Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ই অগাস্ট বুধবার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে তার দল যে ঘোষণা দিয়েছে তা নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, পাল্টাপাল্টি আলোচনা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমেও।
দুই বছর আগে ৫ই অগাস্টেই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হবার পর থেকে ভারতেই অবস্থান করছেন। পরে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় ৫ই আগাস্ট শেখ হাসিনা ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের’ ঘোষণা নিয়ে দিল্লিতে প্রেস কনফারেন্সে যুক্ত হবেন বলে জানানো হয়।
আওয়ামী লীগের এ ঘোষণার পর আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে কেউ যেন তার বক্তব্য নিয়ে খবর প্রচার না করে সে বিষয়ে সরকার গণমাধ্যমকে সতর্ক করার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোঃ আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, শেখ হাসিনার ‘বিদ্বেষমূলক’ বক্তব্য প্রচারে ট্রাইব্যুনালের নিষেধাজ্ঞা আছে এবং সেই নিষেধাজ্ঞা গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম- সবার জন্যই প্রযোজ্য হবে।
যদিও আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের দলের নেত্রীর বক্তব্যের প্রচার ঠেকানো যাবে না।
প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নির্বাহী আদেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করায় তারা চলতি বছরের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
ছবির উৎস, Getty Images
দিল্লিতে কী করবেন হাসিনা
এর আগেও দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের একটি মতবিনিময় সভায় শেখ হাসিনার অংশ নেওয়ার খবর ছড়িয়েছিল চলতি বছরের জানুয়ারিতেই। পরে সেখানে শেখ হাসিনা সরাসরি অংশ নেননি, তার একটি রেকর্ড করা অডিও বার্তা আয়োজকরা বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন।
এবারের অনুষ্ঠানটিরও আয়োজক করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া। তাদের আয়োজনে শেখ হাসিনা দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলন করবেন এবং সশরীরে ভিডিওতে যোগ দিবেন-এমন খবর কয়েকদিন আগেই ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে।
অনুষ্ঠানের জন্য তারা যেই কার্ড সামাজিক মাধ্যমে দিয়েছে তাতে শেখ হাসিনা ছাড়াও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক এমপি ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানসহ আরো কয়েকজনের অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
তবে ভারতীয় কিছু সংবাদ মাধ্যমকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমেও এমন খবর ছড়িয়েছিল যে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে যাওয়ার শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ভার্চুয়ালি তবে সরাসরি প্রকাশ্যে আসছেন, অর্থাৎ ভিডিওতে তাকে দেখা যাবে।
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন যে, দিল্লির ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’ অনুষ্ঠানটির আয়োজক, কিন্তু শেখ হাসিনা বুধবার সন্ধ্যায় ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থেকে তাতে অডিও বক্তব্য রাখবেন।
“আমরা বা দল থেকে কখনোই বলা হয়নি যে শেখ হাসিনা ভিডিওতে যুক্ত থাকবেন। ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবের প্রস্তাব তিনি যখন গ্রহণ করেছেন তখনই এটা চূড়ান্ত হয়েছিল যে তিনি ভার্চুয়ালি অডিওতে সংযুক্ত থেকে বক্তব্য দিবেন,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও জাপানি একটি বার্তা সংস্থাকে দেওয়া ইমেইল সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসবেন বলে দাবি করেছিলেন।

বক্তব্য প্রচার নিয়ে সরকারের সতর্কবার্তা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কেউ যেন শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে খবর প্রচার না করে সে ব্যাপারে গণমাধ্যমকে সতর্ক করবে বাংলাদেশ সরকার।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা যখন বক্তব্য দিচ্ছেন, এর আগের বারও আমরা একটা ব্রিফিং দিয়েছি, পত্রিকাগুলোকে একটা নির্দেশনা দিয়েছি”।
“আবার তিনি বক্তব্য দেবেন- এরকম নিউজ যদি কেউ দিয়ে থাকে, কালকে করবে- এটা যদি কেউ আগাম জানায়, পাবলিশ করে, এটা অবশ্যই আদালতের রায় ভায়োলেট হবে। আমরা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবো,” বলেন তিনি।
মি. রহমান বলেন, “আমরা আবার স্মরণ করিয়ে দেবো যে এই কাজ কেউ যেন না করেন। কারণ এটা আদালতের নির্দেশ আছে। সরকার কিন্তু আদালত নয়”।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “শেখ হাসিনার বিদ্বেষমূলক বক্তব্য যাতে প্রচার না হয়, আপনাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে একটা”।
এর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যের খবর প্রচারের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে যাতে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে বা কর্মকাণ্ড না চালাতে পারে, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
সোমবার ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে এ সহযোগিতা চান বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
“পলাতক শেখ হাসিনা ৫ই অগাস্ট প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখতে পারেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এ খবর আলোচনায় উঠে আসে,” ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল।
একই দিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে এমন আয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সরকারের এ প্রতিক্রিয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলছেন, “নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রচার সরকার ঠেকাতে পারবে না”।
তবে মঙ্গলবারই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নয়াদিল্লিতে বুধবার সাংবাদিকদের যে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে, সেই অনুষ্ঠানের সাথে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই, সেখানকার কোনো বক্তব্যও তারা সমর্থন করে না।
ছবির উৎস, screengrab
কী বিধিনিষেধ, কার জন্য প্রযোজ্য
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ই ডিসেম্বর শেখ হাসিনার ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য’ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।
পরে দুই হাজার পঁচিশ সালের ২২শে অগাস্ট শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে দেশের গণমাধ্যমকে সতর্ক করে একটি বিবৃতি দিয়েছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
সরকারের ওই বিবৃতিতে তখন বলা হয়েছিল, “বিধিনিষেধ অমান্যকারী যেকোনো সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের আইনের অধীনে আইনি জবাবদিহিতার আওতায় পড়বে।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছিল, “বাংলাদেশের আইন অনুসারে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং একই সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ অনুসারে, যে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন যারা তাদের নেতাদের কার্যকলাপ বা বক্তৃতা প্রচার, প্রকাশ বা সম্প্রচার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোঃ আমিনুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “শেখ হাসিনার বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার না করার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের নিষেধাজ্ঞা আছে। অর্থাৎ যে বক্তব্যে আদালত অবমাননা হয় কিংবা কোনও ধরনের ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো হয় এমন যে কোনো বক্তব্য প্রচার করা যাবে না”।
কিন্তু অবমাননাকর বা ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়টি কীভাবে দেখা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বক্তব্য প্রচার হলেই তো দেখা যাবে যে এ ধরনের কোনো কিছু আছে কি-না। থাকলে প্রচারকারী জবাবদিহির আওতায় আসবেন”।
কার জন্য এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে জানতে চাইলে মি. ইসলাম বলেন, “সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম সবই এর আওতায় আসবে”।

শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিষেধাজ্ঞা এবং ওই বক্তব্য প্রচার না করতে গণমাধ্যমকে সরকারের পক্ষ থেকে যে আহবান জানানো হয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, “নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তারা কি শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার ঠেকাতে পেরেছে। বরং বিশ্ব গণমাধ্যমগুলো তার বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এবারেও তার বক্তব্য দেশবাসী শুনবেন”।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল আদালত। ওই সময় আইনের দৃষ্টিতে পলাতক থাকা অবস্থায় তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী।
পরদিন তারেক রহমানের কোনো ধরনের বক্তব্য বা বিবৃতি সব ধরনের গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই সংক্রান্ত আগের সব নির্দেশনা প্রত্যাহার করে হাইকোর্ট। যদিও বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা থাকার সময়েও তখন লন্ডন থেকে মি. রহমান সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে নিয়মিতই তার দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন।
এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও জানিয়েছে যে, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের পেইজগুলো থেকে একযোগে শেখ হাসিনার বুধবারের বক্তব্য তারা প্রচার করবে।




