Home LATEST NEWS BANGLA ‘আমার বাচ্চা ফেরত দিন, না হলে উঠবো না’- পাকিস্তানে হাসপাতালে ১৪ নবজাতকের...

‘আমার বাচ্চা ফেরত দিন, না হলে উঠবো না’- পাকিস্তানে হাসপাতালে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু নিয়ে যা জানা যাচ্ছে

4
0

Source : BBC NEWS

দুই জন পুরুষ ও একজন নারী কাঁদছেন

ছবির উৎস, Reuters/Getty Images

Published

পড়ার সময়: ৬ মিনিট

সতর্কতা: এই প্রতিবেদনের কিছু বিবরণ পাঠকদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।

“আমার বাচ্চা আমাকে দিন, না হলে আমি এখান থেকে উঠব না। আমি এখানেই থাকব। কোথাও যাব না, আমার সন্তানকে আমাকে দিন…”

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থিত সরকারি হাসপাতাল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিআইএমএস)-এ অগ্নিকাণ্ডে ১৪ নবজাতকের মৃত্যুর পর শোকাবহ হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

হাসপাতালটির মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র ভবনের বাইরে মৃত শিশুদের বাবা-মা ও স্বজনদের বিপুল উপস্থিতি দেখা গেছে।

এই কেন্দ্রের বাইরেও অনেক মা রয়েছেন, যারা এই মর্মান্তিক ঘটনায় তাদের নবজাতক সন্তান হারিয়েছেন এবং শোকাহত অবস্থায় আছেন।

এমনই একজন মা, যিনি মাত্র দুদিন আগে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বাইরে মাটিতে বসে আছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলছেন, তার সন্তানকে তার কাছে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তিনি এখান থেকে যাবেন না।

একইভাবে, এক বাবা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটি কথাই বলছিলেন, “আমার সন্তানের মরদেহটা শুধু আমাকে দিন।”

সেখানে উপস্থিত অনেক বাবা-মা ও স্বজনকে হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা ও কর্মীদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ করতে দেখা গেছে।

এছাড়া কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও অভিভাবক দাবি করেছেন, ঘটনার সময় প্রসূতি ওয়ার্ডে কোনো কর্মী উপস্থিত ছিলেন না এবং এর প্রবেশদ্বারটিও বন্ধ ছিল।

তবে হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক রানা ইমরান সিকান্দার বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাৎক্ষণিকভাবে ফেডারেল স্বাস্থ্যসচিব আসলাম গৌরীকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করেছেন এবং ঘটনাটির তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।

একজন নারী কাঁদছেন এবং দুই নারী তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। পেছনে একজন পুরুষ

নিহত শিশুদের একজনের বাবা রয়টার্সকে বলেন, তিনি গত আট দিন ধরে ওই ওয়ার্ডে আসা-যাওয়া করছিলেন এবং সেখানে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক।

“এই ভবনে কোনো অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না, যথাযথ জরুরি নির্গমন পথও ছিল না। সব দরজাই বন্ধ ছিল। শুধু একটি দরজা দিয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের দেখতে যেতে পারতাম। বাকি দরজাগুলো তালাবদ্ধ রাখা হতো, কারণ তারা আশঙ্কা করত আমরা বারবার সন্তানদের দেখতে যাব।”

বুধবার বিকেলেও পিআইএমএস হাসপাতালের প্রবেশপথ ও ভেতরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্যকে টহল দিতে দেখা যায়। অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর গাড়িগুলো হাসপাতালের আশপাশে অবস্থান করছিল।

মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভাঙা কাচ ও মাস্ক ফুটপাতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

বিবিসি প্রসূতি ওয়ার্ডের বাইরে এমন সব পরিবারের সদস্যদের দেখেছে, যারা তাদের নবজাতক সন্তান হারিয়ে কান্নাকাটি করছিলেন। একজন ব্যক্তি আমাদের বলেন, তিন দিন আগে জন্ম নেওয়া তার সন্তানও এই ঘটনায় মারা গেছে।

আগুন লাগার সময় হাফসা ওয়ালিদ তার ননদের সঙ্গে পাশের একটি ওয়ার্ডে ছিলেন, যেখানে সম্প্রতি সিজারিয়ান করানো নারীদের রাখা হয়। তার ননদ দুই দিন আগে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল প্রায় ছয়টার দিকে তিনি কারও চিৎকার শুনতে পান এবং প্রথমে ভেবেছিলেন হাসপাতালে কেউ মারা গেছেন। কিন্তু অল্প পরেই তিনি প্রসূতি ওয়ার্ডের ভেতরে ধোঁয়া দেখতে পান।

পরিস্থিতি দেখে তিনি নবজাতক কন্যাকে কোলে নিয়ে ওয়ার্ড থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসেন।

পিআইএমএস হাসপাতাল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সেই ওয়ার্ডে ১৫ জন নবজাতক ভর্তি ছিল, যার মধ্যে মাত্র একজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।

একজন পুরুষকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন আরেকজন

ছবির উৎস, Reuters

‘ভেতরে প্রচুর ধোঁয়া ছিল, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না’

হাসপাতালে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী আলমজেব খান বিবিসি উর্দুকে বলেন, তিনি হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডের বাইরে লনের একটি প্রবেশপথে ঘুমিয়ে ছিলেন।

“হইচই শুরু হলে আমি উঠে ভেতরে (প্রসূতি ওয়ার্ড) যাই। সেখানে প্রচুর ধোঁয়া ছিল এবং কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। বিশৃঙ্খলার মধ্যে সবাই নিজেদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। নারীরা বেরিয়ে আসার জন্য একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছিলেন। আমি আমার পরিবারের নারীদের বের করে এনে বাইরে বসাই এবং আবার ভেতরে যাই। চারদিকে শুধু ধোঁয়াই ছিল। আমি পুড়ে যাওয়া দুটি শিশুকে দেখেছি, যাদের কোলে করে বাইরে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের বাবারা।”

আলমজেবের মতে, ঘটনাটি সকাল ছয়টা বা সাড়ে ছয়টার দিকে ঘটে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মা ও শিশু কেন্দ্র ভবনের বাইরের লনে শিশুদের স্বজন ও মায়েদের বিপুল উপস্থিতি ছিল।

তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই হাসপাতাল প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে পৌঁছেছিলেন, তবে পুলিশ পৌঁছায় আধা ঘণ্টা পরে। আর অ্যাম্বুলেন্স ও অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে এসে পৌঁছায়।

একজন নারী বলেন, তার মেয়ে দুই দিন আগে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “আমার নবজাতক নাতি পরশু দিন থেকেই সেখানে ছিল। গত রাতে চারটার দিকে আমি ও আমার মেয়ে তাকে দেখতে শিশু যত্ন কেন্দ্রে গিয়েছিলাম, তারপর প্রসূতি ওয়ার্ডে ফিরে আসি। কিছুক্ষণ পরে আমরা এক নারীর চিৎকার শুনতে পাই। ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে দেখি ভেতরে আগুন লেগেছে। শিশু যত্ন কেন্দ্রের প্রবেশদ্বার বন্ধ ছিল। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি দরজাটি ভাঙার, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।”

হাসপাতালের ভাঙা দুটি জানালা দিয়ে বাইরে কাচের গুঁড়ো ফেলছেন দুই জন কর্মী

ছবির উৎস, Reuters

তিনি দাবি করেন, “নার্সিং স্টেশনে কোনো নার্স ছিলেন না এবং সেখানে একজন কর্মীও উপস্থিত ছিলেন না।”

নিহত শিশুটির দাদি বলেন, “আমার শুধু একটি প্রশ্ন, তখন কর্মীরা কোথায় ছিলেন?”

আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসি উর্দুকে বলেন, তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রটির কাছে ছিলেন। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে শব্দ শুনে তিনি আক্রান্ত ভবনের দিকে দৌড়ে যান।

তার মতে, তার এক আত্মীয় পিআইএমএসে ভর্তি আছেন এবং সে কারণেই তিনি হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, আগুন লাগার পর তিনি এবং অন্যান্যরা ভবন থেকে মানুষজনকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। একই সময়ে একজন নারী একটি শিশুকে কোলে নিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসেন এবং কিছুক্ষণ পর উদ্ধারকর্মীরা সেখানে পৌঁছে যান।

মর্গের বাইরে ভিড়

ছবির উৎস, EPA/Shutterstock

অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (পিআইএমএস) দেশটির বৃহত্তম সরকারি হাসপাতালগুলোর একটি। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি ইসলামাবাদ এবং পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের আশপাশের শহরগুলোর রোগীদের সেবা দিয়ে থাকে।

দুই ডজনেরও বেশি চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ইউনিট নিয়ে হাসপাতালটিতে ১,২০০ শয্যা এবং ৫,০০০ বহির্বিভাগীয় রোগী সামলানোর সক্ষমতা রয়েছে।

এখানে একটি নিবেদিত শিশু হাসপাতালও রয়েছে, যেখানে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসা সেবা এবং স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

হাসপাতালটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এর মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য ইউনিটে ১৫৬টি শয্যা রয়েছে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালের তৃতীয় তলায় অবস্থিত এমসিএইচ ওয়ার্ডে আগুন লাগে।

পিআইএমএস হাসপাতালের একজন মুখপাত্রের মতে, প্রসূতি ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল এবং সেখানে থাকা অক্সিজেন সংযোগের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুস্তাফা কামাল স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম জিও নিউজকে বলেছেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ওয়ার্ডে থাকা শিশুরা হয় ইনকিউবেটরে ছিল, নয়তো অক্সিজেন সরঞ্জামের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।

দ্য ডন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসপাতালের একজন মুখপাত্র বলেছেন, যে নবজাতকটি বেঁচে গেছে তাকে একজন চিকিৎসক উদ্ধার করেছিলেন।

হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ইমরান সিকান্দার পরিবারবারগুলোর অভিযোগের জবাবে বিবিসিকে বলেন, প্রসূতি ওয়ার্ডের দরজা তালাবদ্ধ ছিল না এবং সেখানে কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।

তার মতে, অতীতে সরকারি হাসপাতালে শিশু চুরির ঘটনা ঘটেছে। সে কারণে ওয়ার্ড থেকে শিশু চুরি প্রতিরোধে কঠোর প্রবেশবিধি চালু করা হয়েছিল।

ইমরান সিকান্দার স্পষ্ট করেন যে, হাসপাতালের ভেতরে আগুন নেভানোর জন্য পানির সরবরাহ ছিল না, তবে সেখানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা ছিল।

তার মতে, আজ সকালে আগুন নেভানোর প্রচেষ্টায় ২৪টি অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়েছে।

ইসলামাবাদ জেলা প্রশাসন বলছে, পিআইএসএস হাসপাতালের মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ডের তৃতীয় তলায় আগুন লাগে, যাতে মোট ১৪টি শিশু সম্পূর্ণভাবে দগ্ধ হয়েছে।

ভাঙা কাচের টুকরা ছড়িয়ে আছে মেঝেতে

ইসলামাবাদের ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (সিডিএ) বা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে তারা হাসপাতালে আগুন লাগার জরুরি বার্তা পায়। এর পর সাত মিনিটের মধ্যে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ক্যাপিটাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস এবং সিডিএ ফায়ার ডিপার্টমেন্ট দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

সিডিএ জানায়, আগুন লাগার কারণ নির্ধারণ, উদ্ধার কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং হাসপাতালে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার জেনারেল ইসলামাবাদের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, স্থানীয় পুলিশ বলছে, যেসব পরিবারের শিশু এই ঘটনায় মারা গেছে তারা ঘটনাস্থল ছাড়তে রাজি নয়।

পুলিশের মতে, নিহত শিশুদের পরিবার তাদের নবজাতকদের মরদেহ ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

তারা বলছে, প্রসূতি ওয়ার্ডে আগুনের তীব্রতা অত্যন্ত বেশি ছিল এবং ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মৃত শিশুদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

পুলিশের মতে, ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পরই এই ঘটনায় নিহত শিশুদের মরদেহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হবে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই ঘটনায় কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিশুদের সঙ্গে এমন ঘটনা অপূরণীয় ক্ষতি।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যে ঘটনার কারণগুলোর বিস্তারিত পর্যালোচনা করতে হবে, দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

হাসপাতালের বাইরে নিরাপত্তাকর্মীরা দাঁড়িয়ে আছেন