Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Brent Lewin/Bloomberg via Getty Images
কানাডা গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা সর্বশেষ দফার শুল্কের পাল্টা জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
মঙ্গলবার কর্মকর্তারা জানান, এসব কানাডীয় শুল্ক প্রায় ২৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার (২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইস্পাত, আসবাবপত্র, তাজা টুনা মাছ এবং তুলার টি-শার্ট।
টার্গেট করা পণ্যের তালিকাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র যে সব কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর এটি দুই দেশের বাণিজ্য বিরোধে সর্বশেষ উত্তেজনা বাড়াল। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আলোচনার একেবারে শেষ মুহূর্তে অযৌক্তিক দাবি তোলার অভিযোগ করেছে।
ছবির উৎস, Reuters
অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন বলেছেন, শুক্রবার বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, তারই জবাবে কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপ করছে।
তিনি বলেন, “এসব শুল্ক আমাদের পুরো দেশের কানাডীয় শ্রমিক, ব্যবসা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর বাস্তব প্রভাব ফেলবে।”
শ্যাম্পেন কানাডার পাল্টা পদক্ষেপকে “সমানুপাতিক” এবং “কৌশলগত” হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শ্রমিকদের জন্য কানাডা অতিরিক্ত ৭.৫ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার সহায়তা দেবে। এসব সহায়তা কর্মী ছাঁটাই কমানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকতে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হবে।
ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করায় দুই দেশের সীমান্তের উভয় পাশেই অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা সরবরাহ শৃঙ্খল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সর্বশেষ শুল্ক ঘোষণার ফলে বাড়তি বাণিজ্য ব্যয়ের মুখে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সব আকারের ব্যবসা এবং সম্ভাব্য উচ্চ মূল্যের মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে।
বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে তাদের সরকারের কঠোর অবস্থান ধরে রাখার পক্ষে।
তবে বাণিজ্য আলোচনা ঠিক কী কারণে ভেস্তে গেল, তা নিয়ে এখনও কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা খসড়া চুক্তির পুরো লিখিত নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
এদিকে, কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ছবির উৎস, Getty Images
কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে বলেছে, সাম্প্রতিক বাণিজ্য আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে “পৃথিবীর যেকোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা” দিতে প্রস্তুত ছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, “অংশীদারিত্বের বদলে কানাডা অযৌক্তিক দাবি, পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে আসা এবং সরাসরি প্রত্যাখ্যানের পথ বেছে নিয়েছে।”
মঙ্গলবার ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ একাধিক পোস্টে কানাডার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, দেশটি কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকিয়ে আসছে এবং মার্কিন কৃষকদের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করছে।
ট্রাম্প লেখেন, “আমি অনেক দেশের সঙ্গে কাজ করি, আর কানাডাই সবচেয়ে কঠিন এবং অযৌক্তিক।”
“তারা নিজেদের অধিকারপ্রাপ্ত মনে করে, কিন্তু তারা কোনো অঙ্গরাজ্য নয় এবং আর কোনো বিশেষ সুবিধাও পাবে না!”
তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সীমান্তের গ্রেট লেকসের অন্যতম লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখা হতে পারে। তিনি লেখেন, “অন্টারিওর সঙ্গে আমরা আর খুব বেশি ব্যবসা করব বলে আশা করি না।”
ট্রাম্প এ সপ্তাহে হুমকি দেন যে পহেলা জানুয়ারি থেকে কানাডীয় গাড়ির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প কানাডার গাড়ি উৎপাদন, ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়াম শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পকে ‘ধ্বংস’ করতে চান।
সোমবার দুই দেশের নেতাদের বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যে উত্তেজনা চরমে উঠলেও মঙ্গলবার কিছু কর্মকর্তা তুলনামূলক কূটনৈতিক সুরে কথা বলেছেন। এর মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে ‘পরাজিত’ বলার পর অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড মঙ্গলবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, “পরিস্থিতি একটু উত্তপ্ত হয়ে গিয়েছিল।”
ফোর্ড বলেন, “কিন্তু আমি একটি চুক্তি চাই। এমন একটি ভালো চুক্তি, যা মার্কিন জনগণের জন্য ভালো হবে, আবার কানাডীয়দের জন্যও ভালো হবে।”
এই উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএ , এর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম জরুরি আলোচনার জন্য তাঁর অর্থমন্ত্রী মার্সেলো এব্রার্দকে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছেন।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
কোন কোন মার্কিন পণ্যে কানাডা শুল্ক বসাচ্ছে?
মঙ্গলবার কানাডা প্রায় ৯০০টি মার্কিন পণ্যের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যেগুলোর ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে।
তালিকায় রয়েছে:
- ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক, যেগুলোর ওপর আগে ২৫% পাল্টা শুল্ক প্রযোজ্য ছিল।
- প্রাকৃতিক মধু, আসবাবপত্র, পোশাক ও পরিধেয় সামগ্রী, প্রসাধনী ও সুগন্ধিসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর ৫০শতাংশ শুল্ক।
- ডিশওয়াশার ও ওয়াশিং মেশিনের মতো গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, পনিরসহ দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য, এবং নির্দিষ্ট কিছু ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক।
- ফর্কলিফট ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ নির্দিষ্ট ধরনের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক।
কানাডীয় কর্মকর্তারা বলেন, তারা এমন পণ্য বেছে নিয়েছেন যেগুলোর বিকল্প উৎস কানাডার ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে পারবে, যাতে দেশের অভ্যন্তরে ক্ষতি কমানো যায়।




