Home LATEST NEWS BANGLA ব্লুটুথ নামের পেছনে ভাইকিং রাজা ও ডেনমার্কের হাজার বছরের ইতিহাস

ব্লুটুথ নামের পেছনে ভাইকিং রাজা ও ডেনমার্কের হাজার বছরের ইতিহাস

3
0

Source : BBC NEWS

Viking king

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

মোবাইল ফোনের সঙ্গে হেডফোন কিংবা কম্পিউটার যুক্ত করতে ব্লুটুথ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন অনেকেই, কিন্তু আপনারা কি জানেন? এই আধুনিক প্রযুক্তির নামের পেছনে রয়েছে এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ইতিহাস।

জড়িয়ে আছেন ডেনমার্কের এক ভাইকিং রাজার কাহিনী।

ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে জেলিং নামের একটি ছোট শহর।

সেখানে রয়েছে প্রাচীন দুটি পাথরের স্তম্ভ, যাতে খোদাই করা আছে ওই রাজার শাসনামলের ইতিহাস। এই শিলালিপি থেকেই জানা যায়, কীভাবে তাঁর অদ্ভুত ডাকনাম থেকে বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত একটি প্রযুক্তির নাম এসেছে।

ব্লুটুথ নামে পরিচিত ভাইকিং রাজা

রাজা হ্যারল্ড গর্মসন ছিলেন দশম শতকে ডেনমার্কের শাসক। তার ডাকনাম ছিল ব্লুটুথ। প্রাচীন নর্স ভাষায় নামটি ছিল ব্লাতন (Blátǫnn)।

ইতিহাসবিদদের ধারণা, তার একটি দাঁত নীলচে হয়ে গিয়েছিল বা পচে গিয়েছিল। এ কারণেই তিনি এমন ডাকনাম পেয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। তবে তার মৃত্যুর প্রায় ১৫০ বছর পর প্রথম লিখিত নথিতে এই ডাকনামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

রাজা হ্যারল্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব ছিল ডেনমার্কে খ্রিষ্টধর্মের প্রচলন। ধারণা করা হয়, ৯৬৫ সালের দিকে তিনি এই পরিবর্তন আনেন।

হ্যারল্ডের নির্দেশে জেলিংয়ে স্থাপন করা দুটি প্রাচীন শিলালিপির মধ্যে বড়টিতে তার কৃতিত্বের কথা লেখা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি ডেনমার্ক ও নরওয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ডেনিশদের খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করেন।

শিলালিপিটিতে যিশুখ্রিষ্টের একটি চিত্রও খোদাই করা রয়েছে। এটি স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলে যিশুর প্রাচীনতম চিত্রগুলোর একটি বলে মনে করা হয়।

তখন উত্তর ইউরোপের বেশির ভাগ অঞ্চল ছোট ছোট ভূখণ্ডে বিভক্ত ছিল। এসব অঞ্চলে শাসন করতেন বিভিন্ন গোত্রের প্রধানেরা।

খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে রাজা হ্যারাল্ড নিজের ক্ষমতা আরও সুসংহত করার সুযোগ পান। একই সঙ্গে খ্রিষ্টান ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ডেনমার্কের সম্পর্ক জোরদার হয়। এতে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে ডেনমার্ককে ঐক্যবদ্ধ করাও সহজ হয়।

ডেনমার্কের জেলিংয়ে অবস্থিত কিংস জেলিং অভিজ্ঞতা কেন্দ্র ও জাদুঘরের কিউরেটর অ্যাডাম বাক বলেন, ভাইকিং যুগের প্রায় ২০০ বছর পর ডেনমার্কে রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় উত্তর ইউরোপের মানুষকে অনেক কিছু শিখতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে তারা ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। খ্রিষ্টধর্ম কীভাবে তাদের কাজে আসতে পারে, তা-ও বুঝতে শেখেন। পাশাপাশি একটি রাষ্ট্রে কীভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা যায়, সে সম্পর্কেও তাদের ধারণা তৈরি হয়।

জেলিংয়ের প্রাচীন শিলালিপি

ডেনমার্কের ইতিহাসে জেলিং কেন গুরুত্বপূর্ণ

ডেনমার্কের জেলিং শহরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাইকিং রাজা হ্যারাল্ড ব্লুটুথের নাম। তার বাবা গর্ম নিজের স্ত্রী থাইরার স্মৃতিতে শহরটির দুটি প্রাচীন শিলালিপির মধ্যে ছোট ও পুরোনোটি স্থাপন করান।

ধারণা করা হয়, ডেনমার্কের ভূখণ্ডে ‘ডেনমার্ক’ নামটির প্রথম লিখিত উল্লেখ রয়েছে এই শিলালিপিতেই।

কাছের ভেইলে শহরের বাসিন্দা অ্যান হাভগার্ড মিকেলসেন বলেন, “আমরা এটিকে ডেনমার্কের জন্মসনদ বলি।” সেই হিসেবে জেলিংকেই ডেনমার্কের জন্মস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বর্তমানে জেলিংয়ের বাসিন্দা মাত্র চার হাজারের মতো। তবে রাজা হ্যারাল্ড ব্লুটুথের শাসনামলে এটি ছিল ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

একসময় জেলিং ছিল পৌত্তলিক ধর্মাবলম্বীদের সমাধিস্থল। হ্যারল্ডের শাসনামলে জায়গাটি এমন এক কেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে প্যাগান ও খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য পাশাপাশি বিকশিত হয়েছিল।

বর্তমানে জেলিংয়ের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভগুলো যেখানে একসময় কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিল, সেখানে সাদা খুঁটি বসানো হয়েছে। এ ছাড়া শত শত চিহ্ন দিয়ে বিশাল এক জাহাজের আকৃতির কাঠামোর সীমানা দেখানো হয়েছে। ধারণা করা হয়, এটি রাজা হ্যারল্ডের মা থাইরার স্মরণে তৈরি করা হয়েছিল।

এখানে রয়েছে দুটি প্রাচীন সমাধির ঢিবি ও একটি খ্রিষ্টীয় গির্জা। জাদুঘরের কিউরেটর অ্যাডাম বাকের মতে, এই পুরো এলাকা শুধু সাহসী ভাইকিং যোদ্ধা কিংবা থর ও ওডিনের মতো দেবতাদের ইতিহাস তুলে ধরে না। বরং এখানে ফুটে উঠেছে রাজনীতি ও পরিবর্তনের ইতিহাস। পুরোনো বিশ্বাস ও ঐতিহ্য থেকে নতুন ব্যবস্থায় উত্তরণের চিত্র।

১৯৯৪ সালে জেলিংয়ের সমাধির ঢিবি, প্রাচীন শিলালিপি ও গির্জাকে ডেনমার্কের প্রথম ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

কাছেই রয়েছে কিংস জেলিং দর্শনার্থী কেন্দ্র। সেখানে বিভিন্ন ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ভাইকিংদের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে খ্রিষ্টধর্মে উত্তরণের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে, জেলিংয়ের দুটি প্রাচীন শিলালিপি কাচের সুরক্ষাবেষ্টনীর ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলোকে ডেনমার্কের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের স্মারক এবং দেশটির ‘জন্মসনদ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জেলিংয়ের গির্জা, সমাধির ঢিবি ও প্রাচীন শিলালিপি ডেনমার্কের প্রথম ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থলের অংশ।

ভাইকিং রাজা থেকে ব্লুটুথ প্রযুক্তি

এক হাজার বছরেরও বেশি সময় পর রাজা হ্যারল্ডের নাম নতুনভাবে পরিচিতি পায়। বিভিন্ন অঞ্চলকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য পরিচিত এই রাজার নাম যুক্ত হয় আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে।

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে তোশিবা, আইবিএম, নকিয়া, ইন্টেল ও এরিকসনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা নতুন একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছিলেন। এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি যন্ত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে।

নতুন এই প্রযুক্তির জন্য তাদের একটি সাংকেতিক নাম প্রয়োজন ছিল। পরে সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এক হাজার বছরেরও বেশি আগের ভাইকিং রাজা হ্যারল্ড ব্লুটুথের ইতিহাস।

আমেরিকান প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ইন্টেলের প্রকৌশলী জিম কার্ডাচ তখন সুইডিশ প্রকৌশলীদের সঙ্গে কাজ করছিলেন। একসময় তাদের আলোচনায় উঠে আসে ভাইকিংদের ইতিহাস।

বিষয়টি তাকে আগ্রহী করে তোলে। তিনি ভাইকিংদের ইতিহাস নিয়ে একটি বই পড়তে শুরু করেন। বইটি বর্তমানে ডেনমার্কের কিংস জেলিং দর্শনার্থী কেন্দ্রে প্রদর্শিত হচ্ছে।

বইটি পড়ে রাজা হ্যারল্ড ব্লুটুথের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। এই রাজা ডেনমার্ক ও নরওয়েকে একত্র করেছিলেন। কার্ডাচের মনে হয়, নতুন এই প্রযুক্তিও একইভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি যন্ত্রকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে। সেখান থেকেই প্রযুক্তিটির নামকরণের জন্য রাজা হ্যারল্ডের নাম তার মাথায় আসে।

প্রযুক্তিটির আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তৈরির আগেই ‘ব্লুটুথ’ নামটি প্রকাশ্যে চলে আসে। এরপর এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায় প্রযুক্তি ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়।

জেলিংয়ের প্রাচীন শিলালিপিতে পৌত্তলিক ভাইকিং শাসন থেকে খ্রিষ্টীয় রাজ্যে ডেনমার্কের রূপান্তরের ইতিহাস লিপিবদ্ধ রয়েছে।

জেলিংয়ের জাদুঘরের কিউরেটর অ্যাডাম বাক বলেন, “প্রচার ও জনসংযোগ দলের সদস্যরা নামটি পছন্দ করেননি। কারণ, ‘ব্লুটুথ’ নামটি শুনলে তাঁদের দাঁতের অপরিচ্ছন্নতার কথা মনে হতো।”

তিনি বলেন, নামটি নিয়ে তাদের উদ্বেগ ছিল। প্রযুক্তিটির কাজ সহজে বোঝানো যায়, এমন আরও অনেক নামও তারা প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু সেগুলো ছিল বেশ একঘেয়ে।

বাকের মতে, ‘ব্লুটুথ’ নামটি আলাদা ও সহজে মনে রাখার মতো হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ব্লুটুথের লোগোটিও প্রযুক্তিটির পরিচিতি ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। প্রাচীন নর্স ভাষার দুটি বর্ণের রুনিক প্রতীক দিয়ে এটি তৈরি। রাজা হ্যারল্ড ব্লুটুথের নামের আদ্যক্ষর ‘এইচ’ ও ‘বি’ মিলিয়েই এই লোগোর নকশা করা হয়েছে।

২০২৩ সালে ব্লুটুথ প্রযুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জিম কার্ডাচ ও এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন উদ্যোক্তা ডেনমার্কের কিংস জেলিং জাদুঘর পরিদর্শন করেন। সেখানে তারা মজা করে রাজা হ্যারল্ডের অনুমতি ছাড়া তার নাম ব্যবহারের জন্য ‘ক্ষমা’ চান।

জাদুঘর কর্তৃপক্ষও তাদের সেই ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহণ করে। পাশাপাশি, আগামী এক হাজার বছরও প্রযুক্তিটির নাম হিসেবে ‘ব্লুটুথ’ ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

জাদুঘরের কিউরেটর অ্যাডাম বাক বলেন, “হ্যারল্ড নিজের কৃতিত্ব জাহির করতে পছন্দ করতেন। আমার মনে হয়, আজ প্রতিদিন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তার নাম উচ্চারণ করেন, এটা জানতে পারলে তিনি খুব খুশি হতেন।”