Home LATEST NEWS BANGLA নেপালে আকস্মিক বন্যার কারণ কী? সেখানে এত পর্যটক কেন গিয়েছিলেন?

নেপালে আকস্মিক বন্যার কারণ কী? সেখানে এত পর্যটক কেন গিয়েছিলেন?

4
0

Source : BBC NEWS

তিব্বত অংশে উজান লেন্ডে নদীতে বরফ ও পাথরের ধসের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী ফুলে ওঠা ভবন ও অবকাঠামোর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দৃশ্য আকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে। এই আকস্মিক বন্যা ভোতে কোশী ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জনপদগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস করে এবং ভাটির দিকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

ছবির উৎস, Skanda Gautam/SOPA Images/LightRocket via Getty Images

Published

পড়ার সময়: ৪ মিনিট

নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে।

এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪০৩ জন। নিখোঁজ ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিকের বেশিরভাগই ভারতীয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার সকালে নেপাল পুলিশের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৬৪ জনের মরদেহ ভাটির দিকে চিতওয়ান জেলায় এবং আরও ২৬ জনের মরদেহ নওয়ালপরাসি ইস্ট এলাকায় পাওয়া গেছে।

এখনও নিখোঁজ থাকা শত শত মানুষের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।

রাসুয়া অঞ্চলের ভোতেকোশি নদীর আশপাশে বাড়িঘর, সড়ক ও সেতুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, জঙ্গল সাফারির জন্য জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র চিতওয়ানসহ কয়েকটি পৌরসভায় বন্যার পানি বাড়তে থাকায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

বন্যাকবলিত এলাকায় প্রায় আট টন ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে এই আকস্মিক বন্যার কারণ মনে করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বলছে, হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত থেকেই এই দুর্যোগের সূত্রপাত।

সীমান্তের তিব্বত অংশে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮

এদিকে তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতে কাদাধসের ঘটনায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে বলে আজ সকালে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি।

নিখোঁজের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। মৃতের সংখ্যা এখন অব্দি তিনজন রয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

গিয়িরং সীমান্ত চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও পণ্য পরিবহনের প্রধান প্রবেশপথ।

বুধবার দুই দেশের সীমান্তে কাদাধস শুরু হওয়ার পরপরই চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘বড় ধরনের হতাহতের’ খবর জানিয়েছিল।

একজন বৃদ্ধা নারীকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা

ছবির উৎস, Reuters

নিখোঁজের তালিকায় ভারতীয়, অস্ট্রেলীয়, ইউক্রেনীয় ও ব্রিটিশ নাগরিক

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক রয়েছেন।

এদিকে, নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই এলাকায় ‘অল্পসংখ্যক’ নিউজিল্যান্ডের নাগরিক রয়েছেন বলে তারা জানেন এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

তবে, কারা এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো ‘সরকারি বা যাচাইকৃত তথ্য’ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

নিউজিল্যান্ডের হাইকমিশনও নেপালের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জরুরি ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

এছাড়া নিখোঁজদের মধ্যে ৫৩ জন ইউক্রেনীয় নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নেপালের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ সংখ্যা জানানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিখোঁজ ইউক্রেনীয়দের কেউ নিহত বা আহত হয়েছেন – এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের স্বজনদের কাছ থেকেও বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে, একটি ট্যুর কোম্পানির ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে তাদের একটি ভ্রমণ দলের সঙ্গে থাকা নিখোঁজ এক ডজন ব্রিটিশ নাগরিকের পরিবারের কাছ থেকে তিনি ‘হাজার হাজার’ মিসড কল পাচ্ছেন। প্রেস অ্যাসোসিয়েশন – পিএ এ তথ্য জানিয়েছে।

ওই ট্যুর অপারেটর বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা এর আগে উদ্ধারকাজের জন্য একটি হেলিকপ্টার ভাড়া করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেটি উড়তে পারেনি।

পিএ জানিয়েছে, কোম্পানিটির চারজন নেপালি ট্যুর গাইডও নিখোঁজ।

ব্যবস্থাপক কুমার অধিকারী বলেন, সকাল আটটা ৪০ মিনিট পর্যন্ত গাইডদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। ওই সময় তাদের তিব্বতের অভিবাসন দপ্তরে থাকার কথা ছিল। এরপর থেকে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

“আমরা আশা করছিলাম, ভেতরে তারা নিরাপদে আছেন,” পিএকে বলেন অধিকারী।

“কিন্তু পরে চীনা সরকারের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, তিব্বত অংশও বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে।”

অধিকারী জানান, তিনি ব্রিটিশ নাগরিকদের পরিবারের সঙ্গে ‘ধীরে ধীরে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন’, তবে তাদের দেওয়ার মতো কোনো নতুন তথ্য তার কাছে নেই।

তিনি ব্রিটিশ কনস্যুলেটের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন এবং পর্যটকদের পাসপোর্টের কপি তাদের দিয়েছেন।

“আমি খুবই দুঃখিত। আমরা এখন শুধু পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা ভাবছি,” বলেন অধিকারী। “এ মুহূর্তে আমরা খুবই কষ্টের মধ্যে আছি, গভীর কষ্টে।”

তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে গোটা গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা হয়ে গেছে।

ছবির উৎস, EPA

এমন আকস্মিক বন্যার কারণ কী?

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার কারণ হিসেবে প্রথমে ভূমিকম্পের বিষয়টি মনে করা হলেও এখন কর্তৃপক্ষ বলছে, এর সূত্রপাত হয়েছে ভূমিধস থেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা – ইউএসজিএস জানিয়েছে, “দীর্ঘস্থায়ী ভূকম্পন তরঙ্গের আরও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভূকম্পন শক্তি আসলে ভূমিধস থেকেই তৈরি হয়েছিল”।

নেপালের আবহাওয়া ও জলবিজ্ঞান বিভাগের কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ধসে পড়তে পারে, যার সঙ্গে পাথর ও অন্যান্য পলিও নিচে নেমে আসে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলছে। তবে এ ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল কী-না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

হিমবাহের হ্রদ হঠাৎ পানি ছেড়ে দিয়েছে কী-না, কিংবা নদীর প্রবাহে বাধা তৈরি হয়েছিল কী-না এমন বিষয়গুলোসহ সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের তথ্যও খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।

বন্যা কবলিত এলাকায় এত পর্যটক কেন ছিলেন?

বন্যাকবলিত এলাকাটি হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র দুটি উচ্চভূমির হ্রদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এর একটি হলো তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবর, অন্যটি নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদ।

প্রতি বছর কয়েক হাজার পর্যটক নেপাল হয়ে মানস সরোবরে যান।

বছরের এই সময়টিতে, বিশেষ করে ভারতীয় পর্যটকেরা, মানস সরোবর ভ্রমণ এবং গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নান করতে আসেন।

আলপাইন কৈলাস ট্রেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ পাণ্ডিত বিবিসিকে বলেন, এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি রুট।

পূর্ণিমার সময়টি শুভ বলে বিবেচিত হওয়ায় পর্যটকেরা সাধারণত এই সময়েই এখানে আসেন।