Home LATEST NEWS BANGLA চীনের অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হতে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ কোথায়

চীনের অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হতে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ কোথায়

4
0

Source : BBC NEWS

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

ছবির উৎস, PMO Bangladesh

এবার চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব সামনে এনেছে বেইজিং। কিন্তু এই প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীন, দুই দেশের জন্যই মিয়ানমার কেন্দ্রিক ও ভূ-রাজনীতির অনেক চ্যালেঞ্জ দেখছেন কূটনীতি বিশ্লেষকদের অনেকে।

প্রস্তাবটি এসেছে চীনের শীর্ষ নেতার কাছ থেকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২২শে জুন থেকে যখন তিন দিনের সফরে চীনে ছিলেন, তখন তার সঙ্গে বৈঠকে অর্থনৈতিক করিডোরের ওই প্রস্তাব দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

যদিও বাংলাদেশ করিডোরের প্রস্তাবের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। কিন্তু বাংলাদেশও চীনের সঙ্গে অর্থনীতির ব্যাপ্তি ও যোগাযোগ বাড়াতে চায়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, সরকার প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে দেখছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন আরেকটি সূত্র বিবিসিকে বলেছে, বাংলাদেশ সরকার চীনের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

তবে আলোচনায় আসছে ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জের প্রশ্ন। কূটনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, ভারতের অবস্থান সেখানে একটি বড় বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে, সেটাও বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে এগোতে হবে।

বাংলাদেশে তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা প্রকল্পেও সহায়তা করতে চেয়েছে চীন।

দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিখাতের স্বার্থে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও যেকোনো মূল্যে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। এ ক্ষেত্রেও রয়েছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জ।

চীনের প্রস্তাবগুলোকে অবশ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশের কূটনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশের পক্ষ থেকেই ‘দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত’ সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দেশ দুটির মধ্যে রাজনৈতিক শীর্ষ পর্যায়ে একটা বোঝাপড়া হয়েছে এবং এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তারা বলছেন, এখন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানোর বিষয়টি নির্ভর করবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও দূরদর্শিতার ওপর।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে

ছবির উৎস, PMO

অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাব্য রুট কী

চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হবে এই করিডোর। সেটি যাবে মিয়ানমারের মান্দালয়ে। সেখান থেকে করিডোরের একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গন এবং অন্য অংশ বিস্তৃত হবে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত।

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সংযোগটি সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হবে।

চীনের পক্ষ থেকে এমন সম্ভাব্য রুটের প্রস্তাব রয়েছে বলে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট সরকারি একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের রুট হিসেবে চীনের করিডোর তৈরির প্রস্তাব এর আগেও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে।

‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’, চীনের এই প্রকল্প বিসিআইএম নামে পরিচিত। বাংলাদেশ-চীন-ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব একযুগেরও বেশি সময় আগে ২০১৩ সালে সামনে এনেছিল বেইজিং।

কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে তখন তা এগোয়নি। পরে ভারতকে বাদ দিয়েই চীন মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করে, তাতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়টি আসে। এখন চীন সম্ভাব্য সেই প্রস্তাব বাংলাদেশকে দিয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের সাথে চীনের অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাবিত পথ (সরলরেখায় দেখানো, রাস্তার অবস্থান নির্দেশক নয়)

ছবির উৎস, Google Maps

ভেতরের চ্যালেঞ্জ

ভেতরে-বাইরের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন কূটনীতি বিশ্লেষকরা। ভেতরের চ্যালেঞ্জ বলতে তারা বোঝাচ্ছেন মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটকে।

মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত চলছে ‘বিদ্রোহী’ আরাকান আর্মির। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইনের বড় অংশ রয়েছে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

অন্যদিকে রয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যা। মিয়ানমারে নির্যাতনের কারণে সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে বেশ কয়েক বছর ধরে।

এই দুটি সংকটের সমাধান না হলে করিডোরে বাংলাদেশকে যুক্ত করা কতটা কার্যকর ও নিরাপদ হবে, সেই প্রশ্ন উঠছে।

তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, সংকট সামলিয়ে করিডোর কার্যকর করার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ।

বিবিসি বাংলাকে মি. কবির বলেন, মিয়ানমারে চলমান সংকট ও রোহিঙ্গা ইস্যু থাকার পরও চীন যদি কার্যকর উদ্যোগ নেয় এবং বাংলাদেশ ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন সম্ভব।

“অর্থনৈতিক করিডোর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য পরিবর্তনের বিরাট সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের জোট আসিয়ানের সঙ্গে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে” বলেন হুমায়ুন কবির।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, এই করিডোর কার্যকর হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় চীনের বিনিয়োগ বেড়ে যাবে। চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে। পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়, দুটোই উল্লেখযোগ্যহারে কমে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলন করে সেই সফরের বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “অর্থনৈতিক করিডোরের উদ্দেশ্য হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনকে আরও সমৃদ্ধ করা।”

সেই সফরের আলোচনা নিয়ে যে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে এবং চীনের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য যা এসেছে, তাতে অর্থনৈতিক করিডোর এগিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ও চীন, দুই দেশই এ ব্যাপারে আগ্রহী। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যগুলো সমালিয়ে কিভাবে তা এগিয়ে নেওয়া যাবে, সেই আলোচনা যেমন আছে, একইসঙ্গে আসছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জের প্রশ্ন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান

ছবির উৎস, PMO

ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ কতটা

এক যুগেরও বেশি সময় আগে যখন ভারতসহ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব করেছিল চীন, তখন ভারতের আপত্তির কারণে সেই উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়েছিল।

কারণ এই অঞ্চলে প্রভাব নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের যে দ্বন্দ্ব এবং এর জেরে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে তাদের যে সমীকরণ, তাতে এ ধরনের কোনো করিডোরে ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।

এখন ভারতকে বাদ দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোরে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে চাইছে চীন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ ভারতের আগের অবস্থানের পরিবর্তন হতে পারে, এ নিয়ে বিশ্লেষকদের অনেকের সন্দেহ রয়েছে।

তারা বলছেন, ঢাকা যদি চীনের প্রস্তাবিত করিডোরে যুক্ত হয়, এতে দক্ষিণ-পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হবে। এটি ভারতের জন্য চাপ তৈরি করবে এবং তাদের প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।

তবে ভিন্ন পর্যবেক্ষণ রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের। তিনি মনে করেন, ভারত নিজেরাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে এবং তা অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমানও হচ্ছে।

আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জের বাইরে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বিষয়ও রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি সাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশকে বিবেচনায় রেখে এগোতে হবে।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির শর্তগুলোর মধ্যে যে বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা বা বিতর্ক হয়েছে, তা হলো, চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তিতে যেতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। বিশ্লেষকদের অনেকের ধারণা, চীন-রাশিয়াকে লক্ষ্য করে ওই শর্ত আনা হয়ে থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, অর্থনৈতিক করিডোরে বাংলাদেশ যুক্ত হলে দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্যে চীনের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। এমন তৈরি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের এবং সে ধরনের ধারণা থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

তবে হুমায়ুন কবির মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা পরাশক্তির রাজনৈতিক সমীকরণও সামলানো সম্ভব। সেখানে বাংলাদেশ কিভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবে, তাও নির্ভর করবে কূটনীতি ও দূরদর্শিতার ওপর।

বাংলাদেশ ও চীন, দুই দেশের পক্ষ থেকেই 'দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত' সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

তিস্তা প্রকল্পে কীভাবে সহায়তা করতে চায় চীন

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে মহাপরিকল্পনার শুরু থেকে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে কারিগরি সহায়তা দিতে চেয়েছে চীন। অর্থ্যাৎ সমীক্ষা, প্রকল্পের ডিজাইন, বাস্তবায়ন-প্রতিটি ধাপেই যুক্ত হতে আগ্রহী চীন।

অনেক বছর ধরেই তিস্তার ব্যবস্থাপনার প্রকল্পটি ঝুলে রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময় চীন সমীক্ষার কিছুটা কাজও করেছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে আওয়ামী লীগ সরকার চীনের সঙ্গে এ নিয়ে আর এগোয়নি।

অন্যদিকে, তিস্তার পানিবণ্টন প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে চুক্তি অধরাই রয়ে গেছে। বছরের পর বছর বাংলাদেশ এই চুক্তির জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে।

এমনকি দশ বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চুক্তিটি সই হতে যাচ্ছে, এমন ধারণা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। সে সময় ভারত সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কথা কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিল।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের সাথে পানিবণ্টনের চুক্তি করা দরকার, সেটিও একটি প্রয়োজনীয় উপাদান।

তবে এখন বিএনপি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হচ্ছে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন। সরকার গঠনের পরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আদের সরকারের অগ্রাধিকারের কথা বলেছেন।

ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ঢাকার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরাঞ্চলের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তিস্তার বৃহদায়তন প্রকল্পে চীন এগিয়ে এসেছে। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয় চীনের বিবেচনায় নেই।

তিস্তা ব্যারাজ

ছবির উৎস, ABUL KALAM AZAD/BBC

ভারত থেকে বাংলাদেশে যে ৫৪টি নদী প্রবেশ করেছে, তার একটি তিস্তা ভারতের সোলামো লেক থেকে উৎপন্ন হওয়ার পর সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রংপুর জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পরে এটি কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারির কাছে ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে মিলিত হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটিতে তিস্তার উপকূল ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নানা অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানি সংকট দূর করতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হতে পারে।

এটা করা সম্ভব হলে রংপুর, নিলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার কৃষি উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। রংপুর অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং নদীভাঙন কমবে। একই সঙ্গে নদীকেন্দ্রিক শিল্প ও পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়বে।

তারা এ-ও উল্লেখ করেন, তিস্তার বিস্তৃতি কোনো এলাকায় পাঁচ কিলোমিটার, কোথাও দেড় কিলোমিটার বা কোথাও তিন কিলোমিটার আছে। সেক্ষেত্রে গভীরতা বাড়িয়ে চওড়া বা বিস্তৃতি কমিয়ে দেড় বা দুই কিলোমিটার করা হতে পারে। এর ফলে তিস্তার পারে থাকা শত শত একর জমি বা ভূমি পুনরুদ্ধার হবে, যা ভূমিহীন মানুষ কিংবা শিল্পায়নের কাজে লাগানো যাবে।

বিএনপি সরকার তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নকে যেমন অগ্রাধিকার দিচ্ছে, চীনও জোড়ালো আগ্রহ দেখাচ্ছে এই প্রকল্পে সহায়তার জন্য।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে বাংলাদেশকে কৌশলে এগোতে হবে।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমানের প্রথম সফর ছিল মালয়েশিয়া। সেখান থেকেই চীনে গিয়েছিলেন তিনি।

চীনে এই সফরে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোর এবং তিস্তা প্রকল্পের বিষয়কেই স্পর্শকাতর হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

হুমায়ুন কবির বলছেন, এই দুটি বিষয়ের ক্ষেত্রে মূলত ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করতে হবে—চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বনাম ভারত। এর পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো আঞ্চলিক সমীকরণও রয়েছে। এই বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সাথে সহযোগিতায় রূপান্তর করতে পারবে, তার ওপরই সম্ভাব্য এই প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।