Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Reuters
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
নেপালের ত্রিশূলী নদীর তীরে কাদায় ভরা বিশাল টানেল বা সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের ভেতরে শত শত কর্মী আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পরিবারের সদস্যরা এখনও আশা করে আছেন যে, তাদের প্রিয়জনদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
বিবিসি নেপালি জানাচ্ছে, ভোটেকোশী-ত্রিশুলি নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ৯০০ জনেরও বেশি কর্মী গত বুধবারের বন্যার পর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছেন বলে কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন।
তবে সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে পড়াদের সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজরাম বসনেত বিবিসি নেপালিকে জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রাসুওয়াগাধি, লাংটাং, চিলিমে, আপার ত্রিশুলি ৩এ এবং আপার ত্রিশুলি ৩বি এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছিল।
ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্প এলাকায় পাহাড়ের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরি করা হচ্ছে এবং সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস পাঠানো হচ্ছে। উদ্ধারকারীদের আশঙ্কা, জীবিতদের কাছে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ সময় দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।
৩৩ বছর বয়সী প্রকৌশলী অরুস ভান্ডারি প্রকল্প এলাকায় নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্ত্রী অনুশিলা ভান্ডারি বিবিসি নেপালিকে বলেছেন, “তাকে যদি খুঁজে পেতাম। আমি চাই সে বাড়ি ফিরে আসুক।”
এদিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যা বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৩৯-এ দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটি নিখোঁজ মানুষের সংখ্যার হিসাবও সংশোধন করে ৩ হাজার ৯২৫ করেছে। তাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক।
নিখোঁজদের মধ্যে আনুমানিক প্রতি সাতজনের একজন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সোমবার জানিয়েছেন, প্রকল্প এলাকাগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
চীনা ও নেপালি সামরিক সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও এতে সহায়তা করছেন।
ছবির উৎস, Nepal Army/Reuters
জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করছিলেন এমন একজনের স্ত্রী সিতা পাণ্ডে নেপালের দৈনিক কান্তিপুর-কে বলেছেন, “আমার এখনও ৫০ শতাংশ আশা আছে যে সে বেঁচে আছে, কারণ ভেতরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে।”
নেপাল তার বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে জলবিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটি বহু বছর ধরে পাহাড়ি নদীগুলোর পাশে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করে আসছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় অন্তত ১১টি নির্মাণাধীন বা নির্মাণ শেষ হওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উদ্ধারকারীরা সপ্তাহের শেষ নাগাদ একটি সুড়ঙ্গে বাতাস পাম্প করা শুরু করেছেন। তবে আটকে থাকা কর্মীদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এটি আরও আগেই করা উচিত ছিল।
সোমবার সকালে একটি দল একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে যাওয়া একটি সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সেখানে কাউকে না পেয়ে তারা ফিরে আসে।
আটকে থাকা এক ব্যক্তির স্বজন জীবন খড়কা কান্তিপুর-কে বলেন, “যত বেশি সময় যাচ্ছে, আমাদের আশা ততই কমে যাচ্ছে। এই অভিযান আরও দ্রুত করতে হবে, কারণ আমাদের কাছে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ”।
খড়কা আরও বলেন, “উদ্ধার অভিযানে ধীরগতির বিষয়টি হতাশাজনক”।
নেপালের নেতা শাহ জানান, উদ্ধার অভিযান ‘আরও জোরদার করা হয়েছে’। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৩৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
আরেকজন পরিবারের সদস্য, প্রিয়া খারেল, তার ভাই মিলানের খবরের জন্য উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছেন। বন্যার সময় মিলান ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছিলেন।
প্রিয়া বিবিসি নিউজ নেপালিকে বলেন, “জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যারা ফিরে এসেছেন, তারা বলেছেন সুড়ঙ্গের ভেতরে মানুষ ছিল। তাই আশা আছে—সেনাবাহিনী যদি দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে, তাহলে তাদের বাঁচানো সম্ভব।”
ছবির উৎস, Reuters
অস্ট্রেলিয়ান প্রকৌশলী আর্নল্ড ডিক্স দূর থেকে নেপালি কর্তৃপক্ষকে ভূগর্ভস্থ অনুসন্ধান অভিযানে সহায়তা করছেন। তিনি বলেছেন, উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়ছেন।
বিবিসি রেডিও ৪-এর ওয়ার্ল্ড অ্যাট ওয়ান অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, “ওগুলোর প্রকৃত চিহ্নই হারিয়ে গেছে- সবকিছু যেন উধাও। জায়গাটি দেখতে যেন চাঁদের পৃষ্ঠের মতো।”
ডিক্স বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা গেলে সেগুলোতে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। সাধারণত এর জন্য খনন এবং ‘বড় বড় পাথরে বিস্ফোরণ ঘটাতে’ হয়।
তিনি বলেন, “এখানে এমন পাথর রয়েছে যেগুলো বাড়ির চেয়েও বড়- আমি জীবনে আগে কখনও এমন কিছু দেখিনি। এটি সত্যিই এক অসাধারণ অভিযান।”
তবুও ভূগর্ভে আটকে থাকা মানুষদের নিয়ে তিনি কিছুটা আশাবাদী। কারণ ওপরের প্রবল বন্যার ধাক্কা থেকে ভূগর্ভস্থ পরিবেশ তাদের কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে থাকতে পারে।
এদিকে বন্যার মূল আঘাতের স্থান থেকে অনেক দূরে, ভাটির দিকে অবস্থিত চিতওয়ান জেলায় অস্থায়ীভাবে মৃতদেহ দাফন করা হচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলের নদীগুলো দিয়ে প্রায় তিনশ মৃতদেহ ভেসে এসে ওই এলাকার তীরে জমা হয়েছে।
পচনের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সাদা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ও মাস্কও পরা কর্মীরা শনাক্ত করা যায়নি এমন মৃতদেহগুলো ট্রাকে তুলে দিচ্ছিলেন।
ছবির উৎস, Getty Images
শহরের বাইরে একটি জঙ্গলের বড় অংশ খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা শনাক্ত না হওয়া মৃতদেহগুলোর কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ করেন।
জেলা প্রধান কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বিবিসি নেপালিকে বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতদেহ শনাক্ত হওয়ার পর স্বজনরা তাদের প্রিয়জনের মরদেহ ফেরত নিতে পারবেন।
তিনি বলেন, “আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ফ্রিজার নেই…. তাই অস্থায়ীভাবে দাফন করাই ছিল শেষ বিকল্প। আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সত্যিই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি।”
তিব্বতে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৬ এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৫৪৬ বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
চীনে বন্যার ভিডিও ব্যাপকভাবে সেন্সর করা হয়েছে। অনলাইনে কেউ সরকারি হিসাবে দেওয়া সংখ্যার চেয়ে মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি বলে অনুমান করলে চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ‘প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ নিচ্ছে।
এসব শাস্তির মধ্যে সতর্কবার্তা, জরিমানা এবং অল্প সময়ের জন্য আটক রাখার মতো ব্যবস্থা থাকতে পারে।
নেপালেও কর্তৃপক্ষ বন্যা সম্পর্কে যেসব অনলাইন কনটেন্টকে ভুল তথ্য বা গুজব হিসেবে মনে করছে, সেগুলো সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে।




