Home LATEST NEWS BANGLA অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠবেন যেভাবে

অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠবেন যেভাবে

4
0

Source : BBC NEWS

ডোরাকাটা গোলাপি পাজামা পরা এক তরুণী বিছানায় শুয়ে আছেন। তিনি সদ্য ঘুম থেকে উঠেছেন এমন ভঙ্গিতে চোখ ঘষছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ঘুম থেকে ওঠার জন্য অ্যালার্ম সেটা করে রাখা – এটা আমাদের অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু এটা না করেও কি ঠিক সময়মতো ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করে ফেলা সম্ভব?

একসময় স্কুলজীবনের নিয়মিত রুটিন হয়তো একটি শরীরের ভেতর নির্ভরযোগ্য জৈবঘড়ি তৈরি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী জীবনে সময়সূচি আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠলে আমরা ঘড়ি বা ফোনের অ্যালার্মের শব্দের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারি।

সঠিক সময়ে নিজে থেকেই ঘুম থেকে ওঠার জন্য শরীরকে প্রশিক্ষিত করা সুস্থতার জন্য নানা উপকার বয়ে আনতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সকালে ঝিমুনি কমানো থেকে শুরু করে মেজাজের উন্নতি।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে এমন কিছু সহজ পরিবর্তন করা যায়, যা ঘুম থেকে ওঠাকে অনেক সহজ করে তুলতে পারে।

নিজের ছন্দ খুঁজে পাওয়া

শরীর ও মন ঠিকমতো কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর লক্ষ্য রাখা উচিত (ছয় ঘণ্টার কম ঘুম অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়)।

তবে সবার জন্য প্রযোজ্য এমন কোনো জাদুকরি সংখ্যা নেই এক্ষেত্রে।

“আট (ঘণ্টা) মাঝামাঝি একটি মান, কিন্তু কেউ সাত ঘণ্টাতেও ভালো থাকে, আবার কারও নয় ঘণ্টা প্রয়োজন হয়,” বলেন ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস ডালাসের সেন্টার ফর ব্রেইন হেলথের সহকারী অধ্যাপক এবং স্লিপ ইনোভেশন ল্যাবসের সহযোগী পরিচালক ইটি বেন সাইমন।

তিনি বলেন, ব্যক্তির সার্কাডিয়ান ছন্দের ((২৪ ঘণ্টার প্রাকৃতিক দেহঘড়ি) ওপর ভিত্তি করে কিছু জৈবিক পার্থক্য থাকবেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছুটি বা বিশ্রামের এমন একটি সপ্তাহ, যখন কোনো অ্যালার্ম সেট করতে হয় না, সেই সময়টা ঘুম থেকে ওঠার সময় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আদর্শ সুযোগ।

শুধু পর্যাপ্ত ঘুম নয়, নিয়মিত সময়সূচি মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের স্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান রিসার্চ ল্যাবের সহ-পরিচালক হেলেন বার্গেস বলেন, “আপনি যেন মোটামুটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান এবং সেটি এতটাই আগে হয় যে আপনার প্রয়োজনীয় আট ঘণ্টা ঘুম পূরণ করা সম্ভব হয়– সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”

“এই নিয়মিত রুটিনের প্রতিক্রিয়া শরীর পায় এবং প্রায়ই আমরা এই রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে গেলে শরীর নিজে থেকেই শিথিল হতে শুরু করে,” যুক্ত করেন তিনি।

পাজামা পরা একজন তরুণী বিছানায় শুয়ে বই পড়ছেন। তিনি চশমা পরেছেন এবং তার চুল বাঁধা

ছবির উৎস, Getty Images

আলো ও ঘুমের প্রস্তুতি

আপনার অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়িকে ঘুমের সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বেন সাইমন বলেন, আদর্শ অবস্থায় এই দুই ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে, যাতে আপনি “রাতে ক্লান্ত এবং দিনে সজাগ” থাকেন।

প্রাকৃতিক আলো ঘুম ও জেগে ওঠার সংকেত দেওয়া হরমোনগুলোকে সক্রিয় করে।

রিজেন্ট ইউনিভার্সিটি লন্ডনের সনদপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী, ঘুম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও গবেষক আনা জয়েস বলেন, “সার্কাডিয়ান ঘড়ির সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক হলো আলো।”

“এটি মেলাটোনিনকে বন্ধ হতে বলে এবং জানায় যে জেগে ওঠার সময় হয়েছে।”

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, উজ্জ্বল সকালের আলো উল্লেখযোগ্য অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এটি স্বাস্থ্যকর মাত্রায় সেরোটোনিন সরবরাহ করে।

রাতে ব্ল্যাকআউট পর্দা বা যে পর্দা আলো পুরোপুরি ঢেকে দেয় এবং আই মাস্ক ব্যবহার করা একটি ভালো শুরু হতে পারে।

এরপর সকালে ঘুম থেকে উঠেই পর্দা সরিয়ে আলো প্রবেশ করতে দিলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোন আমাদের সজাগ ও কর্মপ্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

“এটি ঘড়িকে বলে দেয়, ‘ঠিক আছে, এটাই আমার দিনের শুরু’,” বলেন বেন সাইমন।

একজন পুরুষ দাঁত ব্রাশ করার সময় আয়নায় তাকিয়ে আছেন। তিনি সাদা টি-শার্ট ও রুপালি রঙের একটি নেকলেস পরেছেন। তার টুথব্রাশ গোলাপি, আর পেছনের বাথরুমটি সাদা রঙের, যেখানে শাওয়ারের অংশে ধূসর টাইলস রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

জয়েস জোর দিয়ে আরও বলেন, আপনি যে সময়ে ঘুমিয়ে পড়তে চান তার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে থেকে একটি “সম্ভাব্য শান্ত হওয়ার রুটিন” থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

এটি কী হবে তা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। যেমন সন্ধ্যার ত্বক পরিচর্যা, দাঁত ব্রাশ করা বা আরামদায়ক পাজামা পরে নেওয়া।

আলোর তীব্রতা কমানোও অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি শরীরকে মেলাটোনিন উৎপাদনের সংকেত দেয় এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।

শরীরের তাপমাত্রার দিকেও খেয়াল রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

রাতে আমাদের মূল দেহতাপ কমে যায়, কারণ তখন আমরা কম শক্তি ব্যয় করি। শরীর রক্তনালীর প্রসারণের মাধ্যমে হাত ও পায়ের সাহায্যে অবশিষ্ট শক্তি বের করে দেয়।

এ কারণেই গরমে ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে বেশি কষ্ট হয়।

অতিরিক্ত গরমের কারণে যদি ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে ফ্যান বা এসি আরামদায়ক তাপমাত্রায় সেট করুন আগেই এবং তুলনামূলক হালকা পোশাক বা পাতলা চাদর ব্যবহার করার কথা ভাবতে পারেন।

ঘুমের বাধা

আমাদের অনেকের জন্যই ঘুমের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হলো স্মার্টফোন।

ডিভাইস থেকে নির্গত নীল আলো এর জন্য আংশিকভাবে দায়ী হতে পারে। এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিনের আলোর কাছাকাছি, ফলে রাতে এটি মস্তিষ্কে বিভ্রান্তিকর সংকেত পাঠাতে পারে।

তবে স্মার্টফোনের আরও বড় প্রভাব হতে পারে তথাকথিত ‘ডোপামিন স্ক্রলিং’। অর্থাৎ, ভালো লাগার ছোটো ছোটো অনুভূতির খোঁজে অভ্যাসবশত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিড স্ক্রল করা।

এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের বেশি সময় ধরে যুক্ত রাখতে তৈরি করা হয়েছে। তাই সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রলিং ঘুমে বাধা সৃষ্টি করে।

প্রযুক্তির ওপর এই অতিনির্ভরতা বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলে, কারণ তাদের বিকাশমান মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্য যেকোনো বয়সগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি ঘুমের প্রয়োজন হয়।

২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণে ৪৫ হাজার নরওয়েজীয় শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার সরাসরি খারাপ ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বেন সাইমন বলেন, “আমরা তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাতের একটি শক্তিশালী সম্পর্ক দেখি। আবার কারও যদি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতি কোনো প্রবণতা বা ঝুঁকি থাকে, তাহলে ঘুমের ঘাটতি তাকে সেই সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “তাদের অন্তত নয় ঘণ্টা ঘুম দরকার, কিন্তু প্রায় ৭০ শতাংশ এমনকি সাত ঘণ্টাও ঘুমায় না।”

একজন তরুণী সোফায় বসে তার গ্রেস্কেল মোডে থাকা ফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন

ছবির উৎস, Ally Hirshlag

এই বাধা কাটিয়ে উঠতে ঘুমানোর আগে অ্যাপ ব্যবহারে বাধা দেয় এমন কোনো অ্যাপ-ব্লকিং ডিভাইস ব্যবহার করা যেতে পারে।

এছাড়া, ফোনের অ্যাক্সেসিবিলিটি সেটিংসে গিয়ে গ্রেস্কেল মোড চালু করতে পারেন, যাতে ছবিগুলো আরও নিস্তেজ ও কম আকর্ষণীয় দেখায়।

আপনার বিপাকক্রিয়াও সার্কাডিয়ান ছন্দকে প্রভাবিত করে। তাই ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত করা, নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়া এবং ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা সহায়ক হতে পারে।

যতটা সম্ভব অ্যালকোহল পরিহার করার পরামর্শ দেন বার্গেস।

তিনি বলেন, “এটি হয়তো আপনাকে কিছুটা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করবে,” কিন্তু “পরবর্তী ঘুমকে বিঘ্নিত করে”, কারণ এটি ঘুমের এমন অবস্থাকে দমন করে যা যা মস্তিষ্ককে শেখার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে, স্মৃতি সঞ্চয় করতে ও পরিচালনা করতে সাহায্য করে।

সময়সূচি পরিবর্তন

দরজার ঘণ্টা থেকে জন্মদিন, কিংবা মানসিক চাপসহ জীবনের নানা ঘটনার ভিড়ে ধারাবাহিক ও সত্যিকার অর্থে আরামদায়ক ঘুম পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এই অভ্যাসগুলোর যেকোনোটি দৈনন্দিন রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করলে আরও আরামদায়ক রাত এবং সহজে ঘুম থেকে ওঠার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

তবে বার্গেস-এর ভাষায়, এটি ধীর একটি প্রক্রিয়া এবং ধৈর্য ধরে এগোতে হয়।

তিনি বলেন, “সার্কাডিয়ান ব্যবস্থা ধীরে পরিবর্তিত হয়। আমি বলব, ঘুমানোর সময় এবং জেগে ওঠার সময় উভয় ক্ষেত্রেই আধা ঘণ্টা করে পরিবর্তন দিয়ে শুরু করুন। প্রতিদিন আধা ঘণ্টা করে আগে আনুন, যতক্ষণ না কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছান। তারপর সেটি ধরে রাখার চেষ্টা করুন।”

আপনার ঘুমের সময়সূচি যদি এলোমেলো হয়ে থাকে এবং সেটি নতুন করে ঠিক করার কিছু সুযোগ যদি থাকে, তাহলে নিজের প্রতি সদয় থাকুন। নিজের স্বতন্ত্র ছন্দ খুঁজে পেতে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

বার্গেস বলেন, “ঘুমের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো– এটি কোনো অন-অফ সুইচ নয়।”

“এটি আসলে এভাবে কাজ করে না।”