Home LATEST NEWS BANGLA চোখের সামনেই লুকিয়ে থাকা বনবিড়াল নতুন প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত

চোখের সামনেই লুকিয়ে থাকা বনবিড়াল নতুন প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত

3
0

Source : BBC NEWS

অ্যাম্বার রঙের চোখওয়ালা একটি ছোট বিড়াল ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। বিড়ালটির নাক কালো, কপালে ডোরাকাটা দাগ এবং ত্রিভুজাকৃতির কান রয়েছে। এর লোম ধূসর-বাদামি এবং চিতাবাঘের মতো দাগ আছে। পেছনে একটি ঘেরের তারের জাল ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছপালা দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Paola Nogales-Ascarrunz/Julie Van Collie

বলিভিয়ার বনাঞ্চলে পাওয়া একটি ছোপ ছোপ দাগযুক্ত বিড়ালকে বিজ্ঞানীরা নতুন একটি প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গৃহপালিত বিড়ালের মতো আকারের এই ছোট ফেলাইনটি এতদিন নজরের বাইরে ছিল, কারণ একই ধরনের দাগ ও ডোরার কারণে একে অন্য বন্য বিড়ালদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হতো।

তবে ডিএনএ গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিড়াল আসলে একেবারেই আলাদা একটি শ্রেণীর সদস্য। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্লভ কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী সম্পর্কে এখনও কত কিছু অজানা রয়ে গেছে।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই আবিষ্কার টাইগার ক্যাট বা বাঘ-বিড়াল সংরক্ষণের দিকে মনোযোগ বাড়াবে। দক্ষিণ এবং মধ্য আমেরিকায় পাওয়া এই ছোট বুনো বিড়ালগুলো তাদের বড় জাতভাই যেমন সিংহ, চিতাবাঘ এবং বাঘের তুলনায় মানুষের খুব কমই মনোযোগ পেয়ে থাকে।

একটি ছোট বিড়াল একটি তাকের ওপর বসে আছে। বিড়ালটির নাক কালো, কপালে ডোরাকাটা দাগ এবং ত্রিভুজাকৃতির কান রয়েছে। এর লোম ধূসর-বাদামি এবং চিতাবাঘের মতো দাগ আছে। পেছনে একটি ঘেরের তারের জাল ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছপালা দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Paola Nogales-Ascarrunz/Julie Van Collie

টাইগার ক্যাট বা বাঘ-বিড়াল হলো ছোট, ছোপযুক্ত বুনো বিড়াল যা দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা জুড়ে, বিশেষ করে কোস্টা রিকা থেকে শুরু করে বলিভিয়া এবং আর্জেন্টিনায় দেখা যায়।

এরা দেখতে এতটাই একই রকম যে, এমনকি বিশেষজ্ঞদেরও এদের আলাদা করে চিনতে বেগ পেতে হয়।

বলিভিয়ার লা পাজে অবস্থিত ইউনিভার্সিদাদ মেয়র দে সান আন্দ্রেসের গবেষক পাওলা নোগালেস-আস্কারুনজ বলেন, “এটি একটি চমৎকার ফলাফল যে আমরা বিশ্বের জন্য নতুন একটি প্রজাতি পেয়েছি, যার নাম লেপার্ডাস তিলকায়ো (Leopardus tilcayo)।”

“এটি সত্যিই বিস্ময়কর যে এখনও নতুন প্রজাতি আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে,আর এর জন্য আমাদেরকে কোনো আগ্নেয়গিরি, কোনো দ্বীপ বা গভীর সমুদ্রে যেতে হয়নি।”

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছপালার পটভূমিতে একটি কাঠের ডালে একটি অনসিলা বসে আছে। এর মুখ খোলা, ওপরের দিকে দুটি ধারালো দাঁত ও একটি লম্বা গোলাপি জিভ দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

এখন পর্যন্ত এই প্রজাতির মাত্র একজন নিশ্চিত সদস্যের কথা জানা গেছে। সেটি হলো বলিভিয়ার একটি উদ্ধারকেন্দ্রে থাকা একটি বিড়াল। তবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এ প্রজাতির আরও সদস্য রয়েছে।

১০ বছর বয়সী এই বিড়াল, যার ডাকনাম “টিগ্রিনো”, বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কারের পথে নিয়ে যায়।

বলিভিয়ার বিজ্ঞানী ড. নোগালেস আসকারুনজ অভয়ারণ্যে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সময় লক্ষ্য করেন যে বিড়ালটিকে কিছুটা অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বন থেকে এটিকে উদ্ধার করেছিলেন। প্রথমে তিনি একে গৃহপালিত বিড়ালের বাচ্চা ভেবেছিলেন।

তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এটি সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের মতো আচরণ করে না।

তিনি আরও শুনেছিলেন যে দেশের ইয়ুঙ্গাস অঞ্চলের ঘন বনাঞ্চলে ছোট আকারের আরও কিছু বন্য বিড়ালের দেখা পাওয়ার ঘটনা আছে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা সেগুলো নিয়ে কোনো অনুসন্ধান করেননি।

এই রহস্যের সমাধানে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে যুক্ত হন। তারা জীবিত প্রাণী ও জাদুঘরের নমুনা থেকে পাওয়া ডিএনএ ব্যবহার করে টাইগার ক্যাটদের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করেন।

“রেকর্ড বা ছবি খুবই কম, জাদুঘরেও কোনো নমুনা ছিল না। এটি একরকম লুকিয়েই ছিল, কারণ কেউ এটি খুঁজছিল না,” বলেছেন ব্রাজিলের পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব রিও গ্রান্ডে দো সুলের সংরক্ষণ জিনতত্ত্ববিদ এদুয়ার্দো এইজিরিক।

কারেন্ট বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটি আরও বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরেছে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে টাইগার ক্যাটের প্রজাতি তিনটি নয়, বরং পাঁচটি। এর মধ্যে রয়েছে সদ্য জানতে পারা বলিভিয়ার টিলকায়া ক্যাট (Leopardus tilcayo)।

ঘন সবুজ বনভূমির ওপর নীল আকাশের পটভূমিতে ঘন ছাউনিযুক্ত গাছপালা দৃশ্যমান।

ছবির উৎস, Getty Images

তবে প্রজাতিটিকে শনাক্ত করা কেবল প্রথম ধাপ।

এখন বিজ্ঞানীদের এর বিস্তৃতি, পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য এবং বন্য পরিবেশে এটি কী ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে, তা বুঝতে হবে।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন রিসার্চ ইউনিটের সহগবেষক ড. ক্যারোলিন সার্টর বলেন, এই আবিষ্কার সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো প্রজাতি কী এবং কোথায় বাস করে তা জানা না থাকলে তাকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, “এরা গৃহপালিত বিড়ালের মতো আকারের প্রাণী। তাই মনে হতে পারে আমরা এদের সম্পর্কে সবই জানি। কিন্তু এই আবিষ্কার দেখিয়ে দিয়েছে যে বিশ্বের কিছু অঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের কত কিছু এখনও আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।”

বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং অবৈধ শিকারের কারণে টাইগার ক্যাট প্রজাতিগুলোকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বলে বিবেচনা করা হয়।

সম্প্রতি পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্র দুটি টাইগার ক্যাট প্রজাতি স্বীকৃত ছিল: উত্তরাঞ্চলীয় টাইগার ক্যাট বা অনসিলা (Leopardus tigrinus) এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় টাইগার ক্যাট (Leopardus guttulus)।

আরও সাম্প্রতিক সময়ে ক্লাউডেড টাইগার ক্যাট (Leopardus pardinoides)-কে পৃথক একটি প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি প্রজাতি সম্পর্কে আরও তথ্য জানা গেলে বিশেষজ্ঞরা বিড়ালগুলো এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষার জন্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবেন।

কমলা ও সাদা লোমওয়ালা একটি কচি আদা রঙের বিড়াল ক্রিম রঙের কার্পেটের ওপর ঝাঁপ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছে।

ছবির উৎস, Getty Images

এই আবিষ্কারের প্রভাব বিশ্বজুড়ে বিড়ালদের শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।

বন্য ও গৃহপালিত সব বিড়ালই জীববৈজ্ঞানিক পরিবার ফেলিডি (Felidae)-এর অন্তর্ভুক্ত। এতে ছোট গৃহপালিত পোষা বিড়াল থেকে শুরু করে বিশালাকার বাঘ পর্যন্ত প্রতিটি জীবিত বিড়াল প্রজাতি রয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমানে ৪১টি প্রজাতি স্বীকৃত। তবে নতুন এই আবিষ্কার এবং টাইগার ক্যাটের একাধিক প্রজাতি থাকার সম্ভাবনা সেই সংখ্যা ৪৪ বা ৪৫-এ নিয়ে যেতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, জিনগত গবেষণা আরও অগ্রসর হলে বিশ্বের বিড়াল প্রজাতির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ ছোট আকারের বন্য বিড়ালগুলো অতীতে বৃহৎ ও বেশি আকর্ষণীয় প্রজাতির তুলনায় অনেক কম বৈজ্ঞানিক মনোযোগ পেয়েছে।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়ামসের স্তন্যপায়ী প্রাণী বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু কিচেনার বলেন, দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দাগযুক্ত বিড়ালগুলো, যাদের টাইগার ক্যাট, টিগ্রিনা বা অনসিলা নামে ডাকা হয়, দীর্ঘদিন ধরেই “শ্রেণিবিন্যাসগত দুঃস্বপ্ন” হিসেবে পরিচিত।

তিনি বলেন, “এই বিড়ালগুলো বিভ্রান্তিকর, কারণ এদের দেখতে খুবই মিল এবং জাদুঘরে নমুনাও খুব কম। তাই জিনগত গবেষণায় আরও প্রজাতি শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা এখনও শিখছি কীভাবে তাদের আলাদা করা যায়।”

“সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির বিকাশ এবং নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে আরও বেশি বন্য নমুনা সংগ্রহের ফলে অবশেষে এই শ্রেণিবিন্যাসগত জট খুলতে শুরু করেছে।”

“অবশ্যই এটি বেশ কয়েকটি ধাপের মধ্যে সর্বশেষ ধাপ, এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্ময় অপেক্ষা করতে পারে।”

বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের জোনাস লেস্ক্রোয়ার বলেন, এই গবেষণা জাদুঘর সংগ্রহশালার গুরুত্বও তুলে ধরেছে।

তিনি বলেন, “এসব না থাকলে বলিভিয়া থেকে পাওয়া তথ্যের সঠিক ব্যাখ্যা করার জন্য হয়তো আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য থাকত না।”

“এটি সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র এ কারণে যে আমাদের কাছে এসব প্রাকৃতিক ইতিহাসভিত্তিক সংগ্রহ রয়েছে, যেগুলো স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।”