Home LATEST NEWS BANGLA গান্ধী পরিবার নিয়ে এই প্রশ্নগুলির উত্তর কি থাকবে সোনিয়া গান্ধীর লেখা বইতে?

গান্ধী পরিবার নিয়ে এই প্রশ্নগুলির উত্তর কি থাকবে সোনিয়া গান্ধীর লেখা বইতে?

3
0

Source : BBC NEWS

সোনিয়া গান্ধী - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

সোনিয়া গান্ধী যখন ১৯৯৮ সালে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব নেন, তখন তাকে ঘিরে এবং তার রাজনৈতিক লক্ষ্য বা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে খুব বেশি তথ্য জানা ছিল না। সেই সময় তাকে অনেকেই ‘অনিচ্ছা সত্বেও রাজনীতিতে এসে পড়া একজন’ হিসেবে দেখতেন।

সোনিয়া গান্ধীর জন্ম ইতালিতে, তিনি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর স্ত্রী।

প্রথম দিকে, তিনি রাজনীতির আলোচনার বাইরে থাকারই চেষ্টা করেছিলেন বহু বছর। কিন্তু পরে তিনিই এমন একটি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, যে দল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের বড় একটি সময় জুড়ে দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে।

সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরের প্রথম কয়েক মাসে ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকা সোনিয়া গান্ধীকে ‘তার দলের নেতাদের কাছেও এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব’ বলে বর্ণনা করেছিল।

পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কড়া নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা সোনিয়া গান্ধী যেন বাইরের বিশ্বের থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তিনি বিদেশি উচ্চারণে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতেন এবং জনসমক্ষে খুব কম কথা বলতেন।

তবে ইন্ডিয়া টুডে-র মতে, এই নীরবতার আড়ালেই তিনি ধীরে ধীরে ক্ষমতার ব্যবহার রপ্ত করছিলেন। বিভিন্ন পক্ষের মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং সব দিক বিবেচনা করে তারপর নিজের সিদ্ধান্ত নিতেন।

পত্রিকাটি লিখেছিল, “সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে কাউকে বাইরে রাখা হয় না এবং কারও কণ্ঠও দমিয়ে দেওয়া হয় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়।”

প্রায় তিন দশক পরে, কংগ্রেসের রাজনীতিতে এক ‘অনিচ্ছুক বহিরাগত’ থেকে দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেত্রী হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, সোনিয়া গান্ধী এখন তার গল্প নিজেই বলছেন।

সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনীর প্রচ্ছদ

ছবির উৎস, William Collins

সোনিয়া এই বইতে গান্ধীর ‘সুখ এবং গভীর হতাশা দুটোই রয়েছে’

সোনিয়া গান্ধীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন ছিল স্বজন বিয়োগের দুঃখ আর উত্থান-পতনে ভরা। তার শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীকে যখন তারই নিরাপত্তারক্ষীরা গুলি করেছিলেন, তখন সোনিয়া গান্ধীই তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

এই ঘটনার সাত বছর পরে, এক আত্মঘাতী হামলাকারী তার স্বামী রাজীব গান্ধীকে হত্যা করে। এর পরে সেই সোনিয়া গান্ধীই তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।

তার আত্মকথা ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ নভেম্বরে প্রকাশিত হওয়ার কথা আছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বইটি প্রকাশ করবে আলফ্রেড এ. নফ এবং যুক্তরাজ্যে উইলিয়াম কলিন্স।

ভারতে প্রকাশিত হওয়ার আগেই বইটি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে।

আলফ্রেড এ. নফ-এর মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, তিনি চান এই স্মৃতিকথা “আমার হৃদয়ের সেই যাত্রার সাক্ষ্য হয়ে থাকুক, যার মধ্যে আমার জীবনের সুখ এবং গভীর হতাশা দুটোই রয়েছে।”

উইলিয়াম কলিন্স জানিয়েছে, বইটির শুরু ১৯৬৫ সালের কেমব্রিজ থেকে। সে সময়ে ১৯ বছরের ইতালীয় ছাত্রী সোনিয়া মাইনো রাজীব গান্ধীর প্রেমে পড়েন।

প্রকাশকদের মতে, বইটির এই অংশে সোনিয়া গান্ধী অত্যন্ত আন্তরিকতা এবং খোলামেলা ভঙ্গিতে তার জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন।

তার জীবনের শুরু ইতালির একটি ছোট শহরে। এর পরে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে যান।

সোনিয়া (ডানে) ১৯ বছর বয়সে কেমব্রিজে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে পরিচিত হন

ছবির উৎস, Keystone/Getty Images

যে বিষয়গুলি নিয়ে আগ্রহ থাকবে পাঠকদের

এই স্মৃতিকথা নিয়ে ভারতে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে।

একাধিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকাশনা সংস্থা ‘পেঙ্গুইন ব়্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া’ পাণ্ডুলিপির কিছু অংশে পরিবর্তন আনার কথা বলেছিল। এর পরে কংগ্রেস নেতারা অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারের সমালোচনা রয়েছে এমন অংশ বদলানোর জন্য প্রকাশকের উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

পেঙ্গুইন এই দাবি অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, তারা “বইটি প্রকাশ করার জন্য সবসময়ে প্রস্তুত ছিল” এবং এ নিয়ে আলোচনা চলছিল।

কিন্তু পাঠকেরা শুধু এই গল্প জানতেই আগ্রহী হবেন না যে, কীভাবে এক তরুণ বিদেশি নারী ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিবারের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। তারা আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির কিছু বড় অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তরও এই বইতে খুঁজবেন।

এমন কী ছিল, যা সোনিয়া গান্ধীকে রাজনীতিতে টেনে এনেছিল? আর ২০০৪ সালে, যখন কংগ্রেস আট বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর আবার ক্ষমতায় ফিরল, তখন পর্দার আড়ালে কী ঘটেছিল?

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শেষকৃত্য - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত এটাই যে, সোনিয়া গান্ধী কেন তার দল ও জোটসঙ্গীদের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী পদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং এর বদলে ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণের উদ্যোক্তা মনমোহন সিংকে বেছে নিয়েছিলেন।

তার কি আশঙ্কা ছিল যে, তার বিদেশি শিকড় নিয়ে সমালোচনা তার সরকারকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দিতে পারে?

সাংবাদিক ও লেখক নীরজা চৌধুরী বলেন, “আমার মনে হয় এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তিনি খুব সহজেই প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। তার দল এবং জোটসঙ্গীদের পূর্ণ সমর্থন ছিল তার প্রতি, আর রাষ্ট্রপতি ভবন সরকার গঠনের আমন্ত্রণপত্রও প্রস্তুত রেখেছিল।”

নিজের স্মৃতিকথায় কংগ্রেসের সাবেক নেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নটবর সিং লিখেছেন, সোনিয়া গান্ধীর ছেলে রাহুল গান্ধী তার মা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কঠোর বিরোধী ছিলেন, কারণ তার আশঙ্কা ছিল, তার ঠাকুমা ও বাবার মতোই পরিণতি হতে পারে মায়ের।

নটবর সিং লিখেছেন, পরিস্থিতি চরমে পৌঁছয় যখন রাহুল বলেছিলেন, তাকে থামাতে তিনি ‘যথাসম্ভব পদক্ষেপ’ নিতে প্রস্তুত।

প্রশ্ন হলো, সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা কি তার সেই সিদ্ধান্তের উপর নতুন আলোকপাত করবে, নাকি পর্দার আড়ালে যা ঘটেছিল তার সম্পূর্ণ ভিন্ন বিবরণ তুলে ধরবে?

১৯৮৫ সালে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগ্যান ও ফার্স্ট লেডি ন্যান্সি রেগ্যানের সঙ্গে রাজীব গান্ধী এবং তার স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী

ছবির উৎস, Universal Images Group via Getty Images

‘ইতালিয়ান ওয়ান্ডার’ থেকে ভারতের রাজনীতির একজন চালক

কারণ যা-ই হোক না কেন, তার এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত রহস্যের হিমশৈলের শুধু চূড়া মাত্র। যে প্রশ্ন অনেকেই করেন, তা হলো, অনিচ্ছা সত্বেও শেষ পর্যন্ত সোনিয়া গান্ধী কেন রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন?

শুরুর দিকে তিনি রাজনীতি থেকে দূরেই ছিলেন। ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধী নিহত হওয়ার পরে, তিনি জনজীবন থেকেও নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।

কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে নির্বাচনে কংগ্রেসের ধারাবাহিক দুর্বল ফলাফলের পরে, তিনি ১৯৯৭ সালে দলে যোগ দেন এবং এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দলের সভাপতি হয়ে ওঠেন।

সে সময়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে এককথায় খারিজ করে দিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে, ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছিল, শুরুতে বিরোধী শিবিরের শীর্ষ রাজনীতিকরা তাকে ‘গৃহিণী’ বা ‘ইতালিয়ান ওয়ান্ডার’-এর বেশি কিছু বলে মনে করতেন না। তবুও, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি তার দলকে বদলে দিতে শুরু করেছিলেন।

কংগ্রেসের এক জ্যেষ্ঠ নেতা স্বীকার করেছিলেন, “আমি কখনও ভাবিনি যে এই নারী এত বড় পালাবদল ঘটাতে পারেন।”

পত্রিকাটি তাকে বাইরে থেকে কোমল মনে হওয়া কিন্তু ভেতরে কঠোর এক নারী হিসেবে বর্ণনা করেছিল এবং বলেছিল, কীভাবে ‘পাহাড়সম অহংকারকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে হয়’, তা তিনি জানেন।

এ ছাড়া সেই মর্মান্তিক ঘটনাগুলিও রয়েছে, যেগুলোর কারণে রাজনীতিতে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল।

১৯৯১ সালে তার স্বামী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর শেষকৃত্যে সোনিয়া গান্ধী (মাঝখানে), তার মেয়ে প্রিয়াঙ্কা ও ছেলে রাহুলের সঙ্গে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

সোনিয়া গান্ধী ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পরে তার পরিবারে আসা পরিবর্তনগুলো দেখেছিলেন।

সাত বছর পরে, আত্মঘাতী এক হামলায় তিনি স্বামী রাজীব গান্ধীকে হারান। এই মৃত্যুগুলো ভারতীয় রাজনীতি এবং তার নিজের জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

সেই বছরগুলো সম্পর্কে তিনি কী বলবেন?

রাজীব গান্ধীর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে, যার তিনি জোরালো বিরোধিতা করেছিলেন? অথবা তার সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ সম্পর্কে?

আর সেই মুহূর্ত সম্পর্কে, যখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না?

এই প্রশ্নগুলি ছাড়াও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে।

তিনি কি বোফর্স কেলেঙ্কারি নিয়ে আলোচনা করবেন, যা রাজীব গান্ধীর সরকারকে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলেছিল এবং ইতালীয় ব্যবসায়ী ওত্তাভিও কোয়াত্রোচ্চির সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল? তিনি কি অভিযোগগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করবেন এবং জানাবেন যে এ বিষয়ে তিনি কী জানতেন?

আর তার ইতালীয় পরিচয় ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তারই বা কী হবে?

বহু বছর ধরে সোনিয়া গান্ধীর সমালোচনা করা হয়েছিল এই ভিত্তিতে যে তিনি বিদেশে জন্মেছেন এবং ভারতের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নন।

ভারতীয় জনতা পার্টির নেত্রী সুষমা স্বরাজ ২০০৪ সালে ঘোষণা করেছিলেন, বিদেশি বংশোদ্ভূত কোনও ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী হওয়া ‘রাষ্ট্রের জন্য অপমানজনক’ হবে। সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি পদত্যাগ করবেন, মাথা মুড়িয়ে ফেলবেন, সাদা পোশাক পরবেন এবং তপস্বীর জীবন যাপন করবেন বলে শপথ করেছিলেন।

ফরাসি সংবাদপত্র লিবেরাসিওঁ-এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত সেই প্রতিবেদন, যেখানে বলা হয়েছিল ১৯৯১ সালে তার স্বামী হত্যার শিকার হওয়ার পরে সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন

ছবির উৎস, Universal Images Group via Getty Images

মনমোহন-সরকারের ‘রিমোট কন্ট্রোল’ ছিল তার হাতে?

সাংবাদিক ও লেখক রশিদ কিদওয়াই বলেন, “১৯৯৯ সালে কংগ্রেসেরই কিছু নেতা তার বিদেশি বংশোদ্ভূত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, তিনি হয়তো কখনও দেশ ছেড়ে ফিরে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন।”

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও এই কৌতূহল রয়েছে যে, এই বইটি ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের নানা স্ববিরোধী সিদ্ধান্তের উপর নতুন আলোকপাত করতে পারে কি না।

সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস টানা দু’টি জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়েছিল এবং তথ্য জানার অধিকার আইন ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচিসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিল।

তবুও, সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে দুর্নীতির অভিযোগ, নীতিগত অচলাবস্থা এবং দলটি নিজের নেতৃত্বের হাতেই গোলাম হয়ে পড়েছে কিনা, সেই প্রশ্ন বার বার উঠে আসছিল।

সোনিয়ার সমালোচকেরা তাকে সরকারের ‘রিমোট কন্ট্রোল’ বলে উল্লেখ করতেন। মনমোহন সিংয়ের উপর তার প্রভাব নিয়ে তারা সন্দেহ প্রকাশ করতেন।

অন্যদিকে, তার সমর্থকেরা তাকে অত্যন্ত জটিল একটি জোটকে একসঙ্গে ধরে রাখা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখতেন।

শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে সোনিয়া কংগ্রেসের নেতৃত্ব তার ছেলে রাহুল গান্ধীর হাতে তুলে দেন। অনেকের মতে, দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে তার ব্যর্থতাই গান্ধী পরিবারের পতনের কাহিনীর ক্ষেত্রে আগ্রহের কেন্দ্র।

২০০৪ সালে কংগ্রেস ক্ষমতায় ফেরার পরে সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হতে অস্বীকার করেন এবং এই পদের জন্য মনমোহন সিংকে বেছে নেন

ছবির উৎস, Getty Images

সোনিয়া গান্ধী তার ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত বই ‘রাজীব’-এ লিখেছিলেন, স্বামীকে রাজনীতিতে আসা থেকে বিরত রাখতে তিনি ‘অনেক লড়াই’ করেছিলেন। তবুও শেষ পর্যন্ত তিনি এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পুত্র রাহুল গান্ধীর হাতে তুলে দেন।

রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক পথচলা সহজ ছিল না। এক সময়ে তাকে অনাগ্রহী রাজনীতিক বলে নস্যাৎ করা হয়েছিল এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রায়ই তাকে এমন এক নেতা বলে বিদ্রূপ করত, যিনি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অনুপস্থিত থাকেন।

মি. কিদওয়াই বলেন, “সোনিয়া তার ছেলের সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ধরন এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কীভাবে দেখেন? এবং তার রাজনীতিকে তিনি কতটা সমর্থন করেন? আমার আশা, এই বই সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে।”

আরও একটি প্রশ্ন হল, পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সোনিয়া গান্ধী কেন রাহুল গান্ধীকে বেছে নিয়েছিলেন, তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদরাকে নয়, যাকে স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক বেশি ক্যারিশম্যাটিক বলে মনে করা হয়?

রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বছরের পর বছর জল্পনা-কল্পনা চলার পরও, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদরা কেন আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৯ সালেই নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন?

মি. কিদওয়াই বলেন, “সোনিয়ার সবসময়ে একই উত্তর ছিল, রাজনীতিতে যোগ দেবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত আমার সন্তানদেরই নিতে হবে।”

আরও একটি বড় প্রশ্ন হল, যে ভারতকে গড়ে তুলতে সোনিয়া গান্ধী একসময়ে ভূমিকা পালন করেছেন, সেই ভারত সম্পর্কে তিনি কী ভাবেন?

১৯৮০-এর দশকে উত্তর প্রদেশে তার স্বামী রাজীব গান্ধীর হয়ে নির্বাচনী প্রচারে সোনিয়া গান্ধী।

ছবির উৎস, Sygma via Getty Images

তিনি এমন এক সময়ে কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যখন ভারতীয় রাজনীতি জোট সরকারের যুগ এবং অর্থনৈতিক উদারীকরণ থেকে সরে গিয়ে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রভাবশালী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।

তবে সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হল, সোনিয়ার স্মৃতিকথা কী বলার সিদ্ধান্ত নেবে এবং কী অনুক্ত রেখে যাবে। নীরজা চৌধুরীর ধারণা, এর উত্তর হয়তো বইটির শিরোনাম ‘বিলংগিং’-এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

মিজ. চৌধুরী বলেন, “নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারের ধারক হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে তিনি সর্বদা সচেতন ছিলেন। সেই উত্তরাধিকারকে জীবিত রাখতে হবে।”

তার প্রত্যাশা, স্মৃতিকথাটি পরিবার এবং তার ইতিহাসে ফিরে যাবে, কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকবে নেহরু-গান্ধী পরিবারের সঙ্গে সোনিয়া গান্ধীর নিজের সম্পৃক্ততার অনুভূতি এবং কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গ্রহণ করার অভিজ্ঞতা।

অবশ্য সেই উত্তরাধিকার এখন ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে।

ক্ষমতাসীন বিজেপি “কংগ্রেস-মুক্ত ভারত”-এর পক্ষে প্রচার চালিয়েছে, অন্যদিকে দলের সমালোচকেরা ক্রমশ এই রাজনৈতিক লড়াইকে বংশানুক্রমিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরছেন।