Home LATEST NEWS BANGLA পৃথিবীতে কয়টি উত্তর মেরু আছে?

পৃথিবীতে কয়টি উত্তর মেরু আছে?

4
0

Source : BBC NEWS

মাঝখানে একটি মেরু ভালুক, বামদিকে হাতে আঁকা একটি কম্পাস এবং ডানদিকে একাধিক চিহ্নযুক্ত একটি খুঁটির সমন্বিত চিত্র; পেছনে উজ্জ্বল নীল পটভূমিতে ভাঙা সামুদ্রিক বরফ ও সাদা মেঘ দেখা যাচ্ছে।

Published

পড়ার সময়: ৬ মিনিট

সামুদ্রিক বরফের এক হিমায়িত ভূমি, মেরু ভাল্লুক, মেরুপ্রভা এবং মধ্যরাতের সূর্য – পৃথিবীর উত্তর মেরুকে নিয়ে এসব কথা আমরা সবাই হয়তো শুনেছি। কিন্তু আপনি কি জানেন যে উত্তর মেরুর সংজ্ঞা দেওয়া আসলে খুব সহজ নয় এবং এর একাধিক মেরু রয়েছে?

ব্রিটিশ অভিযাত্রী ও জলবায়ু বিজ্ঞানী ফেলিসিটি অ্যাস্টনের মতে, প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে “অনেকগুলো উত্তর মেরু” রয়েছে বলে অভিমত রয়েছে এবং তা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।

“যেকোনো সংজ্ঞা অনুযায়ী, দুটি পরম উত্তর মেরু রয়েছে; এর একটি হলো চৌম্বকীয় উত্তর মেরু এবং অন্যটি ভৌগোলিক উত্তর মেরু,” বিবিসি পডকাস্ট ‘দ্য ইনফিনিট মাঙ্কি কেইজ’-কে বলেন তিনি।

ভৌগোলিক উত্তর মেরু

অ্যাস্টন বলেন, ভৌগোলিক উত্তর মেরু হলো সেই জায়গা, “যেটার কথা সবাই ভাবে” যখন উত্তর মেরু নিয়ে কথা বলা হয়।

পৃথিবীকে সামান্য হেলানো একটি গোলক হিসেবে কল্পনা করুন। এরপর ভাবুন, এর কেন্দ্র দিয়ে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একটি কাঠি চলে গেছে। এই কাল্পনিক কাঠিটিই হলো পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ।

ভৌগোলিক উত্তর মেরু হলো সেই বিন্দু যেখানে কাল্পনিক দণ্ডটি পৃথিবীর পৃষ্ঠকে ছেদ করে, যা এক্ষেত্রে আর্কটিক মহাসাগরের পরিবর্তনশীল জল ও বরফের উপর অবস্থিত। একই অক্ষের অপর প্রান্তে অ্যান্টার্কটিকায় দক্ষিণ মেরু অবস্থিত।

একটি চিত্রে দুটি গোলক দেখানো হয়েছে; উপরেরটি ভৌগোলিক উত্তর মেরু নির্দেশ করে, যেখানে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ এর পৃষ্ঠের সাথে মিলিত হয় (একটি স্থির বিন্দু), এবং নিচেরটি চৌম্বকীয় উত্তর মেরু নির্দেশ করে, যেখানে পৃথিবীর চারপাশের চৌম্বক ক্ষেত্র রেখাগুলো উল্লম্বভাবে নিচের দিকে নির্দেশ করে (এটি কোনো স্থির বিন্দু নয়)।

অ্যাস্টন ব্যাখ্যা করেন, ভৌগোলিক উত্তর মেরু হলো “আমাদের গ্রহের একেবারে শীর্ষে, ৯০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত মেরু”। এখানেই সমস্ত দ্রাঘিমা রেখা এসে মিলিত হয়।

এটি একটি স্থির বিন্দু এবং পরিবর্তন হয় না – চৌম্বকীয় উত্তর মেরুর মতো নয়।

চৌম্বকীয় উত্তর মেরু

পৃথিবী একটি চৌম্বক ক্ষেত্র দিয়ে ঘেরা, যা গ্রহটির গলিত বহিঃস্থ কেন্দ্রে প্রবাহিত বৈদ্যুতিক প্রবাহের ফলে সৃষ্টি হয়। এটি সৌর বায়ু ও বিকিরণ থেকে আমাদের রক্ষা করতে সহায়তা করে।

একটি সাধারণ চুম্বকের মতোই পৃথিবীর দুটি চৌম্বক মেরু রয়েছে — একটি উপরে এবং একটি নিচে।

পৃথিবীর চারপাশের চৌম্বক ক্ষেত্ররেখার আকৃতি, যা চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক ও প্রাবল্য নির্দেশকারী একটি দৃশ্যমান মাধ্যম, একটি দণ্ড-চৌম্বকের চারপাশে অঙ্কিত ক্ষেত্ররেখার মতোই।

চৌম্বক উত্তর মেরু হলো পৃথিবীর সেই বিন্দু, যেখানে চৌম্বক ক্ষেত্র উল্লম্ব বা লম্বালম্বিভাবে নিচের দিকে নির্দেশ করে। এটি একটি কম্পাসের সাহায্যে পরিমাপ করা যায়, যা চৌম্বক উত্তরের দিকে নির্দেশ করে।

কিন্তু যেহেতু পৃথিবীর বহিঃস্থ মজ্জার গলিত ধাতু স্থান পরিবর্তন করে, তাই পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রও স্থান পরিবর্তন করে। এর মানে হলো, সময়ের সাথে সাথে চৌম্বক উত্তর মেরুও স্থান পরিবর্তন করে।

বামদিকে পৃথিবীর উপর থেকে দেখা একটি চিত্র রয়েছে, যেখানে নীল বিন্দুগুলো ভৌগোলিক উত্তর মেরুর স্থির অবস্থান এবং ১৮৩১, ১৯৯০ ও ২০২৫ সালে চৌম্বকীয় উত্তর মেরুর পরিবর্তনশীল অবস্থান নির্দেশ করছে; ডানদিকে একটি কম্পাসের চিত্র রয়েছে যার কাঁটাটি প্রায় ১টার অবস্থানে থাকা চৌম্বকীয় উত্তর মেরুর দিকে নির্দেশ করছে, যা ১২টার অবস্থানে থাকা ভৌগোলিক উত্তর মেরু থেকে ‘ডিক্লিনেশন অ্যাঙ্গেল’ দ্বারা পৃথকীকৃত।

“বহুদিন ধরে এটি উত্তর কানাডার কুইন এলিজাবেথ দ্বীপপুঞ্জ, নর্থওয়েস্ট টেরিটোরিজ এবং নুনাভুটে ঘোরাঘুরি করছিল,” অ্যাস্টন ব্যাখ্যা করেন, “কিন্তু তারপর গত ১০ বছরে এর গতি সত্যিই বাড়তে শুরু করেছে”।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ)-এর মতে, ২০১৯ সাল নাগাদ এটি বছরে ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার গতিতে চলছিল।

অ্যাস্টন উল্লেখ করেছেন যে, এখন চৌম্বকীয় উত্তর মেরু কানাডার চেয়ে সাইবেরিয়ার উপকূলের বেশি কাছে।

কখনও কখনও উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু উল্টে যেতে পারে, এই ঘটনাকে ভূ-চৌম্বকীয় মেরু বিপরীতকরণ বলা হয়।

আমরা প্রাচীন চৌম্বকীয় রেকর্ড থেকে জানি যে গত ১৬ কোটি বছরে এটি শত শত বার ঘটেছে, যার মধ্যে সর্বশেষটি ঘটেছিল প্রায় সাত লাখ ৮০ হাজার বছর আগে।

অন্যান্য উত্তর মেরু

উত্তর মেরুর অন্যান্য সংজ্ঞাগুলো ততটা প্রচলিত নয়, এবং এগুলোর মধ্যে কয়েকটি চৌম্বকীয় বা ভৌগোলিক সংজ্ঞাগুলোর চেয়েও বেশি বিতর্কিত।

ভূ-চৌম্বকীয় উত্তর মেরু মূলত চৌম্বক উত্তর মেরু থেকে ভিন্ন।

চৌম্বক উত্তর মেরু পৃথিবীর প্রকৃত চৌম্বক ক্ষেত্রের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। এর বিপরীতে, ভূ-চৌম্বক উত্তর মেরু হলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের একটি কাল্পনিক ও সরলীকৃত মডেলের উপর ভিত্তি করে গণনা করা একটি অবস্থান।

“এটা অনেকটা একটা তাত্ত্বিক উত্তর মেরুর মতো,” অ্যাস্টন ব্যাখ্যা করেন, “এটা এমন একটা পরিস্থিতি, যেখানে পৃথিবী সত্যিই এক ধরনের দণ্ড চুম্বক এবং আমাদের একটি নিখুঁত চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে যা অত্যন্ত সুন্দর, সুষম এবং অভিন্ন।”

তিনি আরও বলেন, ভূ-চৌম্বকীয় উত্তর মেরু অনেক কম্পিউটার মডেলে ব্যবহৃত হয়।

একটি সমতল, বরফাবৃত বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি নিচু দালানসহ একটি গ্রামের আকাশ থেকে তোলা দৃশ্য, যার পেছনে বরফে ঢাকা পর্বতমালা দেখা যাচ্ছে।

তারপর রয়েছে শীতলতার উত্তর মেরু, এবং দুর্গমতার উত্তর মেরু।

প্রথমটি হলো পৃথিবীর শীতলতম জনবসতিপূর্ণ স্থান, যা উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়ার ওইমিয়াকন নামের একটি গ্রাম বলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হয়।

শেষোক্তটি হলো আর্কটিক মহাসাগরের সেই বিন্দু যা স্থলভাগ থেকে সবচেয়ে দূরে এবং সব দিক থেকে সবচেয়ে দুর্গম।

এছাড়াও রয়েছে মহাজাগতিক উত্তর মেরু, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন।

এটি উত্তর আকাশের একটি কাল্পনিক বিন্দু, যেখানে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ সরাসরি মহাকাশের দিকে নির্দেশ করে। এটি ভৌগোলিক উত্তর মেরুর ঠিক উপরে আকাশে, ধ্রুবতারা বা পোলারিসের খুব কাছে অবস্থিত।

রাতের আকাশের একটি দীর্ঘ-এক্সপোজারের ছবি, যেখানে একটি কেন্দ্রীয় বিন্দুকে ঘিরে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকা তারার সারি দেখা যাচ্ছে; আকাশটির রঙ মাঝারি নীল এবং ছবির নিচের দিকে কয়েকটি গাছের চূড়া দেখা যাচ্ছে।

অ্যাস্টন ব্যাখ্যা করেন, “যদি আপনি কল্পনা করেন যে আকাশ আসলে একটি গোলক যা পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে, তাহলে সেই মহাজাগতিক গোলকের উত্তর মেরুকে যদি পৃথিবীর পৃষ্ঠে প্রক্ষেপ করা হয়, তাহলে কেউ কেউ বলেন, এটি হলো গ্রহটির পৃষ্ঠের ওপর আরেকটি উত্তর মেরু।”

উত্তর মেরু খুঁজে বের করা

যদিও বিভিন্ন ধরনের উত্তর মেরু রয়েছে, তাত্ত্বিকভাবে সেগুলোর অবস্থান নির্দিষ্ট করা বেশ সহজ। কিন্তু সেখানে গিয়ে সেগুলোর কয়েকটি—বিশেষ করে ভৌগোলিক উত্তর মেরু খুঁজে বের করাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ব্যাপার।

অ্যাস্টন স্মৃতিচারণ করে বলেন, “শেষবার যখন আমি স্কি করে ভৌগোলিক উত্তর মেরুতে গিয়েছিলাম, একটি হেলিকপ্টার আমাকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে আর্কটিক মহাসাগরের হিমায়িত পৃষ্ঠে নামিয়ে দিয়েছিল… এবং আমাকে নিজের পথ খুঁজে নিতে হয়েছিল। প্রতিটি দিক দেখতে হুবহু একই রকম।”

“তাহলে আপনি কী করেন? কম্পাস ব্যবহার করেন?” প্রশ্ন করেন তিনি।

মোটা পোশাক পরা পাঁচজন লোকের একটি সাদা-কালো ছবি, যাদের প্রত্যেকে একটি বড় পতাকা ধরে আছে এবং তারা বরফের একটি ঢিবির সামনে বরফে ঢাকা মাটিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

কিন্তু তিনি ব্যাখ্যা করেন, কম্পাসের সমস্যা হলো এটি ভৌগোলিক উত্তর মেরুর পরিবর্তে চৌম্বকীয় উত্তর মেরুর দিকে নির্দেশ করে।

আপনার গন্তব্য কোথায় হবে তা বের করার জন্য আপনি ডেক্লিনেশন নামক একটি বিষয় ব্যবহার করতে পারেন—যা হলো ভৌগোলিক উত্তর দিক এবং কম্পাসের কাঁটা যেদিকে নির্দেশ করে তার মধ্যবর্তী কোণ।

কিন্তু অ্যাস্টন বলেন, এই ডেক্লিনেশন “আপনার অবস্থানের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়”।

এবং আপনি যখন সেটা করার চেষ্টা করছেন, তখন আপনার দাঁড়ানো বরফটিও অনিয়মিতভাবে নড়াচড়া করছে, যা সবসময় একই গতিতে বা একই দিকে যায় না।

জিপিএস আরেকটি বিকল্প হতে পারে। কিন্তু তিনি বলেন, জিপিএস সিস্টেমগুলো প্রায়শই ব্যাটারিচালিত হয় এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় ব্যাটারি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়, তাই সবসময় সেগুলোর ওপর নির্ভর করা যায় না।

অন্যদিকে, সেক্সট্যান্টের মতো পুরোনো দিকনির্ণয় যন্ত্রগুলো সূর্যের ওপর নির্ভর করে, যা আকাশ খুব মেঘলা থাকলে বেশ কঠিন হয়ে পড়ে, অ্যাস্টন যোগ করেন।

“উত্তর মেরুতে যাওয়ার এই বিভিন্ন পদ্ধতিগুলোর প্রত্যেকটিরই নিজস্ব অসুবিধা রয়েছে, আর তাই শেষ পর্যন্ত আপনাকে এগুলোর একটা মিশ্রণই ব্যবহার করতে হয়,” তিনি উল্লেখ করেন।

পুরো ব্যাপারটাই অনেকটা আন্দাজের খেলা।