Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক হাঁপানি থেকে যৌনক্ষমতা পর্যন্ত নানা সমস্যার ওষুধ, আবার জোঁকের তেল নাকি ব্যথা ও বিভিন্ন রোগ সারায়– এ ধরনের লোকবিশ্বাস বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহুদিন ধরেই প্রচলিত।
বিশেষ করে একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর তক্ষক দেখা গেলেও, ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে এর চাহিদা ও ব্যবহার নিয়ে প্রচলিত বিশ্বাসের কারণে চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এগুলো পাচার হতে থাকে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে দেশে তক্ষকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন এলাকায় এখনো জোঁকের তেল নামে নানা পণ্য বিক্রি হতে দেখা যায়। বিক্রেতারা দাবি করেন, এসব তেল বাত, জয়েন্টের ব্যথা, কোমরব্যথাসহ নানা রোগে কার্যকর।
একইভাবে শিয়ালের মাংস নিয়েও বিভিন্ন অঞ্চলে লোকবিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে।
কিন্তু এসব বিশ্বাসের পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা? সত্যিই কি এসব প্রাণী বা তাদের দেহ থেকে তৈরি কোনো উপাদান মানুষের রোগ সারাতে পারে?
ছবির উৎস, Getty Images
যেসব কারণে মানুষ শিয়াল মারে
খেঁকশিয়াল হোক কিংবা পাতিশিয়াল, বাংলাদেশে শিয়াল হত্যার ঘটনা হরহামেশাই ঘটে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। অনেকের ধারণা, শিয়াল অশুভ, ধূর্ত, ক্ষতিকর প্রাণী।
গ্রামাঞ্চলে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে যে শিয়াল হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশু নিয়ে যায়। এ কারণে মানুষ শিয়াল দেখলেই পিটিয়ে মেরে ফেলে। যদিও এসবের বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটায় পাতিশিয়াল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, খেঁকশিয়াল সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে।
তার মতে, “কৃষক মনে করে খেঁকশিয়াল তাদের মুরগি খেয়ে ফেলে। কিন্তু আমাদের গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। খেঁকশিয়াল খুবই বিরলভাবে এমনটা করতে পারে।”
পাতিশিয়াল আকারে বড় হওয়ায় তুলনামূলক বড় শিকার ধরতে পারে এবং গৃহপালিত হাঁস-মুরগির ওপর আক্রমণের অভিযোগও তার বিরুদ্ধেই বেশি শোনা যায়, বলছিলেন তিনি।
এছাড়া, রাতের বেলা শিয়ালের ডাককে বাংলাদেশের অনেক এলাকায় এখনও অমঙ্গলের লক্ষণ বলে মনে করা হয়। যদিও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
শিয়াল হত্যার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ, শিয়ালের মাংসের ঔষধি গুণ নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন লোকবিশ্বাস। অনেকে মনে করেন, শিয়ালের মাংস খেলে হাঁপানি, বাত বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ ভালো হয়। এসব দাবির পক্ষেও নির্ভরযোগ্য কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি বরিশালে সাতটি শিয়াল পিটিয়ে মারা হয়েছে। তখন অন্যান্য কারণের পাশাপাশি স্থানীয়রা বিভিন্ন গণমাধ্যমে এও বলেছিলো, শিয়ালের মাংস খেলে বিভিন্ন রোগ ভালো হয় বলে কেউ বা কারা রাতে শিয়ালের মাংস রান্না করে তা দিয়ে রুটি পিঠা খেয়েছেন।
এই ধরনের ঘটনার কথা প্রায়ই শোনা যায়। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান এ নিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ নেই। এটি ভ্রান্ত ধারণা যে এটি খেলে অসুখ ভালো হয়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও বলেন, শিয়ালের মাংস খেলে রোগ-বালাই হয় এমন কোনো দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ঔষধ আবিষ্কার বা আধুনিক ফার্মাকোলজির কোথাও এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায় না।
তার ভাষায়, “এসব মূলত কুসংস্কার বা লোকবিশ্বাস থেকে এসেছে।”
বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ-এর আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদও জানান যে শিয়ালের মাংসের ঔষধি গুণাগুন নিয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য তাদের কাছে নেই।
ছবির উৎস, Getty Images
তক্ষকের দাম কোটি টাকা?
তক্ষককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই কোটি টাকায় বিক্রির নানা প্রতারণার ঘটনা সামনে এসেছে।
বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, ক্যানসারসহ দুরারোগ্য রোগ সারানো বা যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির মতো কথিত ঔষধি গুণের কথা বলে তক্ষকের দাম কয়েক কোটি টাকা দাবি করা হয়।
এমনকি সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে এসব দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা বৈধ বাজারমূল্যের তথ্য নেই।
বরং, এ ধরনের গুজবকে পুঁজি করে প্রতারণার পাশাপাশি তক্ষক ধরার প্রবণতা বেড়েছে।
বিশেষ করে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে তক্ষক পাচার হয়েছে।
এর ফলে বাংলাদেশে একসময় প্রচুর দেখা গেলেও বর্তমানে এ প্রাণীর সংখ্যা কমে গেছে।
এখন থেকে এক যুগ আগে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে সেইসময়ের সরকারি কর্মকর্তারাও বলেছে যে তক্ষক নামের বণ্যপ্রাণীটির আটটি প্রজাতি রয়েছে এবং এগুলোকে বাংলাদেশে এখনো বিলুপ্ত ঘোষণা করা না হলেও এদের অস্তিত্ব সংকটে।
তারা তখন বলেছেন, বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকায় যে হারে এটির নিধন চলছে তাতে করে অচিরেই একে বিলুপ্ত প্রাণীর কাতারে ফেলতে হবে।
এ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেছেন, “তক্ষকের এই গুজব একটি দুষ্টু চক্র তৈরি হয়েছে। গত সাত-আট বছর ধরে এটা চলছে। তবে আগে মানুষ অনেক বেশি তক্ষক ধরতো, এখন কমে এসেছে।”
“কারণ মানুষ এখন বুঝে গেছে যে তাদেরকে বোকা বানানো হচ্ছে,” যোগ করেন তিনি।
এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত বলেন, “কোথাও কোথাও হয়তো তক্ষক খায়। তাই হয়তো ইচ্ছে করে এর দাম এভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।”
ছবির উৎস, Getty Images
জোঁকের তেল নাকি লিচ থেরাপি?
শিয়ালের মাংস ও তক্ষকের ঔষধি গুণাগুণের স্বপক্ষে কিছু পাওয়া না গেলেও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইউনানি শাস্ত্রে জোঁক দিয়ে চিকিৎসা হাজার বছরের পুরনো।
ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতিতে জীবন্ত জোঁক ব্যবহার করে শরীর থেকে দূষিত রক্ত বা তরল অপসারণের একটি পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে।
হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ-এর আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শরীরের কোথাও রক্ত জমাট বাঁধলে, যেমন-জয়েন্টে, আমরা (এক্সটার্নাল) লিচ থেরাপি দিয়ে ওই রক্তকে শরীর থেকে বের করে দেই।”
কিন্তু এই থেরাপির জন্য সুনির্দিষ্ট জোঁক লাগে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মেডিকেটেড জোঁক ওই রক্ত টেনে নেয়। এটা সব জোঁক দিয়ে হয় না। সাধারণ জোঁকে বিষাক্ততা থাকে, তাই ওগুলো দেই না আমরা। এটা চাষ করা হয়। মূলত ভারত থেকে আনা হয়। এখন দেশেও চাষ করে অনেকে।”
একটি ‘মেডিকেটেড’ জোঁককে বিশুদ্ধ করার পর তিন মাস পর আবার ব্যবহার করা যায়।
“একবার ব্যবহারের পর সেটিকে হলুদের পানিতে ভিজিয়ে রাখলে জোঁকটি বমি করে দেয়। তখন সে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিন মাস পর আবার সেটিকে ব্যবহার করা হয়,” যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, শরীরের বিভিন্ন ব্যথা নিরাময়ের জন্য ছাড়াও ডায়াবেটিসজনিত পায়ের ক্ষত (ডায়াবেটিক ফুট আলসার), এমনকি ব্রণ দূর করতেও লিচ থেরাপি দেওয়া যায়।
তবে জোঁকের তেল দিয়েও বাত, ব্যথা, যৌনসমস্যাসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার দাবি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত বলেন, “জোকের তেল কবিরাজরা বিক্রি করে। সাপের বিষ, মাছের তেল, মৌমাছির হুল থেকে অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায়। বিদেশে কিছু প্রাণীর বিষ থেকেও ওষুধ হতে পারে। কিন্তু জোঁকের তেলের কোনো ঔষধি গুণাগুণ নেই।”
ছবির উৎস, Getty Images
স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কোথায়? আইনে কী আছে?
আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা বিস্তৃত হওয়ার পরও বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের ফুটপাত ও গ্রামের হাটবাজারে জোঁকের তেল দিয়ে চিকিৎসার প্রচার দেখা যায়।
যদিও প্রকাশ্যে ক্যানভাসিং করে এ ধরনের চিকিৎসা দেওয়া আইনসম্মত নয়।
এদিকে, শিয়াল ও তক্ষক নিয়ে আইনে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়া আছে।
বাংলাদেশের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা ), ২০২৬’ আইনের তফসিল এক-এর খ ও গ অনুযায়ী, খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়াল সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।
বলা হয়েছে, গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন ব্যতীত অথবা লাইসেন্স বা পজেশন সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো অবস্থাতেই এই দুই প্রাণীকে শিকার, উত্যক্ত, পরিবহণ, ক্রয়-বিক্রয়, আমদানি-রপ্তানি করা যাবে না।
তফসিল এক (গ) অনুযায়ী তক্ষককেও সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার।
এ নিয়ে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শিয়াল নিয়ে কুসংস্কার আছে। অনেকে বলে, এর তেল গায়ে মাখলে রোগ-বালাই যায়। তক্ষকের ক্ষেত্রে আমরা আশেপাশের দেশগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনা করে দেখেছি, আন্তর্জাতিকভাবে এর কোনো মূল্য নেই আসলে।”
কিন্তু আইন অনুযায়ী শিয়াল ও তক্ষক দু’টোই সংরক্ষিত করে তিনি জানান, আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে বন বিভাগ, পুলিশ, কাস্টমস, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড– এই পাঁচ সংস্থা সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী বা আলামত জব্দ করতে পারে এবং তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
যদিও বণ্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নিয়ে বাংলাদেশে আইন থাকলেও এর প্রয়োগ নেই।
এদিকে, আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে খেঁকশিয়ালকে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ এবং তক্ষককে ‘লিস্ট কনসার্ন’ (ঝুঁকি সর্বনিম্ন) প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০২৬ সালেও তক্ষকের সংরক্ষণ অবস্থার মূল্যায়ন করেছে।
“তাতে এসেছে যে প্রাণীটি এখনও লিস্ট কনসার্ন অবস্থায় রয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উদ্বেগের বিষয় হলো, এটিকে বাণিজ্যিকভাবে প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা হয়,” বিবিসি বাংলাকে জানান আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম।
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত বলেন, শিয়ালের মাংস কিংবা তক্ষক কাঁচা খেলে সেগুলোর মাঝে অজানা বিষাক্ত কিছু থাকলে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং তখন তা থেকে কোনো না কোনো শারীরিক অসুস্থ দেখা দিতে পারে।




