Source : BBC NEWS

বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের বই

ছবির উৎস, Getty Images

২০২৮ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে যে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার, সেখানে নতুন আরও চারটি বিষয় যুক্ত করা হবে।

সেগুলো হলো– আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা।

শিক্ষার্থীদেরকে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয় দু’টি চতুর্থ শ্রেণি থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে।

আর মাধ্যমিক স্তরে পা রাখার পর, অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তাদেরকে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ এবং ‘আনন্দময় শিক্ষা’ বা ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ পড়তে হবে।

নতুন শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজি ছাড়াও তৃতীয় আরেকটি ভাষা শিক্ষায়ও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সোমবার আটই জুন বিকেলে এসব তথ্য জানান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

কী থাকবে এসব বিষয়ে

সোমবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।

মঙ্গলবার মাহ্দী আমিন ও ববি হাজ্জাজ, উভয়ের সাথে কথা বলে বিবিসি বাংলা।

আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা — মানে কী, মূলত কী থাকবে এগুলোতে, কারা পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন, এসব জানতে চাওয়া হয় তাদের কাছে।

এসব প্রশ্নের জবাবে ববি হাজ্জাজ খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয় দু’টো নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেন, স্কুলে স্কুলে বিভিন্ন খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চা চালু থাকলেও এগুলোর কোনোটিই বর্তমান শিক্ষাক্রমের অংশ না এবং আগেও কখনও ছিল না।

কিন্তু ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সবসময় শিক্ষাক্রমে থাকা উচিৎ উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সেজন্যই সরকার যত শীঘ্র সম্ভব এই বিষয় দু’টোকে শিক্ষাক্রমে যুক্ত করবে।

তবে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে সবগুলো বিষয় প্রথম দিন থেকেই কার্যকর করতে পারবে না সরকার।

“যেমন, আমরা প্রাথমিকে আটটি খেলা যুক্ত করতে চাই। কিন্তু একবারে এটি সম্ভব না। তাই, আমরা চেষ্টা করবো অন্তর দুই-তিনটি খেলাকে যোগ করতে,” বলছিলেন তিনি।

নতুন যুক্ত হওয়া এসব বিষয়ে কোনো গ্রেড বা জিপিএ নির্ধারণ করা হবে না।

ছবির উৎস, Getty Images

অর্থাৎ, আপাতত ফুটবল, দাবাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বাকীগুলো পরে যোগ করা হবে।

অবশ্য মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, ক্রিকেটকেও এখন থেকেই যুক্ত করা যেতে পারে।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তাই। গান, আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা্র মতো বিষয়গুলো থাকবে।

তবে সংস্কৃতি বিষয়টিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক. পারফরমেটিভ। দুই. এক্সপ্রেসিভ।

“গান, নাচ, বক্তৃতা, পেইন্টিং, সাহিত্য ইত্যাদি থেকে শিক্ষার্থীরা বাছাই করতে পারবে যে সে কোনটি নিবে। পাইলটের পরে এগুলো পরিবর্তন হবে,” বলছিলেন ববি হাজ্জাজ।

পারফরমেটিভ বলতে বোঝানো হচ্ছে যে শিক্ষার্থীরা কোনো শিল্প বা সাংস্কৃতিক কাজ সরাসরি পরিবেশন করবে। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীকে অন্যদের সামনে নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করতে হয়। আর এক্সপ্রেসিভে মঞ্চে পরিবেশনের চেয়ে নিজের ভাবনা বা অনুভূতি প্রকাশের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মূল বিষয় হলো সৃজনশীলভাবে নিজেকে প্রকাশ করা।

‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ কী? জানতে চাইলে মাহ্দী আমিন বলেন, “কারিগরি শিক্ষাকে সমাজের চোখে ভিন্ন চোখে দেখা হয়। এই ধারণা ভেঙ্গে আমরা এটিকে মূলধারার শিক্ষায় আনতে চাই। আমরা চাই, বাংলাদেশের সব স্কুলে যেন একটি করে কারিগরি ল্যাব থাকে।”

এতে করে পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষাটা সুনিশ্চিত করা যাবে বলে মত তার।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন, সব শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একমাত্র পথ নয়। অনেক শিক্ষার্থী যদি স্কুল পর্যায় থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা অর্জন করে, তাহলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং স্বাবলম্বী হতে পারবে।

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদেরকে 'আনন্দময় শিক্ষা' বা 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস' পড়তে হবে।

ছবির উৎস, Getty Images

লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস কী?

এখন থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদেরকে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’র পাশাপাশি ‘আনন্দময় শিক্ষা’ বা ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামক বিষয়টিও পড়তে হবে।

কিন্তু যে কোনো শিক্ষাই তো আনন্দময় হওয়া উচিৎ। তাহলে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ নামক আলাদা একটি বিষয় চালু করার কারণ কী? কী থাকবে এই বিষয়ে?

এ নিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেসের দুইটা দিক আছে।”

“এক, এটা হলো পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ভ্যালু ও প্রিন্সিপ্যাল। যেভাবে আমরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চাই, যে আনন্দময় শিক্ষাব্যবস্থা হবে, উৎসবমুখর পরিবেশে ক্লাস করবে।”

অর্থাৎ, তিনি বোঝাতে চাইছেন যে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ কেবল কোনো আলাদা বিষয় নয়। বরং, পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, তার একটি নীতি হলো এটি। শিক্ষার্থীরা যেন ভয় বা চাপ থেকে না, বরং অংশগ্রহণমূলক পরিবেশে আনন্দ নিয়ে পড়ে, শেখে।

“দুই, এই সাবজেক্টের মাধ্যমেই তারা নীতি, পারিবারিক মূল্যবোধ, পারিবারিক সুশিক্ষা শিখবে।”

অর্থাৎ, এই বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক আচরণ, সততা, দায়িত্ববোধসহ বিভিন্ন জীবনদক্ষতা শেখানো হবে। তবে শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বাস্তব জীবনে এগুলো কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়, সেটিও শেখানো হবে এই বিষয়ে।

উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার্থীদেরকে বৃক্ষরোপণের কথা বলা হয়। কিন্তু সাধারণত শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে বৃক্ষরোপণ করতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাই, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বিষয়টির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে যে কী কারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে করতে হয়।

“এছাড়া, বিভিন্ন দিবস থাকে। যেমন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কিন্তু এই দিবসের তাৎপর্য কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ বা আমরা মানবাধিকারের কথা বলি, কিন্তু কেন এই মানবাধিকার এত গুরুত্বপূর্ণ‒ এর প্রত্যেকটির ব্যবহার আমরা দেখাবো,” বলছিলেন তিনি।

একটি শিশু আঁকছে

ছবির উৎস, Getty Images

এসব বিষয় পড়ানোর জন্য সরকারের প্রস্তুতি

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “২০২৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষাক্রমে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি যুক্ত হবে এবং সেখানে দুই-তিনটি বিষয় শেখানো হবে। কিন্তু ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম পুরোপুরিভাবে পরিবর্তন করবে সরকার।”

এর আগে, সোমবার আটই জুন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনও সাংবাদিকদের বলেছেন, স্বল্প সময়ে শিক্ষাক্রম পুরোপুরি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সে কারণে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য বিদ্যমান শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করে বাস্তবসম্মতভাবে প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে।

যদিও ২০২৮ সাল থেকে একেবারে সব শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হবে, না কি ধাপে ধাপে হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তবে এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতি ও ক্রীড়া বিষয় দু’টো নিয়ে ববি হাজ্জাজ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ২০২৭ সালে শিক্ষাক্রমে যেসব নতুন বিষয় ও উদ্যোগ চালু করা হবে, সেগুলো মূলত পরীক্ষামূলক বা পাইলট পর্যায়ের অংশ। এসব কর্মসূচির সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ২০২৮ সালের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাক্রমের কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে।

রোদে অনেকগুলো নারী শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে

ছবির উৎস, Getty Images

এদিকে, নতুন বিষয়গুলো আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই চালু হওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রয়োজন হবে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ জন্য সরকার ইতোমধ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করেছে। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রশিক্ষিত ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তাই।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন বিষয় ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ পড়াবেন কারা? কীভাবে?

এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের জন্য বিশেষ গাইডলাইন তৈরি করা হবে। এটি যারা পড়াবেন, তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এটি হবে সবচেয়ে বিশেষায়িত বিষয়গুলোর একটি। এজন্য বাছাই ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিদ্যমান শিক্ষকদের মাঝ থেকে শিক্ষক নির্বাচন করা হবে এবং তাদের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বিষয়ে শিক্ষকদের জন্য নির্দেশিকা এমনভাবে তৈরি করা হবে, যাতে তারা সৃজনশীলভাবে শিক্ষার্থীদেরকে পাঠদান করতে পারেন। তবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়; তাই ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া, বাংলা ও ইংরেজির বাইরে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এজন্য শিক্ষক নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার।

এতে করে শিক্ষার্থীরা যেমন সমৃদ্ধ হবে, দেশে কর্মসংস্থানও তৈরি হবে, বলছিলেন মি. আমিন।

উল্লেখ্য, নতুন যুক্ত হওয়া এসব বিষয়ে কোনো গ্রেড বা জিপিএ নির্ধারণ করা হবে না। শিক্ষার্থীদের কেবল পাস বা ফেল হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।