Home LATEST NEWS BANGLA মক্কা চুক্তি কী ও বাংলাদেশ কেন এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে?

মক্কা চুক্তি কী ও বাংলাদেশ কেন এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে?

3
0

Source : BBC NEWS

গত ৭ই অগাস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সাক্ষরিত হয় মক্কা প্যাক্ট

ছবির উৎস, TUR Presidency /Murat Cetinmuhurdar/Anadolu via Getty Images

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত সাতই অগাস্ট চুক্তিতে সই করেছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

মুসলমানদের পবিত্র শহর মক্কায় এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি এর তাৎপর্য নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ-ই এই তিনটি দেশ এই ধরনের চুক্তিতে একমত হয়নি। ২০২৩ সালে গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষিতেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পারিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সাক্ষর করেছিল। তারই ধারাবাহিকতাই এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি।

এই চুক্তি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।

তবে, এই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়া নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের বক্তব্যই পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশে যুক্ত হলে তা সামরিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে”।

তবে, এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

তুরস্কের রেচেপ তাইপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের শাহবাজ শরিফ মক্কায় চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কি?

গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নানা সংকট চলছে। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এই পরিস্থিতিতে আরো জটিল করে তোলে।

এমন অবস্থায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। কেননা, এই চুক্তিতে বলা হয়েছে জোটভুক্ত কোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে তা সকল দেশের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে।

গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো সবাই এখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার পথ খুঁজছে। তারই ধারাবাহিকতা এই মক্কা প্যাক্ট”।

এই জোট গঠনের অন্যতম লক্ষ হলো- চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্যদেশ তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ এই চুক্তি বা জোটভুক্ত দেশগুলো একীভূত হয়ে তারা তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একত্রে কাজে লাগবে।

এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই চুক্তিতে একই সঙ্গে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অঞ্চল ও তার বাইরের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে, কোনো এক দেশ বিপদে পড়লে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা কিংবা আক্রান্ত হলে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটি নির্ধারিত হয়নি চুক্তিতে।

এক দেশ আক্রমণের শিকার হলে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশের এগিয়ে আসার বিষয়টিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নেটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌথ প্রতিরক্ষা ধারার সঙ্গে ‘কার্যত একই’ বলে বর্ণনা করেছেন।

কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, যতক্ষণ না এটি বাস্তবে পরীক্ষিত হচ্ছে, উদাহরণস্বরূপ- সৌদি আরবের ওপর যেকোনো আক্রমণের জবাবে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে—ততক্ষণ পর্যন্ত এই চুক্তিটিকে একটি বাধ্যতামূলক নেটো-ধাঁচের অঙ্গীকারের পরিবর্তে একটি ‘অভিপ্রায়ের ঘোষণা’ হিসেবে দেখা উচিত।

চলতি বছরের ১৯শে মার্চ ইসলামি সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের রিয়াদে তুরস্ক-পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন।

সেখানে একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি কী রকম হতে পারে সেটি নিয়েও আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত সাতই অগাস্ট এই চুক্তিটি সাক্ষর হয়েছে মক্কায়।

এই চুক্তি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান বলেছেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু এই তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়, বরং আরও বিস্তৃত হওয়া এবং সম্ভব হলে এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি করা, যাতে একদিন এই অঞ্চলের সব দেশ এই ছাতার নিচে একত্রিত হতে পারে।”

গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (ডানদিকে) এবং শাহবাজ শরিফ একটি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন

ছবির উৎস, Reuters

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণ কী?

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান এবং মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে তুরস্ক। হঠাৎ কেন এই তিনটি দেশ এমন একটি চুক্তিকে যুক্ত হলো সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হামলা নিয়ে নানা উদ্বেগ রয়েছে গত কয়েক মাস ধরে।

বিশেষ করে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করার কথা বলে ইসরায়েল দেশটির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা দখলে নিয়েছে। এদিকে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে, এসব গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক শক্তির দিক থেকে তুরস্ক অনেকটা এগিয়ে রয়েছে, শীর্ষ তেল রফতানিকারক দেশ সৌদি আরব এবং পাকিস্তান বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সেদিক থেকে তিন দেশ একে অপরের পরিপূরক।

অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা যদি দেখি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের শত্রুদের মধ্যে রয়েছে ইরান কিংবা হুথির মতো বিদ্রোহীরা। কারণ এই জটিলতা শেষ না হলে হুথি জটিলতা শেষ হবে না। সুতরাং সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্যাক্টটা খুব জরুরি ছিল”।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ধরা হয় ইসরায়েলকে। সেই দিক থেকে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের দেশ দুটিকে একসাথে পেলে সেটি তুরস্কের জন্যও লাভবান বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

গবেষক আলতাফ পারভেজ বলছিলেন, “সৌদি আরবের অর্থ, পাকিস্তানের সামরিক কৌশল ও অভিজ্ঞতা আর তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের দক্ষতা। এই দেশগুলো ভেবেছে তারা তিনটি দেশ যদি একত্রিত হয়, সেটি তাদের নিরাপত্তার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ”।

অন্যদিকে, ধর্মীয় দিক থেকেও এই চুক্তির বিশেষ একটি তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই চুক্তিকে মুসলিম দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরতে বার হিসেবে শুক্রবার এবং স্থান হিসেবে মক্কাকে বাছাই করা হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গেথে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত

ছবির উৎস, Ministry of Foreign Affairs, Bangladesh

বাংলাদেশ কেন যুক্ত হতে চায়?

অগাস্টের শুরুতে তিন দেশের মধ্যে এই চুক্তি সই হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে এই চুক্তিকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে আসছে।

বাংলাদেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমে গত সপ্তাহে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এটির জবাব দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সেখানে এই জোটে বা চুক্তি যেতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও জানান তিনি।

সেখানে মি. কবির বলেছেন, “মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মিডল ইস্টে যদি এমনও হয় যে ইসলামিক নেশনসদের মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে ওখানে তো আর অস্বাভাবিক না যাওয়া। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব একটা নেই। সেদিক থেকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি আর তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ও কৌশল আছে। সেদিক থেকে ওই তিন দেশ সাথে একসাথে থাকলে তাতে বাংলাদেশই উপকৃত হবে।

অধ্যাপক খান বলছিলেন, “আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। যেহেতু বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাচ্ছে। সেদিক বিবেচনায় পাকিস্তান-তুরস্ক ও চীন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ”।

যদিও ইতিবাচক দিকও যেমন আছে, সেই সঙ্গে এর ঝুঁকির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকরা ।

আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যখনই যুক্ত হবে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। যেটি একদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবেও দেখছেন তিনি।

মি. পারভেজ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “এটার তাৎক্ষণিক একটি প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। কারণ তখন ভারত ভাব পারে সে অনিরাপদ। তখনই সে ইসরায়েলে শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে তখন ভারতকে সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে ইসরায়েল। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হতে পারে সামরিক উত্তেজনা”।

“এ উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ওয়ার এবং প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে ঝুঁকলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না ঝুঁকলেও থাকবে আরেক ধরনের ঝুঁকি”।

মিসরও অনানুষ্ঠানিক এই জোটে যোগ দিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, মিসর সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, কারণ এতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেই দেশগুলোর মধ্যে ইরান, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতও রয়েছে।