Home LATEST NEWS BANGLA দুর্গাপূজার আগে ফের নিরামিষ-আমিষ বিতর্কে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি, কী বলছে শাস্ত্র?

দুর্গাপূজার আগে ফের নিরামিষ-আমিষ বিতর্কে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি, কী বলছে শাস্ত্র?

3
0

Source : BBC NEWS

স্বঘোষিত ধর্মগুরু ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীকে দুর্গামূর্তি উপহার দিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

ছবির উৎস, Facebook/Bageshwar Dham Sarkar

“বাইরে থেকে কে কী বলল তাতে এত চিন্তা কিসের?” সাতই সেপ্টেম্বর একটি সাংবাদিক সম্মেলন থেকে স্বঘোষিত ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর বক্তব্য থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।

কয়েক দিন আগে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী, যিনি ‘বাগেশ্বর ধাম বাবা’ নামেও পরিচিত।

হাওড়া জেলার লিলুয়ার একটি সভায় তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গা পুজোয় প্যান্ডেলের কাছে আমিষ ভোজন করা হয়। এটি ঘৃণ্য খাবার, আমি চাই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এটিকে বহিষ্কার করুন।”

এই বক্তব্যের পরেই পশ্চিমবঙ্গজুড়ে সমাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

যারা ‘নবরাত্রিতে’ আমিষ খায় তাদের ‘পাখণ্ডি’ বলে সম্বোধন করেন ওই স্বঘোষিত ধর্মগুরু। সংস্কৃত ভাষায় পাখন্ডি শব্দের অর্থ- ভণ্ড বা দুরাচারী ব্যক্তি।

‘নবরাত্রি’ হলো নয় দিন ধরে চলা ধর্মীয় উৎসব যেখানে দেবীর নয়টি রূপকে পূজা করা হয়। ‘নবরাত্রি’র প্রথা উত্তর এবং পশ্চিম ভারতেই মূলত পালন করা হয়। তবে ওই একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে শেষ পাঁচ দিন (ষষ্ঠী থেকে দশমী) দুর্গাপূজা হয়।

ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী ওই বিতর্কিত মন্তব্য করার এক দিন আগেই তার সঙ্গে দেখা করে মালা পরিয়ে দেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরপরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, সরকার কি তাহলে ওই ধর্মগুরুর বয়ানকে সমর্থন করে?

পরের দিনই সাংবাদিক সম্মেলন করে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেছেন যে, ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্য তার ‘ব্যক্তিগত’।

যদিও ওই ধর্মগুরুর সঙ্গে একই মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী ও একাধিক ক্যাবিনেট মন্ত্রীর উপস্থিতি নিয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গিয়েছেন তিনি।

ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে শুধু সামাজিক মাধ্যম উত্তাল তাই নয়, রামকৃষ্ণপন্থি ভাবধারার সন্ন্যাসী স্বামী পরমাত্মনন্দজি মহারাজ এই মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেছেন, “এসব উত্তরপ্রদেশীয় ঢং সে নিজের দেশেই গিয়ে করবে। বাঙালির নিজস্ব ধর্মীয় ঘরানা ও অস্মিতা আছে।”

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী

ছবির উৎস, ANI

কে এই ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী?

মধ্যপ্রদেশের ছত্তরপুর জেলার বাগেশ্বর ধাম নামে একটি মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ৩০ বছর বয়সী ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী।

তরুণ এই স্বঘোষিত ধর্মগুরু তার বক্তব্য ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে অনেক ভিউ পেয়েছেন। প্রায়ই ভারতের শাসক দল বিজেপির পক্ষে বহু ভাষণ দিতে শোনা গিয়েছে তাকে। তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও দেখা করেছেন।

যদিও সামাজিক মাধ্যমে তার সমালোচকরা দাবি করেন যে, তিনি মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব রাখেন ও প্রকাশ্যে উসকানিমূলক কথা বলেন। সমালোচনা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে তার ভক্ত সংখ্যা ও আশ্রমের বহর দুইই বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারতের বহু অঞ্চল থেকে তার ভক্তরা তার বক্তব্য শুনতে আসেন।

ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী একবার বলেছিলেন, মমতা ব্যানার্জীর সরকার তাকে “পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দেয় না”।

যদিও এই ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক সরকারের তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি সেই সময়ে। তবে নতুন সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় তিনি পশ্চিমবঙ্গে এলেন এবং তার বক্তব্য বিতর্কের সৃষ্টি করলো।

“দুর্গা মণ্ডপের পেছনে ঘৃণ্য খাবার তৈরি করা হয়” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এটা আমরা পছন্দ করি না। আমরা চাই কলকাতার প্রত্যেক হিন্দু এই ‘নবদুর্গা’ উৎসবে জেগে উঠুক এবং এই ধরনের লোকদের বয়কট করুক।”

“আমরা তাদের ধার্মিক বলব না, আমরা তাদের পাখণ্ডি বলব।”

কিছুদিন আগে একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের রোষের মধ্যে পড়েছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং পরে সংগঠনটি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছিল, “দুর্গাপূজায় আমিষ খেতে নিষেধ করা হয়নি”, কিন্তু প্যান্ডেলের মধ্যে যেন না খাওয়া হয়।

সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই বলেছেন যে তাদের বাড়িতে দুর্গাপূজায় আমিষ ভোগ দেবীকে উৎসর্গ করার কয়েক শতাব্দী-প্রাচীন প্রথা রয়েছে; তাদের ‘পাখণ্ডি’ সম্বোধন করাকে কীভাবে দেখছে সরকার?

শমীক ভট্টাচার্য - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

বিরোধিতা করল না বিজেপি

সাবেক সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বলেছিলেন, “বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেবে”।

তখন শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, “বাঙালি মাছ খাবে, পাঁঠা খাবে”।

বিরাট জনমঞ্চ থেকে এই বক্তব্য বিজেপির ‘বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী’ তকমা অনেকটাই ঘুচেছিল বলে মনে করেন বহু রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ।

সোমবার সাংবাদিক সম্মেলনে শমীক ভট্টাচার্য প্রথমে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চান। তিনি বলেন, “বাঙালি সাধরণত নবমীর দিন পাঁঠার মাংস খায়, অষ্টমীতে লুচি খায়। সেটাই খাবে”।

তার এই উত্তর সাংবাদিকদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

সাংবাদিকরা ফের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তিনি তার কথা বলতেই পারেন। সারা বিশ্বে অনেকেই তো ভেজিটেরিয়ান হওয়ার পক্ষে প্রচার করেন, কেউ বলেন, ভিগান হয়ে যান। আপনিও বলতে পারেন- সবাই মটন খেতে চলুন।”

তিনি আরও বলেন, “একজন সাধু হওয়ার কারণে তিনি তা বলতেই পারেন। কিন্তু কে কী খাবেন সেটা মানুষের নিজস্ব বিষয়… বাংলা ও বাঙালি যাতে অভ্যস্ত তাই করবে, কে বাইরে থেকে এসে কী বলল তা নিয়ে এত হইচই করবেন?”

এই উত্তরের পরেই এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন যে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীকে রাজ্যের সরকারই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অধিষ্ঠিত করেছে। সেক্ষেত্রে তার বক্তব্য অনেকের কাছেই কি গুরুত্বপূর্ণ নয়?

জবাবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি বলেন, “তার কথাকে বাঙালি গুরুত্ব দেবে কি না সেটা বাঙালির ব্যাপার”।

কলকাতার একটি বাড়ির শতাব্দী-প্রাচীন দুর্গাপূজা

ছবির উৎস, Pratyush Roy

দুর্গাপূজায় আমিষ খাওয়া নিয়ে শাস্ত্র কী বলে?

কলকাতায় যেসব প্রাচীন বাড়ির দুর্গাপূজায় মাছের ভোগ উৎসর্গ করা হয়, তার মধ্যে রয়েছে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার, চোরবাগান চ্যাটার্জী পরিবার ও পটুয়াখোলা ব্যানার্জী বাড়ি, দর্জিপাড়া মিত্র বাড়ির পূজা।

এই সবকটিই পারিবারিক দুর্গাপূজাই আড়াইশো বছরের বেশি পুরোনো।

ফেসবুকে বহু ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে তাদের বাড়ির পূজায় মাছ ভোগে দেওয়া হয়, অথবা পাঁঠা বলির চল আছে। বিভিন্ন পারিবারিক প্রথা মেনে কোথাও ইলিশ, কোথাও রুই বা কোথাও শোল মাছ ভোগে অর্পণ করা হয়।

সামাজিক মাধ্যমে একজন জানিয়েছেন, তাদের বাড়িতে দুর্গাপূজার সঙ্গেই শালগ্রাম শিলায় নারায়ণের পূজা হয় শতাধিক বছর ধরে। তারা দেবীকে আমিষ ভোগ অর্পণ করেন ও নারায়ণকে দেওয়া হয় নিরামিষ ভোগ।

কেউ কেউ আবার জানিয়েছেন, তাদের বাড়িতে বলির চল না থাকলেও কালীঘাট মন্দিরে অর্পিত মাংস তাদের বাড়িতে এনে ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়।

তবে এমন বহু পরিবার আছে যারা পূজায় বলি বা আমিষ ভোগ নিবেদন করেন না।

চন্দননগরের প্রায় ৩০০ বছর পুরোনো মণ্ডল বাড়ির পূজায় আমিষ একেবারেই গ্রহণীয় নয় বলে জানিয়েছেন ওই বাড়ির বাসিন্দারা। ওই বাড়ির বাসিন্দা নেলিন মণ্ডল বলেছেন, যেহেতু তারা বৈষ্ণব ধারার অনুসারী তাই তারা মাংস ভোগ দেন না।

এ বিষয়ে রামকৃষ্ণপন্থি ভাবধারার ধর্মগুরু স্বামী পরমাত্মনন্দজি মহারাজ বলেন, “বাঙালির নিজস্ব ধর্মীয় একটি শৈলী আছে। যেটা শাস্ত্র সম্মত। শাস্ত্র অনুযায়ী দুর্গাপুজোয় এবং যে কোনো শক্তি আরাধনায় আমরা আমিষের ব্যবহার দেখি। বিশেষ করে বাংলাতে তিনশো-চারশো বছরের যে পুরনো পুজো আছে, সেসব পারিবারিক পূজা, জমিদার বাড়ির পুজো – এমন বহু স্থানে আমিষের ব্যবহার আছে।”

বাংলার নিরামিষ ও আমিষ খাদ্যের ধারা বিষয়ে তিনি বলেন, “যে বাঙালির মধ্যে জন্ম নিয়েছেন শ্রী রামকৃষ্ণ, সেই বাঙালির মধ্যেই জন্ম নিয়েছেন শ্রী চৈতন্য। আমরা দিব্যি চৈতন্য এবং রামকৃষ্ণ দুজনকে মিলিয়ে নিয়ে আমাদের মনোভূমিকে সেই আমিষ এবং নিরামিষের জোর সুতোয় বুনে নিয়েছি।”

স্পষ্টতই তিনি হিন্দু বাঙালির দুই ধর্মীয় আইকন রামকৃষ্ণ যিনি আমিষপ্রিয় ও চৈতন্য – যিনি নিরামিষ আহারের কথা বলেছেন – দুইয়ের সহাবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

তার মতে, “আমাদের এখানে কোনো ঝঞ্ঝাট নেই, ঝামেলা নেই। নতুন করে হঠাৎ একটা আবহাওয়া তৈরি করা হচ্ছে যে, শক্তি পূজায় আমিষ ব্যবহার নিষেধ। শক্তি পূজায় দেওয়া যাবে না।”

“নিশ্চিতভাবে শক্তি পূজায় ছেদন হবে। মার্কণ্ডেয় চন্ডীতে পশু, পুষ্প, ধূপ অর্ঘের দ্বারা দেবীর সন্তোষ বিধানের কথা আছে। কোন পশুকে (বলি) দিলে কত সহস্র বর্ষ দেবী সন্তুষ্ট থাকেন, সে কথা বলা আছে।”

তার মতে, দেবীকে কী অর্পণ করা হবে, সেটি মানুষের ব্যক্তিগত রুচির উপর নির্ভর করে।

“মানুষের নিজস্ব মত অনুযায়ী, পথ অনুযায়ী, রুচি অনুযায়ী দেবীকে সে ডাকবে, যারা নিরামিষে মাকে ডাকতে চায় তাদের ডাকও মা শুনবেন।”

রামকৃষ্ণপন্থী সন্ন্যাসী স্বামী পরমাত্মনন্দজি মহারাজ - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Facebook/Swami Paramatma Nandaji Maharaj

পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজার সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে চাইলে রাজি হননি পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি।

তবে এর আগে স্থানীয় একাধিক সংবাদ মাধ্যমে তিনি সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে এই সংস্কৃতি একমাত্রিক নয়।

“পক্ষী, মৃগ, গণ্ডার, ষাঁড়, ছাগল ও মাছ” এই প্রকার মাংস ভোগ দেওয়ার বিধান শাস্ত্রে আছে, তবে কে কী ভোগ দেবেন সেটা অনেকটাই পূজারীর ইচ্ছা ও ভক্তির উপর নির্ভর করে।

“সিলেটের মানুষ যদি ‘লইট্যা শুঁটকি’ ভোগে নিবেদন করতে চান তবে তাও করতে পারেন,” বলেছেন তিনি।

“বৈদিক ধর্মে মাংস খাওয়ার প্রচুর উদাহরণ আছে এবং যজ্ঞে পশু উৎসর্গ করার কথা বলা হয়েছে এবং বন্ধ্যা গাভী ও বৃষ বা ষাঁড়কে বলির মাংস হিসেবে উৎসর্গ করার উল্লেখ আছে,” একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন।

যিনি সাধক, তিনি তার সাধনার অংশ হিসেবেই শুধু নিরামিষ ভোজন করতে পারেন; তবে রামচন্দ্র সহ হিন্দু ধর্মের বহু দেবতারই মাংস ভক্ষণের উল্লেখ শাস্ত্রে আছে।

তার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ‘শাস্ত্রে বলি’ বিষয়ক একটি ভিডিওতে তিনি বলেছেন, “বৈদিক কাল থেকেই বলির মাংস দেবতাদের অর্পণ করার প্রচলন হিন্দুধর্মে ছিল। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ও শতপথ ব্রাহ্মণ দেখাচ্ছে যে একটি পশুকে বলি দেওয়ার আগে কীভাবে তাকে স্নান করিয়ে, তেল, সিঁদুর ও সুগন্ধি মাখানো হচ্ছে।”

তবে তিনি বলেন, ষোড়শ শতকের পণ্ডিত স্মার্ত রঘুনন্দনের লেখা থেকে পাওয়া যায়, যারা বলি দিতে চান না তারা নিজের দেহ থেকে কিছু রক্তও দুর্গা পুজোর সময়ে দান করতে পারেন। সেটিকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ অর্পণ ধরা হয়।

পশ্চিমবঙ্গে বারোয়ারী পুজোর পূজারীরা মূলত এই পন্থাই অনুসরণ করেন।

পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি

ছবির উৎস, Nrisingha Prasad Bhaduri/Facebook

নবরাত্রি ও দুর্গাপূজা – দেবী একই, উৎসব আলাদা

দুর্গাপূজার সময়ে উত্তর ভারতে মূলত নয় দিন ধরে নবরাত্রি উদযাপন হয়। এটি মূলত ব্রত ও উপবাসের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। যারা উপবাস করেন না, তারা আমিষ আহার থেকে বিরত থাকেন।

ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী যে অঞ্চলের বাসিন্দা, সেখানে নবরাত্রি উৎসবের প্রচলন বেশি।

ভারত সরকারের সাবেক আমলা জহর সরকার ‘ওদের নবরাত্রি, আমাদের দুর্গা’ শীর্ষক একটি ব্লগে লিখেছেন, “সে সব জায়গায় (উত্তর ভারতে) নবরাত্রি পালনের অনেক কট্টর পরিবারে ভাত-রুটি, ময়দা, সুজি, এ সবও খাওয়া চলে না। মশলাপাতির ব্যাপারেও কঠোর নিয়ম রয়েছে; জিরে, ধনে, এলাচ, জোয়ান, পুদিনা, কাঁচা লঙ্কা, আমচুর আর আদা ছাড়া অন্য কিছুর ব্যবহার নিষিদ্ধ। তরিতরকারি আর ফলমূলেও বাধানিষেধ আছে। রান্নায় দেওয়া চলবে না ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, হিংও।”

“কিন্তু বাঙালিরা একদম বিপরীত। কয়েকটি গোঁড়া পরিবার কিছু নিয়ম বা ব্রত পালন করলেও, সাধারণ লোকেরা কব্জি ডুবিয়ে মাছ-মাংস খেতে ব্যস্ত। ভোগ পেলে ছাড়ে না, আবার পুজোর আগে থেকেই ঠিক করা হয় কোন দিন বাঙালির কষা মাংস, কবে হবে চাইনিজ আর কোথায় বেস্ট মোঘলাই খানা।”

জহর সরকার মনে করেন, উত্তর ভারতে মূলত কৃচ্ছসাধন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসবের মেজাজ আলাদা।

“ওদের সর্বসাধারণের উৎসব শুধু এক দিনের, দশেরার সময়ে। আমাদের তো প্যান্ডেল বানাতেই দু তিন মাস, আর উৎসব পঞ্চমী থেকে দশমী। আর একটু টানতে পারলে আরও ভালো।”