Home LATEST NEWS BANGLA বাংলাদেশে সার সংকট আছে নাকি নেই?

বাংলাদেশে সার সংকট আছে নাকি নেই?

4
0

Source : BBC NEWS

একজন কৃষক একটি গামলা থেকে সবুজ ফসলের ক্ষেতে সার ছিটাচ্ছেন

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

“পাঁচ বিঘা জমিতে সার লাগবে পাঁচটা, দেয় একটা। লাগবে সকালে, দেয় দুপুরে। এই ভাবে খেত করতে পারবে কেউ?”

বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক তোরাপ শেখ।

আমন মৌসুম সামনে রেখে যখন কৃষকের সারের চাহিদা বাড়ছে, তখন দেশজুড়ে অতি প্রয়োজনীয় এই কৃষি পণ্য নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে।

চাহিদা মতো সার না পেয়ে কুড়িগ্রামে একটি ডিলার গোডাউন ভেঙে সার লুটপাট করার ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি করেছিল।

অনেক কৃষকের অভিযোগ, সার থাকার পরও কৃত্রিম সংকট দেখাচ্ছে ডিলাররা। ফলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে খুচরা দোকান থেকে সার কিনতে হচ্ছে তাদের।

“খুচরা দোকানে সার মেলে, কিন্তু বস্তার ওপর দুইশ থেকে পাঁচশ টাকা করে বেশি নেয়। প্রয়োজন মিটাতে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতি হচ্ছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ঝিনাইদহের কৃষক মোহাম্মদ জনি।

ডিলাররা অবশ্য বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় তারাও রয়েছেন চাপের মধ্যে।

“আগের তুলনায় আমরা সার পাচ্ছি কম, কৃষক চাহিদা বেশি। এ মাসে আমি টিএসপি পেলাম ৬০ বস্তা, ডিএপি পেলাম বিএডিসি ৬০ বস্তা, আর বাংলা ৭০ বস্তা, পটাস ৮০ বস্তা। ইউরিয়া আছে, বাকিগুলা সংকট,” বিবিসি বাংলাকে বলেন রাজশাহীর একজন সারের ডিলার।

সার নিয়ে এই যখন মাঠের বাস্তবতা, তখন ‘সংকট নেই’ বলে দাবি সরকারের। বরং চাহিদা অনুযায়ী মজুদ পর্যাপ্ত বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা।

তিনি বলছেন, এ বছর সার বিপণন ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন আনছে সরকার, যার সাময়িক প্রভাব পড়েছে কৃষক পর্যায়ে।

কিন্তু সরকারের এই দাবি যৌক্তিক নয় বলেই মত কৃষি অর্থনীতিবিদদের। তাদের কেউ কেউ বলছেন, মজুদ আছে, কিন্তু কৃষক ভোগান্তিতে- এই যুক্তি মেলে না।

বরং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন খাতের মতো কৃষি বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় একধরনের পরিবর্তন বা পালাবদল দেখছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, সার বিপণন পর্যায়ে নতুন মুখ বা চক্রের আবির্ভাব, আমন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে কি না সেটিও সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত।

সবুজ ফসলের জমিতে সার ছিটাচ্ছেন একজন কৃষক, তার মুখে সাদা দাঁড়ি এবং মাথায় লাল ও সবুজ ডোরাকাটা গামছা

ছবির উৎস, Getty Images

সরকারি তথ্যে পর্যাপ্ত মজুদ

চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা না থাকায় প্রতি বছরই সারের চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয় বাংলাদেশকে।

তারপরও যতটুকু উৎপাদন সক্ষমতা আছে, সেটিও মিলছে না। কারণ গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি আর কাঁচামাল সংকটে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলো বছরের বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা বিসিআইসি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সারের মোট চাহিদার প্রায় ৮৩ শতাংশ আমদানি করতে হয়েছিল।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে এবং মোট চাহিদার প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন-ই লাগে ইউরিয়া সার।

আমন মৌসুমের শুরুতে গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সার নিয়ে অস্থিরতার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও ডিলারের গুদাম থেকে সার লুট হয়েছে, আবার অনেক জায়গায় বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

তবে, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সারের সংকট নেই, মজুদ পর্যাপ্ত।

মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন যে, দেশে বর্তমানে মোট ১৩ দশমিক ৬৫ লাখ মেট্রিক টন সার মজুদ রয়েছে।

এছাড়া ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে প্রচুর সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

“ইউরিয়া চার দশমিক ৮২২ লাখ মেট্রিক টন, টিএসপি তিন দশমিক ৬৯, ডিএপি ৩ দশমিক ৬৮ এবং এমওপি এক দশমিক ৪৬ লাখ মেট্রিক টন মজুদ রয়েছে,” বলেন মি. রহমান।

চাহিদা মতো সার সরবরাহ না পাওয়ার দাবি করছেন ডিলাররা

ছবির উৎস, Anadolu Agency via Getty Images

এছাড়া দুই লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি, দুই লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি এবং তিন লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি আমদানি পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অবশ্য, সার বিতরণে কিছুটা অনিয়ম রয়েছে বলেও স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলছেন, “সরকার কৃষক ও জনগণের স্বার্থে বিতরণব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।”

উপদেষ্টা বলেন, “২৪শে অগাস্ট সরকারি ক্রয় কমিটির বৈঠকে তিন লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর এক সপ্তাহ আগে কানাডা, রাশিয়া এবং সৌদি আরব থেকে আরও এক লাখ ১৫ হাজার টন অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।”

এছাড়া সার উত্তোলন এবং বিতরণের বিষয়ে ডিলারদেরকে সতর্ক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, সার উত্তোলন, বিতরণ ও ডিলার নিয়োগ সংক্রান্ত কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে তিন সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

ওই কমিটির সদস্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বুধবার একটি অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন যে, সারের বিদ্যমান ডিলারশিপ বাতিল না করে বরং ডিলারদের কমিশন বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে সরকার।

এদিকে, বাংলাদেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই, বরং সার নিয়ে যতটা না বাস্তব সংকট, তার চেয়ে বেশি রটনা হচ্ছে বলে বুধবার লালমনিরহাটে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, যিনি সার সংক্রান্ত ওই মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্য।

সার বিতরণ ব্যবস্থা গতিশীল করতে প্রতিটি ইউনিয়নে আরও একজন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

মাথায় করে সারের বস্তা নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন শ্রমিক

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

বিতরণে সমস্যা, যৌক্তিক নয়

সরকার বলছে, সারের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তাহলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সারের দাম এবং প্রাপ্যতা নিয়ে অস্থিরতা কেন– এই প্রশ্ন তুলেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

সার বিপণন ব্যবস্থা নিয়ে যে সমস্যার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সেটিও যৌক্তিক নয় বলেই মত তাদের।

তাদের মতে, সরকারিভাবে প্রতি বছর যে প্রক্রিয়ায় সার সরবরাহ ও বিপণন করা হয়, সেটি নতুন কোনো ব্যবস্থা নয় যে হঠাৎই ভেঙে পড়বে।

সারের মজুদে ঘাটতি থাকার প্রভাব-ই মাঠ পর্যায়ে পড়ছে বলেই মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান।

“আমন মৌসুম মাত্র শুরু হলো, আমাদের তো আরও দেড় থেকে দুই মাস সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন হবে। কিন্তু সেই অবস্থায় এখনই যদি এমন হয় তাহলে তো মুশকিল,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

সার সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে কদিন আগের জ্বালানি তেল সংকটের মিল দেখছেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ।

তিনি বলছেন, “আমাদের জ্বালানি তেলের যে অবস্থা হয়েছিল, এইটা সেইম। সরকার বলতেছে কোনো ঘাটতি নাই কিন্তু পাম্পে আমরা তেল পেলাম না।”

প্রয়োজনের তুলনায় সার সরবরাহ অপ্রতুল, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলেই মনে করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল।

বর্তমানে কৃষিকাজে রাসায়নিক সার ব্যপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে

ছবির উৎস, Anadolu Agency via Getty Images

কিন্তু যতটুকু সার এখনো দেশে রয়েছে তার বিতরণ বা ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে হচ্ছে না বলেই মনে করেন তিনি।

“ধরে নিলাম সার কম আছে, কিন্তু যতটা আছে সেটা মাঠে যাচ্ছে না কেন? কুড়িগ্রামে যে সার গোডাউন ভেঙে নেওয়া হলো, সার পেলে তো আর সেটা হয় না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ডিলারশিপসহ সারা দেশে সার বিপণন ব্যবস্থায় নতুন সিন্ডিকেটের আবির্ভাব ঘটেছে বলেও মনে করে কৃষি অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ।

“আগে একটা গ্রুপ মধ্যসত্ত্বভোগী ছিল, এখন নতুন একটি গ্রুপ এখানে ঢুকেছে। তারা নতুন মৌসুমটিকে বেছে নিয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার” বলেই মনে করেন মি. মণ্ডল।

এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সাধারণ কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করে বলেই মনে করেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ।

“এখন একটা পিক সময়। সার যদি সঠিক সময়ে না পায় তাহলে একটা শঙ্কা কাজ করবে কৃষকদের মধ্যে। ফলে অনেক কৃষকের মধ্যে ভবিষ্যতের জন্য সার মজুদ করার একটি প্রবণতা তৈরি হতে পারে,” বলেও মনে করেন মি. মণ্ডল।

এক্ষেত্রে দেশে সারের মজুদ কত রয়েছে এবং এলাকাভেদে কত সার দেওয়া হচ্ছে সেটি স্বচ্ছভাবে ঘোষণা দেওয়া উচিত বলেই মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

বিবিসি বাংলাকে মি. মণ্ডল বলছেন, “কোন উপজেলায় কত বরাদ্দ আছে সেটা যখন জানবে সবাই এবং সেই অনুযায়ী সরবরাহ করা হবে, তাহলে ডিলার পর্যায়ে বা যে-কোনো পর্যায়ে মজুদের অভিযোগ উঠবে না।”