Home LATEST NEWS BANGLA কনসার্ট-নৌকাবাইচে বাধার অভিযোগ, সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

কনসার্ট-নৌকাবাইচে বাধার অভিযোগ, সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

4
0

Source : BBC NEWS

নৌকাবাইচে অংশ নিচ্ছে দুটি নৌকা। একটি নৌকায় দাঁড় বাইছেন হলুদ পোশাক পরা অনেক মানুষ। অন্যটিতে কয়েকজন নীল ও সাদা পোশাক পরে দাঁড় বাইছেন, আর কারো শরীরের ওপরের অংশ খালি।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও সিলেটে কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধার অভিযোগ ওঠার পর এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বাধার মুখে একের পর এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনা ঘটেছিল।

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইনসে ঢুকে পুলিশের আয়োজিত অনুষ্ঠানে হামলা, কিশোরগঞ্জে কয়েকটি ব্যান্ডের একটি কনসার্ট স্থগিত করা এবং সিলেটের বিয়ানিবাজারে নৌকা বাইচ আয়োজনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বর্তমান সরকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে বাধা দূর করতে কতটা সক্রিয় সেই প্রশ্ন উঠছে।

এর মধ্যে “ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গান-বাজনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে” এমন বক্তব্য দেওয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি’র মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানারে শুক্রবার রাতভর বিক্ষোভ মিছিল হয়। এ প্রেক্ষাপটে শনিবার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় দুঃখ প্রকাশ করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের কনসার্ট বন্ধ হওয়ার খবর প্রকাশ হওয়ার পর ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজেই বলেছিলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটাই এমন যে গান-বাজনা-সিনেমা বহু বছর যাবত প্রায় নিষিদ্ধের মতো এলাকা। ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা। পরিবেশ বিবেচনায় যেখানে যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেই ব্যবস্থা নিয়েছি”।

সাংস্কৃতিক সংগঠন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজীদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে বাধা আসার পরেও কর্তৃপক্ষের নিরবতার কারণে দেশজুড়ে সংস্কৃতিকর্মীরাই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন।

যদিও তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে, দেশের কিছু জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিলের ঘটনাকে সরকারের ‘সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডবিরোধী অবস্থান’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

একই অনুষ্ঠোনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, “বিভিন্ন কারণেই কোনো অনুষ্ঠান বাতিল হতে পারে। সব ক্ষেত্রে কোনো গোষ্ঠীর আপত্তিই একমাত্র কারণ- এভাবে দেখার সুযোগ নেই”।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরিন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ধর্মীয় আধিপত্যবাদী কিছু গোষ্ঠী সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে, তার বিরুদ্ধে সরকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে তো দেখা যাচ্ছে না।

কয়েকজন নারী নাচের ভঙ্গীতে। তাদের পোশাকে হলুেদ রঙের প্রাধান্য

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

সম্প্রতি যা যা ঘটেছে

গত ১৮ই অগাস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইনসের ভেতরে জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি কনসার্টে হামলার ঘটনা ঘটে। এই হামলায় কিছু মাদ্রাসা শিক্ষার্থী জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে। সেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী আহতও হন।

জেলার কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন- কওমি ঐক্য পরিষদের মুখপাত্র আব্দুল খালেক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা কোনো ‘অপসংস্কৃতির চর্চা’ হতে দেবেন না।

“মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সেখানে হামলা করেনি। গভীর রাতে গান বাজানো হচ্ছিল, সেটা বন্ধ করতে বলায় তারা শিশুদের ওপর হামলা করেছিল,” বলছিলেন তিনি।

ওই ঘটনার পর ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মন্তব্যের জের ধরে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেন কুমিল্লা-৪ আসনের এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ।

তিনি বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, নৌকাবাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না”।

তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ বিক্ষোভ মিছিল করে এবং সেখানে হাসনাত আবদুল্লাহকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে দেওয়া হবে না।

এমন প্রেক্ষাপটে শনিবার নিজের ভেরিফায়েড পাতায় হাসনাত আব্দুল্লাহ লিখেছেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি চেয়ে সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম, তাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করছি”।

তিনি তার পোস্টে লিখেছেন, “এই বাংলাদেশ সবার—এই বাংলাদেশে মসজিদ থাকবে, মন্দির থাকবে, সঙ্গীত থাকবে, ওয়াজ থাকবে, মাজার থাকবে, কনসার্ট হবে, মাহফিল হবে, রথযাত্রা হবে, সিনেমা উৎসব হবে, আবার বিজ্ঞ আলেমদের আলোচনাও হবে। সকল ধর্মের, মতের মিলনস্থল আমার এই বাংলাদেশ। যার যেটা পছন্দ হবে, সে সেটায় যাবে, অংশ নেবে, যার যেটা পছন্দ হবে না, সে সেটায় যাবে না। আর সরকার এইটুকু নিশ্চিত করবে, কেউ যেন আরেকজনের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, এমন কিছু করতে না পারে। আজকে সরকার সেই নিরাপত্তা দিতে পারছে না, এবং তার ফলে সমতার যে বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাচ্ছি, তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে”।

এর আগে গত ১৯শে অগাস্ট কিশোরগঞ্জের পুরোনো স্টেডিয়ামে কয়েকটি ব্যান্ডের একটি কনসার্ট স্থগিত করেছিল স্থানীয় প্রশাসন। কনসার্টটি বন্ধের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া স্মারকলিপি পাঠায় ‘ইমাম-উলামা পরিষদ, কিশোরগঞ্জ সদর শাখা’।

ওদিকে সিলেটের বিয়ানীবাজারের উপজেলার সুনাই নদীতে নৌকাবাইচের আয়োজন বন্ধের দাবি করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার শুরু করেছিল ‘তৌহিদী জনতার’ পরিচয়ধারী একটি গোষ্ঠী। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই শুক্রবার শেষ পর্যন্ত নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। নৌকাবাইচের সময় ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায় বলেও খবরগুলোতে জানানো হয়।

ওই নৌকাবাইচ অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী বলেছেন, প্রতিবছর ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকাবাইচ আয়োজন ও উপভোগ করা হবে।

সরকারের দিক থেকে যা বলা হয়েছে

কোনো কোনো জায়গায় কনসার্ট বন্ধ করার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেছেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বাধাবিঘ্ন হোক, সরকারের তরফ থেকে এমন কোনো মানসিকতা নেই।

গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেছেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকারের সময়ে তেমন কিছুই হচ্ছে না।

“আমি যদি তুলনা করি, ৫ আগস্ট–পরবর্তী বাংলাদেশ যে জায়গায় চলে গিয়েছিল, এ সরকারের সময় সিগনিফিকেন্টলি বললে কম বলা হবে, ড্রামাটিক্যালি ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। তবে দু–একটা ঘটনা যে ঘটছে না, তা নয়,” বলেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকার উত্তরায় বসন্ত উৎসব ও ঢাকা মহানগর নাট্য উৎসবের মতো আয়োজনও বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

শিল্পকলা একাডেমিতে একটি নাট্যদলের শো মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়ার পর আয়োজিত প্রতিবাদে নাট্যকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছিল। চট্টগ্রামে আবৃত্তি সংগঠন প্রমা’র উৎসব বন্ধ করার ঘটনাও আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

হেফাজতে ইসলাম ও কওমী ওলামা পরিষদের নেতাকর্মীদের আপত্তির মুখে টাঙ্গাইলের মধুপুরে লালন স্মরণোৎসবের তারিখ স্থগিত হওয়ার পর সমঝোতার মাধ্যমে করতে হয়েছিল।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাউল গানের অনুষ্ঠানে হামলা ও বাউল শিল্পী আটকের ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।

প্রতীকী ছবিটি ব্যান্ড তারকা জেমসের ২০২৩ সালের একটি কনসার্টের

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images

সংস্কৃতিকর্মী ও বিশ্লেষকের ভাষ্য

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজীদ বলছেন, সাংস্কৃতিক আয়োজন বা কর্মকাণ্ডের ওপর একটি গোষ্ঠী সারাজীবন ধরেই তৎপরতা চালিয়ে আসছে। কিন্তু অন্তর্বতী সরকারের সময়ে যেভাবে হামলা, গ্রেফতার ও বাধা দেওয়া হয়েছে তা এখন ‘গণতান্ত্রিক সরকারের’ সময়েও চলছে, এটি উদ্বেগজনক।

“সরকারের নিরবতা বিপজ্জনক হয়ে দাড়িয়েছে। সরকারকে মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিষয়ে তো ব্যবস্থা নিতে হবে। এই নিরবতার কারণে কনসার্ট, নৌকা বাইচ কিংবা অন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা আসছে। সংস্কৃতিসেবীরা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। যারা বাউল গান গায় তারা তো নিরাপদ নয়। কোনো কিছুর বিচার হচ্ছে না। এটি হতাশার বিষয়,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন বলছেন, আগে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা আসতো রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক্ষেত্রে যেসব বাধা আসছে তার পেছনে কাজ করছে ধর্মীয় আধিপত্যবাদী রাজনীতি।

“এখন যেটা হলো তার পেছনে আছে তৌহিদী জনতা, মুসলিম উম্মাহ কিংবা শরিয়তবিরোধী তকমা ব্যবহারকারী ধর্মীয় আধিপত্যবাদী রাজনীতি। তারাই বিভিন্ন ব্যানারে আক্রমণ-হুমকি দিয়ে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে। ফলে সরকার নিষেধাজ্ঞা না দিলেও কিংবা বাধা না দিলেও একটা ভয় তৈরি হয়েছে। এই নিরাপত্তাহীনতা সরকারকেই দূর করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দৃঢ় ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা যাতে সবাই তার নিজের কাজ বাধাহীনভাবে করতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।