Home LATEST NEWS BANGLA ‘ফেরিটিন ফেস’ কি? চেহারা দেখে কি রক্তশূন্যতা শনাক্ত করা যায়?

‘ফেরিটিন ফেস’ কি? চেহারা দেখে কি রক্তশূন্যতা শনাক্ত করা যায়?

6
0

Source : BBC NEWS

ক্যামেরার দিকে মুখ করে থাকা লুসির পাশাপাশি দুটি ছবি, যেখানে তার লম্বা কালো চুল রয়েছে এবং ছবিগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তোলা।

“আপনার কি ফেরিটিন ফেস?” টিকটকে এক তরুণী নিজের আগে-পরের ছবির সাথে চোখের নিচের কালো দাগ, ফ্যাকাশে ত্বক এবং ভঙ্গুর চুলের দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্নটি করেন। এই কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের মতে, তার শরীরে আয়রনের মাত্রা বেড়ে যাওয়াই এর কারণ।

টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামে সম্প্রতি এমন অসংখ্য ভিডিও ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়ছে, যেগুলোতে দাবি করা হচ্ছে যে, ফেরিটিন মানে শরীরে আয়রন সঞ্চয়কারী প্রোটিন কমে গেলে তার দৃশ্যমান ছাপ মুখে দেখা যেতে পারে।

ওপরের ছবিটি তেমন অসংখ্য পোস্টেরই একটি।

ব্যবহারকারীরা ফ্যাকাশে বা ধূসর ত্বক, চোখের নিচে কালো দাগ, শুষ্ক বা ফাটা ঠোঁট, চুল পড়া এবং দুর্বল নখের কথা উল্লেখ করেন, আবার অনেকে সুস্পষ্ট দৃশ্যমান পার্থক্যের দাবি করে ছবি শেয়ার করেছেন।

‘ফেরিটিন ফেস’ কথাটি সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এ সংক্রান্ত ভিডিওগুলো লক্ষ লক্ষ ভিউ পাচ্ছে।

কিন্তু চিকিৎসকরা বলেন, শুধু বাহ্যিক চেহারা দেখে আয়রনের ঘাটতি নির্ণয় করা যায় না।

“ফেরিটিন ফেস কোনো ডাক্তারি রোগনির্ণায়ক নয়,” বলেছেন ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস-ভিত্তিক জিপি ডাক্তার আজিজা সেসায়।

“তবে, এটি একটি সূত্র হতে পারে, যা আমাদের বলে দেয় যে শরীরে কিছু একটা পরিবর্তন ঘটছে।”

ফ্যাকাশে ত্বক, চুল ঝরে যাওয়া বা ভঙ্গুর নখের মত উপসর্গ শরীরে আয়রনের ঘাটতির সাথে দেখা দিতে পারে, যদিও এগুলো অন্য কোনো রোগের লক্ষণও হতে পারে, বিবিসি নিউজকে বলেন ডাক্তার আজিজা।

ফেরিটিন কী?

ফেরিটিনের মাত্রা থেকে বোঝা যায় আপনার শরীরে আয়রনের সঞ্চয় বা পরিমান কতটা ভালো।

অন্যদিকে হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার সেই প্রোটিন, যা অক্সিজেন বহন করে। যখন হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায়, তখন রক্ত পর্যাপ্ত অক্সিজেন বহন করতে পারে না, এ অবস্থাকে অ্যানিমিয়া বলা হয়।

কিন্তু তার আগেই শরীরে সঞ্চিত আয়রন কমে যেতে পারে, অর্থাৎ কেউ আয়রনের অভাবে ভুগলেও এবং রক্তশূন্যতায় না ভুগলেও তার মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

রক্তশূন্যতা

“আপনার শরীরে কোনো সঞ্চিত আয়রন নেই, কিন্তু আপনি আপনার হিমোগ্লোবিন বজায় রাখছেন। এটাই হলো বড় অসামঞ্জস্য,” বলেছেন কনসালটেন্ট হেমাটোলজিস্ট ডঃ ড্রিউ প্রোভান।

কনসালট্যান্ট হেমাটোলজিস্ট ডঃ স্যু প্যাভোর্ড বলেছেন, মহিলাদের মধ্যে আয়রনের ঘাটতি একটি সাধারণ সমস্যা এবং প্রায়শই এটি সঠিকভাবে নির্ণয় করা হয় না।

ব্রিটিশ সোসাইটি অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির যুক্তরাজ্যের নির্দেশিকা অনুসারে, প্রতি লিটারে ফেরিটিন ১৫ মাইক্রোগ্রামের নিচে থাকলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা যায়।

আর সে মাত্রা ৩০-এর নিচে থাকলে সাধারণত শরীরে আয়রনের পরিমাণ কম থাকে।

৩২ বছর বয়সী লুসি এম, যিনি ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকে চুল পড়া নিয়ে সচেতনতামূলক পোস্ট করেন, তিনি বলেছেন যে ‘ফেরিটিন ফেস’ কথাটি তার নিজের শরীর ও চেহারার মধ্যে লক্ষ্য করা পরিবর্তনগুলোকে বর্ণনা করে বলে মনে হয়েছে।

২০২১ সালে তার বুক ধড়ফড় করা, ক্লান্তি এবং চুল পড়া শুরু হয়।

সেসময় তার রক্ত পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক বলা হলেও, পরে তার জেনারেলাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ধরা পড়ে।

কিন্তু পরবর্তী এক পরীক্ষায় দেখা যায়, ওই সময় তার ফেরিটিনের মাত্রা ছিল প্রতি লিটারে মাত্র ১২ মাইক্রোগ্রাম।

রক্তাল্পতা

লুসি বিবিসিকে বলেছিলেন, ওই সময় তাকে দেখতে ‘ফ্যাকাশে’ লাগত এবং তার চুল নিষ্প্রভ ও ভঙ্গুর হয়ে গেছিল।

তিনি বিবিসি-র সাথে তার ফেরিটিন মাত্রা কম থাকার সময়ের এবং পরে তা স্বাভাবিক হয়ে আসার পরের ছবি শেয়ার করেছেন এবং বলেছেন যে তার অনুভূতি ও চেহারার মধ্যে পার্থক্য ছিল ‘আকাশ-পাতাল’।

আয়রনের অভাব কি চেহারার পরিবর্তন ঘটাতে পারে?

‘ফেরিটিন ফেস’ সম্পর্কিত ভিডিওগুলিতে প্রায়শই দর্শকদের চোখের নিচে কালো দাগ ও ফ্যাকাশে ত্বক থেকে শুরু করে শুষ্ক ঠোঁট, পাতলা চুল এবং ভঙ্গুর নখের মতো বিভিন্ন শারীরিক লক্ষণের সংমিশ্রণ চিহ্নিত করতে এবং সেগুলোকে নিজেদের চেহারার আগের অবস্থার সাথে তুলনা করতে উৎসাহিত করা হয়।

“আপনি কুৎসিত নন, আপনার শরীরে ফেরিটিন কম”, একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলেন।

তবে, প্রোভান বলেছেন, কারও মুখ দেখে তার শরীরের ফেরিটিনের মাত্রা নির্ণয় করা ‘অসম্ভব’।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, গুরুতর রক্ত স্বল্পতায় ভোগা ব্যক্তিদের ফ্যাকাশে দেখাতে পারে, আবার ক্লান্তির কারণে চোখের নিচে কালো দাগ হতে পারে।

কিন্তু এই দৃশ্যমান লক্ষণগুলো একেক মানুষের জন্য একেক রকম হতে পারে, অর্থাৎ লক্ষণ বিচারে সেসব “ব্যক্তিগত এবং অবিশ্বস্ত” উপসর্গ।

তিনি আরও বলেন, যাদের গায়ের রঙ গাঢ়, তাদের ক্ষেত্রে ত্বকের রঙের পরিবর্তন ততটা স্পষ্ট নাও হতে পারে।

যার অর্থ হলো, অনলাইনে বর্ণিত লক্ষণগুলো বিশেষভাবে খুঁজতে গিয়ে কেউ হয়তো আয়রনের অভাবজনিত সমস্যাটি ধরতে পারবেন না।

রক্তাল্পতায় মাথা ঘোরে অনেকের

আয়রনের ঘাটতি কেন হয়, কীভাবে ঘাটতি পূরণ হয়

চিকিৎসকদের কাছে বাহ্যিক চেহারার চেয়ে উপসর্গ এবং রোগীর শারীরিক অনুভূতি বেশি দরকারি।

প্রোভান ও সেসায় বলেছেন, রক্ত পরীক্ষা শুধু আয়রনের ঘাটতি নিশ্চিত করতেই নয়, বরং এর কারণ নির্ণয় এবং চিকিৎসার নির্দেশনা দেওয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

উভয়েই বলেছেন, চিকিৎসার পাশাপাশি এর কারণ নির্ধারণ করাও জরুরি। নারীদের অতিরিক্ত ঋতুস্রাব, খাদ্যে আয়রনের অভাব, পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ এবং অন্ত্রের মাধ্যমে আয়রন শোষণে সমস্যা – এসব কারণ এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

আয়রনের ঘাটতির চিকিৎসায় সাধারণত মুখে খাওয়ার আয়রন দেওয়া হয়।

পাভোর্ড বলেছেন, আয়রন ট্যাবলেট খালি পেটে, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠেই খাওয়া সবচেয়ে ভালো।

তিনি ট্যাবলেট খাওয়ার সময় চা বা কফি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ এগুলো আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে।

মাংস, শিম, ডাল, সবুজ শাকসবজি এবং আয়রন সমৃদ্ধ সিরিয়ালসহ বিভিন্ন খাবার থেকেও প্রাকৃতিকভাবে আয়রন পাওয়া যায়।

তবে, রোগ নির্ণয় ছাড়া আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা ক্ষতিকর হতে পারে। অন্যদিকে, নিজে নিজে চিকিৎসা করলে অন্তর্নিহিত সমস্যার অনুসন্ধান বিলম্বিত হতে পারে।

কন্টেন্ট ক্রিয়েটর লুসি বলেছেন, তা সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়া নারীদের উপসর্গগুলোকে আরও গুরুত্ব সহকারে নিতে সাহায্য করেছে এবং কোনো কিছু অস্বাভাবিক মনে হলে প্রশ্ন করার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।

তবে, তিনি পরিষ্কারভাবে জানান যে, তিনি ডাক্তার নন এবং তার কন্টেন্টগুলো তিনি নিজের অভিজ্ঞতা হিসেবেই উপস্থাপন করেন।

তার কাছে, সামাজিক মাধ্যম নারীদের ক্ষমতায়নের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে – যা তাদের নিজেদের পক্ষে কথা বলার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য জোগায়।

যদিও, সেসায় সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি ‘দ্বিধারী তলোয়ার’ বলে বর্ণনা করেন – এটি মানুষকে সাহায্য চাইতে উৎসাহিত করতে পারে, আবার একটি ছোট ভিডিও দেখে তাদের নিজেদের ভুল রোগ নির্ণয়ের দিকেও পরিচালিত করতে পারে।

এদিকে, লুসির জন্য দরকারি বিষয় হলো নিজের চেহারা দেখে নিজেকে নির্ণয় করা নয়, বরং কখন কিছু একটা ঠিক মনে হচ্ছে না তা জানা এবং কখন প্রশ্ন করতে হবে তা বোঝা।

নিজের দিকে খেয়াল রাখুন, এবং নিজের শরীরের কোন পরিবর্তন দেখতে সচেতন হোন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।