Home LATEST NEWS BANGLA শ্রীলঙ্কায় ‘সবচেয়ে বড়’ গণকবরের সন্ধান, ৫৭২ জনের কঙ্কাল খুঁজে পেলেন শ্রমিকেরা

শ্রীলঙ্কায় ‘সবচেয়ে বড়’ গণকবরের সন্ধান, ৫৭২ জনের কঙ্কাল খুঁজে পেলেন শ্রমিকেরা

3
0

Source : BBC NEWS

জেয়ারুবি জেয়াবালানের বয়স ছিল ১২ বছর, যখন তার বাবা কান্দাইয়া জয়পালান নিখোঁজ হন

ছবির উৎস, Ranjan Arun Prasadh, BBC

গত ফেব্রুয়ারিতে উত্তর শ্রীলঙ্কায় যখন একটি গণকবরের সন্ধান মেলে, সেটি কোনো পরিকল্পিত খননের ফল ছিল না।

সেসময় জাফনা অঞ্চলের চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশান সম্প্রসারণের জন্য খননকাজ করছিলেন শ্রমিকেরা, তখন তারা সেখানে হঠাৎ মানবদেহের অবশিষ্টাংশ খুঁজে পেতে শুরু করেন। এরপর তা নিয়ে একটি তদন্ত শুরু হয়।

অগাস্টের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেখানে খননের তৃতীয় ধাপ সম্পন্ন করেন। এ সময় তারা শিশু ও নবজাতকসহ মোট ৫৭২ জন মানুষের কঙ্কালাবশেষ খুঁজে পান।

সেখানে মৃতদের সঙ্গে তাদের জীবনের নানা ব্যবহার্য জিনিসও পাওয়া যায়, যেমন চুড়ি, একটি স্কুলব্যাগ, একটি দুধের বোতল।

এটি শ্রীলঙ্কায় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবরের স্থান বলে মনে করা হচ্ছে।

এই গণকবরের অস্তিত্ব নিয়ে আগে কিছু গুঞ্জন ছিল।

দেশটিতে কয়েক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সময় একজন তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হওয়া এক সেনাসদস্য এমন একটি গণকবরের কথা বলেছিলেন, যেখানে শত শত মরদেহ ছিল।

অধিকারকর্মী গোষ্ঠীগুলোর মতে, সেখানে নিখোঁজ হওয়া বেসামরিক লোকজনের মরদেহ থাকতে পারে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রমাণ ছিল না।

আর এই আবিষ্কার যতই বিধ্বংসী হোক না কেন, এটি জেয়ারুবি জেয়াবালানের মতো মানুষের মনে বহু আশার সঞ্চার করেছে।

তার বাবা ছিলেন সেই হাজার হাজার মানুষের একজন, যারা কয়েক দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন।

জেয়াবালান এবং তার মতো স্বজন হারানো পরিবারগুলো আশা করছে, তাদের প্রিয়জনদের ঠিক কী হয়েছিল তার জবাব হয়তো এই মরদেহগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

বহু তামিলের বিশ্বাস, এই কবরটিতে রয়েছে গৃহযুদ্ধ চলাকালে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকারদের দেহাবশেষ।

তারা একটি তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।

গণকবরে পাওয়া দেহাবশেষের ফরেনসিক টেস্ট করে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করছে কর্তৃপক্ষ

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

তবে চেম্মানিতে খননপ্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগিয়েছে, যা এই পরিবারগুলোর ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে যেন, যারা নিজেদের নিখোঁজ স্বজনের শেষ পরিনতি কী হয়েছিল সে সম্পর্কে উত্তর খুঁজছেন।

এদিকে, পূর্বে শনাক্ত করা একটি গণকবরের কাছাকাছি শত শত দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়ায় তামিলদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করে আসছিলেন।

অনেকের আশঙ্কা, সত্য উদঘাটনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে শেষ পর্যন্ত এই গণকবর জনসাধারণের দৃষ্টি থেকে হারিয়ে যাবে।

ফলে এটি শ্রীলঙ্কার উত্তর অংশে নতুন করে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জবাবের খোঁজে অপেক্ষা

শ্রীলঙ্কা, বিশেষ করে তামিল অধ্যুষিত উত্তর ও পূর্বাঞ্চল, কয়েক দশক ধরে সংঘাতের শিকার হয়েছে।

ওই অঞ্চলে ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধ দেশটিকে জাতিগত বিভাজনের রেখায় ভাগ করে দেয়।

তামিল টাইগার বিদ্রোহীরা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে লড়াই করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, বছরের পর বছর ধরে সিংহলী-প্রধান সরকারের পক্ষ থেকে পদ্ধতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা।

২৬ বছর স্থায়ী এই সংঘাতে আনুমানিক এক লাখ মানুষ নিহত হয়।

এছাড়া প্রায় ২৩ হাজার মানুষ, যাদের বেশিরভাগই তামিল, নিখোঁজ হয়ে যান।

নিরাপত্তা বাহিনী এবং তামিল টাইগার উভয়ের বিরুদ্ধেই নৃশংসতা ও অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

গণকবর থেকে উদ্ধার হওয়া জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল একটি দুধ খাওয়ার বোতল

ছবির উৎস, Kumanan Kanapathippillai, BBC

১৯৯৫ সালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলাম – এলটিটিইর কাছ থেকে জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করে।

এটি যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০৯ সালে টাইগারদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে সেনাবাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ করলে পুরো চেম্মানি এলাকা একটি কঠোর নিরাপত্তা অঞ্চলের অংশ হয়ে যায়। সেখানে সেনা শিবির, চেকপয়েন্ট ও নিরাপত্তা পোস্ট স্থাপন করা হয়।

চেম্মানিতে কবরস্থানের কাছেও একটি সেনা শিবির ছিল।

তখন কেউ কেউ জাফনা অঞ্চলকে “একটি উন্মুক্ত কারাগার” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আর সেই সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে গুম করার অভিযোগ ওঠে, যদিও শ্রীলঙ্কার সরকারগুলো সবসময় তা অস্বীকার করে এসেছে।

জেয়ারুবি জয়পালান, যিনি বর্তমানে জাফনায় বসবাস করেন, বিবিসিকে বলেন, “১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি ১২ বছর বয়সী ছিলাম, যখন আমার বাবাকে চেম্মানি এলাকার কাছে একটি চেকপয়েন্ট থেকে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী আটক করে নিয়ে যায়। এরপর তার কী হয়েছিল, আমরা আজও জানি না।”

তিনি স্মরণ করেন, তার বাবার নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর পরিবারটি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং মরিয়া হয়ে তথ্যের খোঁজে জাফনার বিভিন্ন সেনা শিবির ও পুলিশ স্টেশনে ঘুরে বেড়ায়।

কিন্তু তিনি আর কখনও ফিরে আসেননি।

জেয়ারুবির বাবা কান্দাইয়া জয়পালান ছিলেন একজন সরকারি কর্মচারী। পাশাপাশি তিনি চেম্মানির কাছেই একটি সড়কপাশের ক্যাফে পরিচালনা করতেন।

জেয়ারুবি বলেন, “আমি অনেকের সঙ্গে চেম্মানির গণকবর পরিদর্শন করেছি এ আশায় যে কিছু উত্তর পাব। কিন্তু আমরা কোনো বস্তুগত প্রমাণ পাইনি। আমরা মানবদেহের অবশিষ্টাংশের বিস্তারিত ফরেনসিক বিশ্লেষণ চাই।”

কান্দাইয়া জয়পালান নিখোঁজ হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে একই এলাকায় ১৮ বছর বয়সী তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারস্বামী নিখোঁজ হন।

১৯৯৮ সালে কলম্বোর একটি আদালত কুমারস্বামীকে ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধে এবং তার পরিবারের আরও তিন সদস্যকে হত্যার দায়ে পাঁচ সেনাসদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

সেসময় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।

পরে তাদের মরদেহ চেম্মানি এলাকায় সমাধিস্থ অবস্থায় পাওয়া যায়।

নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

এটি সংঘাতকালীন সবচেয়ে কুখ্যাত মামলাগুলোর একটি।

বর্তমানে যে গণকবর তদন্তাধীন, তা কুমারস্বামী ও অন্যদের দেহাবশেষ পাওয়া স্থানের ১০০ মিটারের মধ্যেই অবস্থিত।

আদালতে দেওয়া এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্যে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক সেনাসদস্য সোমারাত্নে রাজাপাক্ষে অভিযোগ করেন, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিহত ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষকে চেম্মানিতে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

তার এই দাবি এক বছর পর চেম্মানিতে প্রথম খননের পথ খুলে দেয়। তখন তদন্তকারীরা ১০টিরও বেশি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করেন।

মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেছিলেন, এসব দেহাবশেষ গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বা বিচারিক ব্যবস্থায় এ অনুমানকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

অধিকারকর্মীদের দাবি, তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধ চলমান থাকায় তৎকালীন সরকার তদন্ত এগিয়ে নেয়নি এবং কেন নেয়নি তাও ব্যাখ্যা করেনি।

একই এলাকায় আরেকটি গণকবরের সন্ধান পাওয়ায় এখন জবাবদিহিতার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে।

“প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটি কোনো সাধারণ কবরস্থান নয় এবং এটি প্রচলিত হিন্দু সৎকার প্রথার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়,” বলেন গত বছর চেম্মানিতে পরিদর্শন পরিচালনাকারী শ্রীলঙ্কা মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার গেহান গুনাতিলেকে।

অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্প কয়েকটি দেহাবশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে কবর দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।

অধিকাংশ দেহাবশেষ কাপড়বিহীন অবস্থায় পাওয়া গেছে, সেগুলো ঘনভাবে একসঙ্গে রাখা ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে একটির ওপর আরেকটি স্তূপ করে রাখা হয়েছিল।

কবরগুলো ছিল অগভীর, যেখানে মরদেহ ভূপৃষ্ঠের মাত্র এক থেকে দুই মিটার নিচে সমাহিত ছিল।

গত বছর এক প্রতিবেদনে শ্রীলঙ্কা মানবাধিকার কমিশন বলেছিল, “সমাহিতকরণগুলো অবৈধ ছিল এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”

চেম্মানিতে নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে ছবি হাতে এক মা

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

অতীতের তদন্ত কোনটিই বিচার পর্যন্ত পৌঁছায়নি

সংঘাতের সময় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো নতুন এই গণকবর আবিষ্কারের পর প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

তাদের একজন ৬৫ বছর বয়সী সুসিলা।

তিনি তার ছেলে জ্ঞানাসীলান রবির সন্ধান করছেন, যাকে ২০০৭ সালে ২৪ বছর বয়সে শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

তিনি বিবিসিকে বলেন, “সে ছিল আমার একমাত্র ছেলে। তাকে স্মরণ করে আমি রোজ ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠি। তাকে ছাড়া আমার জীবন শূন্য।”

তিনি চেম্মানির কবরস্থল পরিদর্শন করেছিলেন, কিন্তু তার ছেলে সেখানে সমাধিস্থ হতে পারে এমন কোনো প্রমাণ, অর্থাৎ পোশাক বা ব্যক্তিগত কোন ব্যবহার্য সামগ্রী, খুঁজে পাননি।

উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা এখনো করা হয়নি।

এখন পর্যন্ত চেম্মানি থেকে উদ্ধার হওয়া সব দেহাবশেষ আদালতের হেফাজতে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

গণকবরের প্রধান প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক রাজ সোমদেব বিবিসিকে বলেন, “আমরা একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রস্তুত করছি এবং সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সেটি আদালতে জমা দেওয়া হবে।”

দেহাবশেষের বয়স নির্ধারণে বিস্তারিত পরীক্ষার জন্য কিছু নমুনা বিদেশে পাঠানো হতে পারে।

মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নির্ধারণে পৃথক চিকিৎসাবিষয়ক বিশ্লেষণেরও প্রয়োজন হবে।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন স্থানে ২০টিরও বেশি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে।

তবে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে জোরপূর্বক গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোটি নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা যায়নি, এবং কোনো ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি।

পূর্ববর্তী গণকবরগুলোর তদন্তে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার কারণে নতুন তদন্ত ঠিক কী অর্জন করবে, তা নিয়ে অনেক তামিলের মধ্যে সংশয় রয়েছে।

তারা ২০১৮ সালে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মান্নারে আবিষ্কৃত আরেকটি গণকবরের তদন্তের ফলাফলের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ৩৫০টিরও বেশি কঙ্কালাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল।

সুসিলা ছেলে জ্ঞানাসীলান রবির ছবি ধরে আছেন, যাকে ২০০৭ সালে ২৪ বছর বয়সে শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী তুলে নিয়ে যায়।.

ছবির উৎস, Kumanan Kanapathippillai, BBC

তদন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি, ফলে বহু পরিবারকে হতাশ হতে হয়েছিল।

তারা চায়, বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নেওয়া হোক।

প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সরকার বলছে, তারা তদন্তে পুরোপুরি সহযোগিতা করছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ক্ষমতায় আসার পর দিসানায়েকে ন্যায়বিচার ও জাতিগত পুনর্মিলনের পথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

তবে তার সরকার জাতিগত সংঘাতের সময় সংঘটিত অভিযোগিত যুদ্ধাপরাধ তদন্তে কোনো আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার কঠোর বিরোধিতা করে, যা তামিলদের হতাশ করেছে।

শ্রীলঙ্কার বিচারমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কারা বিবিসিকে বলেন, “আমরা চেম্মানিতে খননকাজ চালিয়ে যাব।”

তিনি বলেন, “আমাদের কঙ্কালগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে এবং জানতে হবে এই মানুষদের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে। এরপর আমাদের ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে।”

তার দাবি, সরকার পরিবারগুলোকেও তাদের ডিএনএ দিতে অনুরোধ করেছে, যাতে পরে তা দেহাবশেষের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়।

জুন মাসে চেম্মানি পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী ন্যায়বিচার ও সত্য উদঘাটনের লক্ষ্যে তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন।

তিনি আরও বলেন, খননকাজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হবে।

শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার ওয়ারুনা গামাগে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার পর বেসামরিক লোকজনকে কবর দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, “সব অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করতে হবে।”

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো চেম্মানির গণকবর নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন।

ছবির উৎস, Kumanan Kanapathippillai, BBC

আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান

অতীতের অপরাধ তদন্তে শ্রীলঙ্কার সরকারি সংস্থাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে অধিকারকর্মী গোষ্ঠীগুলো কঠোর সমালোচনা করেছে।

বহু বছরের আন্তর্জাতিক চাপের পর ২০১৮ সালে সরকার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলো তদন্তের জন্য স্বাধীন সংস্থা অফিস অব দ্য মিসিং পারসন্স (ওএমপি) গঠন করে।

কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, তাদের নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে সংস্থাটি খুব বেশি অগ্রগতি করতে পারেনি।

এ মাসের শুরুতে এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, “জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন ও হত্যার বহু মামলা স্থবির হয়ে রয়েছে, আর ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মীরা হুমকি ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হচ্ছেন।”

জাতিসংঘ শ্রীলঙ্কাকে আহ্বান জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের পরিচয় শনাক্ত করতে, তাদের মৃত্যুর কারণ জানতে এবং কারা দায়ী তা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান রোরি মাঙ্গোভেন বিবিসিকে বলেন, “এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে ভুক্তভোগীরা গভীরভাবে হতাশ, কয়েক দশক ধরে বেদনা নিয়ে বেঁচে আছেন এবং অতীতের তদন্তগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছেন।”

তিনি বলেন, “আমি মনে করি আন্তর্জাতিক সহায়তা যুক্ত হলে এসব তদন্তের প্রতি আস্থা জোরদার হবে।”

ক্রমাগত শ্রীলঙ্কার সরকারগুলো যুদ্ধকালীন সংঘটিত নৃশংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

শ্রীলঙ্কায় আগের প্রতিবেদন তৈরির সফরগুলোতে আমি এমন বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছি, যারা কয়েক দশক ধরে নিজের স্বজনের শেষ পরিনতি কী হয়েছিল সে সত্য জানতে লড়াই করেছেন।

তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইতোমধ্যে মারা গেছেন, কিন্তু তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্য সম্পর্কে তারা কখনো জানতে পারেননি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকের সরকারের সামনে এখন দীর্ঘদিনের বিলম্ব ও অস্বীকারের ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সংঘাতকালে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে।

সুসিলা সত্যটা জানতে চান।

তিনি বলছিলেন, “আমি জানি না এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে আর কতদিন বাঁচব, কিন্তু আমি এর একটা শেষ দেখতে চাই।”

অতিরিক্ত প্রতিবেদন: রঞ্জন অরুণ প্রসাধ, বিবিসি তামিল সার্ভিস, কান্ডি; এবং কুমানান কানাপাথিপ্পিল্লাই, জাফনা।