Home LATEST NEWS BANGLA শেখ হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন কি বাড়ছে?

শেখ হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন কি বাড়ছে?

4
0

Source : BBC NEWS

বাংলাদেশ ও ভারতের পতাকা

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশের আপত্তি সত্বেও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, এই অভিযোগ তুলেছে ঢাকা। নয়া দিল্লির সেই সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা, সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে যেতে পারে কিনা- এ সব প্রশ্ন এখন উঠছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-দিল্লি, দুই পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়।

তবে এরই মধ্যে গত পাঁচই অগাস্ট ভারতে আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনার নয়া দিল্লিতে গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বলার ঘটনা ভিন্ন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।

পাঁচই অগাস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) এই সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করেছিল।

ঘটনাটিকে ঘিরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ঢাকা। শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে কথা বলার দিনেই রাতে কড়া ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সেই বিবৃতিতে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার।

দুই দেশের সম্পর্কউন্নয়নের চেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ ভারত সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। এর পরেও ভারতের মাটিতে এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করছে।

নয়া দিল্লিতে সেই সংবাদ সম্মেলনের একদিন আগেই শেখ হাসিনা যাতে ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করতে না পারে, সে বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দেশটির সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশের সরকার।

এরপরও যখন শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি কথা বলেছেন, তাতে বাংলাদেশ সরকার যেমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, একইসঙ্গে সরকারে থাকা বিএনপি নেতাদেরও অনেকে ভারত সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন।

বিএনপির নেতারা বলছেন, তাদের সরকার আসলে ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি ও কর্মকাণ্ড বন্ধ চায়।

এই সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ দুদিন আগে এক প্রেসব্রিফিংয়ে বলেছেন, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া যদি দেশটি এখনই বন্ধ না করে, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সেটি উদ্বেগ তৈরি করে।

দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন তুলেছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে। তার জবাবে তিনি বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ বসতে চায়। তবে ভারতকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তবে, পরিস্থিতিটাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন সাবেক কূটনীতিকেরা।

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির মনে করেন, নয়া দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের “এই ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যে প্রচেষ্টা ছিল, সেটি আর অনুকূল ভূমিকা পালন করছে না।”

আরেকজন সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, “এই ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, কিন্তু এটি অপ্রয়োজনীয় একটি প্রতিক্রিয়া, এটি দেখানো ঠিক হয়নি।”

দুই বছর ধরে ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন শেখ হাসিনা

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে?

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তিনি দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নেওয়াকে ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা শীতল হয়। বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনাকে প্রত্যপর্ণের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে অনুরোধও জানানো হয়।

জুলাইয়ের আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে বা ফেরাতে ভারত সরকারকে ‘নোট ভারবাল’ পাঠিয়ে সেসময়ও অনুরোধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তখন ভারত ইতিবাচক কোনো জবাব দেয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক একেবারেই তলানীতে গিয়ে ঠেকেছিল বলে সেসময় কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছিলেন।

তবে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা দেখা যায়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিএনপির রাজনৈতিক সরকারের শুরুতেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লা দেশটির প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

তারও আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

পরে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লী সফর করেছিলেন।

তবে ভারতে থাকা শেখ হাসিনার বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়াসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা এবং তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় দিল্লিকে অনুরোধ জানানো হয় বলে ঢাকায় কর্মকর্তারা বলছেন।

কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে বার বারই বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ প্রশ্নে বাংলাদেশের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে তারা।

এরই মাঝে নয়া দিল্লিতে শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বলার ঘটনা এখন দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বড় ইস্যু হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার অভিযোগ করছে, এ ধরনের সংবাদ সম্মেলনের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের সমর্থন ছিল। ঘটনাটি ই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় বাধা তৈরি করছে,এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে।

এর ব্যাখ্যায় কর্মকর্তারা বলছেন, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের আগেই বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা ভারতকে জানানো হয়েছিল। এরপরও সেই সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

ছবির উৎস, Getty Images

বুধবার রাতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “এই আয়োজন বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে ভারত সরকারকে আগেই উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এমন একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে।”

যদিও বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, কিন্তু একইসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, “ভারতের সাথে আমাদের অনেক ইস্যু আছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক অনেক ইস্যু আছে। যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে, ডায়লগের মাধ্যমে, বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। আমরা অবশ্যই বসতে চাই, তবে সিদ্ধান্তটা ভারতকে এখন নিতে হবে।”

এদিকে, সাবেক কূটনৈতিক হুমায়ুন কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, সম্পর্ক উন্নয়নের যে ধারণা বা প্রচেষ্টাটা ছিল, এই ধরনের ঘটনা সেটার জন্য অনুকূল বা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে না বলেই তার ধারণা।

প্রসঙ্গত, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার সেই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। অনুষ্ঠানের বক্তব্যকেও সমর্থন করে না ভারত সরকার।

কিন্তু সেই অনুষ্ঠানকে ঘিরে ভারতের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, “ভারত সরকার কোনো দায়-দায়িত্ব নিচ্ছে না বা তারা এর সাথে যুক্ত নয় বা তারা এই মতের সাথে একমত নয়, এই কথাগুলো সত্যিকার অর্থেই কোনো অর্থ বহন করে না।”

অন্যদিকে, সাবেক কূটনীতিক ফয়েজ আহমদ ব্যাখ্যা করছেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেন, “আমি মনে করি, আমাদের সরকারের বরং উদ্যোগ নিয়ে ভারতের সাথে সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানোটা সরকারের জন্য বিশেষ কাজ হয়নি।”

তবে হুমায়ুন কবির মনে করেন, সরকার যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মতের প্রতিফলনটা এসেছে।

বিশ্লেষকেরা এ-ও বলছেন, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় দুই পক্ষেরই সদিচ্ছা দেখানো উচিত।

তবে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখন ভারতের দিক থেকেই ভূমিকা প্রয়োজন।