Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, SAMEER KHAN
হিন্দু ধর্মীয় মেলা ‘সিংহস্থ ২০২৮’ এর প্রস্তুতির জন্য সড়ক প্রশস্তকরণের কাজকে কেন্দ্র করে আনুমানিক ৬৫০ বছরের পুরোনো বলে পরিচিত ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শাহী মসজিদের সামনে সোমবার সকালে পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষ হয়।
রোববার রাত থেকেই ছত্রি চক এলাকায় মসজিদটির কাছে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন।
সোমবার সকালের সংঘর্ষে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি পাথর ছোড়াছুড়ি হয়, এবং দফায় দফায় মারামারির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শাহী মসজিদ এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
সিংহস্থ মূলত উজ্জয়িনীতে ১২ বছর অন্তর হওয়া একটি হিন্দু ধর্মীয় মেলা, যেখানে ভক্তরা মহাকালেশ্বর মন্দিরে শিবের মহাকাল রূপের পুজো দিতে দূর দূরান্ত থেকে আসেন।
গতবার ২০১৬ সালের সিংহস্থ মেলায় প্রায় সাড়ে সাত কোটি ভক্তের সমাগম হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের তরফে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে এ বছর ১২ কোটি ভক্ত আসতে পারেন বলে ধারনা করা হচ্ছে।
হিন্দু ধর্মের মেলার আয়োজনকে কেন্দ্র করে শাহী মসজিদের একটি অংশ সরিয়ে সড়ক প্রশস্ত করার কাজ শুরু হয়, আর তা নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, মেলার সময় বাড়তি যানবাহনের চাপ ও ভক্তদের যাতায়াত সহজ করার জন্য ওই সড়ক প্রশস্ত করা জরুরি।
উজ্জয়িনীর কালেক্টর রৌশন সিং বলেন, “সিংহস্থ ২০২৮-এর প্রস্তুতির জন্য মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী রাস্তা চওড়া করা এবং অন্যান্য নির্মাণকাজ চলছে। সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ স্বেচ্ছায় এতে সহযোগিতা করছেন।”
তিনি বলেন, “সড়ক সম্প্রসারণের আওতায় চলে আসা নিজেদের বাড়ি বা ধর্মীয় স্থাপনা অনেক মানুষ নিজেরাই সরিয়ে নিচ্ছেন। ছত্রি চকে রাস্তার আওতায় পড়া শাহী মসজিদের অংশটিও মুসলিম সমাজের মানুষ নিজেরাই সরিয়ে নিচ্ছেন। আমি সকলের কাছে আবেদন করছি, কোনও গুজবে কান দেবেন না এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করুন।”
ছবির উৎস, ANI
বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে উজ্জয়িনীর শহর কাজি খলিক উর রহমান বলেন, “রোববার রাতে মসজিদ কমিটি ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে হওয়া বৈঠকের পর কমিটি ওই অংশটি নিজেরাই সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিছু মানুষ গুজবের কারণে ক্ষুব্ধ। এ কারণে সামান্য সংঘর্ষও হয়েছে, তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।”
সড়ক চওড়া করা নিয়ে বিবাদ কেন?
উজ্জয়িনী নগর নিগম (পৌরসভা) জানিয়েছে, উজ্জয়িনী উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০৩৫-এর আওতায় সড়ক চওড়া করার কাজ চলছে।
নগর নিগমের দাবি, সিংহস্থ ২০২৮-এর সময় উজ্জয়িনীতে বিপুল সংখ্যক ভক্ত আসবেন। তাই শহরের যান চলাচল ও মানুষের যাতায়াত আরও সহজ করতে রাস্তা প্রশস্ত করা জরুরি।
ফলে ওই রাস্তাটি ১৫ মিটার পর্যন্ত চওড়া করতে চায় কর্তৃপক্ষ। শাহী মসজিদও ওই একই রাস্তার অংশে অবস্থিত।
উজ্জয়িনী শহর কাজি খলিক উর রহমান বলেছেন, মুসলিম সম্প্রদায় সিংহস্থের বিরোধিতা করে না।
ছবির উৎস, SAMEER KHAN
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “সিংহস্থ আগে হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। মুসলিম সম্প্রদায় সবসময়ই এর সমর্থক ছিল। আমরা শুধু বলছি, বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে দেখা হোক এবং কোনও ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙা না হোক। কারণ এর মধ্যে অনেকগুলোই ঐতিহাসিক স্থাপনা। শাহী মসজিদের কথাই ধরুন, এটি প্রায় ৬৫০ বছর পুরোনো।”
মসজিদ কমিটির বক্তব্য, এর আগেও উজ্জয়িনীতে রাস্তা প্রশস্তকরণের কাজ হয়েছে, কিন্তু তখন ধর্মীয় স্থাপনাগুলিকে রক্ষা করার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
রোববার রাতে মসজিদ কমিটি ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে হওয়া বৈঠকের পর কমিটি রাস্তার আওতায় চলে আসা অংশটি নিজেরাই অপসারণ করতে সম্মত হয়েছে।
আদালতে খারিজ মুসলিম পক্ষের আবেদন
গত কিছুদিন ধরে চলা বিতর্কের মধ্যে নয়ই সেপ্টেম্বর শাহী মসজিদের একটি অংশ অপসারণের জন্য নগর নিগমের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা দুটি আবেদন মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট খারিজ করে দেয়।
আবেদনকারীরা জানিয়েছিলেন, রাস্তা প্রশস্ত করার এ পদক্ষেপের ফলে মসজিদের নামাজের জায়গার একটি অংশ, প্রায় ১২০ ফুট উঁচু মিনার এবং মজহার চক শাহী ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তারা সংবিধানের ১৪, ২৫ এবং ২৬ অনুচ্ছেদের অধীনে নিজেদের অধিকারের কথা উল্লেখ করে আবেদন করেছিলেন।
বিচারপতি সন্দীপ এন ভাটের বেঞ্চ বলেছিল, নগর নিগম নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া মেনে কাজ করছে এবং প্রভাবিত পক্ষদের আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
ছবির উৎস, shrimahakaleshwar.mp.gov.in
তবে, মসজিদ পক্ষের যুক্তি ছিল, এটি একটি ধর্মীয় স্থান হওয়ায় একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু আদালত সে যুক্তি খারিজ করে দেয়।
তবে, আদালতে জমা দেওয়া সরকারি নথি অনুযায়ী, একই সড়কে আগে ১০টি মন্দির এবং একটি মসজিদের অংশ অপসারণ করা হয়েছিল।
আদালতের আদেশে উজ্জয়িনীর প্রায় ৮০টি ধর্মীয় স্থাপনা-সংক্রান্ত নির্মাণের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপেরও উল্লেখ রয়েছে রায়ে।
আদালত বলেছিল, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিটি একটি ধর্মীয় স্থান বলে নগর নিগমের পদক্ষেপকে স্বেচ্ছাচারী বলে মনে করা যায় না।
সিংহস্থের প্রস্তুতির মাঝেই দেখা দিল বিতর্ক
শাহী মসজিদটি মহাকালেশ্বর মন্দির-এর প্রায় সামনেই এবং শিপ্রা নদীর কাছে অবস্থিত। মসজিদ কমিটি ও শহর কাজির দাবি, মসজিদটির বয়স প্রায় ৬৫০ বছর।
শহর কাজি জানিয়েছেন, মসজিদটি ১৩৯০ সালের দিকে নির্মিত হয়েছিল।
এদিকে, নয়ই সেপ্টেম্বরের রায়ের পর মসজিদ কমিটি বিষয়টি হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের সামনে উত্থাপন করেছে।
সোমবার ওই আবেদনের ওপর শুনানি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত সে নিয়ে কিছু জানা যায় নি।
তবে, মসজিদ কমিটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, হাইকোর্টের রায়ের পরে তারা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন।
ওদিকে, পৌরসভা আদালতে জানিয়েছিল, এ পদক্ষেপ শুধুমাত্র শাহী মসজিদকে কেন্দ্র করে নয়, বরং সড়ক প্রশস্তকরণের প্রক্রিয়ায় অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনার অংশও অপসারণ করা হয়েছে।




