Home LATEST NEWS BANGLA ‘কখনোই, কোনোভাবেই ভুলব না’- যেভাবে ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী পালন করল...

‘কখনোই, কোনোভাবেই ভুলব না’- যেভাবে ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী পালন করল আমেরিকা

4
0

Source : BBC NEWS

৯/১১ হামলার বার্ষিকী পালনের দৃশ্য

ছবির উৎস, Reuters

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর হামলার ২৫ বছর পর, দেশটির বর্তমান ও সাবেক প্রেসিডেন্টরা সেই হামলায় নিহতদের স্মরণ করেছেন। ওই হামলায় ছিনতাই করা বিমানগুলো নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন এবং পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে আঘাত করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পেন্টাগনে অনুষ্ঠিত এক স্মরণসভায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার প্রাঙ্গণের স্মরণসভায় যোগ দেন। সেখানে দেশটির জীবিত চার সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তাদের স্ত্রীরাও উপস্থিতি ছিলেন।

হামলার সময়গুলো স্মরণ করতে নীরবতা পালন এবং নিহত প্রায় ৩ হাজার মানুষের নাম পড়ে শোনানো হয়।

‘ট্রিবিউট ইন লাইট’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শুক্রবার সন্ধ্যায় ম্যানহাটনের আকাশে দুটি আলোকরশ্মি জ্বালানো হয় । এছাড়া নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন স্থাপনাও নীল আলোয় আলোকিত করা হয়।

৯/১১-এর সময় প্রেসিডেন্ট থাকা জর্জ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার প্রাঙ্গণে শুক্রবারের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, বারাক ওবামা এবং বিল ক্লিনটন।

পেন্টাগনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার মন্ত্রিসভার সদস্য এবং ৯/১১-এর সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাকা কনডোলিজা রাইসের সঙ্গে স্মরণসভায় অংশ নেন।

ট্রাম্প বলেন, “আজ আমরা সেই পবিত্র অঙ্গীকার আবারও করছি, যা ২৫ বছর আগে তাদের স্মরণে প্রথম করেছিলাম। আমরা কখনোই, কোনোভাবেই ভুলব না। আর এ কারণেই আমরা আজও লড়াই করছি”।

তিনি ৯/১১-এর পর শুরু হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর সঙ্গে বর্তমানে ইরানে চলমান মার্কিন সংঘাতের যোগসূত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ৯/১১-এর পরবর্তী এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা ছিল।

ট্রাম্প সমাবেশে বলেন, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান ‘কখনোই, কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না’।

সাবেক প্রেসিডেন্টরাও অংশ নিয়েছেন

ছবির উৎস, Pool/Getty Images

নিহতদের স্মরণে আলোকরশ্মি

ছবির উৎস, Getty Images

পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলেও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যাত্রীদের প্রতিরোধের পর ছিনতাই হওয়া ফ্লাইট ৯৩ বিধ্বস্ত হয়েছিল।

জেনিস ব্রুকস ৯/১১-এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নিউইয়র্কে এসেছিলেন। তিনি এটিকে তার ভাষায় ‘সবচেয়ে বড় অভিযান’ হিসেবে দেখেছিলেন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সাউথ টাওয়ারের ৮৪তম তলায় একটি প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করতেন।

ব্রুকস বিবিসিকে জানান, প্রথম বিমানটি নর্থ টাওয়ারে আঘাত করার সময় তিনি অফিসেই ছিলেন। তিনি ভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, এমন সময় দ্বিতীয় বিমানটি ‘ভয়ংকর এক প্রচণ্ড শব্দে’ আঘাত করে।

ব্রুকস বলেন, ধ্বংসস্তূপের আঘাতে এক নারী আহত হলে তিনি ‘ভৌতিক সিনেমার মতো একটি চিৎকার’ শুনেছিলেন। তিনি ওপরে তাকিয়ে দেখেন, যেখানে তার অফিস থাকার কথা ছিল সেখানে ‘একটি বিশাল গর্ত’ তৈরি হয়েছে।

প্রতি বছর ১১ই সেপ্টেম্বর হামলার প্রতিটি ঘটনার সঠিক সময় এবং টুইন টাওয়ার ধসে পড়ার সময় স্মরণ করতে ঘণ্টা বাজানো হয়। ছয়টি ঘণ্টার প্রতিটির পর এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

এ বছর হামলার পর বিভিন্ন রোগে, যার মধ্যে ক্যানসারও রয়েছে, মারা যাওয়া হাজারো মানুষকে স্মরণ করতে সপ্তমবার ঘণ্টা বাজানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, টুইন টাওয়ার ধসের ধুলা ও ধোঁয়ার কারণে সৃষ্ট অসুস্থতায় পরবর্তীকালে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা হামলায় নিহত প্রায় ৩ হাজার মানুষের সংখ্যার তিন গুণেরও বেশি।

নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে

ছবির উৎস, Pool/Getty Images

হামলায় নিজের ভাই ও কয়েকজন সহকর্মীকে হারিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক।

ছবির উৎস, EPA

ম্যানহাটনের স্মরণসভায় প্রায় চার ঘণ্টা ধরে নিহতদের নাম পাঠ করা হয়। এ সময় ৯/১১-এ স্বামী হারানো টেরি স্ট্রাডা সৌদি আরবের সমালোচনা করেন এবং সৌদি আরবকে জবাবদিহির আওতায় আনতে মার্কিন কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন।

বিশ্বব্যাপী সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে টেরি স্ট্রাডা তার স্বামী টম স্ট্রাডাকে উদ্দেশ করে বলেন, “প্রতিটি বছর পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে আরও বেশি করে মনে পড়ে”।

“কিন্তু ২৫ বছর হয়ে গেল- তবুও কেন তোমার হত্যায় সৌদি আরবের যে ভূমিকা ছিল, তার জন্য কোনো বিচার পেলাম না?”

টেরি স্ট্রাডা ৯/১১ ফ্যামিলিস ইউনাইটেড সংগঠনের জাতীয় চেয়ারপারসন। তার বক্তব্যের সময় উপস্থিত দর্শকরা করতালি দেন।

৯/১১-এর হামলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি সৌদি আরবের নাগরিক ছিলেন। হামলার পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন, যিনি সৌদি আরবের একটি প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন।

তবে সৌদি কর্মকর্তারা হামলায় কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছেন। ২০০৪ সালে প্রকাশিত ৯/১১ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে সৌদি সরকার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বা দেশটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন-এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নিহতদের সম্মান জানাতে বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

লন্ডনে বাকিংহাম প্যালেসে একটি আনুষ্ঠানিক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ওয়ারেন স্টিফেনস উপস্থিত ছিলেন।

পেন্টাগনে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

নানা আয়োজনে হামলার বার্ষিকীতে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ছবির উৎস, Reuters

পেনসিলভানিয়ায় ফ্লাইট ৯৩ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল

ছবির উৎস, Reuters

টরন্টো স্টক এক্সচেঞ্জেও হামলায় নিহত সহকর্মীদের স্মরণে একটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের গ্যান্ডার শহরে গিয়েছেন কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। তিনি সেই ছোট শহরটির প্রশংসা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পরপরই সেখানে ৩৮টি বিমানের গতিপথ পরিবর্তন করে হাজার হাজার যাত্রীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল।

পিট হোকস্ট্রা বলেন, “আমেরিকার মানুষ যখন গ্যান্ডার শব্দটি শোনে, তখন আমাদের হৃদয় নরম হয়ে আসে।”

“যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের বন্ধুত্বের জন্য ধন্যবাদ… কানাডার জনগণকে ধন্যবাদ, আমাদের সঙ্গে অংশীদার থাকার জন্য এবং আমাদের সঙ্গে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তার জন্য।”

তার বক্তব্য এমন এক সময়ে আসে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ এবং দুই দেশ একটি বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে। ৯/১১-এর স্মরণসভা সামনে রেখে গ্যান্ডারের কিছু বাসিন্দা হোকস্ট্রাকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না জানানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তা সত্ত্বেও হোকস্ট্রার বক্তব্য করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। তবে পরে আলাদা এক বক্তব্যে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জ্যাঁ ক্রেতিয়েন বলেন, “আমার আমেরিকান বন্ধুদের জন্য একটি বার্তা আছে… আমাদের উদারতাকে কখনোই দুর্বলতা বলে ভুল করবেন না।”

তার এই বক্তব্যের পর উপস্থিত জনতা দাঁড়িয়ে করতালি দেয়।

ইতালির মিলানেও ৯/১১-এ কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত জরুরি সেবাকর্মীদের সম্মানে ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের একদল অগ্নিনির্বাপক কর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার কর্মসূচিতে অংশ নেন।

ইউনিফর্ম পরা এবং সরঞ্জাম বহন করা অবস্থায় তারা গালফা টাওয়ারের ১১০ তলা ওপরে ও নিচে ওঠানামা করেন।

টুইন টাওয়ার দুটির প্রতিটির উচ্চতা ১১০ তলা ছিল- নিহত উদ্ধারকর্মীদের স্মরণেই এই প্রতীকী কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।