Home LATEST NEWS BANGLA দান করলেও জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা, নতুন সংশোধনীর ফলে...

দান করলেও জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা, নতুন সংশোধনীর ফলে কী হবে?

6
0

Source : BBC NEWS

একজন বাবার এক মেয়ে ও এক ছেলে

ছবির উৎস, Juan Alberto Casado via Getty Images

সন্তানকে জীবদ্দশায় সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর নিজ বাড়ি থেকেই বিতাড়িত হওয়া অথবা অসহায় হওয়ার ঘটনার বেশ কিছু উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশে। দেশের আদালতগুলোতে এমন মামলার ঘটনাও অহরহ দেখা যায়।

বর্তমানে প্রচলিত “দ্যা ট্রান্সফার অফ প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২ অথবা সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২” অনুযায়ী, কেউ সম্পত্তি দান করলে সেটির মালিকানা ও ভোগদখলের অধিকার গ্রহীতার কাছেই চলে যায়। যে কারণে বাবা-মা জীবদ্দশায় সম্পত্তি লিখে দেয়ার পর অসহায় হয়ে পড়েন।

তবে সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই আইনে আনা একটি সংশোধনী অনুমোদন করেছে।

“সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬” এ আনা নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, সম্পত্তি দান করলেও দাতা জীবদ্দশায় সেটি ভোগ ও ব্যবহার করতে পারবেন।

আইনবিদরা বলছেন, এর ফলে বাংলাদেশে এখন আর বাবা-মায়েরা নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তি সন্তানকে দান করলেও পরবর্তীতে অনিরাপত্তায় ভুগবেন না। কারণ জীবিত থাকাবস্থায় সম্পত্তি তার অধীনেই থাকবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিউল হক ফয়সাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তরের যে আইন সেটি বাতিল করে নয়। বরং আগের আইনেই একটি বিশেষ বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। যেটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

“প্রচলিত আইনানুযায়ী, যাদের শুধুমাত্র কন্যা সন্তান তারা ভবিষ্যতের চিন্তায় অনিরাপদ বোধ করতেন। আমরা এমনও দেখেছি শুধুমাত্র পুত্র সন্তানের জন্য একাধিক সন্তান গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে তার মৃত্যুর পর তার অংশের সম্পত্তি ভাইসহ বৈমাত্রেয়ের কাছে চলে যেত। কিন্তু এই সংশোধনীর ফলে এখন সন্তান যেই লিঙ্গেরই হোক না কেন পিতা-মাতা আর অনিরাপদ বোধ করবেন না” বলেন মি. ফয়সাল।

তবে, মন্ত্রিপরিষদ সংশোধনীতে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে আর এটি জাতীয় সংসদে অনুমোদনের মাধ্যমে এটি আইনে চূড়ান্ত রূপ হিসেবে সংযুক্ত হবে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তি হস্তান্তরের জন্য পৃথক পৃথক ধর্মীয় আইন রয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

প্রচলিত আইনে কী আছে, জটিলতা কোথায়?

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তি হস্তান্তরের জন্য পৃথক পৃথক ধর্মীয় আইন রয়েছে।

এছাড়া প্রচলিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সকল ধর্মের ব্যক্তিরাই সন্তানদের মাঝে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জামিউল হক ফয়সাল বলছেন, মুসলিম আইনে হেবার মাধ্যমে বাবা-মা জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দিতে পারেন।

“তবে হেবার মাধ্যমে পুরো সম্পত্তি দেওয়া যায় না। সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ দেওয়া যায়। এর বেশি দিতে হলে ভবিষ্যত উত্তরাধিকারদের সম্মতির প্রয়োজন হতো। হেবার মাধ্যমে সম্পত্তি একেবারেই হস্তান্তর করে ফেলতে হয়। তাতে জীবনস্বত্ব ছিল না” বলেন মি. ফয়সাল।

আর বাংলাদেশের প্রচলিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ অনুযায়ী, “বাংলাদেশের সকল ধর্মের সকল নাগরিক সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের মাধ্যমে গিফট করতে পারেন। কিন্তু গিফট করা মাত্রই ওই সম্পত্তিতে তার অধিকার খর্ব হয়ে যেত” বলে জানান এই আইনজীবী।

আইনানুযায়ী, একজন ব্যক্তি তার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অন্য আরেকজনের কাছে স্বেচ্ছায় কোনো প্রতিদান ছাড়াই হস্তান্তর করাকে গিফট করা বুঝায়। যেটি গ্রহীতার পক্ষে গৃহীত বলে বিবেচিত হবে।

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী জানান, মুসলিম আইনে ওয়াসিয়তনামার কথাও বলা হয়েছে। যেটি পিতা-মাতার মৃত্যুর পরে কার্যকর হয়। জীবিত ব্যক্তি ওয়াসিয়ত করতে পারেন না।

আর হিন্দু, খ্রিস্টান আইনে উইল করার আইনি বিধান রয়েছে।

এছাড়াও, পিতা-মাতা মারা যাওয়ার আগে সম্পত্তি বন্টন না হলে ধর্মীয় পারিবারিক বা ফারায়েজ আইনানুযায়ী সম্পত্তি উত্তরাধিকারদের মাঝে বন্টন করা হবে।

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী জামিউল হক ফয়সাল বলছিলেন, প্রচলিত আইনের দুর্বলতা হলো, পিতা-মাতা জীবিতাবস্থায় উত্তরাধিকারদের মধ্যে সম্পত্তি লিখে দিলে সেটি সাথে সাথেই হস্তান্তর হয়ে যাওয়ায় নিজেরাই অনিরাপদ হয়ে যেতেন। কেননা এটি আর তার কাছ থেকে ফেরত নেয়া যায় না।

ঢাকার বিচারিক আদালতগুলোতে এই ধরনের অনেক মামলা দেখা যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সম্পত্তির দলিল

ছবির উৎস, Getty Images

নতুন সংশোধনীর ফলে এখন কী হবে?

পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের আলোকে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে একটি সংশোধনী আনার কথা ৩০শে জুলাই জানান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

“এই আইনে গিফটের একটি ধারা আছে। হেবার বাইরেও যে কেউ গিফট করতে পারেন। সেই গিফটের জায়গায় ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটা সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে ওইটাকে এক্সপান্ড করতে চাচ্ছি। গিফটটাকে ইউসুফ্রাক্ট রাইট রাখতে চাচ্ছি, জীবনস্বত্ত্ব” বলেন আইনমন্ত্রী।

প্রচলিত আইনানুযায়ী, পিতা-মাতা সম্পত্তি গিফট বা দান করার সাথে সাথে সেটি হস্তান্তর হয়ে যাওয়ায় ওই সম্পত্তিতে তার আর অধিকার থাকে না।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আইনমন্ত্রী বলেন, “ধরুন আপনার সন্তানদের সম্পত্তি হেবা বা উইল করতে চাচ্ছেন না। আপনি এমনভাবে ব্যবস্থা করে যেতে চাচ্ছেন যেটা আপনার জায়গা থেকে জীবদ্দশায় ভোগ দখল করতে পারেন। সেখানে গিফটে ইউসুফ্রাক্ট রাইট দিলে যতদিন ওনারা বেঁচে থাকবেন ততদিন ভোগদখল করতে পারবেন।”

অর্থাৎ সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে আনা নতুন এই বিশেষ বিধান বা সংশোধনীর ফলে এখন সম্পত্তি দান করলে পিতা-মাতা জীবদ্দশায় সেটি ভোগদখলের অধিকার পাবেন।

তবে, জীবদ্দশায় ভোগদখল করলেও বাবা-মা ওই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন না। বিক্রি করতে গেলে তার সন্তানদের অনুমতি প্রয়োজন হবে বলে জানান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। আবার, সন্তানও পিতা-মাতার অনুমতি ব্যতীত সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন না।

আইনমন্ত্রী জানান, জরুরি প্রয়োজনে যেমন: চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে সম্পত্তি বিক্রির প্রয়োজন হয়েছে কিন্তু সন্তান তাতে সায় দিচ্ছেন না। সেক্ষেত্রে জেলা জজের কাছে একটি বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে নতুন এই সংশোধনীতে।

“সেইক্ষেত্রে জেলা জজকে আমরা একটা ক্ষমতা দিয়ে রাখছি। আবেদন করলে জেলা জজ সেটাকে বিবেচনায় নিতে পারবেন” বলেন আইনমন্ত্রী।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিউল হক ফয়সাল বলেন, “বর্তমান উত্তরাধিকার আইনে, শরীয়াহ ল অনুসরণ করা হয়, যাদের শুধুমাত্র কন্যা সন্তান ছিল তারা পুরো সম্পত্তির মালিক হতে পারতেন না।”

“এখন এই সংশোধনীর ফলে পুরো সম্পত্তির মালিক হতে পারবেন তারা। একটা মানুষ সারা জীবন উপার্জন করেছেন, এক্সপেক্ট করবেন তার সন্তানই সব পাবেন। এই সংশোধনীতে ওই অস্থিরতা থাকবে না” বলেন মি. ফয়সাল।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মি. ফয়সাল জানান, প্রচলিত আইনে সংশোধন করে যে বিশেষ বিধান যুক্ত করা হচ্ছে এটি “অ্যাডপ্ট বা সুযোগ গ্রহণ করতে হবে।”

অর্থাৎ, সম্পত্তি আজীবন ভোগ করতে হলে তাকে নতুন এই সংশোধনী অনুযায়ী জীবদ্দশায়ই দান করে যেতে হবে। যদি না করা হয় তাহলে অন্য ওয়ারিশানরাও তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার আইনানুযায়ী সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবেন।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মি. ফয়সাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ধরুন, যদি জীবদ্দশায় কোন ব্যক্তি তার কন্যা বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিশেষ বিধান অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তর করলেন না।”

“তাহলে ভবিষ্যতে তার মৃত্যুর পরে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন অনুযায়ীই ওয়ারিশানদের মধ্যেই বন্টন হবে। কেউ যদি মনে করেন জীবদ্দশায় ওয়ারিশানদের মধ্যে সম্পত্তি গিফট করে আমৃত্যু সম্পত্তি ভোগদখল করবেন তাহলে তাকে এই বিশেষ বিধানের সুযোগটা নিতে পারবেন” বলেন তিনি।

নতুন এই সংশোধনী মুসলিমদের প্রচলিত শরীয়াহ আইন, হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না বলে মন্তব্য করেন মি. ফয়সাল।

“আমাদের মুসলিম আইন, যে শরীয়াহ আইন আছে সেটিতে বলা আছে, জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তরে বাধা নেই। বর্তমান সংশোধনীতেও এটা বলা আছে, শরীয়াহ আইন তো এটাকেও সাপোর্ট করছে। শুধু জীবদ্দশায় ভোগ করার জায়গায় একটা ক্লারিফিকেশন আসছে। এখন জীবনসত্ত্বটা বহাল থাকবে। সো এটাতো আইনের সাথে সাংঘর্ষিক না” বলেন মি. ফয়সাল।

কিন্তু এরপরেও যদি কোন সম্পত্তি দাতা জটিলতার মুখোমুখি হন, তাহলে অন্যান্য আইনি বিধান রয়েছে বলে জানান তিনি।