিনি।

এরপরে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন চলাকালীন রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডে গুলিবিদ্ধ হন তিনি।

পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান তিনি।

ওই ঘটনায় ঢাকার নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়।

তবে, এখনো তদন্ত শেষ হয়নি এসব মামলার। এতে হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহত প্রিয়র মা সামছি আরা জামান।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “আমরাতো এখনো কোনো অগ্রগতিও পাই নাই, কোনো কিছুও পাচ্ছি না। সন্তান মারা যাওয়ার পর তো অসহায় হয়ে গেছি” বলেন মিজ জামান।

নিহত প্রিয়কে সেদিন পুলিশই গুলি করেছিল বলে অভিযোগ করেন মিজ জামান।

তিনি বলেন, “বলে এই দিচ্ছি, এরমধ্যেই দিচ্ছি(তদন্ত প্রতিবেদন)। পুলিশ করছে গুলি এখন বলে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করছে। ওরা এখনো তদন্ত শেষই করতে পারেনি। পুলিশকে ওরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে চাচ্ছে।”

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ নিউমার্কেট থানার পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট আটজনকে মামলাগুলোতে আসামি করা হয়েছে।

নিহত প্রিয়র মায়ের মতো আরো অনেকের পরিবারের সদস্যরাই বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরে ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় মোট এক হাজার ৮৬৬টি মামলা দায়ের করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

তবে এর মধ্যে কতগুলো হত্যা মামলা বা অন্যান্য ধারার মামলা, কতগুলোতে তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে অথবা কতগুলো মামলাতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে এমন বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

যদিও এর আগে, গত ৩০শে এপ্রিল আইনমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, সারাদেশে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ৭৯৯টি সরাসরি হত্যা মামলা এবং বাকিগুলো অন্যান্য ধারায় দায়ের করা মামলা।

এর মধ্যে ১৫৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। যার মধ্যে ৪০টি হত্যা মামলা এবং ১১০টি অন্যান্য ধারায় মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

দেশের বিচারিক আদালতে এসব মামলার বিচার চলমান রয়েছে বলে সেদিন সংসদে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

একইসঙ্গে এসব মামলার তদন্ত সম্পর্কে সেদিন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, “প্রতিটি মামলায় যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে যাতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আইনি দুর্বলতা না থাকে।”

তবে, বুধবার বিবিসি বাংলাকে পুলিশ সদর দফতর থেকে যে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে, তাতে দেখা গেছে, তদন্ত শেষ হয়েছে এমন মামলার সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ২৬৪টি হয়েছে।

তবে, বিভিন্ন জেলায় কতগুলো মামলা সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি পুলিশ সদর দফতর।

তবে, শুধু ঢাকা মহানগরীতে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর একটি হিসাব বিবিসি বাংলাকে সরবরাহ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

ওই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা মহানগরীতে মোট ৭৯০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

যার মধ্যে ৪৮০টি হত্যা মামলা এবং বাকি ৩১০টি অন্যান্য ধারার মামলা।

এর মধ্যে তদন্ত শেষে মাত্র নয়টি মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে, এর মধ্যে পাঁচটি হত্যা ও বাকি চারটি অন্যান্য ধারার মামলা।

ডিএমপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫৯৮টি মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

তদন্তের ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন করলে পুলিশ সদর দফতরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বিবিসি বাংলাকে বলেন, এসব মামলার তদন্ত সময়সাপেক্ষ ও খুবই সংবেদনশীল।

তিনি বলেন, “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো খুবই সংবেদনশীল এবং অধিকাংশই বহু আসামি, বিপুল সংখ্যক সাক্ষী, ডিজিটাল ও ফরেনসিক আলামত এবং বিভিন্ন স্থান থেকে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।”

“তাই প্রতিটি মামলার তদন্ত নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক ও আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সময় লাগছে। শুধু দ্রুততার জন্য নয়, মানসম্মত তদন্ত নিশ্চিত করাই আমাদের অগ্রাধিকার” বলেন মি. হোসাইন।

কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন সেই লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পর্যায়ক্রমে তদন্ত শেষ করা হবে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

মি. হোসাইন বলছেন, “প্রতিটি মামলার প্রকৃতি ও জটিলতা ভিন্ন হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।”

শেখ হাসিনা

ছবির উৎস, Getty Images

তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন

চব্বিশের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন যাত্রাবাড়ি থানার সামনে গলির মুখে গুলিতে নিহত হন জিহাদ হাসান।

এই ঘটনায় কদমতলী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন পারভেজ হোসেন নামে এক ব্যক্তি, যাকে চেনেন না নিহত জিহাদের পরিবারের সদস্যরা।

কিন্তু ঘটনাস্থল ভুল থাকা এবং মামলার বাদীর ঠিকানা ভুল এবং বারবার নোটিশ দিলেও পুলিশের সাথে যোগাযোগ না করায় এই মামলায় কদমতলী থানার পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় বলে জানিয়েছে ঢাকার বিচারিক আদালতের একটি সূত্র।

এরইমধ্যে, এই মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পর আদালত বাদী পারভেজ হোসেনকে নোটিশ দিলেও এখনও কোন উত্তর দেয়নি বলে জানা গেছে।

একইসঙ্গে, জিহাদ হাসান নিহতের এই ঘটনায় যাত্রাবাড়ি থানায় আরেকটি হত্যা মামলা থাকায় ওই প্রতিবেদন দেওয়া হয় বলে বিচারিক আদালতের সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, ঢাকা মহানগরীতে দায়ের হওয়া ৭৯০ মামলার মধ্যে ২৮টি মামলায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। যার মধ্যে ২৩টি হত্যা মামলা। বাকি পাঁচটি অন্য ধারার মামলা।

একইসঙ্গে, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ২৭২টি মামলা তদন্ত করে।

পিবিআই ১৬৫ মামলার তদন্ত শেষে এ বছরের এপ্রিলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ১১১টি ঘটনার প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু এসব মামলায় অর্ধেকেরও বেশি আসামির বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

বাকি ৩১টি মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।

পিবিআইয়ের তদন্তে এমন ঘটনাও বেরিয়ে এসেছিল, যেখানে মামলায় জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়েছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করার অর্থ হলো, মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রমাণ না পেলে যে প্রতিবেদনটি দাখিল করেন আদালতে সেটিকেই বোঝানো হয়।

আদালতে কোনো মামলায় এই চূড়ান্ত রিপোর্ট বা এফআরটি দাখিল করে ওই মামলা থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে থাকে পুলিশ বা তদন্ত কর্মকর্তা।

তবে এটি দিলেই যে মামলাটি শেষ তা নয়। এরপরেও আইনি ধাপ রয়েছে।

এর মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত চাইলে বাদীপক্ষকে নোটিশ দিতে পারে, বাদী তদন্তে সন্তুষ্ট না হলে নারাজি আবেদন দিতে পারে এবং পরবর্তীতে আদালত বিভিন্ন বিষয় শুনানি করে ওই মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এক্ষেত্রে আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করতে পারেন বা বাদীর নারাজি আবেদন গ্রহণ করে পুনঃতদন্তের নির্দেশও দিতে পারেন।

একইসঙ্গে, আদালতের কাছে যদি মনে হয়, অপরাধের পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে তাহলে পুলিশের ওই রিপোর্ট গ্রহণ না করে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশও দেওয়ার এখতিয়ারও রয়েছে আদালতের।

এদিকে, কতগুলো ভুয়া, অসত্য ও মিথ্যা মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে সেই তথ্য দেওয়া হয়নি পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকে।

তবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে, সারাদেশে এরকম ১১০টি মামলা চিহ্নিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুয়া বা মিথ্যা মামলা সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর না দিলেও পুলিশ সদর দফতরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, তদন্ত করতে গিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা শত্রুতা ও হয়রানিমূলক মামলাসহ নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

“প্রতিকূলতা বলতে এজাহারের দুর্বলতা, ঘটনার নির্ভুল বর্ণনার অনুপস্থিতি, শত্রুতা এবং হয়রানিমূলক মামলা, ময়না তদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফন, কিছু ক্ষেত্রে বাদীর সাক্ষাৎ না পাওয়ার” মতো ঘটনা পাচ্ছেন বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ছবির উৎস, BBC/TANVEE

জুলাইয়ের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর যে অবস্থা

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরুর পর চব্বিশের ১৪ই জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে, কোটায় সরকারি চাকরির বিষয়ে বলেন, “মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা পাবে না, রাজাকারের বাচ্চারা পাবে?”

তার এমন মন্তব্যের পরই মূলত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন আরো বেগবান হয়। ওই ঘটনার পর ওইদিনই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আন্দোলনকারীরা ফুঁসে ওঠে।

“তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার” স্লোগান দিয়ে আন্দোলনে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা।

পরে ১৬ই জুলাই আন্দোলন চলাকালীন রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী এনে জুলাইয়ের ঘটনার বিচার শুরু করা হয়।

তবে, সেসময় থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞরা এই বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

পরবর্তীতে বিচারিক কার্যক্রম শেষে এই ট্রাইব্যুনালে রায়ও হয়েছে কয়েকটি।

গত ১৪ই জুলাই জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৫৯০টি অভিযোগ জমা পড়েছিল।

“৫৯০টি অভিযোগের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রসিকিউশন টিম যাচাই-বাছাই করে ১০৯টি মামলা সিলেক্ট করেছিলেন। সেই ১০৯টি মামলার মধ্যে ৪৩টি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে” বলেছেন আইনমন্ত্রী।

ছয়টি মামলায় বিচার শেষ করে রায় দিয়েছে পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল।

যার মধ্যে নিহত আবু সাঈদ হত্যা মামলাটিও রয়েছে।

এই মামলায় দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদী কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।

এছাড়াও, জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

এই মামলার গ্রেফতারকৃত আসামি ও অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমির হোসেনকে গুলি ও দুইজনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

এছাড়া এই মামলার আসামি এক পুলিশ সদস্যের যাবজ্জীবন এবং আরেক পুলিশ সদস্যকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

এছাড়া জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে।

জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেওয়া এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে।

এছাড়া ৩৫ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে, একজন রাজসাক্ষীকে খালাস দেয়া হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন।

এছাড়া ২৬টি মামলা এখনো বিচারাধীন আছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

তবে এরইমধ্যে, আরো কয়েকটি মামলার তদন্ত শেষে প্রসিকিউশনে প্রতিবেদন দাখিলের পর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

এরমধ্যে, ২০১৮ সালে কক্সবাজার জেলার টেকনাফে মাদকবিরোধী এক অভিযানে সাবেক পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

এছাড়া, ২০১৩ সালের পাঁচ ও ছয়ই মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের এক সমাবেশে হামলার ঘটনার তদন্ত শেষে ৬১ জনকে হত্যার ঘটনায় গণহত্যার অভিযোগ এনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে।

এই মামলায় শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্য, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরসহ ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

কিন্তু এই অভিযোগপত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড সমুন্নত রাখতে কর্তৃপক্ষ ‘ব্যর্থ হচ্ছে’ বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

একইসঙ্গে, সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

“ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজমের সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছি” বলেন তিনি।