Home LATEST NEWS BANGLA দ্বিতীয় লংমার্চ থেকে যেসব দাবিদাওয়া জানাল জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট

দ্বিতীয় লংমার্চ থেকে যেসব দাবিদাওয়া জানাল জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট

3
0

Source : BBC NEWS

ঢাকায় উদ্বোধনী সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্য প্রধান জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান

ছবির উৎস, https://www.facebook.com/BJI.Official

Published

পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের দ্বিতীয় লংমার্চে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান গাজীপুরে এক সমাবেশে বলেছেন, বিএনপি সরকারই তাদের দাবি মানতে বাধ্য হবে। এর আগে সকালে ঢাকায় উদ্বোধনী সমাবেশে তিনি বলেছেন, বিরোধী দলের আট দফা এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ জোটের নেতারা ঢাকা-রংপুর লংমার্চ এর পথে পথে বিভিন্ন সমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ তাদের আট দফা মেনে নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

জোটের অন্যতম দল এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বিভিন্ন সমাবেশে বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ দাবি না মানলে সরকারকে গণঅভ্যুত্থানের মুখে পড়তে হবে।

যদিও সরকারি দল বিএনপি মনে করছে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যেসব বক্তব্য দিচ্ছে এগুলো নিতান্তই রাজনৈতিক বক্তব্য।

“তারা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতেই পারে। সরকারি দল হিসেব আমরা মনে করি সরকার জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যথাযথ কাজই করছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ডঃ খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, ১১ দলীয় ঐক্যের পরবর্তী লংমার্চ হবে খুলনায় ১০ই অক্টোবর। আর ২৪শে অক্টোবর লংমার্চ হবে সিলেটে।

বিভাগীয় শহরে লং মার্চ কর্মসূচিগুলো শেষ হওয়ার পর নভেম্বরে ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার কথা রয়েছে।

গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাসে পথসভা, স্থানীয় নানা ইস্যু উঠে এসেছে  সমাবেশগুলোতে

ছবির উৎস, https://www.facebook.com/BJI.Official

লং মার্চ যেমন হচ্ছে

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ১১ দলীয় ঐক্য যে লং মার্চ কর্মসূচি পালন করেছিল, তাতে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ৬ দফা দাবির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আজ সেটি বেড়ে ৮ দফা হয়েছে।

আজ সমাবেশের উদ্বোধন করে শফিকুর রহমান বলেছেন, “আজকের আট দফা, মনে রাখবেন এটা নয় দফা, দশ দফা হতে পারে। আবার জাতির প্রয়োজনে এটা যে কোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে। আমরা কোনো দলীয় দাবি নিয়ে মাঠে নামিনি। সরকার দাবি মেনে নিতে ব্যর্থ হলে কোনো কিছুতেই কাজ হবে না”।

সকালে মানিক মিয়া এভিনিউতে ১১ দলীয় ঐক্যের এই উদ্বোধনী সমাবেশে তাদের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক যোগ দিয়েছেন।

সমাবেশে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার তারেক রহমানের হাতে সুরক্ষিত নয়। কারণ সরকার এমন কিছু কালো আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে যা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণের পথ সুগম করছে।

“এভাবে চলতে থাকলে তারেক রহমানকে ঠিক করতে হবে কীভাবে তিনি পদত্যাগ করবেন,” বলেছেন তিনি।

রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া লংমার্চটি ঢাকা থেকে রওনা হয়ে ভোগরা, গাজীপুর বাইপাস, টাঙ্গাইল, হাটিকুমরুল হয়ে দুপুর দুইটার দিকে বগুড়ার দিকে যাচ্ছিল।

বগুড়ার শেরপুরে পথসভার দৃশ্য

ছবির উৎস, facebook.com/BJI.Official

লংমার্চের গাড়ি বহরে থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকার একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক রমিজ হোসাইন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, পথে বিভিন্ন জায়গায় ১১ দলীয় ঐক্যের সমর্থকদের রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নেতাদের অভ্যর্থনা জানাতে দেখেছেন তিনি।

তিনি জানান, হাজারের বেশি গাড়ির বহর নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতারা এই লংমার্চে অংশ নিচ্ছেন। তিনি জানান, যাত্রাপথে পথসভা ও সমাবেশগুলোতে নিজেদের দাবি তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারের কঠোর সমালোচনা করছেন বিরোধী নেতারা।

“তারা বলছেন যে সরকার অতীতের ফ্যাসিবাদী কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। সেজন্যই সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ দিয়েছে। একই সাথে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যর্থতার অভিযোগ করে সরকারের তীব্র সমালোচনাও করছেন তারা,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলে মি. হোসাইন।

গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের সাথে হওয়া গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ-সার সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই লংমার্চের আয়োজন করেছিল বিরোধী এই জোট।

১১ দলীয় ঐক্য জোটের দাবিগুলো হলো—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।

কিন্তু আজ রংপুরের উদ্দেশ্যে লংমার্চ শুরুর সময়ে দেওয়া সমাবেশে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ নেতারা ৮ দফা দাবির কথা জানিয়েছেন।

নতুন যেটি তারা যোগ করেছেন তাহলো- দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি।

৫ই সেপ্টেম্বর প্রথম  লংমার্চে অংশ নিয়েছিলেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা

ছবির উৎস, Bangladesh Jamaat-e-Islami

গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব বিষয়, সরকারি দল যা ভাবছে

ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রথম লংমার্চের পথসভা ও সমাবেশগুলোতে মূলত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন এবং নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের মতো বিষয়গুলোতে বেশি জোর দিয়েছিল ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।

কিন্তু রংপুরের লংমার্চে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় অনেকেই মনে করছেন, উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জেলায় জামায়াতের শক্ত অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতেই স্থানীয় ইস্যুকে যুক্ত করা হচ্ছে।

মানিক মিয়া এভিনিউতে উদ্বোধনী সমাবেশে শফিকুর রহমানের বক্তৃতাতেও জনজীবনের সংকটগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি তার বক্তব্যে চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সংকট ছাড়াও আইন শৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজির ইস্যুগুলোকে তুলে ধরেছেন।

সমবেত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, ”আপনাদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। কোনো দলীয় দাবি নিয়ে নামিনি। ১৮ কোটি মানুষের দাবি নিয়ে নেমেছি। গণভোটে হ্যাঁ বলেছে ৭০ ভাগ মানুষ। সরকার আপনাদের গণভোটকে অগ্রাহ্য করে আপনাদের অপমান করেছে। সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে রাস্তায় নেমেছি”।

“জনগণের রায়ের বাস্তবায়ন বাংলার মাটিতে হবে। এই বিএনপিই করতে বাধ্য হবে। পানি খাবে কিন্তু ঘোলা করে খাবে। আজ আট দফা দাবি দিয়েছি। জনগণের প্রয়োজনে এই আট দফা যে কোনো এক দফায় পরিণত হতে পারে। আমরা দাবি আদায় করে ঘরে ফিরবো,” বলেছেন তিনি।

বিরোধী দলের লংমার্চ ও এই কর্মসূচিতে বিরোধী দলীয় নেতাদের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ বলেছেন, দল থেকে এসব কর্মসূচির দিকে নজর আছে। যদিও তারা এখনই একে বেশি গুরুত্ব দিতে রাজি নন।

“বিরোধী দল তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে। তাদের যেসব দাবি বা বক্তব্য তা নিয়ে সরকারের তরফ থেকে সংসদ ও সংসদের বাইরে পরিষ্কার বক্তব্য দেওয়া হয়েছে এবং সেটিই দেশের মানুষ সমর্থন করছে। সরকার মনে করে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার নিয়ম মোতাবেক কাজ করে যাচ্ছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডঃ খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

এর আগে বিরোধী দলের প্রথম লংমার্চ কর্মসূচির পর সংসদে ওই কর্মসূচিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন যে, “জনগণকে বিভ্রান্ত করে অরাজকতা তৈরি চেষ্টা হচ্ছে”।

“আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না? গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম,” বলেছিলেন তিনি।

গত বারোই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। বিরোধী জোটের অভিযোগ বিএনপি সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে যে গণভোট হয়েছে তার রায় বাস্তবায়নের জন্য জামায়াত ও সমমনা দলগুলো শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এই জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথও নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের বিধান না থাকায় সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা এ ধরনের শপথ নেয়নি।

জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির জন্য বিরোধী দল থেকে সদস্যদের নাম চাওয়া হলেও তারা তা দেয়নি।

তখন কমিটির গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

এরপর থেকে বিরোধী দল থেকে ধারাবাহিকভাবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি করা হচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ই অগাস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি ঢাকাসহ চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লং মার্চ’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন জোটের নেতা শফিকুর রহমান।