Home LATEST NEWS BANGLA ‘রংপুরে ৪ জনকে খুন করে বাসায় বসেই খেজুর, শসা খেয়েছে খুনিরা’, বলছে...

‘রংপুরে ৪ জনকে খুন করে বাসায় বসেই খেজুর, শসা খেয়েছে খুনিরা’, বলছে পুলিশ

4
0

Source : BBC NEWS

পুলিশ দুই জনকে আটক করে বলেছে এরাই খুনের সাথে জড়িত

ছবির উৎস, SHARIER MIM

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরে জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্যকে খুনের সাথে জড়িত সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে একই এলাকা থেকে আটকের পর পুলিশ বলছে, তারা দুইজন হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছেন এবং তার আগে ওই বাড়ির ছাদে বসে মাদক সেবন করেছে।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, “ইয়াবা খাওয়ার আলামত পেয়েছি। খেজুরের বিচি পেয়েছি। ফ্রিজ থেকে বের করে শসা খেয়েছে তারও আলামত পেয়েছি। খুন শেষের পর তারা গোসল করে। আগুনে টেস্ট করা চুড়ি পেয়েছি। তখন মনে হয়েছে গোল্ডের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ জড়িত থাকতে পারে। এসব আলামত বিশ্লেষণ করে আমরা আসামি গ্রেফতারে সমর্থ হয়েছি”।

অন্যদিকে জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদের পর রংপুরের ডিবি ডিসি সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন যে, ওই শিক্ষক ও পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর তারা আরও ৬-৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতেই ছিল বলে তাদের কাছে স্বীকার করেছেন।

“ভোর রাতে সন্দেহভাজন দুজনকে আটকের পর তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তারা অকপট খুনের কথা স্বীকার করেছে। আমরা তাদের একসাথে ও আলাদা ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হয়েছি,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

রংপুর মহানগরের কোতোয়ালী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম নাজমুল কাদের জানিয়েছেন যে, এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন নিহত শিক্ষকের ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী।

মি. চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “আমি খবর পেয়ে গ্রাম থেকে এসেছি। মামলা করেছি। আশা করি সঠিক তদন্ত করে তারা (পুলিশ) বের করবে কী হয়েছে”।

এই বাড়িতেই খুন হয়েছেন গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের ৪ সদস্য

ছবির উৎস, SHARIER MIM

হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আরও যা জানা যাচ্ছে

শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের মোট চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।

অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসাবে কাজ করতেন।

মি. চক্রবর্তী দোতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। মৃতদেহগুলোতে পচন ধরে পুরো বাড়িতেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানিয়েছে।

সেখান থেকেই একে একে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী রংপুরের স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার তাদের সাথে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সবশেষ কথা হয়েছিল।

এরপর শনিবার রাত পর্যন্ত মোবাইল বন্ধ পেয়ে তারা ওই বাড়িতে এসে মেইন দরজা বন্ধ পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে তালা ভেঙ্গে ঘরের ভেতরে ঢুকে একের পর এক মরদেহগুলো উদ্ধার করে।

নিহত শিক্ষকের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “আমার ভাই খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তার কোনো শত্রু ছিল না। এভাবে কেন তাকে খুন করা হবে। আমরা চাই সঠিক তদন্ত করে সত্যিটা বের করা হোক”।

রংপুরের পুলিশ অবশ্য দাবি করছে, তারা ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছেন এবং ঘটনার সাথে জড়িত দুই জনকে আজ ভোরে আটক করেছেন।

রোববার বাড়ির সামনে স্থানীয়দের ভিড়

ছবির উৎস, SHARIER MIM

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, গণপতি চক্রবর্তী সম্মানিত মানুষ ছিলেন এবং কারও সাথে তাদের কোনো বিবাদ ছিলনা। তাকে ও পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তারা অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানান তিনি।

তিনি জানান, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে তারা আটক করেছেন এবং তারা পরস্পরের আত্মীয় ও একই এলাকার। এর মধ্যে একজন সেখানকার একটি স্বর্ণের দোকানের কারিগর হিসেবে কাজ করতেন।

“পাশের নির্মাণাধীন বাড়ির ভেতর দিয়ে ওনাদের (গণপতি চক্রবর্তীর) বাড়ির ছাদে এসেছিল দুজন। ওই ছাদে তারা ইয়াবা সেবন করে। এ সময় গণপতি স্যার শব্দ শুনে খালি গায়ে উপরে যান। তার ঘাড়ে গামছা ছিল। তিনি ওই দুজনকে চ্যালেঞ্জ করলে তারা স্যারের গলার গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন। তখন তিনি বাঁচার জন্য চেষ্টা করেন। এতে শব্দ হয়। শব্দ শুনে প্রীতিলতা চক্রবর্তী উপরে আসার চেষ্টা করেন। এ সময় ওই দুজন সিঁড়িতে গামছা পেঁচিয়ে সিঁড়ির মধ্যেই তাকেও হত্যা করে,” বলেছেন মি. মাবুদ।

তার বর্ণনা অনুযায়ী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে তাদের মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে আসলে ওই দুজন তাকেও রশি দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করে। এরপর প্রার্থীর ছোট ভাই ১২ বছর বয়েসি প্রিয়মকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিতে হত্যা করে ওই দুজন।

সংবাদ সম্মেলনে করে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ

ছবির উৎস, SHARIER MIM

“এরপর ছোটো ছেলের বাথরুমে গিয়ে তারা গোসল করে। পরে তাদের ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর খায়। সেখানে ইয়াবা সেবন করে। এসব আলামত আমরা পেয়েছি। এরমধ্যে সকাল হওয়ার পর তারা বেরিয়ে যাবার সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। জিনিসপত্র লুট করে জুমার নামাজের সময় তারা বেরিয়ে যায়,” বলছিলেন রংপুরের পুলিশ কমিশনার।

তিনি জানান, যাওয়ার সময় বাসার ভেতরের সবকিছু ওই দুজনই ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে যায়। বাসায় থাকা দুটি ফোন তারা ডিটারজেন্ট দিয়ে বালতিতে ভিজিয়ে রাখে।

“কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা সেখানকার মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে যায়। পরে তাদের দেখানো মতে এগুলো উদ্ধার করা হয়েছে”।

পুলিশ কমিশনার বলেন, টানা চারটি খুন করেও খুনিদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক এবং খুনের পর বাসার ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খেয়েছে তারা।

কিন্তু দুইজন ব্যক্তি একটি বাসার চার জনকে খুন করলো কিভাবে এমন প্রশ্নের উত্তরে রংপুরের ডিবি ডিসি সনাতন চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “তারা প্রথমে মাদক সেবন করেছে। এরপর একজন একজন করে খুন করেছে। আমরা দুজনকে একসাথে ও আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করে একই তথ্য পেয়েছি। ঘটনার পর ৬/৭ ঘণ্টা তারা ভেতরেই অবস্থান করেছে”।

পুলিশের এসব বর্ণনার বিষয়ে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, তাদের আশা পুলিশ সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আটক করবে।

“আমি ঘটনা শুনে মিঠাপুকুরে গ্রামের বাড়ি থেকে আসছি। কিছুই জানি না। এটা তো পুলিশই বলবে যে কেন ও কিভাবে ঘটনাটি হলো,” বলছিলেন তিনি।