Home LATEST NEWS BANGLA ব্রিটিশদের ১০৯ বছর আগে ধার দেওয়া টাকা এখন সুদসহ ফেরত চায় ভারতের...

ব্রিটিশদের ১০৯ বছর আগে ধার দেওয়া টাকা এখন সুদসহ ফেরত চায় ভারতের এক পরিবার

4
0

Source : BBC NEWS

নিজের পরিবার ও রোলস রয়েস গাড়ির সঙ্গে জুম্মালাল রুঠিয়া

ছবির উৎস, Gautam Ruthiya

সেটা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধরত ভারতীয় সৈন্যদের ভরণপোষণের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছিল সরকার। হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে এক ব্যবসায়ী। সরকারকে ‘ধার’ দিয়েছিলেন ৩৫ হাজার টাকা।

দীর্ঘ ১০৯ বছর পরে তার পরিবার যুক্তরাজ্যের সরকারের কাছে সেই অর্থ সুদ সমেত ফেরত চেয়েছে।

ওই পরিবারটি দাবি করেছে, তাদের পূর্বপুরুষ জুম্মালাল রুঠিয়া যে ব্রিটিশ সরকারকে এই অর্থ ঋণ দিয়েছিলেন তার প্রয়োজনীয় দলিলপত্র তাদের কাছে আছে। চৌঠা জুন ১৯১৭ তারিখ দেওয়া একটি শংসাপত্রই ৩৫ হাজার টাকার এই আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ বলে দাবি করেছে রুঠিয়া পরিবার।

পরিবারটির দাবি এই অর্থ ভোপাল এজেন্সিতে কর্মরত ব্রিটিশ সরকারের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে সরকারকে দেওয়া হয়েছিল।

এই দাবির পরে যুক্তরাজ্যের ডেট ম্যানেজমেন্ট দফতর বা ডিএমও পরিবারটির কাছ থেকে এই বিষয় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়ে পাঠিয়েছে।

ব্যবসায়ী জুম্মালাল রুঠিয়া ও তার স্ত্রী

ছবির উৎস, Gautam Ruthiya

যেভাবে সামনে এল এই ঘটনা

জুম্মালাল রুঠিয়ার প্রপৌত্র গৌতম রুঠিয়া জানিয়েছেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা এই ঘটনটির আরও বিস্তারিত মূল্যায়ণ করবেন বলে সে দেশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়েছেন। এছাড়াও পরিবারটির থেকে আরও কিছু তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে।

গৌতম রুঠিয়া ফোনে বিবিসিকে বলেছেন, “দেখুন, আমরা ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে একটি ইমেইল পেয়েছি, যেখানে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে। তারা আরও বলেছে যে বিষয়টি তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। যাচাইয়ের জন্য তাদের যা যা তথ্য প্রয়োজন, আমরা তা পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

তবে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এখনো নিশ্চিত করেনি যে তারা পরিবারটির দাবি গ্রহণ করবে কি না। নথিপত্রের এই অনুরোধটি বর্তমানে দাবি যাচাই প্রক্রিয়ার একটি অংশ।

জুম্মালালের নাতি এবং গৌতমের বাবা বিনয় রুঠিয়া বলেন যে, ব্রিটিশ সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় পরিবারটি খুবই উচ্ছ্বসিত।

“কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রথম আমরা যুক্তরাজ্যের সরকারের কাছ থেকে সাড়া পেয়েছি। আমাদের আশা জেগেছে। এই বিষয়টি টাকার ঊর্ধ্বে। আমাদের কাছে এটি আমাদের পৈতৃক ঐতিহ্যের বিষয়।”

পরিবারটি এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই নথিটির বিষয়ে জানতে পারে বলে জানিয়েছেন বিনয় রুঠিয়া।

তিনি বলেন, “এই বছরের শুরুতে, আমরা অন্য একটি মামলার জন্য পুরোনো নথি ঘাঁটতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া একটি ঋণ সংক্রান্ত এই নথিটি খুঁজে পাই। এরপর আমরা একজন আইনজীবীর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করি।”

পরিবারের খুঁজে পাওয়া আর্থিক ঋণের শংসাপত্র

ছবির উৎস, Gautam Ruthiya

কেন একজন ভারতীর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছিল ব্রিটিশ সরকারকে?

পরিবারের ভাষ্যমতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জুম্মালাল রুঠিয়া এই টাকা ব্রিটিশ সরকারকে দিয়েছিলেন।

আমরা যখন বিনয় রুঠিয়াকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি, তিনি বলেন, “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ভারতীয় সৈন্যরাও ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তখন ব্রিটিশ সরকার সৈন্যদের ভরণপোষণের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছিল। এই সূত্রে আমার দাদু, জুম্মালাল, যুদ্ধে যাওয়া ভারতীয় সৈন্যদের খরচের জন্য এই অর্থ ব্রিটিশ সরকারকে দিয়েছিলেন।”

পারিবারিক নথিপত্রে ঋণ গ্রহণের তারিখ হিসেবে চৌঠা জুন, ১৯১৭ উল্লেখ আছে।

জুম্মালালের পরিবার এটিকে যুদ্ধকালীন ঋণ বলে দাবি করেছে। অর্থাৎ, এই ঋণ সাধারণ ব্যাংক ঋণের মতো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শোধ করতে হয়।

গৌতম রুঠিয়া বলেন, “যদি এটি একটি ব্যাংকিং নথি হতো, তাহলে পরিশোধের জন্য পাঁচ বছর বা দশ বছরের মতো একটি সময়সীমা উল্লেখ করা থাকত। কিন্তু এটি ছিল একটি যুদ্ধকালীন ঋণ, অর্থাৎ যুদ্ধের জন্য দেওয়া ঋণ। যুদ্ধ কতদিন চলবে বা কখন শেষ হবে, তা নিশ্চিত ছিল না।”

ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এখন রুঠিয়া পরিবারের পারিবারিক নথিপত্র, বংশতালিকা, পুরোনো সনদপত্র, ঋণের পরিমাণ এবং সেই সময়ের ফর্ম সম্পর্কে তথ্য চেয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবারটি।

গৌতম রুঠিয়ার মতে, কর্তৃপক্ষ যাচাই করে দেখতে চায় যে, ১৯১৭ সালে যে পরিবার টাকা দিয়েছিল এবং যে পরিবার এখন তা দাবি করছে, তারা একই পরিবার কি না।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেট ম্যানেজমেন্ট অফিসের ইমেইল

ছবির উৎস, Gautam Ruthiya

৩৫ হাজার টাকার মূল্য এখন কত?

রুঠিয়া পরিবার ১৯১৭ সালে দেওয়া ৩৫ হাজার টাকার বর্তমান মূল্যও হিসাব করছে।

গৌতম রুঠিয়ার মতে, পরিবারটি তাদের আর্থিক দাবিতে সুদ, আসল, চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং অন্যান্য খরচ অন্তর্ভুক্ত করবে।

তিনি বলেন, “আমরা সব টাকাটাই দাবি করব। ৩৫ হাজার হলো আমাদের দেওয়া ঋণের আসল, তার সঙ্গে যোগ হবে সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং উদ্ভূত যেকোনো খরচ।”

“এই সবকিছু হিসাব করার পর, আমরা আজকের বাজারে টাকার অর্থমূল্যের সঙ্গে তুলনা করব।”

অর্থাৎ বর্তমান মুদ্রাস্ফীতিজনিত আর্থিক হিসাবও এই দাবিকৃত টাকার অঙ্কে যোগ হতে চলেছে।

এই হিসাবটা এখনো হওয়া বাকি, তাই ১০৯ বছর পর এই কথিত ঋণের বিনিময়ে তারা কত টাকা দাবি করবে, পরিবারটি এখনো তা স্থির করেনি।

জুম্মালাল রুঠিয়ার ছবি হাতে প্রপৌত্র গৌতম রুঠিয়া

ছবির উৎস, Gautam Ruthiya

২২০ কোটি পাউন্ড ইতোমধ্যেই পরিশোধ করেছে ব্রিটেন

বিনয় রুঠিয়া দাবি করেছেন ২০১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য নেওয়া বিভিন্ন ঋণের মোট ২২০ কোটি পাউন্ড পরিশোধ করেছে।

তিনি খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছেন যে, “২০১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য নেওয়া ঋণের অনেকটা অংশই পরিশোধ করেছে। এই ঋণগুলো ১৯১৭ সাল নাগাদই নেওয়া হয়েছিল।”

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া সরকারের এক জবাব অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কিত সরকারের প্রায় ২২০ কোটি পাউন্ডের বকেয়া ঋণ ছিল। এর কয়েক শতাংশ ছিল যুদ্ধকালীন ঋণ, যা ২০১৫ সালের নয়ই মার্চ পরিশোধ করা হয়। আরও ১০ লক্ষ পাউন্ড ছিল একটি কনসোলিডেটেড ঋণ এবং একটি কনভার্শন ঋণ, যা ২০১৫ সালেই পরিশোধ করা হয়েছিল।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া আরেকটি জবাব অনুযায়ী, কনসোলিডেটেড ঋণের ৪ শতাংশ এবং যুদ্ধকালীন ঋণের ৩.৫ শতাংশ ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশে জারি করা সরকারি বন্ড। সেই সময়ে জারি করা মোট যুদ্ধকালীন বন্ডের প্রায় ৯৯ শতাংশই ছিল এই দুটি বন্ড।

তবে, ২০১৫ সালে ব্রিটেনের এই পুরোনো ঋণগুলো পরিশোধ করা হলেও ১৯১৭ সালে জুম্মালাল রুঠিয়ার দেওয়া ৩৫ হাজার টাকাও এই বন্ডগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না তা এখনো প্রমাণ সাপেক্ষ।

জুম্মালাল রুঠিয়ার নাতি বিনয় রুঠিয়া

ছবির উৎস, Gautam Ruthiya

কে ছিলেন এই জুম্মালাল রুঠিয়া?

পরিবারের ভাষ্যমতে, জুম্মালাল রুঠিয়া সেই সময়ে এলাকার একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ছিলেন।

তার নাতি, বিনয় রুঠিয়া জানান যে, জুম্মালাল রুঠিয়ার প্রায় তিন হাজার গরুসহ একটি গোশালা ছিল।

পরিবারের কাছে জুম্মালাল রুঠিয়ার একটি পুরনো ছবি এবং সেই সময়ে তার ব্যবহৃত গাড়ির একটি ছবিও রয়েছে।

পরিবারটি জানায় যে তাদের পুরোনো ব্যবসা ও পরিবার সম্পর্কিত অন্যান্য নথিও রয়েছে।

বিনয় রুঠিয়া বলেন, “এগুলো ছাড়াও আমার দাদুর একটি বিশাল ব্যবসা ছিল। তিনি সে সময়ে আফিম চাষও করতেন। তার একটি রোলস রয়েস গাড়ি ছিল। সুতরাং, তিনি ঋণ দিয়েছিলেন কি না, তা প্রশ্ন নয়। তার কাছে টাকা ছিল এবং ঋণের নথিও রয়েছে। প্রশ্ন হলো, এ বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার কী পদক্ষেপ নেবে।”

ঋণ দেওয়ার প্রায় দুই দশক পর, ১৯৩৭ সালে শেঠ জুম্মালাল রুঠিয়া মারা যান। প্রায় ১০ বছর পর, ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ সরকার ভারত ছেড়ে যায়। পরিবারটির দাবি, এই অর্থ কখনও পরিশোধ বা নিষ্পত্তি করা হয়নি।

ফ্রান্সে মার্চ করছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় শিখ সৈন্যরা

ছবির উৎস, Hulton Archive/Getty Images

নথিপত্র এখনো যাচাই হওয়া বাকি

আপাতত ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ পরিবারটির দাবি মেনে নেয়নি। কারণ, পরিবারটির কাছে চাওয়া নথি ও তথ্য যাচাই করতে হবে।

তথ্য যাচাই করে ১৯১৭ সালে দেওয়া ৩৫,০০০ টাকা সংক্রান্ত নথিগুলো ব্রিটিশ সরকারের নথিপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

পরিবারটি অবশ্য এক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ এবং আরবিট্রেশনের পথেও হাঁটতে পারে বলে জানিয়েছে।

বিনয় রুঠিয়ার মতে, মূল নথিগুলো যাচাই হওয়ার পরেই পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা।

১০৯ বছরের পুরনো এই ঘটনায় পরিবারটি বর্তমানে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের তরফে অনুরোধ করা নথিগুলো সরবরাহ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।