Home LATEST NEWS BANGLA কুয়াকাটায় জালে উঠে আসা ‘স্লেন্ডার সানফিশ’ কী ধরনের মাছ?

কুয়াকাটায় জালে উঠে আসা ‘স্লেন্ডার সানফিশ’ কী ধরনের মাছ?

4
0

Source : BBC NEWS

'লংইয়ার সানফিশ' বা লম্বা কানওয়ালা সানফিশের একটি হাতে আঁকা ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশের কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে অদ্ভুত আকৃতির এক মাছ, যেটি অনেকটাই ‘অচেনা’।

গতকাল রোববার সকালে অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের সঙ্গে এটি জালে ধরা পড়ে।

কিন্তু লম্বাটে শরীর, ছোট নলের মতো মুখ এবং অন্যান্য মাছের তুলনায় অস্বাভাবিক গড়নের কারণে মাছটি কোন প্রজাতির, প্রথমে তা শনাক্ত করতে পারেননি জেলেরা।

পরে জানা যায়, মাছটির নাম স্লেন্ডার সানফিশ, যার বৈজ্ঞানিক নাম র‍্যানজানিয়া লেভিস।

প্রায় দুই কেজি ৭০০ গ্রাম ওজনের মাছটি প্রথমে পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের একটি আড়তে নেওয়া হয়। ‘অচেনা’ এই মাছটিকে দেখতে সেখানে ভিড় করে উৎসুক মানুষ।

পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে এর ছবি আসার পর মাছটিকে নিয়ে আগ্রহ আরও বাড়ে।

এই স্লেন্ডার সানফিশ আসলে কী ধরনের মাছ? বঙ্গোপসাগরে এই মাছের উপস্থিতি কতটা স্বাভাবিক? মাছটি কি মানুষের জন্য ক্ষতিকর, নাকি এটি খাওয়া যায়?

মাছটি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

কুয়াকাটায় পাওয়া যাওয়া স্লেন্ডার সানফিশ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন একজন

ছবির উৎস, Abul Hossain Raju

শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিলো কুয়াকাটার মাছটির?

মাছটি আড়তে তোলা হলেও অপরিচিত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এটি আর বিক্রি হয়নি।

স্থানীয় সাংবাদিক আবুল হোসেন রাজু জেলেদের বরাতে জানিয়েছেন, কুয়াকাটায় বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ পাওয়া গেলেও এটি পাওয়া যায়নি এর আগে। জেলেরাও এই মাছ প্রথম দেখেছেন।

তার সঙ্গে যখন বিবিসি বাংলার কথা হচ্ছিলো, তখন যে আড়তে মাছটি তোলা হয়, সেই শাহীন এন্টারপ্রাইজের সরদার শহীদুল ইসলামের সাথেও কথা বলেন তিনি।

মি. ইসলাম জানান, মাছটি বিক্রি হয়নি। জেলেরা ওই মাছ সাগরেই নিয়ে গেছে।

“ওই মাছ কোনো প্রাণীও খায় না,” মাছটি খাওয়ার উপযোগী না বোঝাতে বলছিলেন তিনি।

এই অঞ্চলের মানুষের কাছে অচেনা মাছটির ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিলো, তা বলতে পারেননি কলাপাড়া উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা।

তিনি জানান, কলাপাড়া থেকে কুয়াকাটা ২৫ কিলোমিটার দূরে। তাই, শুধু একটি মাছের জন্য তারা সাধারণত মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে যান না।

“সমুদ্রে নানান প্রজাতির মাছ আছে। এইরকম ‘রেয়ারেস্ট’ মাছ মাঝে মাঝে এই অঞ্চলে আসে। সেক্ষেত্রে মাছ ধরা পড়লে আমরা আইডেন্টিফিকেশন করে দেই। এরপর সেটি বিক্রি হলে ঢাকা চলে যায়। কারণ বিভিন্ন ফাইভ স্টার হোটেলে এসব মাছের চাহিদা আছে,” বলছিলেন তিনি।

দু'টি সানফিশ একসঙ্গে সাঁতার কাটছে। তবে এরা স্লেন্ডার সানফিশ নয়, অন্য প্রজাতির।

ছবির উৎস, Getty Images

মাছটি কি আসলেই বিষাক্ত, কোথায় বসবাস?

স্থানীয়দের মনে হয়েছিলো, মাছটি হয়তো বিষাক্ত, তাই এটিকে খাওয়া যাবে না।

কিন্তু মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, যেকোনো সামুদ্রিক মাছ বা প্রাণী খাওয়ারই নিয়ম আছে।

“স্কুইড থেকে শুরু করে অক্টোপাস, সবকিছুর প্রসেসিং ভিন্ন ভিন্ন। সানফিশেরও প্রসেসিং আছে। সেটি অনুসরণ করলে এটিও খাওয়া যায়,” বলছিলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন যে, মানুষের খাদ্যাভাসের ওপর নির্ভর করে কোনো মাছ দামি, নাকি কম দামি। বাংলাদেশে ‘স্লেন্ডার সানফিশ’ মানুষ খায় না বা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি খাবার উপযোগী না। তাই, এখানের প্রক্ষাপটে এটি দামিও না। কিন্তু হতো অন্য কোথাও এটি দামি।

তবে মাছের প্রজাতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক তথ্যভাণ্ডার ফিশবেজের তথ্য অনুযায়ী, স্লেন্ডার সানফিশ মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। সেখানে এটিকে ‘হার্মলেস’ বলা হয়েছে।

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের ২০১১ সালের মূল্যায়নেও প্রজাতিটি বৈশ্বিকভাবে বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা মাছ নয়।

আইইউসিএনের তথ্য বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রে স্লেন্ডার সানফিশের দেখা মেলে। বিশেষ করে আটলান্টিক, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে। তাদের মানচিত্রে বঙ্গোপসাগরে মাছটির উপস্থিতি দেখানো না হলেও যেসব দেশে এই মাছ পাওয়া যায় সেই তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে।

এদিকে, ফিশবেজ বলছে, আটলান্টিক মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত এর দেখা মেলে। ভারত মহাসাগরে মাদাগাস্কার, মরিশাস, ইরান ও অস্ট্রেলিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরে জাপান, চীন, তাইওয়ান ও নিউজিল্যান্ডেও মাছটির উপস্থিতি রয়েছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকুয়াকালচার ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলীও বলছিলেন, “এই মাছে টক্সিন থাকার রেকর্ড নেই।”

যেসব দেশে এই সানফিশ পাওয়া যায়, সেসব দেশে এটি খায় বলেও জানান তিনি।

'এ হিস্ট্রি অব দ্য ফিশেস অব দ্য ব্রিটিশ আইল্যান্ডস' বইয়ে স্লেন্ডার সানফিশের ছবি।

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশে এই মাছ পাওয়া কি স্বাভাবিক?

স্লেন্ডার সানফিশ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া গেলেও বঙ্গোপসাগরে এর উপস্থিতি কতটা স্বাভাবিক, সেই প্রশ্ন উঠেছে মাছটি ধরা পড়ার পর।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেছেন, ভারত মহাসাগরে এই মাছ পাওয়া গেলেও “বঙ্গোপসাগরে পাওয়ার কোনো রেকর্ড দেখতে পাচ্ছি না।”

“বাংলাদেশে কখনোই পায় নাই এই মাছ, ভারতও বলছে রেয়ার। এর ডিস্ট্রিবিউশন হলো অস্ট্রেলিয়া, ইউএস, প্যাসিফিক, মাদাগাস্কার। নিউজিল্যান্ড, জাপান, চীন, তাইওয়ানেও পাওয়া গেছে। ৭০টার মতো দেশে পাওয়া গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয়াতে।”

মূলত, স্লেন্ডার সানফিশ সাধারণত উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ সমুদ্রের মাছ – বলছিলেন তিনি।

তাহলে বিশ্বের অন্য অঞ্চলের মাছটি কীভাবে বাংলাদেশের উপকূলে এলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “একটি-দুইটা চলে আসে ভুল করে। অনেকসময় দুর্বল হলে স্রোতের সাথেও চলে আসে।”

তার মতে, এই মাছ যদি পর্যাপ্ত পাওয়া যেত, তাহলে কোনো একটা কারণ সুনির্দিষ্ট করা যেত।

কলাপাড়া উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহাও বলছিলেন যে তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে ওই অঞ্চলে কর্মরত এবং এর আগে তিনি কখনও এই মাছটি ধরা পড়তে দেখেননি।

“এই ধরনের মাছ একসাথে লট (অনেক মাছ একসঙ্গে) পাওয়া গেলে বলা যেত আবহাওয়াজনিত কারণে আসছে। কিন্তু এক্ষেত্রে দুই একটা দলছুট হয়ে যায় এবং ধরা পড়ে। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির একটা দুইটা মাছ-ই বিভিন্ন সময় পাওয়া যায়। একসাথে ১০-২০ টা পাওয়া যায় না বা ঘনঘন পাওয়া যায় না। যা বলা যায়, কোনো কারণে হয়তো সে তার মূল গতিপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে এদিকে চলে এসেছে।”

তিনি আরও বলেন যে এই মাছ গভীর সমুদ্রে থাকে। তাই, কুয়াকাটার জেলেরা এটি পায় না।

“কুয়াকাটার অংশের সমুদ্রের ধরণ কিছুটা ভিন্ন। কক্সবাজারে উপকূল থেকে কিছুদূর গেলেই গভীর সমুদ্র, মানে মহীসোপান তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কুয়াকাটার দিকে মহীসোপান প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে এরপর গভীর সমুদ্রে নেমে গেছে।”

তাই, কুয়াকাটার অংশে গভীর সমুদ্রের মাছ আসে না। হঠাৎ হঠাৎ দলছুট হয়ে পড়ে ধরা পড়ে। আর, এই সানফিশ ভারত মহাসাগর লাগোয়া দেশগুলোতে, বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় পাওয়া যেতে পারে। আর কক্সবাজারে সেন্টমার্টিনের নিচের দিকেও এর বিস্তৃতি আছে বলে মত তার।

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের ফলস বে এলাকায় ধরা পড়া একটি স্লেন্ডার সানফিশ।

ছবির উৎস, Getty Images

স্লেন্ডার সানফিশ সম্বন্ধে আর যেসব জানা যায়

‘মোলিডে’ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত স্লেন্ডার সানফিশ মূলত খোলা সমুদ্রের মাছ। এই পরিবারকে সাধারণভাবে ওশান সানফিশ বা মোলা বলা হয়।

আর, স্লেন্ডার সানফিশকে ওবলং সানফিশ, স্লেন্ডার মোলা বা ট্রাংকফিশ নামেও ডাকা হয়।

তবে সাধারণত খোলা সমুদ্রে থাকার কারণে উপকূলের মানুষের কাছে মাছটি খুব পরিচিত নয়। মাছ ধরার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবেও জালে উঠে আসতে পারে।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের সমুদ্রের উপরিভাগের পানিতে এরা বিচরণ করে। সমুদ্রের এক থেকে ১৪০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত এদের উপস্থিতির রেকর্ড রয়েছে।

ফিশবেজ বলছে, একটি পূর্ণবয়স্ক স্লেন্ডার সানফিশ দৈর্ঘ্যে প্রায় একশো সে.মি. পর্যন্ত হতে পারে।

স্লেন্ডার সানফিশের সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর শরীরের গঠন।

অন্যান্য অনেক মাছের মতো এর স্বাভাবিক লেজ নেই। ছোট অবস্থায় লেজ থাকলেও বেড়ে ওঠার সময় সেটি বিলীন হয়ে ‘ক্ল্যাভাস’ নামে লেজের মতো একটি অংশ তৈরি হয়।

ফলে মাছটির শরীরের পেছনের অংশ দেখে মনে হতে পারে সেটি যেন হঠাৎ কেটে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক ইতিহাস ও বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, সানফিশ প্রজাতিগুলোর মধ্যে স্লেন্ডার সানফিশের শরীর সবচেয়ে লম্বা।

তারা বলছে যে এই মাছটি সর্বোচ্চ ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে লম্বায়। আর, এদের প্রকৃত লেজ নেই। লেজের পরিবর্তে এদের পেছনের দিকে ‘ক্ল্যাভাস’ থাকে।

রুপালি রঙের এই মাছটির শরীরে নীল, ধূসর, বাদামি বা সবুজাভ ডোরা ও ফোঁটা থাকতে পারে।

এদের শরীর দুই পাশ থেকে বেশ চাপা এবং লম্বাটে। মুখও তুলনামূলকভাবে ছোট এবং অনেকটা ফানেল বা নলের মতো। মুখ বন্ধ থাকলে মনে হয় যে সোজাসোজি এক রেখে চলে গেছে।

এদিকে, অস্বাভাবিক শারীরিক গঠন সত্ত্বেও এরা বেশ দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে।

সেইসাথে, এরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে বা ঝাঁক বেঁধে চলাচল করে।

এবার প্রশ্ন, স্লেন্ডার সানফিশ কী খেয়ে বেঁচে থাকে?

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, এরা সমুদ্রের উপরের স্তরে থাকা বিভিন্ন ধরনের খাবার খায়। যেমন উদ্ভিদ কনা, ছোট ক্রাস্টেশিয়ান বা চিংড়ি-কাঁকড়াজাতীয় ক্ষুদ্র প্রাণী।