Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা আপাতত বাতিল হয়ে গেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, “এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন”।
ঢাকায় রোববার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম।
এর আগে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো আভাস দিয়েছিল যে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি দুই দিনের সফরে ভারত যেতে পারেন তারেক রহমান।
পাশাপাশি ঢাকায় বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রস্তুতি নেওয়ার আভাস দিয়েছিলেন।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম বলেছেন, “দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। বাংলাদেশ এই জবাবের অপেক্ষায় আছে।”
প্রসঙ্গত, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ভারতীয় লোকসভার স্পীকার দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে মি. রহমানকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এছাড়া ভারতের দিক থেকে আরও একটি আমন্ত্রণ ছিল। সেটি হলো চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে ব্রিকসের যে সম্মেলন হবে সেখানে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাতের পর এসব আমন্ত্রণের কথা জানিয়ে বলেছিলেন, তারা তখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।
কিন্তু এর মধ্যেই দুই দেশের সংবাদমাধ্যমে কর্তৃপক্ষের সূত্রকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অগাস্টের তৃতীয় সপ্তাহে দিল্লি সফরে যেতে পারেন বলে খবর বেরিয়েছিল।
ছবির উৎস, Getty Images
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যা বললো
দুপুরে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ‘উভয় দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে’।
“তবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত পাঁচই আগস্ট নতুন দিল্লিতে যেভাবে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন, তাতে এই প্রক্রিয়ার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন,” ব্রিফিংয়ে বলেন তিনি।
মি. করিম বলেন, “দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। বাংলাদেশ এই জবাবের অপেক্ষায় আছে।”
“এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্ব্যক্ত করা হয়, সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ অন্যান্য সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আমরা আমাদের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (বাংলাদেশ প্রথম) নীতি অব্যাহত রাখব,” বলেন তিনি।
তবে, মি. করিম এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি।
ফলে তার ভাষায় ‘দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ’ থাকা সত্ত্বেও কেন এখন সফরটি হচ্ছে না তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ছবির উৎস, PMO
শেখ হাসিনার পতনের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অবনতি
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।
এমন প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-দিল্লি, দুই পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল।
বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতি এবং তারও আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
পরে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লী সফর করেন। সব মিলিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকেই আস্থা বৃদ্ধির চেষ্টা দেখা গেছে।
কিন্তু এর মধ্যেই দুই সরকারের মধ্যে অস্বস্তির বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ওই সংবাদ সম্মেলনের একদিন আগেই শেখ হাসিনা যাতে ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করতে না পারে, সে বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দেশটির সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশের সরকার।
পাঁচই অগাস্ট নয়া দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব এফসিসি সাউথ এশিয়া ওই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে পরপরই শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে কথা বলার দিনেই রাতে কড়া ভাষায় একটি বিবৃতি দেয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তারেক রহমানের সরকার শুরু থেকেই ভারতে থাকা শেখ হাসিনার বক্তব্যবিবৃতি দেওয়াসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বিভিন্ন সময় দিল্লিকে অনুরোধ জানানোর কথা সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছিল।
ভারতের পক্ষ থেকে বার বারই বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে বাংলাদেশের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে তারা।

এমন পটভূমিতে গত ১০ই অগাস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
মি. ত্রিবেদী ঢাকায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর সাথে এটাই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ।
ওই বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়৷ বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে”।
আর বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেছিলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার ‘খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে’। তারা এখন সামনের দিকে তাকাচ্ছেন।
তিনি তখন বলেছিলেন, “(তারেক রহমানের ভারত সফর বিষয়ে) আমাদের আমন্ত্রণ তো আগে থেকে আছে। ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী আর লুকিং ফরোয়ার্ড, অ্যান্ড উই আর পজিটিভ।
দুই নেতা সাথে বসলে আলোচনা হলে… ডেমোক্রেসিতে ইস্যু থাকবে। ইস্যু না থাকলে ওটা ডেমোক্রেসি না। আমাদের ইস্যু হবে, বাংলাদেশের ইস্যু হবে। কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই – ভালো সম্পর্ক। আর ভালো সম্পর্ক হবে উইন উইন সিচুয়েশনে।”
ছবির উৎস, Getty Images
ওই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লিতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাত করেন দীনেশ ত্রিবেদী, যা তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে গুঞ্জন আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক ভাবেই জানালো যে পরিবেশ আরও অনুকূল হওয়ার প্রয়োজন দেখছে বাংলাদেশ।
আর সেই অনুকুল পরিবেশের শর্ত হিসেবেই মূলত বিবৃতিতে ‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তরের’ শর্তই ঢাকা তুলে ধরেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন যে, তারেক রহমানের দিল্লি সফরের প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক ফিরিয়ে এনে আলোচনার পরিবেশ তৈরি।
এখন ঢাকার দিক থেকে অনুকূল পরিবেশ এবং সেজন্য কার্যত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ দুটি শর্ত তুলে ধরার পর দিল্লির প্রতিক্রিয়া কেমন হয় তা নিয়েই কৌতূহল তৈরি হয়েছে।




